ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাড়েনি তাদের আয়। ফলে খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন নানা পেশার মানুষ। এই সংকট এতটাই প্রকট হয়েছে যে, বহু মানুষ রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে জীবিকা নির্বাহের কথা ভাবছেন।
এদেরই একজন তরিকুল ইসলাম। দেড় বছর আগে পোশাক ব্যবসায় লোকসানের পর ৫৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি রাইড শেয়ারিং করে চার সন্তানের ভরণপোষণ শুরু করেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। এর ফলে তার আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। সম্প্রতি জ্বালানিসংকট কিছুটা প্রশমিত হলেও তার আয়ের ক্ষেত্রে কোনো তারতম্য ঘটেনি। কারণ ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় ঢাকায় বসবাসরত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়ের খরচ চালানো তার জন্য এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তরিকুল বলেন, ‘রাইড-শেয়ারিং করে আমাদের পরিবার মোটামুটি ভালোই চলছিল। কিন্তু জ্বালানিসংকট শুরুর পর আমাকে এক দিন তেল কিনে পরের দুই দিন চালাতে হয়েছে। ফলে এক দিন আমাকে বসে থাকতে হয়, যা আমার আয় কমিয়ে দেয়।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
বাংলাদেশের মতো আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব বহুমুখী। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়, যা যুদ্ধের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৬ সালে এই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ করেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে। বাংলাদেশের
অর্থনীতিতে জ্বালানিসংকটের চাপ
জ্বালানিসংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে অফিস ও শপিং মল খোলা রাখার সময়সীমা কমিয়ে আনার মতো কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এলএনজি ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত ১.০৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কাছ থেকে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে। ভারত বর্তমানে রাশিয়া থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে তার উৎসে বৈচিত্র্য এনেছে। এদিকে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও ডিজেলের অভাবে লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে এবং রাতে শপিং মল খোলা রাখার সময় সীমিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, ‘পূর্বের বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে এই যুদ্ধের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।’ তিনি সতর্ক করেছেন, জ্বালানির দাম বাড়লে তা কৃষক ও কৃষি খাতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
রপ্তানি কমে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পোশাকশিল্প
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পোশাক খাতও এই জ্বালানিসংকটে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী জানান, ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি ৫ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ক্রেতারা সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়লে ভারত, ভিয়েতনাম বা ক্যাম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বাজার দখল করে নিতে পারে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ব্যবসায়িক ব্যয় ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কারখানার উৎপাদন ৩০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে।
অ্যারাইভাল ফ্যাশন লিমিটেডের পরিচালক আলভি ইসলাম জানান, পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামাল যেমন সেলাইয়ের সুতা ও পলি ব্যাগের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি লোডশেডিং মোকাবিলায় ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালাতে গিয়ে খরচ বহুগুণ বেড়েছে। তার কোম্পানি এখন প্রতিদিন গড়ে অন্তত চার ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে বাধ্য হচ্ছে।
জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় শ্রমিকরা
পোশাকশ্রমিক মোসাম্মত রুনা (৩৫) তার পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। তিনি এবং তার স্বামী মিলে মাসে প্রায় ৪০০ ডলার আয় করেন, যা দিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার চলে। রুনা বলেন, ‘আমাদের মতো লাখ লাখ মানুষ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমাদের চাকরি চলে যেতে পারে। আমরা নির্দোষ মানুষ, আমাদের কেন এই যুদ্ধের শিকার হতে হবে?’
সূত্র: এপি