ঢাকা ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪

‘কালো? তা সে যতই কালো হোক’

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৪, ১১:৪৫ এএম
‘কালো? তা সে যতই কালো হোক’
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণকলি নামের একটি কালো মেয়েকে নিয়ে যে গান রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে যে সৌন্দর্য তিনি অবলোকন করেছিলেন, তার ঠিক ১২৪ বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে নয়া আয়কর আইনের প্রথম তফসিলে ‘‘অংশ ৩’ হিসেবে অপরিদর্শিত পরিসম্পদ প্রদর্শন’’ (ব্যবহারিক অর্থে কালোটাকা সাদা করা) শিরোনামে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজনের বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত ঘটেছে। 

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে, টাকার আয় এবং আয়ের উৎস ঘোষণা না দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাপ্য কর ফাঁকি দেওয়া হয় বা যায়, যে টাকা অবৈধভাবে অর্জিত, সে টাকাই কালোটাকা। মূলত এবং মুখ্যত এই কালোটাকাই যেকোনো অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য, প্রতারণা, বঞ্চনা, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ব্যত্যয়ের প্রমাণক, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও ন্যায়নীতিনির্ভরতাবিহীনতারই সূচক এবং অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে বিচ্যুতির মাধ্যমে সমূহ ক্ষতি সাধনের প্রভাবক ভূমিকা পালন করে এ কালোটাকা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আবহমান কাল থেকে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নানান আঙ্গিকে বিচার-বিশ্লেষণের অবকাশ উঠে আসে। 

কালোটাকা সাদা করার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নিয়ে নানান মতভেদ যাই-ই থাকুক না কেন, এর বিধিব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সামাজিক অর্থনীতি তথা রাষ্ট্রের এখতিয়ার, সরকার পরিচালিত রাজনৈতিক অর্থনীতির হওয়া উচিত নয়; অবশ্যই কালোটাকা সমাজের বা সরকারের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনৈতিকতা ও অব্যস্থাপনার সৃষ্টি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়-ন্যায্যতা ও নীতিনির্ভরতায় বিপুল ব্যর্থতার প্রতিফল। 

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক নজির থেকে দেখা যায়, তুলনামূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাওয়ার পর হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, ইরান, নিকারাগুয়া, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে পেরেছে। এসব দেশ প্রথম পর্বে কালোটাকাকে প্রযত্ন দিতে সাদা করাকে গুরুত্ব দিত, পরবর্তীকালে শক্ত হাতে কালোটাকার সৃষ্টির উৎস বন্ধ করার রাষ্ট্রীয় প্রতিবিধান জোরদার করার ফলে সেসব দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে চমকপ্রদ গতিসঞ্চার হয়েছে। 

আরও খোলাসা করে বলা যায়, যেমন সুহার্তোর ১৯৬৫-৯৮ সালের ৩৩ বছরের শাসনকে ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নতত্ত্বে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ আখ্যায়িত হতো, গত দুই দশকে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হওয়ায় সেখানে এখন অর্থবহ উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে। 

আমাদের এই উপমহাদেশে ১৯৫৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত কর আহরণ পদ্ধতি সংস্কার কর্মসূচির আওতায় তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার দুর্নীতিতে নিমজ্জিত অর্থনীতি থেকে কালোটাকা সাফ করার উদ্যোগ নিয়েছিল, দুর্নীতি দমনের ঘোষণা দিয়ে আসা সামরিক সরকার তা লেজেগোবরে মিশিয়ে ফেলে। সেখানে উদ্দেশ্য ও বিধেয়র মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। 

ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৯৭ সালে ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম অ্যান্ড ইমপোজিশন অব ট্যাক্স অ্যাক্ট জারি করে। ভিডিআইএস প্রবর্তনের পর ভারতের কম্পট্রোলার জেনারেল তার এক প্রতিবেদনে এ স্কিমের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি এই ব্যবস্থাকে as abusive and a fraud on the genuine taxpayers of the country বলে অভিমত দেন। [সূত্র: Rediff.com » Business » Cut your tax bill to just 2-3%, by Sunil Jain May 31, 2004 12:52]

বাংলাদেশে বছর বছর কালোটাকাকে কর প্রদানের সময় ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ সংজ্ঞায়িত করে গুরুতর অপরাধটিকে হালকা করার অবস্থান নেওয়াকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা হচ্ছে। সংবিধানের ২০(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ 

সংবিধানের এ বিধানমতে ‘অনুপার্জিত আয়’ যদি কালোটাকা হয়, তাহলে কালোটাকার সংজ্ঞা ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ এবং এ সংজ্ঞা দুর্নীতির সঙ্গে কালোটাকার যে ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে, সেটাকে অনেকটাই গৌণ বা লঘু করে দিচ্ছে কি না, তা আইনবেত্তাদের দেখা এবং এর পরীক্ষা পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে সুশীল সমাজ থেকে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে। 

এটা অনস্বীকার্য যে, অনেক সময় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের ওপর যেমন জমিজমা, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, দোকান ইত্যাদি রিয়েল এস্টেট ক্রয়-বিক্রয়ে প্রকৃত দাম না দেখিয়ে কম দাম দেখালে রেজিস্ট্রেশন খরচ, স্ট্যাম্প খরচ, সম্পদ কর ও ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া যায়। 

এসব ক্ষেত্রে কালোটাকাকে ‘অপ্রদর্শিত অর্থ’ বলাই সংগত এবং তা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই বছর বছর সময় দিয়ে, বিদ্যমান করহার হ্রাস করে নয়। উপরন্তু জরিমানা দিয়ে তো বটেই। আয়কর আইনে প্রযোজ্য কর, জরিমানা পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শনের সুযোগ রাখাই আছে।

প্রসঙ্গত, ২০০৭-০৮ অর্থবর্ষে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০০৮) প্রযোজ্য করসহ বছরপ্রতি ১০ শতাংশ হারে (সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ) জরিমানা দিয়ে এ-জাতীয় অপ্রদর্শিত আয় ‘প্রদর্শন’ বা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সময় শেষ হওয়ার পর যাদের কাছে অপ্রদর্শিত আয়ের টাকা পাওয়া যেত, তাদের বিরুদ্ধে আয়কর আইনেই জেল-জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল।

সে সময় এ স্কিম ইতিবাচক ফলাফল এনে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সময়সীমা অবারিত করে দিয়ে, জরিমানা না দিয়ে, হ্রাসকৃত হারে কর দিয়ে এবং অপ্রদর্শিত আয়ের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না, এ ধরনের ইমিউনিটি দিয়েও কালোটাকা সাদা করায় সাড়া পাওয়া যায়নি। কালোটাকার রাজনৈতিক অর্থনীতির এই চেহারা ও চরিত্র সবার জন্যই বেশ উদ্বেগজনক। 

হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ, এমএলএম কেলেঙ্কারি, রাতারাতি মালিকানা দখলকারী ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির সাগর চুরির পর, বেশি দিন আগের কথা নয়, ক্যাসিনোকাণ্ড, প্রখ্যাত প্রতারক, স্বনামধন্য গাড়িচালক ও গোল্ডেন ব্যক্তিনিচয়ের ছিটেফোঁটা কেচ্ছাকাহিনি থেকেও তো অনুমান করা চলে কী ধরনের আয়বৈষম্য বৃদ্ধি তথা ক্ষরণের শিকার হতে চলেছে এই অর্থনীতি। 

স্বেচ্ছা সহনশীল সলিলা (রেজিলিয়েন্ট) শক্তির জোরে আমজনতার ইমিউন পাওয়ার এখনো বলশালী বলেই অর্থনীতি আপাতত স্ট্রোক করছে না। এটাকেই আত্মতুষ্টির হেতু ধরে নিয়ে অর্থনীতির মৌল সহায়ক নৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকাটাই হবে, এর ভালো থাকতে দেওয়ার অন্যতম উপায়। প্রতিকার, প্রতিবিধান ছাড়া কালোটাকা অর্থনীতির জন্য অর্থনীতির ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না। 

সৎ ও নিয়মিত করদাতা ১৫-২৫ শতাংশ কর দেবেন আর কালোটাকার মালিক ১০-১৫ শতাংশ কর দিয়ে টাকা সাদা করতে পারবে, এ নীতির ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত যে বছরের পর বছর ৭-৮ শতাংশের নিচে রয়ে যাচ্ছে, তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এহেন অনৈতিক নীতির পরিপোষণ এবং কালোটাকার দাগি আসামিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়াও একটি।

কয়েক বছর আগে কালোটাকায় কেনা স্থাবর সম্পত্তি এখন নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হলে বিগত বছরগুলোতে এ সম্পত্তি ব্যবহারজাত আয়ের ওপর কর আহরণের বিষয়েও ছলচাতুরির প্রশ্রয় দেওয়া হবে। এই নজিরের ফলে এ ধরনের খাতে কর প্রদানে বিলম্ব বা বিরত থাকার প্রবণতা বাড়বে। 

যারা রাষ্ট্রের সব নিয়মকানুন মানার বাধার বিন্ধাচল পেরিয়ে স্থাবর সম্পত্তি, অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল, হাইটেক পার্ক, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সেই পরিশ্রম ও কর প্রদান অপমান, অবমাননার শিকার হবেন যদি এখন বিনা ব্যাখ্যায়,  জরিমানা ও কর প্রণোদনা দিয়ে ‘আধার দিয়ে মাছ ধরার মতো’ উপায়ে কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে, বিশেষ করে কর রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে নৈতিক দাবি দুর্বল হবে এবং তার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। 

অর্থনীতিতে কালোটাকা ফিরিয়ে আনার প্রথম ও প্রধান উপাদেয় উদ্দেশ্য জরিমানা ও নিয়মিত কর আদায়, তারপর পুষ্টিকর খাতে সেই অর্থ বিনিয়োগ। কয়েক বছর আগে কালোটাকায় কেনা স্থাবর সম্পত্তি কিংবা পুঁজিবাজারে মাত্র সীমিত সময়ে লক-ইন করে রাখা বিনিয়োগ থেকে অর্থনীতির জন্য লাভের চাইতে ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ নীতিভ্রষ্টতার দোষে ক্ষতিই বেশি হয়েছিল বলে ইতোমধ্যে প্রতীয়মান হয়েছে। 

জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের সম্পদের পাহাড়চুম্বী উন্নতি আয়বৈষম্যের বাহ্যিক এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির গজেন্দ্রগামিতার প্রমাণ- এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। নানান আঙ্গিক ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরীক্ষা পর্যালোচনায় কালোটাকা পুষ্টিসাধনের নিমিত্তে অর্থনীতিতে ফিরে আসার পরিবর্তে অর্থনীতি বরং কালোটাকামুখী হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়েই চলেছে। কালোটাকা গণতন্ত্রসহ সব নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সংক্রমণ এবং দখল করার পথে ধাবমান। 

ভারতের সিঅ্যান্ডএজি এবং দেশের সুশীল সমাজের পর্যবেক্ষণ (বণিক বার্তায় ২৩ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে প্রকাশিত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলামের নিবন্ধ দ্রষ্টব্য) অনুসারে বলা যায়, সামান্য কিছু অর্থ দুর্নীতিবাজ হ্রাসকৃত কর দিয়ে বৈধ করে নিলে ওই বৈধকরণের নথিপত্রগুলো তাদের হাজার হাজার কোটি কালোটাকা নিরাপদে রেখে দেওয়ার ভালো দালিলিক সুরক্ষা দিতে পারে। 

ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে কালোটাকা আড়াল করার ভালো ব্যবস্থার সুবাদে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জনের মানেই হলো একটা সুনির্দিষ্ট সমঝোতা-নেটওয়ার্কের সহায়তায় দুর্নীতিবাজরা নিজেদের সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমর্থ হচ্ছে। এটি দৃশ্যত দুর্নীতিবাজদের জন্য সম্ভাব্য দুর্নীতি দমনের জাল থেকে পলায়নের পথ খুলে দেওয়ার শামিল। এ ব্যবস্থা রাখার মাধ্যমে কালোটাকার মালিকদের সিগনাল দেওয়া হচ্ছে যে, এ সুবিধা নিলে তাদের দুর্নীতিকে দমন করা হবে না। 

‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে’- এই চিন্তাচেতনাকে আড়াল করতে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র প্রবণতায় কালোটাকা সৃষ্টির প্রেরণা ও প্রযত্ন প্রদানের নীতি সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘দুর্নীতিজাত অনুপার্জিত আয়’ এর উৎস, উপায় ও উপলক্ষ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করা। অবৈধভাবে অর্জিত বা আয়ের জ্ঞাত সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন যেকোনো অর্থবিত্তকে কালোটাকা অভিহিত করার যে আইনি অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ সেটাই সাংবিধানিকভাবে বেশি যৌক্তিক। 

এর আলোকে দুর্বৃত্তায়নের ভয়াবহ বেড়াজাল থেকে আইনের আওতায় ‘মার্জিনখোর রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর সুশীল সেবক (আমলা) এবং মুনাফাবাজ, কালোবাজারি, চোরাকারবারি, ব্যাংকঋণ লুটেরা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের’ অপরাধের শাস্তি বিধান করা হলে সমাজে ও অর্থনীতিতে একটা ইতিবাচক মেসেজ যাবে। জরিমানা ছাড়া অত্যন্ত হ্রাসকৃতহারে কর প্রদানের সুযোগ এবং ‘অর্থের উৎস নিয়ে আয়কর কর্তৃপক্ষসহ অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না’ জাতীয় বিধান জারি বলবৎ থাকলে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ-এর কনসেপ্ট ‘নৈতিক বিপদ’-এর উপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাবে। 

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

কোটা বহাল বা বাতিল এখন আদালতের বিষয়

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:১৪ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:১৪ পিএম
কোটা বহাল বা বাতিল এখন আদালতের বিষয়
ড. মিজানুর রহমান

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বহাল কিংবা বাতিল কী আসলেই আদালতের নাকি সরকারের বিষয়? সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১০ জুলাই এক আদেশের মাধ্যমে আপাতত ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্রটি পুনর্বহাল করেছেন। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, কোটা বহাল বা বাতিলে আদালতের করণীয় কিছুই নেই। এই যেমন কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কোটা বহাল বা বাতিল আদালতের এখতিয়ারভুক্ত নয়। 

তারা মূলত সরকারের নির্বাহী বিভাগের কাছ থেকেই কোটাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান চান। আবার একজন দৈনিক প্রথম আলোতে একটি বিশ্লেষণ লিখে বলেই ফেললেন, কোটা রাখতে কিংবা বাতিল করতে বলা কোনোটিই আদালতের মীমাংসার বিষয় নয় (প্রথম আলো, ১০ জুলাই, ২০২৪)। এ ধরনের বক্তব্য বা প্রবন্ধ জনমনে, বিশেষ করে আন্দোলনরত ছাত্রদের বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের এখতিয়ার প্রসঙ্গে সংবিধান কী বলছে, সে প্রসঙ্গে আরও আলোচনা করা প্রয়োজন।     

প্রথমত, মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ের সাংবিধানিকতা যাচাই করার অধিকার সর্বোচ্চ আদালতের রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো সবার জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা। সে উদ্দেশ্যে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বিভিন্ন মৌলিক অধিকার সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ভাগের বৈশিষ্ট্য হলো, এতে বর্ণিত অধিকারগুলো বাস্তবায়ন করতে সরকার বাধ্য এবং তা আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যায়। 

সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অনুচ্ছেদ ২৮ ও ২৯ অনুযায়ী রাষ্ট্র চাইলে নাগরিকদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া কোনো অংশকে প্রজাতন্ত্রের কোনো কাজে অংশগ্রহণের বিশেষ সুযোগ দিতে পারে। একেই আমরা কোটাব্যবস্থা বলি। যেহেতু সংবিধানে এ অনুচ্ছেদদ্বয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত এবং আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য, তাই রাষ্ট্র কোনো অনগ্রসর অংশের নাগরিকদের কোটা না দিলে বা কোটা থেকে অহেতুক বাদ দেওয়া হলে সেই অংশের মানুষ আদালতের মাধ্যমে তা দেওয়ার বা পুনর্বহালের আবেদন করতে পারেন। কাজেই কোটা বহাল বা বাতিলে আদালতের যে একটি ভূমিকা রয়েছে তা অনস্বীকার্য। 

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, সংবিধান নিয়ে যারা নিয়মিত চর্চা করেন তারা জানেন সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ের ব্যাখ্যা সংবিধানের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সাহায্য করতে হবে। অর্থাৎ ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করতে গেলে আমাদের অবশ্যই দ্বিতীয় অধ্যায়ের অনুচ্ছেদ ১০ (সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি), ১৪ (কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি) ও ১৯ (সুযোগের সমতা) বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুচ্ছেদ ১৯(১)-এ বলা হয়েছে, সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবে। অনুচ্ছেদ ১৯(২)-এ মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপের জন্য নাগরিকদের মধ্যে সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার নিমিত্তে এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে- এই কথা বলা হয়েছে। 

সবশেষে অনুচ্ছেদ ১৯(৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৯ বিবেচনায় নিলে অনুচ্ছেদ ২৮ ও ২৯-এর যে বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন তা সংসদ নয় একমাত্র আদালতই দিতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাংবিধানিক প্রাধান্য (অনুচ্ছেদ ৭)। অর্থাৎ সংবিধানই প্রধান, সংসদ নয়। সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, কোনো আইন যদি সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদকে আইন প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেছে। 

১৯৮৯ সালের সংবিধান সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা প্রথম মামলা আনোয়ার হোসেইন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশে বলা হয়েছিল, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ কখনোই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন তৈরি করতে পারবে না, এমনকি এভাবে সংবিধানও সংশোধন করা যাবে না। অর্থাৎ কোনো আইন বা কোনো কাজ সংবিধানের চৌহদ্দি লঙ্ঘন করলে সুপ্রিম কোর্ট সেটিকে অসাংবিধানিক বিধায় বাতিল করতে পারবেন। সে কারণেই সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালের কোটা বাতিলে জারি করা পরিপত্রের সাংবিধানিকতা যাচাই করতে পারেন। ৭ নম্বর অনুচ্ছেদটি সংবিধানের প্রথম ভাগে রয়েছে এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। তাই কোনোভাবেই এর ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, কোটা থাকবে কী থাকবে না, থাকলে কার জন্য থাকবে, এই বিষয়গুলো যে অবশ্যই জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট- এ কথাটা নিশ্চয়ই কেউ অস্বীকার করবেন না। একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন, সাধারণ অর্থে জনস্বার্থ হলো জনসাধারণের জন্য কল্যাণকর কোনো কাজ। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার আমাদের সাংবিধানিক আইনের অংশ। যে আদেশের বলে ২০১৮ সালের পরিপত্রটি পুনর্বহাল হলো, সেটি একটি জনস্বার্থমূলক মামলার আদেশ। 

২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্রটির মাধ্যমে রাষ্ট্র সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে তাদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নিয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার এখতিয়ার বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে আদালতের রয়েছে। সুতরাং এই জনস্বার্থ মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার আমাদের রাষ্ট্রে অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন হঠাৎ করে বলে দিলেই হবে না যে, কোটা সংস্কারের বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে নেই, এটি সরকারের নির্বাহী বিভাগের একক এখতিয়ারের বিষয়।  

কোটা প্রসঙ্গে ওপরে উল্লিখিত প্রথম আলোর বিশ্লেষণে সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদদ্বয়ের সঙ্গে ৫৯ অনুচ্ছেদের তুলনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, সংবিধান ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দেশের অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান সৃষ্টি করার অধিকার দিয়েছে। তবে রাষ্ট্র অবশ্যই এ ধরনের বিধান তৈরি করবে এমনটা বলা হয়নি। 

অপরদিকে, ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ আইন তৈরি করে স্থানীয় প্রশাসনের মাঝে বিভিন্ন ক্ষমতা বণ্টন করতে পারে। প্রথম আলোতে লেখক দাবি করেছেন, ৫৯ অনুচ্ছেদের বিষয়ে আদালত যেমন সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করতে পারে না, তেমনি  ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের বিশেষ সুবিধা প্রদান, সংস্কার বা বাতিলের ক্ষেত্রে আদালত সরকারকে বাধ্য করতে পারবে না। এই বক্তব্যটি সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্তিকর। 

আইনের একটি সহজ পাঠ হলো, কোনো আইনের একটি অনুচ্ছেদের অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে আইনটির  প্রস্তাবনা, সেই অনুচ্ছেদটি যে ভাগের অংশ সে ভাগের শিরোনাম, সে ভাগের উদ্দেশ্য, এর চৌহদ্দি এবং সাংবিধানিক গুরুত্ব বিবেচনা করা আবশ্যক। ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অংশ, এ ভাগের শিরোনাম ‘মৌলিক অধিকার’ এবং এটি আইন দ্বারা বলবৎযোগ্য। আগেই উল্লেখ করেছি যে, সংক্ষুব্ধ অনগ্রসর অংশের জনগণ আদালতে ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের বিশেষ সুবিধার জন্য মামলা করতে পারেন। 

যদি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির দাবি আইনসম্মত মনে হয়, তাহলে আদালত সরকারকে সে বিষয়েও নির্দেশনা দিতে পারেন। অর্থাৎ আদালত বলতে পারেন যে, যারা বিশেষ সুবিধা দাবি করছে তারা আদৌ অনগ্রসর অংশ কি না বা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে কি না। অন্যদিকে সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ চতুর্থ ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছদের অংশ। এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো নয়, এবং সংসদ এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন তৈরি না করলে কাউকে মামলা করার অধিকার দেওয়া হয়নি। 

এটির ক্ষেত্রে আদালত সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করতে পারে না। সুতরাং উল্লিখিত ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে ৫৯ অনুচ্ছেদের তুলনা অমূলক। অতএব, এ কথা বিনা দ্বিধায় বলা যায়, আদালত সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন দেখভাল করার জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত। 

কোটা বহাল বা বাতিলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে একই পত্রিকায় বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, কোটার শতকরা পরিমাণ সরকারকেই নির্ধারণ করতে হবে, তা আদালত ঠিক করে দেবেন না। তবে কোটার সাংবিধানিকতা প্রশ্নে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে। সরকার চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী ২০১৮ সালের পরিপত্রটি পুনর্বহাল করে কিছুদিন পরেই নতুন একটি পরিপত্র জারি করতে পারেন, যার মাধ্যমে কোটা সংস্কার করা হবে। 

তার মতে, আইন করলে ভবিষ্যতে সমস্যা হতে পারে, কারণ পরিস্থিতি সব সময় একই রকম না-ও থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে আইন পরিবর্তন করা অনেক কঠিন হবে। তাই পরিপত্র দিয়েই সমস্যা সমাধান সম্ভব। তিনি প্রকারান্তরে আদালতের এখতিয়ার মেনে নিয়ে রায়ের পর সরকার কী করবে তার নির্দেশনা দিয়েছেন। 

অতএব, কোটা পদ্ধতি বহাল বা বাতিলের বিষয়ে আদালতের ভূমিকা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। তবে এটি শুধু আদালতের কাজ নয়। প্রাথমিক কাজ অবশ্যই সরকারের। সরকার তা ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র জারির মাধ্যমে করেছে। এখন দেখার বিষয় যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারে সরকারের এ সিদ্ধান্ত কতটুকু সাংবিধানিক হয়।

নানা রকম অসমতায় নিমজ্জিত একটি দেশের সংবিধানে কোটাব্যবস্থা তাই একটি অলংকারস্বরূপ। তবে এটি কতটুকু যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্যভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই বিষয় নিয়ে সাংবিধানিকভাবে আলোচনার এখতিয়ার আদালতকে দেওয়া হয়েছে। তাই সেই প্রসঙ্গে কাউকে বিভ্রান্ত না করে বরং সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। আশা করি, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাই বিবেচনা করবেন। 

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পুতিনের যুদ্ধাপরাধ

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:১১ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ১২:১১ পিএম
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং পুতিনের যুদ্ধাপরাধ
গর্ডন ব্রাউন

চলতি সপ্তাহেই ইউক্রেনের কিয়েভে শিশু হাসপাতালে বোমা হামলা করেছে রাশিয়া। যুদ্ধাপরাধের সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হতে পারে ভ্লাদিমির পুতিনের। তিনি শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেন না। ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলন শুধু ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্যই নয়, রুশ নৃশংসতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) তদন্তকে আরও গভীর ও ত্বরান্বিত করার উত্তম সময় এখনই।

কিয়েভের ওখমাতদিত শিশু হাসপাতালকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই হামলায় হতাহতদের মধ্যে রয়েছে ট্রান্সপ্লান্ট করা শিশু, যারা ক্যানসার ও কিডনি রোগের জন্য চিকিৎসারত ছিল। টিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ধ্বংসাবশেষে উদ্ধার অসুস্থ শিশুদের মধ্যে অধিকাংশই আইভি রোগে আক্রান্ত। তাদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয়। ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার একাধিক নৃশংস হামলায় কমপক্ষে ৪১ শিশুর প্রাণহানি ঘটে এবং ১৬৬ জন আহত হয়।  

ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেল অ্যান্ড্রি কোস্টিন আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটর করিম খানের সঙ্গে শিশু হাসপাতালে হামলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আইসিসি প্রসিকিউটর অফিসে কিয়েভ এবং ইউক্রেনের অন্যান্য শহরে হামলার সব তথ্য ইতোমধ্যে পাঠিয়েছি।’ 

এ থেকে বোঝা যায়, রাশিয়ান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কতটা নির্বিচারভাবে করা হয়েছে। ইউক্রেনজুড়ে নিহত শিশুর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪০ শতাংশের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহত ছেলেমেয়ের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০।

যখন নিরপরাধ শিশুদের হত্যা, ইউক্রেন এবং অন্যত্র স্কুল ও হাসপাতালে নির্বিচারে হামলা প্রত্যক্ষ করি, তখন দুর্বলদের অধিকার সম্পর্কে উদ্বিগ্ন কেউ নীরব থাকতে পারে না। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের অধিকারগুলো প্রায়ই মানুষ ভুলে যায়। যেমনটি গাজার ক্ষেত্রে ঘটেছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেনের হাসপাতালে হামলার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তারা কিয়েভে শিশু হাসপাতালে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করছে। 

তাদের দাবি, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণে ত্রুটির কারণে শিশু হাসপাতাল আক্রান্ত হয়। তারা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু খুব বেশি দিন করতে পারবে না। কিয়েভ কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা রাশিয়ান ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেয়েছে।

ইতোমধ্যে আইসিসি রাশিয়ায় ইউক্রেনের শিশুদের নির্বাসন, অবৈধভাবে অপহরণের জন্য পুতিন এবং শিশুদের অধিকারবিষয়ক রাশিয়ান কমিশনার মারিয়া লভোভা-বেলোয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। গত মাসে আইসিসি রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইউক্রেনের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় হামলার জন্য তাদের সামরিক প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। 

অখণ্ডনীয় প্রমাণ আছে যে, রাশিয়ান সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে  জোরপূর্বক অপহরণ এবং ইউক্রেনীয় যুদ্ধবন্দিদের যৌন সহিংসতা, নির্যাতন, দুর্ব্যবহার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ইউক্রেনে রাসায়নিক অস্ত্র এবং ক্লাস্টার বোমার অবৈধ ব্যবহারও তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাশিয়ার এই বিষয়গুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয় তাহলে এটি যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। 

এগুলো পুতিনের মূল অপরাধ। ইউক্রেন আক্রমণের মতো বেআইনি কাজের জন্য দায়ী রাশিয়ান রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের বিচারের অনুমতি দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকবে। কিন্তু আইসিসির বিচার যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

রাশিয়ার আগ্রাসনের অপরাধের ওপর আইসিসির এখতিয়ার সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, যদি না আগ্রাসী রাষ্ট্র এবং ভুক্তভোগী রাষ্ট্র উভয়ই বিচারকার্যে অংশগ্রহণ না করে। রাশিয়া অবশ্য এ ব্যাপারে স্বাক্ষর করেনি। এখন পর্যন্ত এই মৌলিক অপরাধের জন্য পুতিনকে দায়বদ্ধ করার মতো উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা বা চুক্তি হয়নি।

ইউরোপ কাউন্সিল পর্যবেক্ষণ করছে, আইসিসি কী পদক্ষেপ নিতে পারে তা দেখার জন্য। গত মে মাসে ইউরোপ কাউন্সিলের মন্ত্রীদের কমিটি তার মহাসচিবকে ইউক্রেনের মধ্যে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং এ-জাতীয় ট্রাইব্যুনালের সংবিধির জন্য খসড়া চুক্তি তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল। কাউন্সিল বলেছে, এই চুক্তিটি ইউরোপ কাউন্সিলের সদস্য নয়, এমন অন্যান্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও চুক্তির আওতায় থাকতে পারে। 

ইউরোপ কাউন্সিলের দেশগুলো রাশিয়ার নৃশংসতার অসংখ্য প্রতিবেদন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ইউক্রেনে রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের সুস্পস্ট প্রমাণ উল্লেখ করেছে। আগ্রাসনের অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের সেই প্রক্রিয়াটিও থাকতে হবে, যার মাধ্যমে পুতিনের অপরাধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ইউরোপ কাউন্সিলের ৪০টিরও বেশি সদস্যরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আগ্রহী রাষ্ট্র অংশীদারদের মধ্যে পরামর্শ করছে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপের কাউন্সিলের পরিকল্পনায় ইউক্রেনের সঙ্গে যোগদান করে ভ্লাদিমির পুতিনকে জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে। 

পুতিন এবং তার অনুসারীদের এ ধরনের আগ্রাসনের অপরাধ থেকে বিরত রাখার জন্য সব রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিলের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি মস্কো সফর করে পুতিনের শাসনামলকে বৈধতা দেবেন। 

আমি বিশ্বাস করি, যুক্তরাজ্যের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রসচিব ইউক্রেনে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানকে সমর্থন করবেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যে অপরাধ করেছেন, তার বিচার করার তাগিদকে আরও বাড়িয়ে তুলবেন। এটি একটি বার্তা দেবে যে, আগ্রাসনকারীদের বিচার এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যুদ্ধাপরাধীদের জন্য কোনো ছাড় নেই। প্রেসিডেন্ট হোক বা না হোক তার বিচার হতে হবে। পুতিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

লেখক: যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের বিশ্বদূত
দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: সানজিদ সকাল

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যকরণীয়

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৪, ১২:০৬ পিএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৪, ০২:০৯ পিএম
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যকরণীয়
ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয় একটি বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে। অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা সবই বিধ্বস্ত ছিল। সব দিক দিয়ে অচলায়তন। সেই অবস্থা থেকে পুনর্গঠনের সুযোগ হলো স্বাধীনতার কারণে। ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আগ্রাসন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কৌশলগত ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতার কারণে নিজেরা দায়িত্বে-ক্ষমতায় থাকার ফলে। সেটা এখন প্রমাণিত।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন তদানীন্তন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। কিন্তু সম্প্রতি প্রয়াত কিসিঞ্জার দেখে গেছেন তিনি যে কত ভুল ছিলেন এবং কত অবিবেচকের মতো ওই শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন। আজ আর্থসামাজিক বিবেচনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। মাথাপিছু আয় স্বাধীনতার পর যেখানে ছিল ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে, এখন তা ২ হাজার ৬০০ ডলারের মতো। 

বেড়েছে শিক্ষার হার ও নারীর ক্ষমতায়ন। দারিদ্র্যের হার ৮০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৮-১৯ শতাংশে। জন্মের সময় প্রত্যাশিত আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ বছরে, ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে। উল্লেখযোগ্য এবং সম্ভাবনাময় অগ্রগতি সাধন করেছে বাংলাদেশ, বিশেষ করে বিগত এক যুগে।

আজ সব ক্ষেত্রে বড় বড় দায়িত্ব পালন করছেন বাঙালিরাই, নিজেদের স্বাধীন দেশে। যদি পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে যেত, তাহলে আজ ধুঁকে ধুঁকেই চলতে হতো বাঙালিকে। উদাহরণ দেওয়া যাক, ১৯৬০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদন থেকে ১৪ শতাংশ বেশি ছিল, কিন্তু ১৯৭০ সালে এ অবস্থা পাল্টে যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় উৎপাদন থেকে ১০ শতাংশ বেশি হয়ে যায়। 

অর্থাৎ ১৪ শতাংশ ঘাটতি কাটিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তান। পিছিয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান। এটা এমনি এমনি ঘটেনি। পাকিস্তানি নীতি ও পরিকল্পনার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।

পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগ অনেক কম করা হতো। বলা হতো, পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা নেই। অর্থাৎ পরিকল্পিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখা হচ্ছিল। 

চাকরির ক্ষেত্রেও বৈষম্য ছিল চরম পর্যায়ের। সরকারি চাকরিতে বাঙালিরা ছিলেন মূলত অধস্তন পর্যায়ে। যদিও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সব সময় কিছু বাঙালি ছিলেন, এমনকি আয়ুব খান-পূর্ববর্তী সময়ে (১৯৫৮ সালের আগে) তিনজন পূর্ব পাকিস্তানি স্বল্প মেয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তারা পাকিস্তানিদের দৌরাত্ম্যের কাছে ছিলেন বাঁধা। 

বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ থাকাকালীন শেষের দিকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মাত্র একজন বা দুজন সচিব ছিলেন। সশস্ত্র বাহিনীতে কর্নেলের ওপর নগণ্যসংখ্যক বাঙালি ছিলেন। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানেও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলো সাধারণত পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে থাকত। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত যা কিছু শিল্প ছিল সেগুলোর বেশির ভাগের মালিক ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিরা। পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হতো, তার অধিকাংশ ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য আমদানিতে।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা বাঙালিদের নিপীড়ন শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে তাদের দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাঙালির ওপর চড়াও হওয়ার মধ্য দিয়ে। বাঙালি রুখে দাঁড়ায়। তার পর পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালির আন্দোলন এগিয়ে চলে। 

১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচন, ১৯৫৬ সালে শাসনতন্ত্র আন্দোলন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ৭ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন এবং ২৬ মার্চের ভোর থেকে মুক্তিযুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাঙালি নিজের দেশকে দখলদারমুক্ত করে, প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন ভূখণ্ড, মানচিত্র, পতাকা, জাতীয় সংগীত।

সেই ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮ ও ১৯৫২) থেকে শুরু করে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত লাখো মুক্তিযোদ্ধার এক সাগর রক্ত এবং অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধার চরম ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়; স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে আবির্ভূত হয়। 

মুক্তিযোদ্ধারা যদি জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ না করতেন, তাহলে দেশ আজও পাকিস্তানের উপনিবেশের মতোই থাকত। যারা এখন ক্ষমতায়-সম্পদে উচ্চমার্গে আছেন তাদের অবস্থান কোথায় থাকত? একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও তারা প্রকৃত অর্থে অপাঙ্ক্তেয় থাকতেন। দাসখত লিখে দিয়ে কেউ কেউ মন্ত্রী হতেন, সরকারি চাকরিতে কিছু দূর এগোতেন, শিল্প-বাণিজ্যে অংশীদার হতেন।

এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশের জন্ম হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে। জাতীয় চার নেতা বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দেন। তাদের নাম সবারই জানার কথা। 

যদিও আমার ধারণা, অনেকেই নিজে এই স্বাধীন দেশের বাসিন্দা কেমনে হলেন সেই শিকড়ের খবর রাখেন না, বিশেষ করে যারা নানা পন্থায় ক্ষমতা ও সম্পদে ভরপুর হয়েছেন এবং হতে চান। তাদের নাম তাই এখানে বলে রাখি:  সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মো. মনসুর আলী। বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের যদি কেউ অসম্মান করে কথা বলে, তবে তার এ দেশের উত্তরাধিকার ও মনুষত্ব্যই প্রশ্নবিদ্ধ বলে আমি মনে করি।

দেখা যায়, কেউ কেউ ফেসবুকে বা বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কটাক্ষ করে থাকেন। যে ছেলেমেয়েরা বর্তমানে কোটা আন্দোলনে আছে, এই স্বাধীন দেশে তারা তাদের মতের বা দাবির পক্ষে আন্দোলন করতে পারে। খুবই দুঃখজনক যে, তাদের কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বন্ধে অসম্মানসূচক উক্তি করছে। 

খুবই গর্হিত কাজ করছে তারা, তাদের নিজেদের আজকের স্বাধীন অবস্থান গড়েছেন যেসব বীর সেনানী তাদের সম্বন্ধে এমন উক্তি করে তারা নিজেদের এই রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তাদের নিজেদের অস্থিত্বের ইতিহাস সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতে হবে এবং সেই চেতনায় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দায়বদ্ধ হতে হবে।

আসলে যারা গোলামি থেকে বাঙালিকে মুক্ত করল, তাদেরই জেনেবুঝে অস্বীকার করা বা তাদের প্রতি কটাক্ষ করে কথা বলা ধিক্কারজনক। মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে যাননি নিজেদের জন্য কিছু পাওয়ার আশায়। তাদের কেউই জানতেন না তারা জীবন্ত ফিরে আসবেন কি না। 

কেউই জানতেন না দেশকে কখন শত্রুমুক্ত করা যাবে; কত বছর লাগবে? আদৌ তা সম্ভব হবে কি না? তারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন দেশমাতৃকাকে এবং বাঙালিকে পরাধীনতার নাগপাশ ছিঁড়ে ফেলে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের আলোয় উদ্ভাসিত করার লক্ষ্য নিয়ে।

উল্লেখ্য, অবশ্যই মানুষ হিসেবে সবাই নিজের অগ্রগতি চায়। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থার কোনো ক্ষেত্রে যারা দ্বিমত পোষণ করেন, তারা সেই নীতি বা আইনের পরিবর্তন চাইতেই পারেন, সেই লক্ষ্যে আন্দোলনও করতে পারেন। 

কিন্তু তা নিজের শিকড়কে, বর্তমান স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠার নায়কদের ভুলে গিয়ে নয় এবং অবশ্যই তাদের অস্বীকার করে নয়, অসম্মান করে তো নয়ই। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাকে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মান জানানো হয়েছে।

তরুণ প্রজন্ম, যাদের মধ্যে এ বিষয়ে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, তারা আজ যে স্বাধীন রাষ্ট্রে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে তার শিকড় সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়ার জন্য সচেষ্ট হতে পরামর্শ দিতে চাই।

লেখাটি শেষ করি যুক্তরাষ্ট্রে দেশের জন্য যুদ্ধে যারা আত্মদান করেন তাদের যে সম্মান দেওয়া হয় সেই উদাহরণ উল্লেখ করে। সে দেশে যারা দেশের জন্য সশস্ত্র সেবাদানে অর্থাৎ দেশের জন্য কোনো যুদ্ধে নিহত হন তাদের নিকটাত্মীয়দের (যথা: মা-বাবা, স্ত্রী/স্বামী-সন্তান, ভাইবোন) ‘গোল্ড স্টার ফ্যামিলি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। 

এটা করা হয় নিহত সদস্যের দেশের জন্য আত্মদানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং পরিবারের দুঃখভরা ক্ষতির স্বীকৃতি দান এবং তাদের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য। এসব পরিবারকে স্বাভাবিক এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য নানাভাবে সহযোগিতা দেওয়া হয়।
(http://americasgoldstarfamilies.org)

লেখক: অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক এবং সভাপতি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৪, ১১:৫৮ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৪, ০২:১১ পিএম
‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’
ড. সারিয়া সুলতানা

ছাগলকাণ্ডের পর অনেকটা গা-ঝাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে দুদক। এরপর থেকে একের পর এক থলের বিড়াল বের হতে শুরু করেছে। আগে এসব বিষয় সামনে এলে মনে হতো বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? কারণ একসময় দুদককে নিয়েও দেশবাসী কম জল ঘোলা দেখেনি। দুদক শক্তিশালী হয়ে কাজ করবে এবং সাধারণ জনগণ দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে, এটা আশা করতেই পারি।

দুর্নীতি করে এসব ছাপোষা সম্পদকে কোথায় লুকিয়ে রাখতে পারবে দুর্নীতিবাজরা? যেখানে স্ত্রী-সন্তান, পরিবার-পরিজন কেউই এই দায় গ্রহণ করবে না, সেখানে কেন এত লুকোচুরি করে সোনার রাজহাঁস পোষার আয়োজন। 

গাড়িচালক আবেদের মতো এমন অনেক আবেদ ঘাপটি মেরে আছে বেশির ভাগ সেবা প্রতিষ্ঠানে। ইদানীং পত্রপত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে এই অফিস পিয়নের এত বাড়ি-গাড়ি, ওই অফিসের অফিস সহকারীর কামিয়াবি সম্পদ। সরকারি কর্মকর্তার নিজের থেকে স্ত্রীর সম্পদ বেশি। এ যেন সম্পদ আহরণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। 

সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যানের একজন গাড়িচালক কীভাবে এত বিত্তবৈভবের মালিক হলেন? এটা তো একদিনে হয়নি। নিশ্চয়ই তিনি আলাদিনের চেরাগ পাননি যে, রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাবেন। একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে দিনে দিনে তিনি মহারাজ বনে গেছেন। স্বপ্ন লালন করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার। স্বপ্নে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার চিন্তাও করেছিলেন কি না, কে জানে। 

দুর্নীতিবাজদের পরিবারের দিকে তাকান। সেখানে দেখা যাবে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার নামে অঢেল সম্পদ। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ি উপহার বিনিময়। কখনো ছেলে বাবাকে উপহার দিচ্ছে। আবার কখনো বাবা সন্তানকে উপহার দিচ্ছেন। এটা যেন পথভ্রষ্টদের আবেগ দেখানো প্রতিযোগিতার এক উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চ। 

অবশ্য দেখিয়েছে বলেই তো আমরা ছাগলকাণ্ড, গাড়িচালকের কাণ্ডগুলো রঙিন বায়োস্কপে সারাক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। অপরদিকে কানাডার বেগমপাড়ায় বেগমদের জন্য জান্নাতি হাওয়ার ব্যবস্থা করে বেগমদের সুখঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি বলব, বেগম মহাশয়া আপনি কি জেগে আছেন? নাকি সঙ্গীর দেওয়া তালপাখার বাতাসে বেহুঁশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভাবুন একটিবার। 

কীভাবে আপনার সঙ্গী এত সম্পদ অর্জন করলেন। আর আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে আলিশান অট্টালিকায় থাকার ব্যবস্থা করলেন। কখনো কি জানতে চেয়েছেন তার এত সম্পদ কোথা থেকে এল? 

বাড়ি-গাড়ি, অজস্র সম্পদ আপনাকে দিয়েছে বলেই কি আপনি সব ভুলে স্বর্গসুখ উপভোগ করছেন। নাকি আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দিয়েছেন আপনার সঙ্গীর মধ্যে। আপনি কি কখনো ভেবেছেন, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের শ্রম ও ঘামে অর্জিত সম্পদ আপনার পতিবর অবৈধ পন্থায় আহরণ করে আপনার সুখের আলয় গড়েছেন? না, তা ভাববার সময় কোথায়? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। যে-ই হোক, দুর্নীতি করলে কারও রক্ষা নেই। যারাই দুর্নীতি করবে তাদের ধরা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

সরকারের দৃঢ় অবস্থানে আতঙ্কে মন্ত্রী-এমপিরাও। প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। ব্যক্তির দায় সরকার কোনোভাবেই বহন করবে না। উচ্চমাত্রায় দুর্নীতি কমাতে সরকারি চাকরিজীবীদের কাছ থেকে প্রতিবছর সম্পদের হিসাব নেওয়া এবং সম্পদের তথ্য হালনাগাদ করতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। 

বাংলাদেশ বিষয়ে আইএমএফের কান্ট্রি রিপোর্টে এ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনেকেই বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল নিশ্চিত করতে পারলে অপরাধ ও দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে।

অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে সৎ এবং মেধাবী কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের এখন ধৈর্যের এক মহাযন্ত্র সেজে বসে থাকতে হচ্ছে। অবস্থা যেন কিল খেয়ে কিল হজম করার মতো। নিজের অফিসের দুর্নীতি তারা নিষ্ক্রিয় দর্শকের মতো দেখেন আর আড়ালে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। যা-ই হোক, আমি তো এই কাজে সম্পৃক্ত নেই। এই নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে থাকেন। এটাই তাদের প্রাপ্তির খোরাক। 

আবার কেউ যদি দুর্নীতি দেখে প্রতিবাদ করে বসেন, তাহলে তার নিস্তার নেই। অবস্থা এমন হয় যে, তিনি এ জগতের সবচেয়ে খারাপ কর্মকর্তা। তাকে দিয়ে কোনো কাজই হবে না। চেষ্টা করা হয় তার অন্য কোনো ত্রুটি আবিষ্কার করা যায় কি না। আরও কত কী? কথায় আছে না- চোরের মায়ের বড় গলা। আমি মনে করি, অফিসগুলোতে এমন প্রতিবাদীর সংখ্যা বাড়াতেই হবে। এর বিকল্প নেই।
 
সম্প্রতি একটি সরকারি অফিসে গিয়ে দেখি, গেটের বাইরে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে- ‘আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত’। এই কথাগুলো খুবই পবিত্র। লোকপ্রশাসনের ছাত্রী হিসেবে আমি এই শব্দগুলোকে পবিত্র মনে করি। একটা সাইনবোর্ডের আড়ালে কী চলে সেটা প্রথমত দেখা উচিত। 

অভিযোগ রয়েছে, অনেক দপ্তরে গুনে গুনে টাকা নিয়ে প্রকল্প পাস করা হয়। প্রশিক্ষণের টাকা করা হয় নয়ছয়। ভাগ করা হয় একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার চেইন অব কমান্ডের মাধ্যমে। অথচ দোষটা দেওয়া হয় অধস্তন বা পিয়ন গোছের অফিস সহকারীদের। অসাধু কর্মকর্তারা দুর্নীতিগুলো আগে গোপনে করতেন। 

এখন তা ওপেন সিক্রেট। অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় প্রতিটি দপ্তরে এই সাইনবোর্ডের আড়ালে চলে অবৈধ অর্থের ভাগ-বাঁটোয়ারা। জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কতটা নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগের স্বচ্ছতা সবার আগে জরুরি। শিকড় ঠিক না থাকলে শিখরে ঘুন পোকা বসত করবে, এটাই স্বাভাবিক। 

সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন। লাখো তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন ঘিরে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে। কিন্তু পিএসসির চেয়ারম্যানের গাড়িচালক একটি সিন্ডিকেট চক্র গড়ে তুলে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে প্রশ্ন ফাঁস করেছেন। 

এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা এই সমাজ ও রাষ্ট্রকে কী উপহার দেবেন! দুর্নীতি তো তারাই করবেন। তারাই হবেন দেশের বড় আমলা। গাড়িচালক বুক ফুলিয়ে বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস করে যে টাকা এসেছে তা তিনি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছেন। শুধুই তামাশা দেখা ছাড়া আমজনতার কী আর করার আছে। 

সারা দেশে ছড়িয়ে আছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা। দেশের বায়তুল মাল সংরক্ষণ করেন তারা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসার উপক্রম। অক্টোপাস তার প্রকোষ্ঠে আটকে ফেলছে শিকারগুলো। অর্থাৎ দুদকের জালে বন্দি এখন এনবিআরের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী। 

দুর্নীতি, অবৈধ উপায়ে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার- কী অভিযোগ নেই তাদের বিরুদ্ধে। আমি মনে করি, সরকার যেন থেমে না যায়। দুদককে তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দুদকের কর্মকর্তা যাতে জবাবদিহির আওতায় থাকেন এবং তারাও যাতে দুর্নীতিতে জড়িয়ে না পড়েন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। দুর্নীতিবাজদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বয়কট করতে হবে। 

দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শুধু সম্পদের হিসাব জমা দিলেই হবে না। দুর্নীতিবাজরা অনেকে নিজের নামে সম্পদ করে না। এ ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যারা দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

প্রতিটি সেক্টরে কাজের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে দুর্নীতিবাজদের খুঁজে তালিকা করে বরখাস্ত এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে পারলে এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা কমে আসবে। 

লেখক: সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ ও বেগম রোকেয়া পদক ২০২১ প্রাপ্ত (পল্লি উন্নয়ন)
[email protected]

সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে প্রস্তুত পিএসসি: সোহরাব হোসাইন

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১১:০৯ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৪, ১১:০৯ এএম
সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে প্রস্তুত পিএসসি: সোহরাব হোসাইন
সোহরাব হোসাইন

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তার ব্যাখ্যা আমরা দিয়েছি। তার পরও বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্ত করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। 

যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হলে পিএসসি সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে আমরা কাউকে ছাড় দেব না। 

তার পরও একটা বিষয় থাকে যখন কোনো পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, সেটা তাৎক্ষণিক যদি সামনে আসে; তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। কিন্তু ১২ বছর ধরে যেসব পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলো নিয়ে তখন একটি অভিযোগও আসেনি। 

এখন এতদিন পর সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন। আমি এটুকু আশ্বস্ত করতে পারি, আমাদের তদন্তের মধ্যে সব বিষয় থাকবে। 

যে প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন নির্ধারণ ও সাপ্লাই করা হয়, সেখানে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ নেই। তবে এ কার্যক্রমের সঙ্গে যেহেতু অনেকেই জড়িত থাকেন, তাই শতভাগ নিশ্চিতভাবেও কিছু বলা যায় না।

চেয়ারম্যান, পিএসসি