বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারসহ ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারের আমলেই যেন দেশে কোনো 'আয়নাঘর'-এর জন্ম না হয়, গুম-খুন, নির্যাতন, হয়রানি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, তা সুনিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এসব বিষয় বর্তমান সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই। সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে, কেবলমাত্র মানব পরিবারের সব সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই পারে বিশ্বে শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি গড়ে তুলতে; কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়।...
আজ ১০ ডিসেম্বর। বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে: ‘Our Everyday Essentials.’ অর্থাৎ আমাদের প্রতিদিনের জিনিস। প্রতি বছর দিবসটির একটি নির্দিষ্ট থিম এবং উদ্দেশ্য থাকে। ২০২৫ সাল বা চলতি বছর আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু সম্পর্কে, যার লক্ষ্য হলো মানবাধিকার কীভাবে দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ তা দেখানো আর হলোকস্ট স্মরণ হলো বিকল্প থিম। জাতিসংঘের উদ্যোগে ও নির্দেশনায় বিশ্বের সব দেশেই প্রতি বছর দিবসটি ১৯৪৮ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় দিবসটি বাংলাদেশেও পালিত হয়। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির সত্যিকার চিত্র খুবই ভয়াবহ। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন; আইনি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর শিকার হয়েছেন ২৮ জন; মব ভায়োলেন্সের শিকার হয়ে মারা গেছেন ১৬৫ জন। আর প্রতিবেদনেগুলোতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। সেখানে ২৮১ জন মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। আর নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অধিকারের পরিসংখ্যান নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার উচ্চ প্রবণতা নির্দেশ করে, যার মধ্যে ১৪,০৮৩টি ধর্ষণের ঘটনা এবং ৪,৪৮৯টি যৌতুক-সম্পর্কিত সহিংসতার ঘটনা রয়েছে। সর্বোপরি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাংবাদিকরা উল্লেখযোগ্যভাবে হয়ানির সম্মুখীন হয়েছেন বরাবরের মতোই এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৩৫১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে ১০৯টি শারীরিক আক্রমণও রয়েছে। গত বছর (২০২৪) অধিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত শাসনামলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৯ জন। এ সময়ে গুম হন ৬৭৭ জন, কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন ১ হাজার ৪৮ জন। আর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহতদের তালিকাসহ ২০২৪ সালের ঘটনা যুক্ত করলে নিহতের সংখ্যা হবে ৩ হাজার। অধিকারের পরিসংখ্যান বলছে, আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার বছর ২০০৯ সালে হত্যার শিকার হন মোট ১৫৪ জন। এ ছাড়া ২০১০ সালে ১২৭ জন, ২০১১ সালে ৮৪, ২০১২ সালে ৭০ জনকে হত্যা করা হয়। নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৯ জনে। আর নির্বাচনের বছর ২০১৪ সালে ১৭২ জন, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৬ সালে ১৭৮, ২০১৭ সালে ১৫৫ জনকে হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছরে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয় ৪৬৬ জনকে। ২০১৯ সালে ৩৯১ জন, ২০২০ সালে ২২৫ জনকে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা জারির পর তা কমে ১০৭ জন, ২০২২ সালে ৩১ ও ২০২৩ সালে ২৪ জনকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়। শুধু অধিকার-এর প্রতিবেদনই নয়, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সময়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমন- ২০২৩ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। মার্কিন ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, উল্লেযোগ্য মানবাধিকার-সংক্রান্ত যেসব বিষয় নিয়ে গ্রহণযোগ্য খবর রয়েছে, সেগুলো হলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ বিধিবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন বা নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ বা সরকারের তরফে সাজা; কঠোর ও জীবনের জন্য হুমকি এমন কারাগার পরিস্থিতি; নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যা, রাজনৈতিক বন্দি বা আটক; ভিনদেশে থাকা নাগরিকদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন; মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় স্বেচ্ছাচারমূলক বা বেআইনি হস্তক্ষেপ; কারও অপরাধের অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যদের সাজা দেওয়া; মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় গুরুতর বাধা সৃষ্টি, যার মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের হুমকি-ভয়ভীতি দেখানো, সাংবাদিকদের অন্যায্যভাবে গ্রেপ্তার বা বিচারের সম্মুখীন করা, বিধিনিষেধ এবং মতপ্রকাশ সীমিত করতে ফৌজদারি মানহানিকর আইনের প্রয়োগ বা প্রয়োগের হুমকি; ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতায় গুরুতর বাধার সৃষ্টি; শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকারে হস্তক্ষেপ। এর মধ্যে রয়েছে সংগঠন, অর্থায়ন বা বেসরকারি ও নাগরিক সংগঠনগুলো পরিচালনায় অতিরিক্ত বিধিনিষেধ সংক্রান্ত আইন; চলাচলের স্বাধীনতায় প্রতিবন্ধকতা; সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনে জনগণের সুযোগ না থাকা; রাজনীতিতে অংশগ্রহণে গুরুতর ও অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা; সরকারি খাতে গুরুতর দুর্নীতি; দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ডে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুতর বিধিনিষেধ বা হয়রানি; লিঙ্গভিত্তিক ব্যাপক সহিংসতা। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, শিশু-বাল্যবিবাহ, জোরপূর্বক বিয়ে এবং এমন সহিংসতার অন্যান্য ধরন; জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকিসহ বিভিন্ন অপরাধ; স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন ও কর্মীদের সংগঠনের স্বাধীনতার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ এবং শিশুশ্রমের নিকৃষ্ট ধরনের উপস্থিতি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন- এমন কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের শনাক্ত ও শাস্তির ক্ষেত্রে বিগত আওয়ামী সরকার গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নেয়নি। বলা বাহুল্য, তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকারের আমালে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম ঘৃণিত ও জঘন্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আয়নাঘর’। সাধারণ অর্থে জনগণের কাছে ‘আয়নাঘর’ বলতে আয়নানির্মিত ঘর মনে হলেও আসলে আয়নাঘর কিন্তু আয়নানির্মিত কোনো ঘর নয়। মূলত: আয়নাঘর হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা সংস্থা ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই) এবং কাউন্টার-টেরোরিজম ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) দ্বারা পরিচালিত গোপন আটককেন্দ্র। যা মূলত: এক গোপন বন্দিশালা।
আমাদের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অহরহই ঘটে থাকলেও অনেক লোকই জানেন না মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ব্যাপারে কোথায় ও কীভাবে অভিযোগ করতে হবে বা হয়। যেমন: থানা ও আদালতে মামলা বা অভিযোগ দায়ের করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতি, ধর্ম, বর্ণনির্বিশেষে যেকোনো বয়সের দেশি বা বিদেশি যেকোনো ব্যক্তি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে অথবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও এখানে অভিযোগ করতে পারেন। কেউ যদি মনে করেন যে, মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তার জীবন, সমতা ও মর্যাদার যে অধিকার পাওনা আছে তা ক্ষুণ্ন হয়েছে কিংবা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বা সরকারি সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা কোনো জনসেবক বা কোনো ব্যক্তি কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে বা লঙ্ঘনের প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে বা এসব অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে অবহেলা করা হয়েছে, তাহলে মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ করা যায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার ও আটকে রক্ষাকবচ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্রেপ্তারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং উক্ত ব্যক্তিকে তাঁহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাঁহার দ্বারা আত্মপক্ষ-সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়, ‘গ্রেপ্তারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেপ্তারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেপ্তারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাঁহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।’ সংবিধান ছাড়ও জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্র, ১৯৪৮-এর ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কাউকে নির্যাতন করা যাবে না; কিংবা কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা যাবে না অথবা কাউকে এহেন শাস্তি দেওয়া যাবে না।’ মানবাধিকারের সর্বজনীন ওই ঘোষণাপত্রের ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কাউকেই খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার বা অন্তরিন করা কিংবা নির্বাসন দেওয়া যাবে না’।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারসহ ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারের আমলেই যেন দেশে কোনো ‘আয়নাঘর’-এর জন্ম না হয়, গুম-খুন, নির্যাতন, হয়রানি তথা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, তা সুনিশ্চিত করার এখনই উপযুক্ত সময়। আর এসব বিষয় বর্তমান সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই। পাশাপাশি আয়নাঘরসহ বিগত বিভিন্ন সময়ে গুম, খুন, নির্য়াতন, হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও এখন সময়ের দাবি। সবাইকে স্মরণে রাখতে হবে, কেবলমাত্র মানব পরিবারের সব সদস্যের সমান ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারসমূহ এবং সহজাত মর্যাদার স্বীকৃতিই পারে বিশ্বে শান্তি, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি গড়ে তুলতে; কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়।
লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য
[email protected]

