ঢাকা ১০ শ্রাবণ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪

এবারের বাজেট কেমন হলো?

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১০:৩৫ এএম
আপডেট: ১০ জুলাই ২০২৪, ১১:০১ এএম
এবারের বাজেট কেমন হলো?
ড. আতিউর রহমান

গত ২৯ জুন মহান জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৩তম জাতীয় বাজেট। ‘সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার’ স্লোগান নিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটের আকার বেড়েছে ৪.৬ শতাংশ। এই বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটের ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৪.৬ শতাংশ। যা গত বাজেটের চেয়ে দশমিক ১ শতাংশ কম। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ৯০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আগামী অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। 

অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে গত ১৫ বছরে যে ধরনের প্রবৃদ্ধির গতি দেখতে আমরা অভ্যস্ত, তার ক্ষেত্রে একটু ছাড় দিয়ে হলেও বাস্তবতার নিরিখে মুদ্রানীতির সঙ্গে সমন্বয় করে বেশ খানিকটা সংকোচনমুখী বাজেটের দিকেই সরকার হাঁটবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। বাস্তবেও তাই হয়েছে। তবে যেমনটি আগেই ধারণা করেছিলাম, সে মতে এই কাটছাঁট থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির মতো সামাজিক খাতগুলোকে পুরোপুরি মুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি।

সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখেই হয়তো বাজেট চূড়ান্ত করার আগে এ খাতগুলোতে বরাদ্দ আর বাড়ানো সম্ভব হয়নি বাজেট প্রণেতাদের পক্ষে। ফলে সামাজিক খাতগুলোতে দেওয়া এই সংকোচনমুখী বরাদ্দের যথাযথ বাস্তবায়ন আরও জরুরি হয়ে পড়েছে। বিরাজমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কবল থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাজেট বাস্তবায়নে সংবেদনশীলতা তাই বিশেষভাবে কাম্য। এ কথা জোর দিয়েই বলা চলে যে, বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়টিই এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে চলমান বন্যা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সামাজিক সুরক্ষা বাজেটটি হয়তো আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতে পারে। 

জুন ২০২৪-এর শুরুতে যখন বাজেটটি মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়, তখনই প্রাথমিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে এ বাজেটটিকে বাস্তবানুগ বলেছিলাম। কেননা দু-একটি বাদে সময়ের দাবিগুলোর প্রতি বাজেটের প্রস্তাবনাগুলোকে যথাযথ সংবেদনশীলই মনে হয়েছিল। বাজেট চূড়ান্তকরণের সময় ওই অর্থে বড় ধরনের রদবদল না হওয়ায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কারণ দেখছি না। সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এই বাজেটকে জনগণের কাছে অর্থবহ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। 

সর্বোচ্চ আয়শ্রেণির নাগরিকদের ওপর প্রযোজ্য কর ৩০ শতাংশে উন্নিত করার কথা প্রথমে ভাবা হলেও পরে সেটা ২৫ শতাংশেই রাখা হয়েছে। কেউ কেউ হয়তো এই সিদ্ধান্তকে ধনিক-তোষণ বলে আপত্তি তুলবেন। তবে এ বছর উচ্চমধ্য আয়ের মানুষেরও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে আয়-রোজকার করেন আমি তাদের কথা বলছি। এ অবস্থায় তাদের ওপর করের বোঝা বাড়ালে তারা বরং কর প্রদানে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। 

এই আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরূপ প্রভাবের কথাটিও মনে রাখা চাই। মনে হয় বাজেট প্রণেতাদেরও সে কথাটি মনে আছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, পরের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই কর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এতে করে নাগরিকরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন। মনে হয়, এটিও একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে করহার ছাড়াও ভ্যাট ও অন্যান্য ক্ষেত্র আছে, যেসব জায়গায় আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে; যাতে করে অতি লোভ ও অতি লাভের কারিগরদের বিরত রেখে অর্থনীতিকে সুষম করা যায়।   

অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করা, বৃহত্তর জনকল্যাণ, কিংবা রপ্তানি-কর্মসংস্থানকে বলশালী করতে নতুন বছরের বাজেটে অনেক ক্ষেত্রেই নানা রকম ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এগুলোর ফাঁক গলে কেউ যেন অনৈতিক সুবিধা না নেয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা চাই। যেমন, একাধিক মোটরযানের মালিকদের ওপর বাড়তি পরিবেশ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে, যা একটি স্বাগত জানানোর মতো সিদ্ধান্ত। 

তবে একাধিক মোটরযানের জন্য বাড়তি সারচার্জের বিধান থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে কোম্পানিগুলোকে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যেই হয়তো এমন বিধান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির মালিক বা পরিচালকদের কেউ কেউ কোম্পানির মোটরযান ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে এই বিধানের ফাঁক গলে কর ফাঁকি দেওয়ার পাঁয়তারা করতে পারেন। এ দিকটি ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। অথবা কোম্পানিকে এই গাড়ির ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা বাবদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আর্থসামাজিক বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতা দেখা গেছে। এ খাতে বরাদ্দ হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট জাতীয় বাজেটের ১৭.০৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটেও এ খাতে মোট বাজেটের প্রায় ১৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতাকে প্রশংসনীয়ই বলতে হবে। তবে বিদ্যমান বাস্তবতার বিচারে বিশেষত নগরাঞ্চলের দরিদ্র নাগরিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাবদ আরও খানিকটা বাড়ানোর সুযোগ ছিল বলে মনে করি। মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে আসছে বছরে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

এই বাস্তবতার প্রতি সংবেদনশীলতার জায়গা থেকেই এবারের সামাজিক সুরক্ষা বাজেটে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় তিনটি কর্মসূচিতে মোট ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ‘খোলাবাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় কর্মসূচি’তে ২ হাজার কোটি টাকা এবং ‘খাদ্য ভর্তুকি’ বাবদ প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এগুলোর পাশাপাশি ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ শিরোনামের নতুন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। 

এসব খাদ্য কর্মসূচির একটি অংশ রপ্তানিমুখী শিল্পশ্রমিকদের জন্য দেওয়া যায় কি না, তা ভাবা যেতে পারে। মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে সিএসআর কর্মসূচির আওতায় এই কম দামের খাদ্যের প্যাকেট সপ্তাহ শেষে কি দেওয়া যায় না? কর্মীর বেতন থেকে ভর্তুকি সমন্বিত মূল্য ডিজিটালি নিশ্চয়ই কেটে নেওয়া সম্ভব। আর বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে বাড়তি খরচের প্রয়োজনকে অস্বীকার করারও উপায় নেই। 

নতুন বছরের বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের জন্য ২৫টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের আওতায় প্রায় ৪২ হাজার ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৫.৩০ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে বলা যায়, নতুন বছরে এ খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। 

২০২০-২১ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবছরই জাতীয় বাজেটে জলবায়ু সম্পৃক্ত বরাদ্দ গড়ে ১৬.৪৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। তবে মোট বাজেটে এ খাতের অংশ অত বেশি হারে বাড়েনি (বছরে গড়ে ৫.৬২ শতাংশ হারে বেড়েছে)। তবু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য জাতীয় বাজেটে এমন ধারাবাহিক নীতি-মনোযোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

এখনকার বাস্তবতার বিবেচনায় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি জলবায়ুসহিষ্ণু কৃষি বিকাশের স্বার্থে কৃষি ভর্তুকিও বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি ভর্তুকি বাবদ ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষি ইনপুটস আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি সাপেক্ষে এ ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি থাকা দরকার। ২০২৩-২৪-এর প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি ভর্তুকিতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সংশোধিততে এই বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরজুড়েই সম্ভবত আমাদের কঠিন সামষ্টিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করে এগোতে হবে। তবে সামষ্টিক-অর্থনীতির গতিপ্রকৃতির প্রতি নজর রেখে যথাযথ নীতি গ্রহণ ও তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে এ সংকট নিশ্চয়ই কাটিয়ে ওঠা যাবে। প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকেই এমন নজির মেলে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ ও তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একই ধাঁচের রাজস্ব নীতি (বাজেট) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা দ্রুতই সাফল্যের মুখ দেখেছে। পাশাপাশি তারা মুদ্রা বিনিময় হারকেও বাজারভিত্তিক করেছে।

বাংলাদেশও সে পথেই এগোচ্ছে। তাই সংকট উত্তরণের বিষয়ে আশাবাদী হওয়াই যায়। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে বিশেষভাবে যা শিক্ষণীয় তা হলো, মুদ্রা অবমূল্যায়নের কারণে কম ডলার খরচ করেই পর্যটক আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য। বলে রাখা ভালো, শ্রীলঙ্কায় যাওয়া পর্যটকদের বড় অংশই ভারতীয়। কাজেই পর্যটন খাত বিকশিত করার মতো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বাংলাদেশেও ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে পর্যটকের আনাগোনা নিশ্চয় বাড়ানো সম্ভব। আমাদের টাকার মানও তো কমেছে। তাহলে পাশের দেশের বাড়তি পর্যটকদের নিরাপত্তা, আবাসন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ছোঁয়া দিয়ে কেন আকর্ষণ করা যাবে না?

কার্যকরভাবে বিরাজমান ডলারসংকট মোকাবিলার ওপরই বহুলাংশে নির্ভর করছে নতুন অর্থবছরে বাংলাদেশের সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহকে বলশালী করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে। আশার কথা, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কার্যক্রমের কারণে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বিনিময় হার প্রায় কাছাকাছি হয়ে গেছে। আশা করি, এর ফলে প্রচলিত প্রবাস আয়ের প্রবাহ আরও বাড়বে। রপ্তানির আয়ের প্রবাহও বাড়বে। ইতোমধ্যেই রেমিট্যান্স খাতে স্বস্তির সুবাতাস বইতে শুধু করেছে। 

একই সঙ্গে যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অস্থায়ীভাবে শ্রমিক-পেশাজীবী হিসেবে কাজ করতে গেছেন, তারা যেন তাদের আয়গুলো ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়মিত দেশে পাঠাতে উৎসাহিত হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য তাদের বাড়তি নগদ সহায়তা ছাড়াও গৃহঋণ, পেনশন সুবিধা, শিক্ষা উপবৃত্তি, পরিবহন সুবিধাসহ নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, যে প্রবাসীরা স্থায়ীভাবে অন্য দেশে বসবাস করতে শুরু করেছেন, তারা যেন দেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হন, সে লক্ষ্যে দেশে তাদের জন্য কাস্টমাইজড ডলার বন্ডের ডিজিটাল সেকেন্ডারি মার্কেট দ্রুতই উদ্ভাবন এবং পুরোনো বন্ডগুলোর সিলিং তুলে দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া উচিত। 

তবে হালে রপ্তানি খাতের সংশোধিত তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় প্রায় ৬.৮ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে পোশাক খাতেই কমেছে ৬.৭ শতাংশ। এর প্রভাবে জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের অঙ্কও খানিকটা কমবে। এ জন্য যদি প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশে চলে আসে, তবু উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। কেননা, এ সময়টায় প্রবৃদ্ধির চেয়ে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাই বেশি কাম্য। আর বাংলাদেশ ব্যাংক যে সাহস করে রপ্তানির তথ্য এভাবে সংশোধন করতে পেরেছে সে জন্য তার প্রশংসা করতেই হয়।

সব মিলিয়ে বিদ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো একটি বাজেটই নতুন অর্থবছরে আমরা পেয়েছি। এটাও সত্য যে, বাস্তবানুগ এ বাজেট হয়তো আরও বেশি ন্যায়ানুগ হতে পারত। সর্বোপরি বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে দেশকে আবার বলশালী প্রবৃদ্ধির পথে সচল করতে সংকোচনমুখী এ বাজেট বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করা একান্ত কাম্য।

বাজেট প্রণেতারা এ বছর আরও প্রবৃদ্ধির চেয়ে সংকোচনমূলক বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে নজর দিয়েছেন। আরও কিছু দিন এই কৌশলটি অব্যাহত রাখার দরকার রয়েছে। আশা করি, আগামী মুদ্রানীতিতে বিষয়টির প্রতিফলন ঘটবে। 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়, নজর দিতে হবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দিকে

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৫০ এএম
আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৫০ এএম
বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়, নজর দিতে হবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দিকে
শাহদীন মালিক

ছাত্রছাত্রীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা দেখেছি। প্রথম দিকে আন্দোলন কোনো রকম সহিংসতা ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের দাবি আদায়ের জন্য শৃঙ্খলবদ্ধভাবে এই আন্দোলন করেছেন। অবরোধের মধ্যে কিছু কর্মসূচিতে জনদুর্ভোগ হয়েছে এ কথা অনস্বীকার্য। তবে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা সংঘটিত হতে দেখা যায়নি। 

তারপর সহসা আমরা দেখলাম চারদিকে সহিংসতা শুরু হয়ে গেল। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করা হলো। গাড়িঘোড়া পোড়ানো হলো। নরসিংদীর জেলখানা ভেঙে ৮০০-এর মতো কয়েদি পালিয়ে গেল। দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক কিছুই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের আন্দোলনের সঙ্গে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে- কারা এ ধরনের সহিংস আন্দোলনের পথে গেল!

সরকারের জবাব একটাই। এ কাজ করেছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে অবস্থিত ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের ৬০ জন রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিবিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই কাজ সংঘটিত করেছে বিএনপি-জামায়াত, ছাত্রফ্রন্ট ইত্যাদি গোষ্ঠী। 

সরকার মনে করে, বড় বড় দেশ যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা এসব কে করছে, কেন করছে, এসবকিছুই তারা জানেন না। প্রকৃতপক্ষে তারা অনেক কিছুই জানেন। সারা বিশ্ব এ সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে। এই সহিংসতা কে করেছে? এই সহিংসতা করেছে একটি অশুভ শক্তি, যারা কখনো দেশ ও দেশের মানুষের মঙ্গল চায় না। তারাই দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়েছে। এরাই সেই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সহিংসতায় বিএনপি-জামায়াতের যে সম্পৃক্ততা নেই, সেটা কেউই জোর গলায় দাবি করছে না। এ ধরনের সহিংসতার পেছনে অবশ্যই জঙ্গিবাদী দলের সম্পৃক্ততা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়। একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে কিছু সহিংস লোক থাকতে পারে। মনে রাখতে হবে, এভাবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর ওপর সংঘবদ্ধভাবে হামলা করা, এটা রাষ্ট্র আক্রমণের শামিল। এ ধরনের আক্রমণ দল-মতনির্বিশেষে সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীই করতে পারে।

এ ধরনের কার্যক্রম করে তারা পরিবেশ অস্থিতিশীল করে থাকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকায় আগমন উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকেন্দ্রিক যে সহিংসতা হয়েছিল, স্থানীয় সরকারের অফিস পুড়িয়ে দেওয়া, পাঠাগার পুড়িয়ে দেওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কার্যক্রম হয়েছিল। সেটাও জঙ্গিগোষ্ঠীর নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে। সরকার শুধু বিএনপি-জামায়াতে ভূত দেখছে। এটা সম্পূর্ণ অমূলক। 

জামায়াত-বিএনপির ঘাড়ে দোষ চাপানোয় সরকারের অতি উৎসাহের কারণে এই সন্ত্রাস গোপনে গোপনে ব্যাপক আকারে সংঘটিত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে নজরদারির প্রয়োজন ছিল, সেই নজরদারি অনেকটাই শিথিল। হোলি আর্টিজেনের কথা যদি আমরা মনে করি, যে ছেলেরা এই হোলি আর্টিজেনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা জামায়াত-বিএনপির ছিল না। 

তারা ছিল উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রশিক্ষিত সদস্য। গত কয়েক দিনের সহিংসতায় বিএনপির বর্ষীয়ান নেতাকে রিমান্ডে নেওয়া হলো। কিন্তু ছাত্রী মেরে ফেলা কোনো জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের কথা আমরা শুনিনি। বিএনপি-জামায়াতের নিশ্চয়ই কিছু সংশ্লিষ্টতা আছে। এ ধরনের সহিংসতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাত করে, এমন সব স্থাপনায় ভাঙচুর করা, ইন্টারনেট অকেজো করে দেওয়া, আমি বিশ্বাস করতে চাই না, ভালোমন্দ যেটাই হোক, বিএনপির মতো পুরোনো রাজনৈতিক দল এটা করতে পারে না। 

এসব কাজ করে থাকে চরমপন্থী জঙ্গিরা। আমরা দেখছি সরকার বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ করছে। ফলে চরমপন্থী জঙ্গিরা যে ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হচ্ছে, সেদিকে সরকারের যতটুকু তৎপর হওয়ার কথা ছিল, সেই তৎপরতা দেখছি না। এতে আশঙ্কা করা হয়, সরকার এক পক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে আরও অন্যান্য যে ভিশন শত্রু দেশে সয়লাব হয়ে গেছে, সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেদিক থেকে নজর ফিরিয়ে নিয়েছে। 

এটাই সবচেয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কার ব্যাপার যে, এতে নিশ্চয়ই আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের বিরাট ব্যর্থতা আছে। এত জায়গায়, এতভাবে আক্রমণ হলো এভাবে সংঘবদ্ধ আক্রমণ, অথচ তারা কিছুই জানত না। সত্তরোর্ধ্ব বয়সের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে সরকারের যে একচোখা মনোভাব দেখাল, এতে আমাদের রাষ্ট্রই সশস্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ল। 

আমরা চাই দেশব্যাপী অস্থিতিশীল পরিবেশ কাটিয়ে উঠতে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হোক। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এখন অবধি সঠিকভাবে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ দেখছি না। এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকার যদি সমঝোতার পথে আসতে চায়, তাহলে শুরুতেই এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা দরকার। 

পুলিশের গুলিতে নিহত রংপুরের আবু সাইদের মৃত্যু এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের একজন সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলামকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের তদন্তের মাধ্যমে বিচার করা উচিত। দেশে অন্যায়-অবিচার হলে সব মহলই বিচারের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানায়। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সঠিক বিচার তারা পায় না। আমার মতে, বিচার বিভাগকে অচিরেই ঢেলে সাজানো খুবই জরুরি। 

দেশব্যাপী সহিংসতায় অর্থনীতি অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। দেশে সেনাবাহিনী নামিয়ে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে, হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে, একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারকে সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সব সমস্যা সমাধানের পথে যেতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যাপীঠে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। দেশ ও দেশের স্বার্থকে সবার আগে আমলে নিয়ে দল-মতনির্বিশেষে সব পক্ষকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তৎপর হতে হবে।

লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইউনিভার্সিটি অব প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক

প্রগতিশীল সমাজ গঠনে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৪৫ এএম
আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৪৫ এএম
প্রগতিশীল সমাজ গঠনে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে
হীরেন পণ্ডিত

দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ যুবক। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বৈচিত্র্যসহ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হলে তরুণদের কথা ভাবতে হবে। তরুণরা বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, যুবকদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। সরকারের যুবনীতিতে এ সীমা ১৮ থেকে ৩৫ বছর। বয়সসীমা যদি ২৯ বছর ধরে যুবক হিসেবে ধরা হয়, তাহলে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এর নিচে।

তারুণ্য হলো মানুষের জীবনে সাহস, সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার সময়। পুরোনো ভেঙে সংস্কার করে নতুন কিছু করা যেন তারুণ্যের ধর্ম। সমাজের এই সংস্কারকাজে তরুণসমাজকে সাহস ও সততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণরা সমাজের সর্বস্তরে পরিবর্তনের বিপ্লব শুরু করবে এবং এ ক্ষেত্রে তরুণসমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সবচেয়ে কার্যকর। সমাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি দেখলে তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে হবে এবং প্রতিবাদ যদি তরুণসমাজের কাছ থেকে আসে তাহলে তা কেউ ঠেকাতে পারবে না।

আমাদের দেশের তরুণদের অর্জন অনেক। খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তরুণরা এগিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন উদ্দীপনা এবং সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে এগিয়ে যাচ্ছে তরুণসমাজ। তবে তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শক্তি দেশ ও জাতির জন্য সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনি তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আজকের তরুণসমাজই ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারক। 

তারা অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে সমাজ ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করবে। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সব কল্যাণমূলক কাজে যুবসমাজের অংশগ্রহণ আবশ্যক। তরুণসমাজ ঘুমিয়ে থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সমাজের আকাশ থেকে কখনো কালো মেঘের ছায়া সরবে না। সমাজ পরিবর্তন করতে হলে তরুণসমাজকে আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের কথাও ভাবতে হয়। সব সমাজকল্যাণমূলক কাজে এগিয়ে আসতে হবে। 

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ সব সংস্কার আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ছিল। আমাদের ভবিষ্যৎ অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক। তাই একটি আদর্শ সমাজ গঠনে তরুণসমাজকে কিছু চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। সামাজিক রাষ্ট্র নিয়ে স্বপ্ন দেখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সাহসিকতার সঙ্গে সব বাধা অতিক্রম করে স্বপ্নের পথে হাঁটতে হবে। সঠিক প্রস্তুতি নিতে হবে এবং তরুণসমাজের সঠিক প্রস্তুতি শুধু নিজেকে নয়, সমাজকে, রাষ্ট্রকে নিয়ে যাবে অনন্য সাফল্যের পথে। 

তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উনয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে জন্য বর্তমান সরকার মজুরির মাধ্যমে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তরুণদের জন্য উপযুক্ত চাকরি নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিচ্ছে- উপার্জন এবং আত্মকর্মসংস্থান।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারে দক্ষ ও শিক্ষাগতভাবে যোগ্য শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে পারছে না। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষায় বিশেষ দক্ষতার অভাবে চাকরির বাজারের চাহিদা মেটাতে পারছে না পড়াশোনা শেষ করা তরুণ-তরুণীরা। কলেজের স্নাতকদের মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ ফুলটাইম বা পার্টটাইম নিযুক্ত, যেখানে প্রায় অর্ধেক বেকার। অধিকন্তু নারী স্নাতকদের স্নাতক হওয়ার দুই বছর পরও বেকার এবং পড়াশোনার বাইরে থাকার আশঙ্কা অনেক বেশি: ৩৭ শতাংশ পুরুষ স্নাতকের বিপরীতে ৪৩ শতাংশ নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বেকার থাকে।

তরুণদের বেকারত্বকে অর্থনীতির জন্য একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আমাদের নীতিমালায় অনুপস্থিত। জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন অনেকে। নীতিমালায় তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। অবশ্য অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অবদান বেশি হওয়ায় কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হতে হবে বেসরকারি খাতকে। 

এ জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন কাঠামো, তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে করতে হবে। উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম তৈরি করতে হলে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিকুলাম হালনাগাদ করতে হবে। আইনপ্রণেতা, নিয়োগকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সরকারকে কিছু প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নিতে হবে। 

এ জন্য আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ, রাস্তা সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য কর্মশক্তির বিভিন্ন বিভাগের জন্য চাকরি তৈরি করে। চাকরির সংখ্যা, তাদের ধরন এবং কোন সেক্টরে চাকরি তৈরি করা হবে তার একটি চিত্র থাকতে হবে।

যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষতা উনয়ন প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবু চাকরির বাজারে দক্ষতার বিশাল ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি খাতের অনেক কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের যুবকদের মধ্যে, কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব দেখায়, যা তাদের আরও পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। একটি প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের জন্য যুবসমাজকে মূলধারায় যুক্ত করার জন্য আমাদের উপরিউক্ত বিষয়টিতে মনোনিবেশ করা উচিত। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো

হাওয়ায় ভেসে থাকা থেকে মাটিতে নেমে আসার অনুভূতি

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৪২ এএম
আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৪২ এএম
হাওয়ায় ভেসে থাকা থেকে মাটিতে নেমে আসার অনুভূতি
অমিয় দত্ত ভৌমিক

আজ থেকে পাঁচ শ বা হাজার বছর পর ইন্টারনেট আবিষ্কারের আগের সময়টাকে বলা হবে আদিম যুগ। আর আমরা যেটাকে আদিম যুগ বলছি সেটাকে ‘আদিম দাদার যুগ’ বলা হতে পারে। সে হিসেবে আমরা যারা ইন্টারনেট যুগের আগে জন্মেছি তারা আদিম যুগের মানুষ হিসেবে বিবেচিত হব। আর যারা এই আদিম যুগের শেষ ধাপ আর ইন্টারনেট যুগে প্রবেশের সময়টা দেখেছি, তারা কোন হিসেবে বিবেচিত হব, তার সঠিক নাম আমি এখনো দিতে পারছি না।

আজ আমার এই লেখাটি যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। আমরা যারা আদিম যুগ থেকে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট তথা আধুনিক যুগে প্রবেশ করেছি, তাদের কাছে বিষয়টি বেশ মজার। অন্যদিকে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বা তারপর যারা জন্মেছে তারা আদিম যুগের মধ্যে পড়ছে না। তবে তার বাবা-মা, দাদা-দাদিরা আদিম যুগের।

আধুনিক যুগে প্রবেশের পর থেকে আমরা কমবেশি সবাই আদিমতা ভুলে এই যুগের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখে গেছি। আমাদের হাতে আদিমকালে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিকস জিনিসের পরিবর্তে চলে এসেছে অত্যাধুনিক সব ডিভাইস। এগুলোই এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। এক দশক আগেও কিছু কিছু অফিস-আদালতে ‘সেমি আদিম’ যুগের ইলকট্রনিকস জিনিসের ব্যবহার ছিল। 

বিশেষ করে দেশে-বিদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে টেলিফোনের ল্যান্ডলাইন, ফ্যাক্স ইত্যাদি। ধীরে ধীরে এগুলোও আর ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক অফিসে যন্ত্রটি থাকলেও তা সচল আছে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ আছে।

আধুনিক যুগে প্রবেশের পর আমরা সবচেয়ে বেশি যে জিনিসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তা হলো ইন্টারনেট। এর ব্যবহার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে সব জায়গাতেই এটি সমানভাবে সমাদৃত। আমাদের কাছে এটি এখন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যে পরিণত হয়েছে। অনেককে তো বলতে শোনা যায়, এটি নাকি অনেক ক্ষেত্রে ‘টনিক’ হিসেবে কাজ করে। 

সন্তান লালন-পালন করতে ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও অনেকে অভিমত দেন। আবার এর বদৌলতে ঘরে বসেই দলবদ্ধ আড্ডাও চলে। যাক ওসব কথা। আসি সাম্প্রতিক বিষয়ে।

মাঝেমধ্যে এই ইন্টারনেট ডাউন হয়ে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কিছু বিষয়ের সঙ্গে আমাদের কমবেশি পরিচয় আছে। এটা স্বল্প সময়ের জন্য হতো। তবে বিকল্প ব্যবস্থাও থাকত। কোম্পানি বদল করে বা একসঙ্গে একাধিক সংযোগ ব্যবহার করে সবাই কাজ চালিয়ে নিতে পেরেছেন। 

কিন্তু গেল কয়েক দিন দেশজুড়ে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংস আন্দোলনের ফলে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা। এটাও সপ্তাহখানেক হয়ে গেল। এর প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেমন বিরাট ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি জনজীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার! যারা শতভাগ ডিজিটাল জীবনযাপন করেন, তাদের তো ‘ঘোর কলি’ চলছে। তাদের খাওয়া, ঘুম, চলাফেরা সবই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ইন্টারনেটের বদৌলতে সংবাদমাধ্যমেও এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। আগে যেভাবে সংবাদ সংগ্রহ বা প্রকাশ করা হতো, তা থেকে সরে আধুনিক যত পদ্ধতি আছে সবই ব্যবহৃত হচ্ছে এই দুনিয়ায়। ফলে সংবাদ সংগ্রহে সংবাদমাধ্যমগুলোকে বেগ পেতে হচ্ছে। 

আর ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বড় একটা অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ভিত্তি করে মূল ধারাকে ছাড়িয়ে ফেসবুক বা ইউটিউবকে সংবাদ পাওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম মনে করে থাকে। ফলে এসব নেশাতুরদের চলছে ‘ঘোর কলি’।

অন্যদিকে যারা, আধা আদিম আর আধা আধুনিক তারা একটা অন্য রকম অনুভূতি পাচ্ছেন। অনেক দিন পর এমন একটা সময়ের অপেক্ষা হয়তো তারা করেননি। কিন্তু যেকোনোভাবেই হোক, এমন একটা সময় তারা উপভোগ করছেন। তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের মতো সেই দিনগুলো অল্প সময়ের জন্য হলেও ফিরে পেয়েছেন। আর চলমান ইন্টারনেটবিহীন পারিবারিক আড্ডায় সন্তানদের সঙ্গে আদিম হতে যাওয়া যুগের কিছু প্রচলিত সামাজিক ও পারিবারিক চিত্র কেমন ছিল তা হয়তো বোঝাতে পারছেন।

আমরা যান্ত্রিক জীবনে শুধু ছুটছি আর ছুটছি। যতটুকু সময় ঘরে কাটানোর সুযোগ হয় তারও অধিকাংশ কেটে যায় মোবাইল ফোন ঘিরে। এতে এক সময়ের পারিবারিক রীতিগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। এই কয়েক দিন ভাসমান দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অনুভূতি নতুন প্রজন্মের কাছে একেবারেই অনভিপ্রেত। তবে তাদের আগের প্রজন্মের থেকে শোনা কথাগুলো সপ্তাহখানেক আগ পর্যন্ত অনেকটা গল্পের মতো লাগলেও তা যে সত্যিই এমন ছিল, এটা নিশ্চয়ই বুঝতে আর বাকি থাকার কথা নয়।

যে শিশুটি বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইল সেটে গেম খেলত, সে এখন টেলিভিশন দেখছে। অনেকেই লুডু খেলছে। সবকিছু বন্ধ থাকায় পরিবারের সবাই বসে টেলিভিশনে সিনেমা বা নাটক দেখছে। খাবার টেবিলে বসে দাদা-দাদি, মা-বাবার সঙ্গে আড্ডা হচ্ছে। পরে পড়বে বলে ফেলে রাখা বইগুলোও হয়তো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। 

মোট কথা, এক ছাদের নিচে থেকেও যে পরিবারের সঙ্গে অনেকটা দূরত্ব ছিল তা অল্প সময়ের জন্য হলেও সবার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে। 

এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা আমাদের অর্থনৈতিক দিক থেকে পেছনে নিয়ে গেলেও পরিবার বা সমাজের যে আলাদা একটা প্রাণ আছে, তা এই প্রজন্মের সামনে হাজির করতে পেরেছে।

লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, খবরের কাগজ

কোটা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও বৈষম্য নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:১১ পিএম
আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:১১ পিএম
কোটা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় ও বৈষম্য নিয়ে কিছু কথা
ড. মিজানুর রহমান

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কোটাবিষয়ক রায় দিয়েছেন গত ২১ জুলাই। গণমাধ্যমে দেখেছি যে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে আদালতের বিধান মেনে রচিত প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। রায়ের পর দুই দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন মহল এর প্রতিক্রিয়া জানানো শুরু করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা যেমন- জাতীয় মহিলা পরিষদ এবং আদিবাসী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংগঠন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ইতোমধ্যে তাদের মতামত জানিয়েছে। ৬৬টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি তাদের বক্তব্যে বলেছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর একটি হলো নারী-পুরুষের সমতা। সেই লক্ষ্যে যেতে হলে নারীদের জন্য কোটা অবশ্যই প্রয়োজন। 

২০২২ সালের সরকারি জনশুমারি অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। এর অর্থ হলো এই যে দেশে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি। তবে সরকারি চাকরিতে নারীদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি কর্মচারী রয়েছেন; যার মধ্যে নারীর সংখ্যা ৪ লাখ ৯ হাজার ৬৮ জন। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড পর্যন্ত ৫৬ শতাংশ নিয়োগ হতো কোটার মাধ্যমে। এই ৫৬ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ নারী; কেননা বিভিন্ন কারণে চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ এখন অনেক কম। এ জন্য সরকারি চাকরিতে নারী কোটা রাখা প্রয়োজন। তাই নারী কোটা তুলে দেওয়ার সময় এখনো আসেনি। চাকরিতে নারী-পুরুষের যে বৈষম্য আছে তা দৃশ্যমানভাবে কমে যাওয়ার পর নারী কোটা বিলুপ্ত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নারীদের উপযুক্ত মূল্যায়ন হচ্ছে না। 

এ ধরনের দৃশ্যমান বৈষম্য থাকার পরও কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু নারী শিক্ষার্থীকে বলতে শুনলাম ‘নারী কোটায় চাকরি পাওয়া লজ্জাজনক’। প্রশ্ন হচ্ছে, আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীরা কি বাংলাদেশের সব নারীর প্রতিনিধিত্ব করছেন? উত্তর হচ্ছে ‘না’। কারণ এই নারী কোটা সমাজের পিছিয়ে পড়া নারী জনগোষ্ঠীর জন্য। বেসরকারি সংস্থা এলকপের গবেষণায় উঠে এসেছে এসব পিছিয়ে পড়া নারীর কথা। ঢাকা শহরের নারীরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান, দেশের অন্যান্য জেলা বা উপজেলা শহরের মেয়েরা কি সমানভাবে সুযোগ-সুবিধা পান? পাবনার সাঁথিয়া থানার তাঁতহীন তাঁতি শেফালি মোল্লাকে বাঁচাতে হলে সরকার এখন কোন কোটায় তাকে চাকরি দেবে? দিনাজপুরের কাহারোল থানার ভূমিহীন সাঁওতাল হেমলতা বাস্কে বা হরিজন পল্লির মিনা কুমারীর প্রতিনিধিত্ব কি ঢাকার নারী শিক্ষার্থীরা করছেন? আমার মনে হয় তারা ‘না’ বুঝে বা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ ধরনের বক্তব্য গণমাধ্যমের সামনে দিয়েছেন। সবার স্মরণ করা প্রয়োজন, যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য আলাদা ৫০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে, সেখানে কীভাবে নারীদের কর্মজীবন নিশ্চিত করার জন্য কোটা থাকবে না। 

২.
এবার আসা যাক জেলা কোটায়। সরকার ২০১৮ সালের পরিপত্রের আগ পর্যন্ত ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে ১০ শতাংশ ছিল বিভিন্ন জেলার জন্য বরাদ্দকৃত। আমাদের দেশের প্রতিটা জেলায় বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সমানভাবে বাস্তবায়ন করা যায় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মূল বাজেটের বাস্তবায়ন একেক জেলায় একেক রকম হওয়ার ফলে প্রতিটা জেলার জনগণ সমানভাবে সরকারি চাকরি লাভ করেনি। এর বাইরে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা সরকারি চাকরি লাভের ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন। উল্লেখ্য যে, সব জেলায় মানসম্মত শিক্ষার হার সমান নয় বলে ৯ম গ্রেডের চাকরিতে সব জেলার প্রতিনিধিত্ব দেখা যায় না। ঘূর্ণিঝড় আইলার ভিকটিম সাতক্ষীরার পানখালির বাসিন্দা রবিউল ইসলামের মেয়ে ভেবেছিলেন ১৩তম গ্রেডে চাকরির জন্য। ভাইভাতে গিয়ে হয়তো জেলা কোটার বদৌলতে সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করতেন, কিন্তু এখন আর পাবেন কি না, জানেন না। 

এর বাইরে সমতলের আদিবাসী ও নৃগোষ্ঠীগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ, যা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। মাত্র ১ শতাংশ কোটা দিয়ে মৌলভীবাজারের খাসিয়া জনগোষ্ঠী বা গাইবান্ধার সাঁওতালদের বা পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘ম্র’ জনগোষ্ঠীর ন্যায্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে প্রতিনিধিত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব? রাজনৈতিক ডামাডোলে সমতলের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আর পিছিয়ে পড়বে বলে প্রতীয়মান হয়। 

৩.
আপিল বিভাগের রায়টি সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি, তার ভিত্তিতে বলা যায় একটি ‘সাংলাপিক’ আবহে রায়টি প্রদান করা হয়েছে। সাংলাপিক বলছি এ কারণে যে, আপিল বিভাগ একদিকে ‘বিচারিক আত্মনিয়ন্ত্রণ’ (judicial self-restraint)-এর নীতি প্রয়োগ করে বলেছেন নীতিনির্ধারণী বিষয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে, বিচার বিভাগের নয়। অন্যদিকে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে নির্বাহী বিভাগকে ৭ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন। উল্লিখিত দুই নীতির ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলনে আলোচিত দুই নীতির, অর্থাৎ কোটা সংস্কারের এখতিয়ার নির্বাহী বিভাগের এবং বিচার বিভাগ এই বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন- সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। বলা যায়, এই রায়ের মাধ্যমে আন্দোলনকারী পক্ষ ও নির্বাহী বিভাগ সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে সন্তুষ্টি লাভ করবে। আমার মনের শঙ্কাটি হচ্ছে, ভবিষ্যতে আবার কোনো পক্ষ হয়তো আন্দোলন শুরু করতে পারে বা আদালতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট মামলা করতে পারে। দেশের নারী জনগোষ্ঠী ও সমতলের আদিবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের যে আকাঙ্ক্ষা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রচিত সংবিধানে প্রতিভাত হয়েছে, তা এই রায়ে কতটুকু প্রতিফলিত হয়েছে? সম্পূর্ণ রায় হাতে পেলে সেই আলোচনা করব। আপাতত, নির্বাহী বিভাগকে এই প্রবন্ধে আলোচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার বিনীত অনুরোধ রইল। 

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

ক্ষতি করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়া কি আদৌ সম্ভব?

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:০৬ পিএম
আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:০৬ পিএম
ক্ষতি করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়া কি আদৌ সম্ভব?
রেজানুর রহমান

প্রথম কথা হচ্ছে ভালোবাসা। আপনি যদি কাউকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, তাহলে কখনো তার ক্ষতি চাইবেন না। বরং তার যাতে ক্ষতি না হয় সেই চেষ্টাই করবেন। বিপদে পড়লে তার পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবেন। নিশ্চয়ই হুংকার দেবেন, আয় তো দেখি তোর কত বড় সাহস, আয়…। ভালোবাসার অনেক রং। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, অথবা সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভারোবাসা। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, ভাইবোনের ভালোবাসার প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই একটা বিষয় কমন, তা হলো নির্ভরতা, অর্থাৎ পরস্পরকে আগলে রাখা। ভালোবাসার ক্ষেত্রে দেশ, অর্থাৎ মাতৃভূমি অনেক বড় ব্যাপার। একটি মানুষের দেশ নেই তো তার কিছুই নেই। এর জ্বলন্ত উদাহরণ ফিলিস্তিনের জনগণ। একটি দেশের জন্য বছরের পর বছর ধরে মরণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন অসহায় ফিলিস্তিনিরা। তারা জানেন একটি দেশের কত প্রয়োজন। আমরাও মরণপণ লড়াই করে, ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ অর্জন করেছি। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ভালোবেসেই দেশের জন্য জীবন দিয়েছি। সেই ভালোবাসাটা গেল কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের অজুহাতে প্রিয় মাতৃভূমিকে এই যে এত ক্ষতবিক্ষত করা হলো, তার যুক্তি কী? মাতৃভূমির দোষটাই-বা কী যে, তার বুক চিরে হৃৎপিণ্ড বের করে নিতে চাইলাম? দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করা মানেই তো তার হৃৎপিণ্ডে আঘাত করা। যারা বিপুল বিক্রমে দেশের এত ক্ষতি করলেন, হৃৎপিণ্ডে আঘাত হানলেন, তারা কি একবারও ভেবেছেন দেশই যদি না থাকে তাহলে আপনি, আপনারা যাবেন কোথায়? শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বন্ধুর পরিচয়ে ঢুকে চতুর কায়দায় শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশের হৃৎপিণ্ডে আঘাত করলেন যারা তারা নিশ্চয়ই নিজেকে, নিজেদের দেশপ্রেমিক হিসেবে দাবি করতে পারেন না। 

আন্দোলনের নামে যারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জ্বালিয়ে দিলেন, মেট্রোরেলের স্টেশনে হামলা করলেন, আগুন দিলেন, এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা ধ্বংস করলেন, ডাক বিভাগের কেন্দ্রীয় অফিস পুড়িয়ে দিলেন, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সদর দপ্তর নিমেষে ভগ্নস্তূপে পরিণত করলেন, মহাখালীর ডেটা সেন্টার ধ্বংস করলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে থানায় আগুন দিলেন, ভয়ংকর জঙ্গিসহ কারাগার থেকে শত শত অপরাধীকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন, তারা আর যা-ই হোক দেশপ্রেমিক হতে পারেন না। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক যে কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার দায় শিক্ষার্থীরা নেবেন না। শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়াননি। তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করেছেন। তাহলে রাজধানী ঢাকাসহ গোটা দেশের এই যে স্মরণকালের ভয়াবহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হলো এবং এখনো চালানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী? 

নরসিংদী কারাগারে হামলা করা হয়েছে। এই সুযোগে ৮২৬ জন কয়েদি কারাগার থেকে পালিয়ে গেছে। এদের মধ্যে ৯ জন ভয়ংকর জঙ্গি রয়েছে। এটা নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের কাজ নয়। সুযোগসন্ধানীরা এই কাজ করেছে। মেট্রোরেলের দুটি স্টেশনে ভাঙচুর করা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা যায়নি। তবে কর্তৃপক্ষ বলেছে, স্টেশন দুটি চালু করতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। মহাখালীতে ডেটা সেন্টার জ্বালিয়ে দেওয়ায় কারণে দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ কার্যত বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রযুক্তিগত যোগাযোগের  ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। ইন্টারনেটবিহীন দেশে শুধু ব্যবসা ক্ষেত্রেই নয়, প্রাত্যহিক জনজীবনেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসের (বেসিস) সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বলেছেন, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রতিদিন আইটি সেবা খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা। বিদেশ থেকে যেসব অর্ডার আসে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা হচ্ছে। গ্রাহকরা আস্থা হারাচ্ছেন। 

দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। ঢাকায় সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন,  বিআইটিএ  ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সদর দপ্তরে দুষ্কৃতকারীরা ভয়ংকর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। প্রায় ২০০ যানবাহনে আগুন দিয়েছে তারা। আগুন দেওয়ায় আগে সরকারি এই স্থাপনাগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ও মালামাল লুট করেছে দুষ্কৃতকারীরা। মহাখালীর সেতু ভবনের সামনে পার্ক করে রাখা ৫৫টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে। এই সময় পাশের বস্তি থেকে অনেকে পুড়ে যাওয়া গাড়ির যন্ত্রপাতি লুটপাট করতে আসে। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, টেলিভিশনসহ আসবাবপত্র লুটপাট করে নিয়ে গেছে অনেকে।

সেতু ভবনের পাশেই বিআরটিএ ভবনে হামলা চালায় দুষ্কৃতকারীরা। একসময় তারা বিআরটিএ ভবনেও আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সময়ে আগুন দেওয়া হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী, মহাখালী তেজগাঁওয়ের টোল প্লাজায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনেও হামলা চালিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। ৫৩টি গাড়ি ও ১৩টি মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছে। ভবনের একটি সাবস্টেশন পুরোপুরি পুড়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের মতে, ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে কোটি কোটি টাকা। বিটিভি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনায়ও ৪০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

মহাখালীর ডেটা সেন্টার পুড়িয়ে দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক রুটে উড়োজাহাজের টিকিট প্রাপ্তি ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক রুটের অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ট্রাভেল এজেন্সিস অব বাংলাদেশ (আটাব) বলেছে, উড়োজাহাজের টিকিট বিক্রয়ের জন্য সারা দেশে ৪ হাজার এজেন্সি আছে। দিনে তাদের ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এখন লেনদেন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কর্তৃক কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সুযোগসন্ধানী একাধিক মহল দেশকে ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। দেশে কারফিউ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে সহিংস কর্মকাণ্ড চালানোর চেষ্টা করছে তারা। ২২ জুলাই এ লেখার দিন পর্যন্ত পাঁচ দিনে ১৭৪ জন ছাত্র-জনতার মৃত্যু ঘটেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর ও স্থাপনায় হামলা চালিয়ে, আগুন ধরিয়ে দিয়ে দেশকে ভয়াবহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, যারা রাষ্ট্রের এই যে এত ক্ষতি করলেন তারা কি দেশপ্রেমিক? তাদের আদৌ কি বিচার হবে?

একটি গল্পের মাধ্যমে লেখাটি শেষ করি। গল্পটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হলো। মায়ের কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল তার একমাত্র ছেলে। মায়ের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা। বাবা কী হয়েছে তোর? কোনো সমস্যা? বিপথগামী ছেলে বলল, মা তোমার বউমা বিশ্বাসই করতে চায় না আমি তোমার চেয়ে তাকেই বেশি ভালোবাসি… মা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন- আমাকে কী করতে হবে সেটা বল।

ছেলে বলল, তোমার হৃৎপিণ্ড চাই। আমি যদি তোমার হৃৎপিণ্ড নিয়ে যেতে পারি তাহলে তোমার বউমা বিশ্বাস করবে আমি তোমার চেয়ে তাকেই বেশি ভালোবাসি।

মা মৃদু হেসে নিজের হৃৎপিণ্ড ছেলের হাতে তুলে দিলেন। ছেলে মায়ের হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশে দৌড় দিতেই হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তার হাত থেকে ছিটকে পড়া মায়ের হৃৎপিণ্ড ছেলের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ল- ব্যথা পেয়েছিস বাবা? এই হলেন মা। দেশ তো মায়ের মতোই। আমরা কি এই গল্পের সারমর্ম বুঝতে পারছি?

শেষে একটি প্রস্তাব রাখতে চাই। সরকারি ও বিরোধী দল মিলে একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা জরুরি। যে দলই বিরোধী অবস্থানে থাকুক না কেন, আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানকে জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করা হবে দণ্ডনীয় অপরাধ। দেশকে বাঁচাতে হলে এ ব্যাপারে ঐকমত্য জরুরি। প্রশ্ন উঠতেই পারে সরকার যদি স্বৈরাচার হয়ে ওঠে, তখন আন্দোলনের ঘৃণ্য মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। শুভকামনা সবার জন্য। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো