রাজনৈতিক কর্মোদ্যোগ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে পরিবেশগত সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালন করা হয়। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন ইতিহাসের প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আলোকেই ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছরই দিবসটি বর্ণিল আকারে পৃথিবীব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫, ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত এবং ২০১০ সালে এ দিবসটি পালনের আয়োজক দেশ ছিল বাংলাদেশ।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৫-এর প্রতিপাদ্য ‘প্লাস্টিকদূষণ বন্ধ করা’, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্লাস্টিকদূষণ একটি বৈশ্বিকসংকট, যেটি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ প্রতিপাদ্য বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিকদূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানায়। ২০২৫ সালের ৫ জুন দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে এ দিবসটি উদ্যাপিত হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে ‘২০৪০ প্লাস্টিক জিরো দ্বীপ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০৪০ সালের মধ্যে একক-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ, উন্নত বর্জ্যব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। জেনেভা এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্কের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে প্লাস্টিকদূষণের বৈশ্বিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর ৪৩০ মিলিয়ন টনেরও বেশি প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়, যার দুই-তৃতীয়াংশ স্বল্পস্থায়ী পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় ও দ্রুত বর্জ্যে পরিণত হয় এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের হার মাত্র ৯ শতাংশ, বাকি অংশ ল্যান্ডফিলে জমা হয়, পুড়িয়ে ফেলা হয় বা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর প্রায় ৮ থেকে ১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিকবর্জ্য সমুদ্রে প্রবেশ করে প্রবাহমান নদীগুলো থেকে, যার বেশির ভাগই এশিয়া ও আফ্রিকার মাত্র ১০টি নদী থেকে আসে। প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কোটি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি মিনিটে সাগরে পতিত হওয়া প্লাস্টিক বোতল ও ব্যাগের সংখ্যা প্রায় ৩৩ হাজার ৮০০টি। প্রতি বছর প্লাস্টিক উৎপাদনে প্রায় ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো তেলের দরকার হয়। শুধু ১ কেজি প্লাস্টিক উৎপাদনে ২ থেকে ৩ কেজি পরিমাণ বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়; যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৪৫ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিকবর্জ্য পরিবেশে যোগ হচ্ছে এবং বিগত ৫০ বছরে সমগ্র পৃথিবীতে জনপ্রতি এক টনের বেশি প্লাস্টিকদ্রব্য উৎপাদিত হয়েছে। পরিবেশগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্লাস্টিক সমুদ্রে শত শত বছর ধরে অবিকৃত ও অবিচ্ছিন্ন থাকে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে এবং রূপান্তরিত মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করে। মানবস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর প্লাস্টিকদূষণের প্রভাব বর্ণনা করতে গিয়ে ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহের রক্ত, যকৃত এবং প্লাসেন্টায় পাওয়া গেছে, যা ক্যানসার, হরমোনজনিত সমস্যা এবং স্নায়ুতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। প্লাস্টিকদূষণ প্রতি বছর সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের জন্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির কারণ হয়।
প্লাস্টিক একটি বহুল ব্যবহৃত উপাদান হলেও এর যথেচ্ছ ব্যবহার ও অপচনশীল প্রকৃতির কারণে এটি এখন একটি বৈশ্বিক দূষণসংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও এ সংকট থেকে মুক্ত নয়। নদী, শহর, গ্রাম এমনকি কৃষিজমিতেও প্লাস্টিকবর্জ্য জমে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ২০০৫ সালে যেখানে ঢাকায় একজন নাগরিক বার্ষিক গড়ে ৩ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করতেন, ২০২২ সালে তা বেড়ে ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে উৎপাদিত প্লাস্টিকবর্জ্যের মাত্র ৩৬ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়, বাকিটুকু পরিবেশে পড়ে থেকে দূষণ সৃষ্টি করে। প্লাস্টিকবর্জ্য বিশেষ করে একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ও প্যাকেজিংসামগ্রী দেশের প্রধান নদীগুলোয় পড়ে জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে ফেলছে, ড্রেন ও নর্দমা বন্ধ করে দিয়ে নগরজীবনে ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নদীর পানি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক বিদ্যমান, যা মানবদেহে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। আবার, উন্মুক্তভাবে প্লাস্টিক পোড়ানোর ফলে বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যা শ্বাসকষ্ট, ক্যানসার এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বর্তমানে সমুদ্রে আনুমানিক ৭৫ থেকে ১৯৯ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পাওয়া যায়, যা সমুদ্রে প্লাস্টিকদূষণের মাত্রাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর মহাসাগরে কোটি কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ করছে। এ সংকট বিশ্বের প্রতিটি কোনে পৌঁছে গেছে, সবচেয়ে দূরবর্তী দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে গভীর সমুদ্রের খাঁজ পর্যন্ত যেখানে প্লাস্টিকের আবর্জনা সামুদ্রিক জীবন, বাস্তুতন্ত্র এবং এমনকি মানবস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। এসব আবর্জনার একটি বৃহৎ অংশ জমা হচ্ছে হাওয়াই এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যে অবস্থিত প্রায় ১.৬ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অবস্থিত দ্য গ্রেট প্যাসিফিক গার্বেজ প্যাচে, যা আয়তনে টেক্সাসের প্রায় দ্বিগুণ। প্লাস্টিক সামুদ্রিক আবর্জনার প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করে যা পৃষ্ঠের জল থেকে গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পাওয়া যায়। ইকোড্রাইভ কমিউনিটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী প্লাস্টিকদূষণের কারণে মারা যায়। এ ছাড়া প্রায় ৭০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিকদূষণের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে, ১২৩টি সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রজাতির মধ্যে ৮১টি প্লাস্টিক খাওয়া বা তাতে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত এবং কচ্ছপ প্রজাতির সবগুলোই এতে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। সমুদ্রে বিদ্যমান প্রায় সাতটি সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজাতির প্রতিটিই জেলিফিশ ভেবে প্লাস্টিককে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। সমুদ্রে প্লাস্টিক যোগের এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রে ওজনের দিক থেকে মাছের চেয়ে বেশি প্লাস্টিক থাকবে বলে অনুমান করা হয়। বর্তমানে ১১৪টি জলজ প্রজাতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কিছু মানবখাদ্য চেইনেও বিরাজমান। বর্তমানে জীবিত প্রায় ৯০ শতাংশ সামুদ্রিক পাখির পেটে প্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে, যা তারা সমুদ্রে প্লাস্টিক খাওয়ার কারণে প্রবেশ করছে। হারিয়ে যাওয়া বা ফেলে দেওয়া মাছ ধরার সরঞ্জামের মাধ্যমে মৎস্য আহরণশিল্প সমুদ্রের প্লাস্টিকদূষণের প্রায় ১০ শতাংশ দায়ী। বিশ্বজুড়ে প্রতি মিনিটে ১ মিলিয়নেরও বেশি প্লাস্টিক বোতল কেনা হয়, যা প্লাস্টিকবর্জ্যের একটি বড় উৎস। উৎপাদিত প্লাস্টিকের প্রায় ৫০ শতাংশ শুধু একবার ব্যবহারের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যা সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক নামে পরিচিত এবং উল্লেখযোগ্য বর্জ্য উৎপাদন ও পরিবেশগত প্রভাব সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে চলেছে।
ভয়াবহ প্লাস্টিকদূষণের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষায় জাতিসংঘের ইউএনইপি ২০২২ সালে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা ২০২৫ সালে চূড়ান্ত হবে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনসাধারণকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে জৈব-বিনাশযোগ্য প্লাস্টিক ও বিকল্প পণ্যের উন্নয়ন সাধন করা। এ শঙ্কাজনক পরিসংখ্যান সত্ত্বেও সমুদ্রে প্লাস্টিকসংকট মোকাবিলায় পৃথিবীব্যাপী ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। দ্য ওশান ক্লিনআপ প্রকল্প বিশ্বজুড়ে সমুদ্র থেকে ১৬ মিলিয়ন কিলোগ্রামেরও বেশি প্লাস্টিক সফলভাবে অপসারণ করেছে। এ প্রচেষ্টা সমুদ্রের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথমবারের মতো পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে। বর্তমানে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বন্ধে খসড়া নীতি প্রণয়নাধীন, তবে এর যথাযথ বাস্তবায়নে দুর্বলতা ও সচেতনতার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, প্লাস্টিক কর ও এক্সটেন্ডেড প্রডিওসার রেস্পনসিবিলিটি চালু করা, রিসাইক্লিংশিল্পে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রচারণা চালানো, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা চালু করা, পাটের মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপকরণের ব্যবহার প্রসার করা যেতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৫ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্লাস্টিকদূষণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার সমাধানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ে পর্যায়ে সচেতনতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি প্লাস্টিকমুক্ত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারি।
লেখক: অধ্যাপক, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]

