ব্যবসায়ীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তারা হতাশ, বিক্ষুব্ধ। লাগামহীন ডলারের দাম সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। উচ্চ সুদের হার কমেনি। পতনে পতনে জেরবার পুঁজিবাজার। রেকর্ডমাত্রায় পৌঁছেছে মূল্যস্ফীতি। ব্যবসার জন্য চাইলেই পাওয়া যাচ্ছে না ঋণ। স্থবির বিনিয়োগ কর্মসংস্থান। আসছে না শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। বেচাবিক্রিতে মন্দা। একে একে বন্ধ হচ্ছে শিল্প কারখানা। খুন-খারাবি-মব থামেনি। দেশে ফেরেনি নিরাপত্তা। চাকরি হারাচ্ছেন শ্রমিকরা। বাড়ছে বেকারত্ব। বকেয়া পড়ছে বেতন-ভাতা। রপ্তানিও কমছে উদ্বেগজনক হারে।
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও উৎপাদনে যেতে পারছে না। উৎপাদনে যেতে না পারার কারণে বিনিয়োগকারী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশে ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা তৈরির কাজ শুরু করে চট্টগ্রামের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা এনএসইজেড। ১০০ একর জায়গায় ২০২২ সালে এ কারখানার কাজ শুরু হয়েছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতায় দেড় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠানটি গত জুনে তাদের নির্মাণকাজ শেষ করে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদনে যেতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। কেইপিজেড (কোরিয়ান ইপিজেড) ২০১১ সালে সরকার প্রথম বেসরকারি ইপিজেড হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রতিষ্ঠিত ২ হাজার ৪৯২ একর জায়গায় আধুনিক পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক শিল্প শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠিত কোরিয়ান ইপিজেড দেশের শীর্ষস্থানীয় এবং সর্বোচ্চ বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইয়ংওয়ান করপোরেশন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগকারীদের জন্য কেইপিজেডে বিশেষ আর্থিক ও অরাজস্ব সুবিধা এবং দ্রুত প্রশাসনিক অনুমোদনের অগ্রাধিকার দিয়েছে। ৭০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক বিনিয়োগে এখানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার শিল্প উদ্যোক্তা এবং চেয়ারম্যান মি. কিহাক সাং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ছোট আকারের পোশাক শিল্পের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ইপিজেড চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা হলে তিনি এখানে প্রথম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। সরকার মি. কিহাক সাংকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য নাগরিকত্ব দেন। কিন্তু সরকারের নানা সুবিধা ও উদ্যোগের সাফল্য ম্লান হয়ে যায় যখন তার প্রতিষ্ঠিত বৃহত্তম ইপিজেডের কারখানাগুলো গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কোরিয়ান ইপিজেডে স্থাপিত আমেরিকার বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত মেসার্স আমেরিকান অ্যান্ড এফিয়ার্ড (বাংলাদেশ) লিমিটেড বছরের অধিক সময় আগে আবেদন করেও গ্যাস সংযোগ পাইনি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার আবেদন করেও শিল্প সংযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রথম ইপিজেড চট্টগ্রামের সিইপিজেডে প্রতিষ্ঠিত মেসার্স বিডি অ্যাপারেলস লি. দুই বছরের অধিককাল ধরে ছোট একটি বয়লারে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেও সংযোগ পায়নি। গ্যাস সংযোগ না পাওয়াতে বিদেশি বায়ার তাদের অর্ডার ক্যানসেল করে দিয়েছে। এভাবে চট্টগ্রামের অনেক আবেদনকারী উদ্যোক্তা গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করে সংযোগ পাচ্ছে না। অথচ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বশেষ নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান ও লোড বৃদ্ধিকরণ বিষয়ে গত ২৫ জুলাই এক পরিপত্র জারি করে। ‘সেখানে বলা হয়েছে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান ও লোড বৃদ্ধিকরণ সংক্রান্ত বিষয়ে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে জারি করা সূত্রোক্ত পত্রগুলো একীভূত করে এবং ক্ষেত্র বিশেষে আংশিক সংশোধনক্রমে নিম্নরূপ নিদের্শনাগুলো প্রতিপালনের জন্য নির্দেশক্রমে এ পরিপত্র জারি করা হলো।’
‘নতুন গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে....সরকার নির্ধারিত শিল্পাঞ্চল, ইপিজেড এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় গ্যাস সংযোগের বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের এবং উদ্যোক্তাদের, বারবার পরিপত্র জারি হয় ঠিকই কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিনিয়োগকারীরা ধুঁকে ধুঁকে মরে। বর্তমান দেশের প্রায় ৩০ শতাংশের অধিক শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদনে যেতে পারছে না অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে ধাক্কা লাগছে রাজস্বে। রেমিট্যান্স ছাড়া প্রায় সব সূচকই ভঙ্গুর অবস্থায়। বলা যায়, অনেকটা পিচ্ছিল পথেই চলছে দেশের অর্থনীতি। ব্যবসায়ীদের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, দেশের শীর্ষ গ্রুপ ও স্বনামধন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে জীবনেও যাদের কখনোই খেলাপির রেকর্ড নেই, তাদের কপালেও আজ ঋণখেলাপির তিলক। ছোট-বড় সব স্তরের শিল্পগ্রুপগুলো টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে। চাকা যেন আর চলছে না! এমনই চিত্র এখন দেশের অর্থনীতিতে। অর্থ মন্ত্রণালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআরসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করে এমন চিত্র পাওয়া যায়।
জ্বালানি তথা জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার (অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থান) ঘাটতি যতটা না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানি ঘাটতি অত্যধিক বিপজ্জনক। তাই এ ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল।
সুতরাং দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ব্যবসায়ীরা এই সরকারের কাছ থেকে এখনো এমন কোনো আশা জাগানিয়া বার্তা পাননি। সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বরং কখনো কখনো তাদের টুঁটি চেপে ধরার মতো অবস্থাও তৈরি হয়েছে। আগের সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব, ঘুষ-দুর্নীতি, ভুল নীতির কারণে যেমন একটি পরিবর্তনের প্রত্যাশা জেগেছিল; গণ-অভ্যুত্থানে অনেক ত্যাগের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিল, তাদের সময়ও পরিস্থিতি অনেকটা এমনই।
ব্যবসায়ীরা প্রায়ই বলে আসছেন, তারা রীতিমতো সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার। গত ১৪ মাসে এমন কোনো ফোরাম বা সম্মেলনের কথা শোনা যায়নি, যার মাধ্যমে দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে ডেকে সরকার তাদের সমস্যা, সংকট ও চ্যালেঞ্জের কথা শুনবে।
দেশের অর্থনীতি সংকটময় পরিস্থিতি পার করেছে। কোনোভাবেই এতে স্বস্তি ফেরানো যাচ্ছে না। বিনিয়োগ স্থবিরতা, বেকারত্ব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, রপ্তানি রাজস্বের মন্দা, অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে। আস্থাহীনতা অর্থনীতির গতিকে আরও মন্থর করে দিয়েছে। সরকারের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে অর্থনীতির নানা দুর্বলতার কথা। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইভি) অক্টোবর মাসের ইকোনমিক আপডেট বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।
ব্যাংকগুলোয় ঋণ বিতরণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন উভয় ক্ষেত্রেই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে এ বিষয়ে অস্থিরতা লক্ষণীয়। কমিটির পর কমিটি গঠন করা হচ্ছে মাসের পর মাস অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু কার্যকর কোনো ফলাফল উদ্যোক্তারা দেখতে পাচ্ছেন না। ফলে বিনিয়োগকারীদের মাঝেও অস্থরিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গ্যাসের অভাবে আমদানি করা যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো আশার বাণী তারা পাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ বিনিয়োগহীন পরিবেশের মধ্যে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি সহায়তা ও স্বচ্ছতা থাকলে বিনিয়োগকারীরা আবার সাহস পাবে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সব ভয়ভীতি, আশঙ্কা ও সংশয় দূর করে নির্বাচন হবে- সরকারের এই আশ্বাসেই অবিচল। তারা আশা করতে চান যে, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট হবে। এতে জনগণের ভোটে একটি রাজনৈতিক দলের সরকার হবে। অন্তর্বর্তী সরকারও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের কৃতিত্ব নিয়ে জনগণের সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। ফলে দেশে আইনশৃঙ্খলায় আস্থা ফিরবে। ব্যবসায়ী বিনিয়োগকারীরাও তাদের ব্যবসা উদ্যোগে পূর্ণোদ্যমে ফিরবেন। সেদিকেই চেয়ে আছে তারা। আমরা চাই দেশে বিনিয়োগ হোক। কারও ইচ্ছার কাছে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ যেন নষ্ট না হয়। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে জ্বালানি সেক্টর সম্পূর্ণ দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞমহল। বর্ণিত সমস্যাদি এখন দ্রুত সমাধান সময়ের দাবি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ এক পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন অনেক কিছু নতুন করে ভাবা ও করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যমান নীতি-কৌশলগুলো সময়োপযোগী করে নেওয়ার এখনই সময়। সরকারের জন্য রাষ্ট্র কাঠামোগত সংস্কার ও বিদ্যমান নীতি-কৌশলগুলো ঢেলে সাজানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি।
অতীতে জ্বালানি যখন পরিচালনা ও উন্নয়নে যেসব নীতি কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে তাতে জ্বালানি নিরাপত্তার চরম বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিপণনবিষয়ক মতামতকে কাজে লাগিয়ে আবেদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে দ্রুততম সময়ে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা নিলে জ্বালানি খাত কিছুটা হলেও দুর্নীতিমুক্ত হবে। এ ছাড়া বন্ধ কারখানাগুলোর অব্যবহৃত গ্যাস নতুন সংযোগের জন্য অনুমোদন দিলে গ্যাস সরবরাহ সমন্বয় সাধন হবে অতিরিক্ত গ্যাস প্রয়োজন হবে না। বিষয়গুলো বর্তমান সময়ের দ্রুততম সময়ে সমাধা করা প্রয়োজন।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক
[email protected]

.jpg)