ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩৩, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হারুন আল রশীদ খাল খননের পর ভরাট করে গাড়ির গ‍্যারেজ, কার গরজে? রংপুরে নিখোঁজের এক দিন পর পাটখেতে মিলল শিক্ষার্থীর মরদেহ পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে বদলে যাবে ২৪ জেলার দৃশ্যপট, তৈরি হবে নতুন সম্ভাবনা নিয়োগ দেবে ব্যাংক এশিয়া জিপিএস ছাড়া গণপরিবহনের ফিটনেস সনদ ইস্যু ও নবায়ন হবে না পরিবেশবান্ধব বায়োগ্যাস প্রযুক্তি সম্প্রসারণে একসঙ্গে কাজ করবে প্রাণ ডেইরী ও এটিইসি খিলগাঁওয়ে স্কয়ার গ্রুপের ফ্রি হেলথ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত জামালপুরে পুলিশের চাকরি দেওয়ার চুক্তি, ২ প্রতারক গ্রেপ্তার সাঙ্গু নদে নিখোঁজ শিশুর সন্ধান মেলেনি ১৬ ঘণ্টায়ও ঝিনাইদহে রেললাইন-মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবি রোহিঙ্গাদের জন্য জমি চাইল জাতিসংঘ, নাকচ বাংলাদেশের ব্রাজিলের বিপক্ষে অগ্নিপরীক্ষার আগে স্বকীয়তায় ফেরার আহ্বান ম্যাকগিনের রামু বৌদ্ধ বিহারে একদিন দ্রুত বিদায়ে হতাশ তুরস্ক কোচ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় বাবা বরগুনায় বেড়েছে গরুর ক্ষুরা রোগ,ভ্যাকসিন সংকটে খামারিরা রিকন্ডিশন্ড গাড়িতে বাড়তি কর প্রত্যাহারের আহ্বান বারভিডার আ. লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, তারা মাফিয়া পার্টি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর লজ্জিত আরদা গুলের বেনজিরকে শিগগিরই ফেরত আনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মালয়েশিয়া ও চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী ২৮ জন টিনএজ থেকে গ্লোবাল সুপারস্টার চকরিয়ায় শ্রীরামকে অবমাননার প্রতিবাদে বিক্ষোভ রূপগঞ্জে  ব্যবসায়ীর বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর লুটপাটের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন নওগাঁয় ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের খাঁচায় ৩ ডাকাত আইওএস ২৭-এ আসছে নতুন ফিচার কেমন ছিল রাসুল (সা.)-এর প্রিয় পোশাক রাঙামাটিতে জাম পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে শিক্ষিকার মৃত্যু ব্রাজিলের কাছে হেরেও ফুটবলারদের নিয়ে গর্বিত হাইতির কোচ

বিশেষ সাক্ষাৎকার: মোস্তফা কামাল গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী গণমাধ্যম অপরিহার্য

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৫০ পিএম
আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০১:০০ পিএম
গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী গণমাধ্যম অপরিহার্য
মোস্তফা কামাল

২য় পর্ব

প্রতিষ্ঠার দুই বছর পূর্ণ করে তৃতীয় বর্ষে পা দিচ্ছে দৈনিক খবরের কাগজ। জাতীয় এ দৈনিকটি অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা সময়ে ছাপা পত্রিকা প্রকাশ কতটা চ্যালেঞ্জের, হাজারও সংবাদপত্রের ভিড়ে কেন আরেকটি নতুন কাগজ নিয়ে এলেন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। সেসব গল্প শুনতেই খবরের কাগজের হেড অব ডিজিটাল গোলাম রাব্বানী মুখোমুখি হয়েছিলেন খবরের কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামালের। 

তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে, এই জায়গাটায় কাজ করার সুযোগ আছে, বিপণনের আধুনিকায়ন হলে সংবাদপত্রই উপকৃত হবে? এবং পাঠকও উপকৃত হবে। 

মোস্তফা কামাল : হ্যাঁ, পাঠক তো চায় পত্রিকা পড়তে। কিন্তু তার হাতের কাছে পত্রিকা পায় না। এখন তো মানুষ পুরো পৃথিবীটাকে একটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ হিসেবে দেখে। সে সারা বিশ্বের খবর পড়তে চায়। আপনি দেখেন যে, গ্রামের ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তার দিন দিন স্বপ্ন কিন্তু বড় হয়, সে দেশের সীমানা পার হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে। এ স্বপ্নবাজরা তো গ্রামে বসেই দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো পড়তে চায়। তারা তো সে সুযোগটা পায় না। এখন মোবাইলের কারণে হয়েছে কী সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক ভুল জিনিস ছড়িয়ে পড়ে। যার যা খুশি ছেড়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এগুলো দেখে হয়তো মানুষ বিনোদন পায়, কিন্তু যদি তার হাতে আমরা পত্রিকাটা পৌঁছাতে পারতাম, সে সত্যটা জানতে পারত। তখন সে ভুল জিনিসে সময় দেবে না।  

বিপণন নিয়ে আপনার কথা শুনলাম আমরা। এখন একটু জানতে চাই পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগ নিয়ে। যেকোনো ছাপা কাগজের মূল চালিকাশক্তিই হচ্ছে তার বিজ্ঞাপন ও মার্কেটিং বিভাগ। বিজ্ঞাপনকে সংবাদপত্রের ভাষায় লক্ষ্মীও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের ও সেবার প্রচার প্রচারণার জন্য ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল অ্যাডসেন্স, টিকটকের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে দেশের বিজ্ঞাপন বাজারও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে গণমাধ্যম টিকে থাকাই তো এখন বড় চ্যালেঞ্জ? এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ আছে কি? 

মোস্তফা কামাল: খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রসঙ্গ। এটা আসলে শুরু হয়েছে করোনার সময় থেকে। ওই সময় তো অনেক পত্রিকাই বন্ধ হয়ে গেল। আমি তখন কালের কণ্ঠে, তখন আমরা দেখলাম পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপন আমরা পেতাম তা অর্ধেকে নেমে এল। ফলে আয়ের ওপর একটা বিশাল চাপ পড়ল আমাদের। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। এই মুহূর্তে আমি বলব যে,  করোনা থেকে শুরু করে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকরা। অনেক সাংবাদিক বেকার হয়েছেন। তাদের পরিবার দুর্বিষহ জীবন যাপন করেছে। সেই কঠিন সময়টায় আমরা দেখেছি যে, একটা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানও ভেঙে গেছে। কোনো কোনো সম্পাদক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তো বিজ্ঞাপনের চ্যালেঞ্জটা এখনো আছে এবং গণমাধ্যম সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। 

এই সময় কি পার হবে না?

মোস্তফা কামাল: আমরা আশা করছি একটি ভালো নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে এ খারাপ সময় কেটে যাবে। আর ফেসবুক বা গুগলে বিজ্ঞাপন চলে যাওয়ার যে বিষয়টা বললেন, আমি বলব কোম্পানি তো সব সময় চাইবে তার প্রোডাক্টের সর্বোচ্চ প্রচার যেখানে পাবে সেখানেই অ্যাড দিতে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোর জন্য মাল্টিমিডিয়াও একটি বড় আয়ের জায়গা হতে পারে। আমরাও এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। একজন বিজ্ঞাপনদাতা যখন দেখবেন যে, তার একটি বিজ্ঞাপন একই সঙ্গে প্রিন্টে যাচ্ছে, অনলাইন এবং ভিজ্যুয়ালেও প্রকাশ হচ্ছে; তখন তো তিনি এটার ফিডব্যাক ভালো পাবেন। এ জায়গাগুলো নিয়ে তখন মার্কেটিং টিম কাজ করতে পারে। আসলে সমস্যা হয়েছে এখন দক্ষ মার্কেটিংয়ের লোকও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিং। এ কঠিন সময়কে উত্তরণ করাই তো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা একটা নতুন পত্রিকা, গত দুই বছরে আমাদের আহামরি ফ্যান ফলোয়ার তৈরি না হলেও আমরা মানুষের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে আস্তা তৈরি করতে পেরেছি। আর পণ্যের প্রচার সবাই চায় একটি বিশ্বাসযোগ্য প্লাটফর্ম থেকেই করতে। 

বিপণন ও মার্কেটিংয়ের অনেক খবর তো জানা হলো, আমি একটু জানতে চাই খবরের কাগজ প্রকাশের পর পরই দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে গণ-অভ্যুত্থান, পুরোটা সময় মোকাবিলা করা তো একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আপনার জন্য। আপনি এ চ্যালেঞ্জটা কীভাবে সামাল দিয়েছেন।

 মোস্তফা কামাল: একটা রেজিম চেঞ্জ আন্দোলন হবে এটা অনেকেই তখন বুঝতে পারেনি। কোটা নিয়ে ছাত্রদের একটা আন্দোলন যেটা আবার শাহবাগ টিএসসিকেন্দ্রিক আন্দোলন, সবাই তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু খবরের কাগজ শুরু থেকেই এ আন্দোলনের আচটা টের পাচ্ছিল। আমরা তখন গুরুত্বের সঙ্গে আন্দোলনের খবরগুলো প্রকাশ করছিলাম। আমাদেরও প্রশ্ন ছিল স্বাধীনতার এত বছর পর চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩০ ভাগ কোটা কেন থাকবে? ২০১৮ সালে কিন্তু এ ইস্যুটার মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। এটাকে আদালতে আটকে দেওয়া হলো। আমাদের দেশে অনেকেই আদালতের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কিন্তু আদালতের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলে, প্রশ্ন তোলে। আমরা যদি সমালোচনা না করতে পারি, না কথা বলতে পারি, যে এই সিদ্ধান্তটা আবার পুনর্বিবেচনা করা দরকার। মিডিয়া তো বলতেই পারে। সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। একটা গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদপত্রকে আমরা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলি। যদি কিছুই না লিখতে পারি, যদি একটা রায়ের সমালোচনা না করতে পারি, তাহলে তো এই যে চতুর্থ স্তম্ভ বিষয়টাই তো একটা বেজলেস কথা হয়ে যায়। সেই জায়গা থেকে আমরা আন্দোলনটা কাভার করেছি। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে, আন্দোলনটা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। কারণ সরকার একের পর এক ভুল করে যাচ্ছিল। সেই ভুলগুলোও কিন্তু আমরা পত্রিকায় একের পর এক প্রকাশ করেছি। যেহেতু ছাত্র আন্দোলন, সেখানে আমরা দেখেছি যে, এই আন্দোলনে অভিভাবকরা যুক্ত হয়েছে। আমরা তাদের কথাও বলেছি। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আমাদের এখানে এসেছে, আমরা তাদেরও বলেছি আন্দোলনটা কিন্তু ভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। তারাও আমাদের কথাগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু সরকার এটাকে গুরুত্ব দেয়নি। বিদেশি সংস্থাগুলোও সরকারকে জানিয়েছিল যে, এটা কিন্তু স্বাভাবিক আন্দোলন না। দ্রুত সেটেল করা ভালো। আমাদের পত্রিকার কলাম, নিউজগুলোয় সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের কলামিস্ট আবুল কাসেম ফজলুল হকের সেই সময়কার কলামগুলো যদি কেউ পড়ে থাকেন, তিনি কিন্তু স্পষ্ট করে বলেছেন এই আন্দোলনের পেছনে আমেরিকা যুক্ত হয়েছে। বড় একটা শক্তি কাজ করছে। তার পরও সরকার এক ধরনের গেম খেলেছে এ আন্দোলন নিয়ে। সেগুলো আমরা প্রকাশ করেছি। পত্রিকার কাজই আসলে এটা। আগের সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে কিছু লেখা যেত না বল হতো, আমরা কিন্তু তাদের অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখেছি। দেখুন ছাত্রদের দাবি তারা ঠিকই মেনেছিল কিন্তু ততদিনে অনেক ছাত্র শহিদ হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সরকার আসলে নিজের ফাঁদেই নিজে পা দিয়েছে। 

আপনি শুরু থেকেই নানান প্রসঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বলছিলেন। আসলে সোশ্যাল মিডিয়া এখন সংবাদপত্র জগতের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সংবাদমাধ্যমগুলো এখন ডিজিটাল প্লাটফর্মের দিকেই বেশি ঝুঁকছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে লড়াই করে সংবাদমাধ্যম কীভাবে টিকে থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মোস্তফা কামাল: আমি কিছুটা অতীতে যাই, আমি কালের কণ্ঠ ছাড়ার পর আমার বন্ধুবান্ধবরা বলেছিলেন, আপনি তো সম্পাদক হয়েছেন, সাংবাদিকতায় আর তো কিছু হওয়ার নেই। এখন আপনি লেখালেখিতে মন দেন। পত্রিকা আর করার দরকার নেই। পত্রিকা আর মার্কেট পাবে না। করোনার ওই সময়টায় ঘরে ঘরে অনলাইন হয়ে গিয়েছিল এবং ফেক নিউজের ছড়াছড়ি ছিল চারদিকে। যে যেভাবে পেরেছে একটা ডোমেন নিয়ে অনলাইন শুরু করে দিয়েছে। মানুষ এক ধরনের পাগল হয়ে যাওয়ার দশা। সেই রকম একটা পরিস্থিতিতে মনে হলো বস্তুনিষ্ঠ কিছু করা যায় কি না। তখনই আমার কিছু বন্ধুর সাপোর্ট নিয়ে আমি শুরু করেছিলাম ঢাকা প্রকাশ। সেখানে আমাদের স্লোগান ছিল সততাই শক্তি, সুসাংবাদিকতায় মুক্তি, তো এই যে স্লোগান, এটা মানুষ বিশ্বাস করেছিল। আমরাও চেষ্টা করেছিলাম যে, কোনো ভুল সংবাদ প্রকাশ করব না এবং প্রকাশের পর যেন কোনো সংবাদ প্রত্যাহারও করতে না হয়। যদি আমি কোনো সংবাদ প্রত্যাহার না করি, তাহলে সবাই সজাগ থাকবে, ভুল নিউজ দেবে না। সেই সময় ঢাকা প্রকাশ দ্রুত মার্কেট পায়। সেই ধারাবাহিকতায় খবরের কাগজ সৃষ্টি। খবরের কাগজেও আমরা সততা, নিষ্ঠা এবং পেশাদারত্ব বজায় রেখেছি। মানুষ আসলে কী চায়, সাংবাদিকরাই সত্য প্রকাশ করবে, সাংবাদিকরাই সাহসী কথা বলবে, এবং সাংবাদিকরাই নিরপেক্ষ থাকবে। তার কোনো দল থাকবে না, আপনি হয়তো মনে মনে একটা দলকে ভালোবাসতে পারেন, বা একটা দলকে নিশ্চয়ই আপনি ভোট দেন, কিন্তু আপনার পেশায় তার কোনো প্রভাব থাকবে না। হ্যাঁ, আমি একটা দলকে ভোট দিই, কিন্তু আমি আমার পেশায় পবিত্র থাকছি কি না, পেশাকে কলুষিত করছি কি না। অথবা আমি পেশার সঙ্গে বেইমানি করছি কি না, সেটা দেখতে হবে। আমার মূল লক্ষই ছিল পেশাকে কলুষিত না করা, সত্যের পক্ষে থাকা। যে কারণে পাঠক আমাদের আস্থার জায়গায় রেখেছে। 

মিস ইনফরমেশন ডিল করাও এখন সংবাদপত্রের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সবাইকে, ফেক নিউজ নিয়ন্ত্রণের জন্য কী কী পদক্ষেপ গণমাধ্যমগুলোর নেওয়া উচিত বলে মনে করেন? 

মোস্তফা কামাল: সারা বিশ্বের মানুষ এখন অনলাইনেই সব খবর পড়ে ফেলছে, দেখে ফেলছে, যার হাতে এখন স্মার্টফোন তার হাতে এখন সারা দুনিয়া। 
সত্য প্রকাশ আপনি ঢেকে রাখতে পারবেন না। সরকারকে হানিমুন পিরিয়ড দিই, সেটা আর দেওয়া যাবে না। নতুন সরকার এলেই তাকে হানিমুন পিরিয়ড দিলাম, বা তার প্রথম ১০০ দিনকে সেক্রিফাইস করলাম, তার ভুলভ্রান্তি লুকিয়ে রাখলাম। এগুলো করা যাবে না। ভুল তো ভুলই, এটাকে লুকানো যাবে না। দুর্নীতি তো দুর্নীতিই। সরকার যদি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই একটা দুর্নীতি করে তাহলে কী আপনি চোখ বন্ধ করে রাখবেন। সরকারকে সঠিক পথে রাখার দায়িত্ব কিন্তু গণমাধ্যমের। আমি প্রথমে যদি তার ভুলটা না ধরে দিই তাহলে পরে সে  আরেকটা ভুল করবে। আজকে আমরা যে দুর্নীতির কথা বলি, গত ১৫ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে, বিদেশে পাচার হয়েছে, আমরা যদি শুরু থেকেই এগুলোর বিরুদ্ধে লিখতে পারতাম, তাহলে এতটা দুর্নীতি হতো না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দিকে যেতে হবে। নতুন যারা ক্ষমতায় আসবে আগামীতে তারা যদি শুরুতেই তাদের মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব দেয়, দুই বছর পর সাংবাদিকরাই খুঁজে বের করবে কার কার সম্পদ বাড়ল এবং সেটা কী প্রক্রিয়ায় বেড়েছে। সত্য প্রকাশ যতই কঠিন হোক সেটা প্রকাশ করতে হবে। সত্য যদি সাহসের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমগুলো প্রকাশ না করতে পারে তাহলে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে হেরে যাবে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় সব খবর চলে আসে। আপনি কয়জনের অ্যাকাউন্ট ব্লক করবেন, সত্য তো আপনার সামনে আসবেই। সোশ্যাল মিডিয়া এখন এতটাই শক্তিশালী যে, আপনি তাকে অস্বীকার করতে পারবেন না। তোয়াজ না করে তোষামদ না করে সংবাদ মাধ্যম যদি সত্য প্রকাশ না করতে পারে তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে হারিয়ে যাবে সংবাদমাধ্যম। এটাই এখন সংবাদপত্রের বড় চ্যালেঞ্জ। 

কামাল ভাই আপনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কথা বলছিলেন, অনেকেই বলে বাংলাদেশে এখন প্রেস রিলিজ সাংবাদিকতা চলছে। আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কমে গেছে? 

মোস্তফা কামাল : হ্যাঁ, তা তো কমেছেই। অনেকটাই কমেছে। আমরাও অনুসন্ধানী রিপোর্টার খুঁজি কিন্তু পাই না। ছয় মাস এক বছর ধরেও একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি হয়। আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম তখন সুযোগ হয়েছিল দেশটির একাধিক পত্রিকা অফিস ভিজিট করার। সেখানকার প্রভাবশালী পত্রিকা লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস যেটাকে এলএ টাইমস বলা হয়। পত্রিকাটির এডিটরের সঙ্গে অনুসন্ধানী রিপোর্টিং নিয়ে আলাপের সময় তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন, তাদের একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করতে এক বছর সময় লেগেছিল, যেটা নিয়ে তারা পরে ৭টি সিরিজ প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেই প্রতিবেদনগুলো এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, ওই সিরিজগুলো নিয়ে আলাদা সাপ্লিমেন্ট প্রকাশ করতে হয়। টনক নড়িয়ে দিয়েছিল পুরো আমেরিকার। এই প্রতিবেদন তৈরি করতে তাদের বিভিন্ন দেশে যেতে হয়েছিল এবং প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়েছিল। তো আমাদের দেশেও তো এরকম হতে পারে। সেটা আমরা পারছি না। এটার পেছনে যে বিনিয়োগ দরকার সেটা আমরা করতে পারি না। রিপোর্টারদের আগ্রহ এবং ধৈর্যও নেই। আমার মনে হয় সামনের দিনের সাংবাদিকতাই হবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। পুরো পত্রিকায় যদি একটিও অনুসন্ধানী রিপোর্ট থাকে তাহলে সেটাই পাঠক পড়বে। গতানুগতিক পত্রিকা দিয়ে এই মার্কেট ধরে রাখা যাবে না। আমরা অনেক কঠিন জিনিস দেখি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। তখন সোশ্যাল মিডিয়ার চাপের কারণে পত্রিকাগুলো বাধ্য হয় নিউজ করার। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়ই নির্ধারণ করে সরকার থাকবে, না থাকবে না। আমাদের দেশেও যদি দেখেন ’২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বিশাল ভূমিকা ছিল। কিছুদিন আগে নেপালে যে সরকার পরিবর্তন হলো সেখানেও সোশ্যাল মিডিয়ার একটা ভূমিকা ছিল। 

কামাল ভাই এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করে, যার মধ্যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনও একটি। আপনার কি মনে হয় এ কমিশন দিয়ে সাংবাদিকদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হবে? 

মোস্তফা কামাল: আমার তো মনে হয় না। কারণ কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। তারা একটি ভালো রিপোর্ট দিয়েছে সরকারকে। যেমন ধরেন টিভি এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ওয়েজবোর্ড নেই। পত্রিকাগুলোয় আছে তাও সেটা নামমাত্র। সব মিডিয়া ওয়েজবোর্ড সাপোর্টও করে না। সরকারি যে সাপোর্ট দরকার সেটাও আমরা পাই না। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও কিন্তু পত্রিকাকে সাপোর্ট দেয়, বিশেষ করে বিজ্ঞাপনে। আমাদের এখানে সরকার যদি মনে করে এটা আমার পক্ষের পত্রিকা তাহলে সেখানে বেশি করে সরকারি বিজ্ঞাপন দেয়, আর যদি মনে করে আমার পক্ষের না, তাহলে সেখানে বিজ্ঞাপন দেয় না। নিউজ প্রিন্টের কোনো সুবিধা নেই। নিউজপ্রিন্ট যারা আমদানি করে সরকার যদি তাদের টেরিফ ফ্রি করে দেয় তাহলে দেশের মার্কেটে কম দামে নিউজপ্রিন্ট পাওয়া যায়। তাহলে পত্রিকার উৎপাদন খরচ কমে যায়। কিন্তু সে জায়গাটায় সরকারের কোনো সাপোর্ট নেই। আমরা আশা করেছিলাম অন্তর্বর্তী সরকার এ জায়গাটি নিয়ে কাজ করবে। কারণ গণমাধ্যম ঠিক না হলে কিন্তু এ দেশের গণতন্ত্রও ঠিক হবে না। এ গণতন্ত্রেরও আমরা ফ্যাসিবাদী রূপ হিসেবে দেখব। গণতন্ত্র আমরা চাই, কিন্তু মিডিয়াকে শক্তিশালী রূপে দেখতে চাই না, তাহলে তো হবে না। মুখে আমরা অনেক কথাই বলি, কিন্তু সাংবাদিকরা যদি ভালো না থাকে তার পরিবার যদি ভালো না থাকে সে তো ভালো কাজটা দিতে পারবে না। সেই শৃঙ্খলাটা তো আসতে হবে। এখন যে সংবাদ মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে আসে, তাকে আগে ভাবতে হয় যে, কত বছর লস দিয়ে প্রতিষ্ঠানটা চালাতে হবে। সেখানে সরকার যদি কিছুটা সাপোর্ট দেয় তাহলে লসের পরিমাণটা কমে আসে। এ সরকারের সুযোগ ছিল কিছু করার, সেটা আমরা হারিয়েছি। এখন ভবিষ্যৎ সরকারের কাছে চাওয়া থাকবে তারা যদি সত্যিকারের গণতন্ত্র চায় তাহলে তারা শক্তিশালী গণমাধ্যম চাইবে। বিজ্ঞাপনে মনোপলি করবে না। নিউজপ্রিন্ট আমদানির ক্ষেত্রে যে মনোপলি সেটা তারা করবে না। এমন অনেকেই আছেন যারা সরকারি সুবিধার অপব্যবহার করে থাকেন। সেগুলো বন্ধ করা হবে। একই সঙ্গে যারা পেশাদার হাউস, পেশাদার সাংবাদিক তাদের সাপোর্ট দিতে হবে, টিকিয়ে রাখতে হবে সরকারকে। এই জায়গাটা তৈরি না হলে আমাদের দুর্ভোগ-দুর্গতি থাকবেই। 

আপনার সাংবাদিকতার ক্যারিয়ার দীর্ঘ বছরের, সংবাদ দিয়ে শুরু করেছিলেন। এরপর প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, ঢাকা প্রকাশ হয়ে বর্তমানে খবরের কাগজ। তো আপনার কাছে কী মনে হয় বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কী?

মোস্তফা কামাল: আমার ৩৬ বছরের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ভালো কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। ’৯১ সালের পর থেকে আমি পেশাদার সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি। তখনকার সময়টা আসলে ভালো ছিল। ওই যে লোকে বলে না, যায় দিন ভালো। আগে সবকটি পত্রিকা হাউসে ওয়েজবোর্ড দিত, সবার মধ্যে পেশাদার একটা মনোভাব ছিল। সেই জায়গা থেকে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি। মনে হয়েছে আমার প্রোটেকশন দরকার, তাই আমি একটা পত্রিকা খুলে ফেললাম, কিন্তু আমি চিন্তা করিনি এখানে যারা কাজ করবেন তাদের কতটা সুযোগ-সুবিধা দিতে পারব, বা এটাকে একটা পেশাদার হাউস হিসেবে গড়ে তুলতে পারব কি না। সেই জায়গাটা থেকে মুক্ত থেকে আমরা তো এখন টিকে থাকার লড়াই করছি। আমরা একটা পেশাদার হাউস করলাম কিন্তু এখন টিকে থাকতে পারছি না, সহযোগিতার পরিবর্তে অসহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলাম যে, বৈষম্য দূর হবে। কিন্তু এখন কী দেখছি- বৈষম্য আরও বাড়ছে। আমরা দেখলাম যে, সারা দেশে মব সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে, আমরা দেখলাম যে, এ দেশের যে ইতিহাস-ঐতিহ্য সেগুলোকে ভূলণ্ঠিত করা হলো। পীর-আউলিয়াদের এই দেশে আমরা দেখলাম তাদের মাজারগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। সমাজে সহমর্মিতার জায়গা নেই। আমি আমার বাবা-মাকে যেভাবে পা ছুঁয়ে সালাম করতাম, শিক্ষকদেরও সেভাবে সালাম করতাম। সেই জিনিসগুলো এখন আর নেই। আমরা এখন দেখি যে, বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ করাচ্ছে ছাত্ররা। শিক্ষকদের অপমান করছে। এই শিক্ষার্থীরাও তো একটা সময় পেশায় যাবে, হয়তো কেউ শিক্ষক হবে, কেউ অন্য পেশায় যাবে, তখন তাদের কী অবস্থা হবে? এই জায়গাটা আমরা ঠিক করতে পারিনি। আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করছি, পারস্পরিক যে শ্রদ্ধাবোধ সেটা আমাদের মধ্যে নেই। আমরা একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা ভাবতে পারি না। একটা বড় গ্রুপকে ছাড়াই আমরা চিন্তা করছি আমরা কীভাবে নির্বাচনে যাব। জিতে আসব এবং ক্ষমতায় যাব। তাহলে তো আর ইনক্লুসিভ সোসাইটি হলো না। আমি খুব শঙ্কিত, কারণ একটা বিভাজিত সমাজ আমাদের সামনে। মব সন্ত্রাসের চেয়েও কঠিন একটা ভায়োলেন্স অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। দেশের অসংখ্য তরুণ বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছে, অসংখ্য পরিবারও একই চেষ্টা করছে। কেন সে মাতৃভূমি ছেড়ে যাবে। সে তো একটা অড জব করার জন্য যাবে না। কিন্তু সেই চিন্তাটা তারা করছে। এ দেশকে তারা নিরাপদ আবাস ভূমি মনে করছে না। এই নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব কাদের? যারা রাজনীতি করে তাদের। আজকে একটা বড় রাজনৈতিক দল অপেক্ষায় আছে ক্ষমতায় যাবে, কিন্তু সে কেন ভাবছে না যে, তারা আরেকটা বড় দলকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এক বছর পরই তো তারা আরও বেশি শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়াবে। তখন তো দেশে আরও বেশি সামাজিক ক্লেশ তৈরি হবে। এগুলো ভেবে আমি আরও বেশি শঙ্কিত গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে। 

ধন্যবাদ কামাল ভাই। আমরা আশা করতে চাই আপনার এই শঙ্কা কেটে যাবে। সুন্দর সময় আসবে। শেষ করার আগে জানতে চাই- খবরের কাগজের পাঠকের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলেন? 

মোস্তফা কামাল: গত দুই বছরে খবরের কাগজ পাঠকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে, ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে এবং সুধী সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ পাঠক সবাই সহযোগিতা করেছেন। দেশ-বিদেশের পাঠক আমাদের উৎসাহ দিচ্ছেন, সাহস দিচ্ছেন। আমাদের পাঠকরাই আমাদের শক্তি, আমাদের পেশাদারত্বই আমাদের শক্তি। যত সংকট আসুক, যত বাধা আসুক সব বাধা মোকাবিলা করেই আমরা পাঠকের সামনে হাজির হবে। আমরাও আশা করছি, পাঠক আমাদের সঙ্গেই থাকবেন, তাদের ভালোবাসা পাব আমরা। 

আরও পড়ুন:

প্রথম পর্ব: বিশেষ সাক্ষাৎকার: মোস্তফা কামাল আমরা নিরপেক্ষভাবে সত্য প্রকাশ করছি

মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
মেধা পাচার: উন্নয়নের আড়ালে নীরব বিপর্যয়
সোনিয়া তাসনিম

শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য...

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব ২০২৪-২০২৫ অনুযায়ী, সে সময়ে বাংলাদেশিদের বিদেশে শিক্ষার ব্যয়ের অঙ্ক ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বাংলাদেশি টাকায় ব্যয়কৃত ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ ব্যয়ের অর্থের পরিমাণ, হাজার ৭৯ কোটি টাকা (ডলারপ্রতি ১২২ টাকা হিসাবে) চমকে গেলেন? এত দ্রুত চোখ গোলাকার করলে হবে না কারণ, কেবল বিশাল ব্যয় নয়, সংখ্যার দিক থেকেও এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের মেধা বগলদাবা করে পাড়ি জমাচ্ছে দূরদেশের পথে

আপাতদৃষ্টিতে একে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যায় কারণ, অ্যামাজন, গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কর্মীর সংখ্যা যেখানে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশের মেধাবী তরুণরা নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে সেটা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গর্ব তবে এই অহমের তাজকে ছুঁয়ে দিতে আমরা কি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বিশাল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি? যদি হয়েও থাকি তবে কেন?

গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, ব্যক্তিগত উন্নতির আকাঙ্ক্ষার এই আনন্দযাত্রার নেপথ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের উন্নয়নের পথে বিশাল হুমকি পরিস্থিতি বিচারে একে আমরা বলতে পারি মেধা পাচার যা নীরবে বয়ে আনতে পারে জাতীয় জীবনের জন্য এক গভীর বিপর্যয়

যদি কোনো তরুণকে প্রশ্ন করা হয়, কেন সে বিদেশে পড়তে আগ্রহী? তাহলে চটজলদি অনেক বিষয় আমাদের সামনে চলে আসবে একজন মেধাবী ছাত্রের কাছে এখন বিদেশ পাড়ি দেওয়া কেবল উচ্চশিক্ষা লাভ নয়, পাশাপাশি যে বিষয়গুলো তাকে এই পদক্ষেপে আগ্রহী করে সেগুলো হলো, সম্মানজনক পরিবেশ তথা নিরাপত্তা, যোগ্যতার মূল্যায়ন, দক্ষতার সঠিক ব্যবহার মূলত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, একজন তরুণকে যখন ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও লম্বা সময় ধরে বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেরাতে হয় এবং তার যোগ্যতার বিপরীতে লবিং সংস্কৃতি জোড়ালো হয়ে ওঠে, তখন দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মক্ষেত্র নির্বাচনে সে স্বভাবতই হতাশ হয়ে পড়ে

মূলত, আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে উন্নয়ন হয়নি শিক্ষার মানসহ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গুণগত দক্ষতা বর্তমানে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে হারে বাড়ছে তার চেয়ে দ্বিগুণ হারে পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার নীতিমালা এর গুণগত মান

পড়াশোনার পরিবর্তে শিক্ষালয়গুলো অসুস্থ রাজনৈতিক চর্চামহলের আঁকড় হয়ে উঠছে দলীয় রাজনীতির প্রভাব, গেস্টরুম কালচার, ভিন্নমত দমনএমন সব বিষয় রীতিমতো এখন অভিভাবক থেকে শিক্ষার্থীমহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে মেধার বদলে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের নৈতিক জায়গা থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে কেউ প্রচলিত কাঠামোর বাইরে কিছু ভাবতে গেলে তাকে প্রতিহত করা হচ্ছে, যার কারণে একজন প্রকৃত মেধাবী ক্রমশ এটি অনুধাবন করে, যেখানে ট্রেন্ডিং কাঠামো উপস্থিত, সেখানে নিজেকে প্রমাণ করা সম্ভব নয় আর এই ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতাই তাকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ভিন্ন ভাবনায় ধাবিত করতে বাধ্য করে

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় কোনোভাবে পাস করে সার্টিফিকেট অর্জন করেও দুশ্চিন্তার অবসান নেই কারণ, একজন শিক্ষার্থীর বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ওপর তার চাকরির ব্যাপারটা নির্ভর করে না যেমন, পলিটিক্যাল সায়েন্স কিংবা ইংরেজি বিষয়ে একজন স্নাতক ডিগ্রিধারীকে দেখা যায় ব্যাংকিং সেক্টরের কাজ করতে অথচ এখানে তার শিক্ষাগত ্যাকগ্রাউন্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে যখন কাউকে নিজের প্রকৃত মেধার বিপরীতে নিয়োজিত হতে হয়, তখন সেখানে ডিমোটিভেশন কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক আমাদের দেশে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার অভাব বিশ্ববাজারের বহুমাত্রিক প্রতিয়োগিতায় অবতীর্ণ হতে অক্ষম অপরপক্ষে আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামও আন্তর্জাতিক মাপকাঠি অনুযায়ী প্রণীত হয় না দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোয় রাজনৈতিক পালাবদল, নির্লজ্জ রাজনৈতিক আগ্রাসনের কারণে শিক্ষার্থীদের অহেতুক দুর্ভোগ পোহাতে হয়

এবার আসা যাক শিক্ষকদের বিষয়েশিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর এখন যদি কারিগরের কারিগরি প্রশিক্ষণেই গোলমাল থাকে, তবে? আমাদের শিক্ষা খাতের বিষয়টা এখানে এমনই গোড়াতেই গলদ যাকে বলে কী করে? দেশের ইউনিভার্সিটিগুলোর ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রফেসর এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ চাটুকারিতার প্রভাবে অনেক অযোগ্য লোকেরা অলংকৃত করে তুলছেন, যার খেসারত শিক্ষার্থীদের মেটাতে হয় পাশাপাশি আমাদের এখানে পুঁথিগত শিক্ষাটাকেই মূল ভিত্তি বলে বিবেচনা করা হয় কারিগরি শিক্ষা থাকে উপেক্ষিত অথচ হাতে-কলমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না হলে দক্ষ জনশক্তি তথা দক্ষ মেধার বিকাশ ঘটা অসম্ভব এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা কেন যেন সব সরকারের অগোচরেই থেকে যায় সঙ্গে দেশে গবেষণাভিত্তিক কাজগুলো করা যতটুকু কঠিন, সীমিত আবার ততটুকু জটিলও যে কারণে এখন কেবল ডাক্তার, প্রকৌশলী নয় বরং গবেষক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সৃজনশীল তরুণরা ভিনদেশে পাড়ি জমাতে উদগ্রীব

যেখানে সময়ের গতিতে দাঁড়িয়ে আজকের বিশ্ব ভিন্ন কিছু করার স্বপ্ন দেখে, সেখানে আমাদের মেধাবী তরুণরা একগাদা সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরির আশায় এখানে-ওখানে ধরনা দিয়ে বেড়ায় প্রচলিত সেকেলে ধারা থেকে কেন যেন আমাদের শিক্ষা কর্মব্যবস্থার যথাযথ মুক্তি মিলছে না কোনোভাবেই আমরা আজ ড্রোন প্রযুক্তি থেকে নানা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য দেশের বাইরে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করে নিজেদের আধুনিক করে তুলতে চাই অথচ এই বিনিয়োগের অর্ধেকটাও যদি নিজ দেশের গবেষণা খাতে করতাম, তবে আজকের বাংলাদেশের চেহারাটা হয়তো অন্যরকম হতো যেখানে গবেষণা থেকে উদ্ভাবন স্বাধীনচর্চার রাস্তা এতটা বন্ধুর, সেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জায়গা থেকে দুর্বল হবে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই

এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয় কারণ, একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর করে না একটি প্রগতিশীল জাতি গড়ে উঠতে দরকার দক্ষ মানবসম্পদ একজন মানসম্মত ডাক্তার কিংবা গবেষক গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের একটা লম্বা সময়ের শ্রম অর্থ ব্যয় করার পর তারা যখন অন্য দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে, তখন তা আপাত দৃষ্টিতে আমাদের বুক ফুলিয়ে তুললেও পরোক্ষভাবে ক্ষতিটা আমাদেরই হয় আর আমাদের প্রচলিত অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি একজন শিক্ষার্থীর মগজে এই নীতিটাই ঠুঁসে দেয়যোগ্য হলেই দেশ ছাড়তে হবে কারণ, এখানে ভবিষ্যৎ নেই

মূলত, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেকেই দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করলেও প্রকৃতপক্ষে মিলেছে শুভংকরের ফাঁকি যেখানে আশা করা হয়েছিলরিভার্স ব্রেইন ড্রেইনহবে, সেখানে বাস্তব ছিল পুরোটাই উল্টো রাজনৈতিক পট বদলালেও শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা, মন্থর গতির সরকারি নিয়োগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকায় তরুণ শিক্ষার্থীদের হতাশা একই রকম রয়েছে ফলে ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে

সরকার বদলে মুখ পরিবর্তন হয়, কিন্তু ভাগ্য বদলায় না আমজনতার মসনদে থাকা শক্তি বারবার জনগণের স্পন্দন বুঝতে ভুল করে ফেলে, নচেৎ এড়িয়ে যায় আমাদের যুবসমাজ যেখানে তাদের দক্ষতা প্রমাণে উদগ্রীব, সেখানে সময়সীমা বেঁধে বেকার ভাতার মূলা ঝুলিয়ে নিলে তাদের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক ভাতা বা রেশন হয়তো সাময়িক সমাধান দেবে, পূর্ণাঙ্গ সমাধন নয় অতএব, প্রতিশ্রুতি এবং কার্যক্রমের মধ্যে সুষম মেলবন্ধন ঘটানো প্রয়োজন এই দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারের

মেধাবী এই সমাজকে দেশের কাজে লাগাতে হলে তাদের জন্য একটি দক্ষ ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে শিক্ষার ব্যাকগ্রাউন্ড অনুযায়ী তাকে কাজে নিয়োগ দিতে হবে বদলাতে হবে দেশের প্রচলিত সেকেলে শিক্ষা কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকে সমর্থন করে এমন আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে ছোটবেলা থেকেই স্কুলে কারিগরি কর্মশালা স্থাপন করতে হবে ছেলেমেয়েরা পুথিগত বিদ্যা আর বাস্তবভিত্তিক বিদ্যাকে এতে করে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে শিখবে

সর্বোপরি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবক মহলে আস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করা সর্বস্তরে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করা অপরিহার্যএকজন শিক্ষার্থী তার নিজ দেশে থেকেও স্বপ্ন দেখতে তা পূরণ করতে সক্ষম কারণ, কেউ যদি নিজ ভূমিতেই তার ভবিষ্যৎ দেখতে না পায় সে ব্যর্থতা রাষ্ট্রের জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই তরুণ সম্পদের শতকরা ৯০ ভাগই যদি ভিন্ন মানচিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে পায়, নিজেকে স্বার্থক মনে করে, সে ক্ষেত্রে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানের মধ্যে থেকেও দেশ হয়ে পড়বে মেধাশূন্য ভুললে চলবে না, ভবিষ্যতের যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, তা বাস্তবায়নে দক্ষ পারদর্শী তরুণ প্রজন্মের এখন নিজ দেশের মাটিতে শেকড় গেঁড়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি

লেখক: প্রাবন্ধিক কলাম লেখক

রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
আবু আহমেদ

পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে নতুন এএমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে...

বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাড়ে শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক শতাংশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য লাখ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার কোটি টাকা বিশাল রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে কারণ বর্তমানে দেশের সামস্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংস্কার জরুরি

প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে বাজেট উপস্থাপনের পর প্রথম কার্যদিবসে মূল্যসূচকের উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে একই সঙ্গে বেড়েছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার ইউনিটের দাম পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ১০০ পয়েন্টের ওপরে লেনদেন হয়েছে হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে সূচকের এই বড় উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিমা কোম্পানি

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারবান্ধব কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি করকাঠামোয় আনা পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে ফলে বাজেট-পরবর্তী বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে কারণে বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবসেই হয়েছে বড় উত্থান আর্থিক খাতের ১৬টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে কমেছে পাঁচটির এবং দুটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ছাড়া বিমা খাতের ৪৭টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার বিপরীতে দাম কমেছে আটটির এবং তিনটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে হাজার ৩৫৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা তার আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় হাজার ২৩৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লেনদেন বেড়েছে ১১৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা 

 

 

আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি বাজেটের আকার বড় হলে রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালঞ্জে হবে বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে

ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এতে বিনিয়োগ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বাজেটঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংকব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি ছাড়া বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা দরকার বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চমূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে

পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক আস্থাভিত্তিক করতে মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানা যায় একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস শিল্প, অবকাঠামো, নগর উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সম্ভাবনাময় ব্যবসা শুধু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে আর্থিক খাতের ওপর চাপ বাড়ে তাই পুঁজিবাজারকে গভীর, বহুমাত্রিক, স্বচ্ছ আস্থাভিত্তিক করে উৎপাদনশীল খাত সম্ভাবনাময় কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের কার্যকর প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে ভালো সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো কেন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয় না, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত ব্যয়, একই ধরনের কাগজপত্র বারবার দাখিল এবং অনুমোদন পরিপালনসংক্রান্ত অস্পষ্টতা ধাপে ধাপে কমানো হবে বলে জানা যায় বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে তালিকাভুক্তির মানদণ্ড আরও স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত এবং প্রবৃদ্ধিশীল কোম্পানির জন্য সহায়ক হবে

বাজেটে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারকে স্থিতিশীল করতে পেনশন তহবিল, বিমাপ্রতিষ্ঠান, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে নতুন এএমসি গড়ে তোলা, পেশাদার ফান্ড ম্যানেজমেন্ট জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের সুযোগ বাড়িয়ে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে করপোরেট বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার নগর অবকাঠামো উন্নয়নে মিউনিসিপ্যাল বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে সরকারি বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বন্ড, অবকাঠামো ফান্ডের ব্যবহার বাড়ানো হবে, যাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমে বিনিয়োগের সুযোগ বাণিজ্যিক কাঁচামালের পরিসর বাড়াতে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা যায় বিদ্যমান লাইসেন্স কার্যকর করা, প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সহায়তা নিশ্চিত করা হবে

দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্তের সুযোগ এবং বাছাইকৃত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা যাচাই করা হবে অনাবাসী বাংলাদেশি বিদেশি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ সহজ করতে এনআইটিএ হিসাব খোলা পরিচালনার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির তথ্য প্রকাশ, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা, শেয়ার মূল্যায়ন, ক্রেডিট রেটিং, আইপিও ব্যবস্থাপনা রিসার্চ রিপোর্টের মান উন্নত করা হবে লেনদেনের পর শেয়ার অর্থ হস্তান্তর দ্রুত নিরাপদ করতে সেটেলমেন্টের সময় ধাপে ধাপে কমানো হবে কথাও উল্লেখ আছে, পুঁজিবাজারসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত নিষ্পত্তি আদালত গঠনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হবে, যার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আইনি ক্ষমতা থাকবে এতে বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়বে এবং বাজারে শৃঙ্খলা শক্তিশালী হবে এসব উদ্যোগ পুঁজিবাজারকে শুধু শেয়ার কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ, অবকাঠামো অর্থায়ন, সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তর এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করবে, এটাই প্রত্যাশা

লেখক: অর্থনীতিবিদ চেয়ারম্যান, আইসিবি

ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
রায়হান আহমেদ তপাদার

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।...

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও তীব্র কূটনীতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ১৪ জুন যৌথভাবে এ ঘোষণা দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও একযোগে এ ঘোষণা সম্প্রচার করা হয়। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, যা ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। অবশ্য এই সময় থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উভয়ের পক্ষ থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত দুই দফা হামলায় ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশকেই লক্ষ্যবস্তু করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা হিসেবে বাহরাইন, জর্দান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে উদ্দেশ করে হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো হলেও বলা হয়েছে, ইরান আর হামলা না করলে তারাও হামলা চালাবে না। সে ক্ষেত্রে ইরানের এই মুহূর্তের অন্যতম দাবি হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানকে সংগত কারণেই এর জবাব হিসেবে ইসরায়েলে হামলা চালাতে হচ্ছে, যা একটি সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিছুদিন ধরে এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। সর্বশেষ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার পর এক টেলিফোন কথোপকথনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন যে, তাদের কারণে যদি ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবে না, তাদের একাই চলতে হবে। প্রায় দুই মাস ধরে একটি চুক্তিস্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনেক দেনদরবার চলছে। ইসলামাবাদ থেকে শুরু হওয়া আলোচনাটি এখন ইউরোপের জেনেভায় গিয়ে ঠেকেছে। এ সময়ের মধ্যে ট্রাম্প বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন, একটি চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দুই পক্ষই। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েল রয়েছে অন্ধকারে। জানা গেছে, তারা নানাভাবে এ চুক্তির বিষয়বস্তুগুলো নিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং একটি চুক্তিস্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য যত দূর কূটকৌশল অবলম্বন করা দরকার, এর সবটাই করে যাচ্ছে। লেবাননে এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসরায়েলের এ ধরনের অবস্থান এ যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে চাওয়াকে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। এ যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ নানা চাপে জর্জরিত। সে দেশের জনমত এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা দ্বিধাবিভক্ত, রয়েছে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক চাপও। এসব সামাল দিতে এখন তারা যুদ্ধবিরতি অবস্থাকে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে ইতি টেনে মান রক্ষার সর্বশেষ চেষ্টা করছে। ইরানকে তারা যতটা একা ভেবেছিল এবং তাদের সামর্থ্যকে যতটা খাটো করে দেখেছিল, এমনটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি, বরং চীন ও রাশিয়ার রহস্যজনক ভূমিকাটা এখানে অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সুতরাং, এ যুদ্ধে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হওয়া বেশ কঠিন। একটি চুক্তিস্বাক্ষরের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোয় ইরানের অবস্থান একে আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে। হরমুজ প্রণালিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা তাদের সামর্থ্যের ভালোই প্রমাণ দিয়েছে। এখন দর-কষাকষিতে ইরান এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে যুদ্ধকালে, এমনকি যুদ্ধপূর্ব সময়ে তারা যেসব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়। এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় ইরানের শত শত কোটি জব্দ ডলার ফেরত চাওয়া ছাড়াও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিকে তারা চুক্তিস্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব দাবি সামনে আনা হয়েছে, তা হচ্ছে–ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে হবে এবং তারা ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যদি হস্তান্তর করতেই হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই কেন করতে হবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর কোনো সদুত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি এখন এমন একপর্যায়ে রয়েছে যে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো যেতে পারে–এমন বিষয়ে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে। আর সেটি করা গেলে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না–এমন শর্ত আরোপ করার আর প্রয়োজন হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য বারবারই বলা হচ্ছিল যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে ইচ্ছুক নয়, বরং তারা পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করতে চায়। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল দিকটি হচ্ছে, ইরাকযুদ্ধের মতো করে তারা ইরানযুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল।

ইতিহাসের এই পুনরুত্থান ঘটাতে গিয়ে তারা হোঁচট খেয়েছে, ইরানকে ইরাকের মতোই দুর্বল ভেবেছে এবং বড় ভুল করেছে। সবচেয়ে সহজ কাজটিকে তারা অনেক জটিল করেছে এবং সেটা ইসরায়েলের স্বার্থে দেখতে গিয়েই তারা করেছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতি চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনাই যদি করে থাকতেন, তাহলে হয়তো তার স্বপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কিছুটা বৈধতা থাকত। কিন্তু বিষয়টিকে করা হয়েছে শুধু ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রভাগে রেখে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র যখন এ চুক্তি থেকে সরে আসে, তখন ইরানের বিরুদ্ধে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ ছিল না, ছিল শুধু নেতানিয়াহুর প্ররোচনা। ট্রাম্প সে ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন। চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এ দফায় নির্বাচিত হয়ে একই ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সর্বশেষ দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ ক্ষেত্রে মৌলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি আগের মতোই উন্মুক্ত করে দেবে। সেই সঙ্গে এ সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘটবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে। অবশ্য এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ইরান শর্তগুলো মেনে চললে তাদের জব্দকৃত কিছু সম্পদ অবমুক্ত করাসহ মার্কিন অবরোধ কিছু সময়ের জন্য তুলে নেওয়া হবে, যেন ইরান আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছু রাজস্ব সঞ্চয় করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এখানে ইসরায়েলের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয় এবং তাদের দাবি হচ্ছে, বর্তমানে এনিয়ে কী হচ্ছে না হচ্ছে, এর কিছুই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জানাচ্ছে না। এমন অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা স্মারক সই এবং পরবর্তী সময়ে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বিষয়টি এমন যে, এই মুহূর্তে নিজেদের স্বার্থে একটি চুক্তির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সরে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার শঙ্কা থেকেই যাবে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ইসরায়েলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্তভাবে নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ খুবই সংকুচিত। সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করেই ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সবটাকেই গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। তবে চুক্তি হোক আর না-ই হোক, ইসরায়েলকে তাদের বর্তমান আগ্রাসী অবস্থায় রেখে শুধু ইরানকে নিবৃত্ত করতে যাওয়াটা ইরানকে আবারও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শক্তি সঞ্চয়ের তাড়া দেবে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য 
[email protected]

বাজেট ২০২৬-২৭ সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর
ড. মোস্তাফিজুর রহমান

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। যারা নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে এবং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে...।  

 

এবারের বাজেট নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় বাজেট ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আশা নিয়ে সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তার প্রতিফলন তারা বাজেটে দেখতে চাইবেন। তবে বাজেট কেবল অঙ্কের হিসাব নয়; এর সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। অতীতে দেখা গেছে, উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত নয়, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন খাতে করছাড় দেওয়া হলে রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন করদাতা যুক্ত করা, করের আওতা বিস্তৃত করা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দিকে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর ফাঁকি রোধ এবং বাড়াতে হবে আদায় ব্যবস্থার দক্ষতা। কারণ, ব্যয় বাড়লেও যদি আয় সমানতালে না বাড়ে, তাহলে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ পরিচালন ব্যয়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যয়ের কার্যকর বাস্তবায়ন–এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য কর-সুবিধা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, হয়রানি হ্রাস, সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা ও আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, সরকার নানা খাতে ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। উচ্চমূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, দুর্বল বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতের চাপের মধ্যে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাক্ত খাতে এক ধরনের আস্থার অভাব রয়েছে। কাজেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে তা ফিরিয়ে আনতে হবে।

নতুন বাজেটে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই ব্যবধানই বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতা তুলে ধরে। গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চমূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেটা অর্জন করতে হলে অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি অবলম্বন করতে হবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরও কিছুদিন চালিয়ে নিতে হবে। খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। চালে সরবরাহজনিত সমস্যা আছে। সেখানে নজর দিতে হবে। জ্বালানিসংকটের সমাধান প্রয়োজন। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই এখন চাপে রয়েছে। যদিও রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো দুর্বল। সেদিক বিবেচনায় সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা দেখলে বোঝা যায় আগামী বাজেট বাস্তবায়নের বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এত বড় বাজেটের বড় আকাঙ্ক্ষাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার প্রবণতাও তুলে ধরা হয়। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না, ফলে ব্যয় বাড়ছে এবং কার্যকারিতা কমছে। একই সঙ্গে অনেক প্রকল্পে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার ঝুঁকির সম্ভাবনাও আছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে উন্নয়ন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেট মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার কথা বললেও, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা অর্জন খুব দরকার।

নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। বাজেটের এ দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচনি অঙ্গীকারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাজেটেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানব উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন সরকারের জন্য এ বাজেট একটি বড় সুযোগ। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক নীতিপত্র, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করা সম্ভব হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য বাজেটে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বাস্তব অগ্রগতি আগামীর প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এর আকার দিয়ে নয়, বরং বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং জনগণের জীবনে এর প্রভাব দিয়ে।

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। যারা নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে এবং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে। বাজেটের আকার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় হলেও সেটিই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল হলে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, নীতির কার্যকর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)Save

বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
মহিদুল ইসলাম হাওলাদার

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উচ্চাভিলাষী বাজেট রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট খুব কমই দেখা গেছে।

 

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতিকে গতিশীল করার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মূল প্রশ্ন হলো–এই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ কোটিরও বেশি। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় প্রায় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতা এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ অথবা অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতার কারণে এ অর্থ প্রত্যাশিত মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতাও সে আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে তার চাপ সরাসরি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়বে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্যসংকট এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব ও ঋণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

আমার বিবেচনায় বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো–উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহে সম্ভাব্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতও নিয়মিতভাবে বড় আকারের ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক গভীর ও শক্তিশালী। ফলে তারা সহজেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই একই ধরনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন।

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, সুস্থ ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়, এই বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সভাপতি, জাতীয় পার্টি, মাদারীপুর জেলা শাখা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা