এ বৈষম্য যতদিন দূর না হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। বিজ্ঞাননির্ভর জ্ঞান আবেগকে প্রতিস্থাপন করে, সেখানে যুক্তির পরাকাষ্ঠাকে ধারণ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ মাধ্যমগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত মানসিকতার ঔদ্ধত্যপনা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে।…

STEM শব্দটি ইংরেজি চারটি পৃথক পৃথক শব্দের আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত। অধুনা এ শব্দটি উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাবিষয়ক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। শব্দটির অক্ষরগুলোকে বিশ্লেষণ করলে ধনী রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার একটা সার্বিক দিক-নির্দেশনার মানসিক চিত্র পাওয়া যায়। ‘S’ অক্ষরটির সম্পূর্ণ শব্দ হলো Science, ‘T’-তে Technology, ‘E’-তে Engineering এবং ‘M’ অক্ষর দ্বারা বোঝায় Mathematics. বাংলায় STEM-এর সহজ সম্প্রসারণ হলো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত।
বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানপ্রসূত প্রায়োগিক পদ্ধতিকে প্রাধান্য দেওয়াই হলো এ শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য। এ ধারণার উদ্ভব হয়েছে মানবজাতির বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। যে জাতি বিজ্ঞান শিক্ষায় যত অগ্রসরমান, সে জাতি তত বেশি সম্পদশালী এবং ধনী। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো। এশিয়া মহাদেশে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরে STEM-এর প্রাধান্য তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে ধারণ করে মানবসম্পদকে শক্তিশালী করার টেকসই বিকাশে সচেষ্ট রয়েছে।
STEM শিক্ষার আবির্ভাবের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের প্রতি ধনী দেশগুলোর আকর্ষণ এবং ভালোবাসা। STEM শিক্ষা ছাত্রদের সূক্ষ চিন্তার মেধাকে উন্মোচিত করে। এর ফলে তাদের সমস্যা সমাধানের (Problem Solving) দক্ষতা বৃদ্ধি পায় এবং বাস্তব জীবনের জটিল ক্ষেত্রগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ছাত্রদের সংজ্ঞানাত্মক শক্তিতে (Cognitive Power) যৌক্তিকতার (Rationality) মূল্য অপরিসীম। যৌক্তিক মন তৈরি করতে প্রয়োজন চিন্তাপ্রবণতা এবং উদারমনস্কতার। মানুষের মধ্যে এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ছোটবেলা থেকেই অনুশীলন করতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন যুক্তিবিদ্যা এবং সম্ভাবনা তত্ত্বের ওপর শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক স্তর থেকে দক্ষতা তৈরির কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া। যুক্তিবিদ্যা এবং সম্ভাবনাতত্ত্ব উভয়ই দর্শনবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত দুটি বিষয়। অথচ আমাদের দেশে দর্শন সমন্ধে পরিষ্কার ধারণা রয়েছে এমন ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা নগণ্য। আমরা বর্তমানে জ্ঞানের যে বিষয়টিকে পদার্থবিদ্যা বলে সংজ্ঞায়িত করি, প্রাচীনকালে জ্ঞানতাপসরা সে বিষয়টিকে প্রাকৃতিক দর্শন (Natural Philosophy) হিসেবে গণ্য করতেন। যুক্তরাষ্ট্রে দর্শনের ওপর পড়াশোনা করার আগ্রহের কারণ হলো এ বিষয়ে পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়ার সুযোগ সহজতর হয়, কারণ দর্শন ছাত্রদের স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা (Transferable Skills) তৈরিতে বিরাট ভূমিকা পালন করে, যেমন- সূক্ষ চিন্তন (Critical Thinking) এবং যোগাযোগ উৎকর্ষতা (Communication Skills)।
আমাদের অনেকের হয়তোবা জানা নেই যে, দর্শন শিক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমন্ধে (Artificial Intelligence) মৌলিক ধারণার ভিত্তি স্থাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি রাষ্ট্রের শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক দিকগুলোর নির্ণায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। যে রাষ্ট্র এ শিক্ষায় যত বেশি প্রাগ্রসরমান হবে, সে রাষ্ট্র তত বেশি বিজ্ঞানের সুযোগকে জনগণের কল্যাণ এবং সম্পদ সৃষ্টির ক্রিয়াশীল কাজে নিয়োগ করতে সক্ষম হবে। অনেক রাষ্ট্রই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জাতীয় প্রকল্প (National Project) হিসেবে গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ পর্যন্ত জাতি হিসেবে আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সারবত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। ভবিষ্যতের উচ্চতর শিক্ষাব্যবস্থায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে প্রাইমারি পর্যায় থেকে STEM পদ্ধতি চালুর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রথমেই পরিলক্ষিত হয় ভারসাম্যহীনতা। বস্তুত, তিন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি চালু রয়েছে। এ শিক্ষাপদ্ধতিগুলো তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষার মাধ্যমে পরিচালিত হয়; যেমন- বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম এবং আরবি মাধ্যম। ভাষাগত দিক থেকে তিনটি ভিন্ন মাধ্যমে শিক্ষা পরিচালিত হওয়ার কারণে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের ওপর দৃষ্টি দেওয়া হলেও বর্তমান যুগের মানদণ্ড অনুযায়ী সন্তোষজনক হওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মাদ্রাসাগুলোতে বিজ্ঞানচর্চার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবেশ নেই বললেই চলে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কারিকুলাম অনুসরণ করার ফলে বিজ্ঞান শিক্ষার সময়োচিত স্পর্শ পাওয়া যায়।
মাদ্রাসায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানরা পড়াশোনা করে। এদের অনেককে অতি অল্প বয়সে কোরআন মুখস্ত করে হাফেজ হতে হয়। এতে বোঝা যায় যে, কত মেধাবী হলে তা সম্ভব। এ মেধার ব্যবহার বিজ্ঞানশিক্ষার দিকে অনুপ্রাণিত হলে তা সমানভাবে ফলপ্রসূ হবে বলে সবার ধারণা। এ ছাড়া, মাদ্রাসায় এক ধরনের অতি ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এখনো কাজ করে। তা হলো শিক্ষা কারিকুলামে বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর অনুশীলনের স্পৃহার অভাব। মাদ্রাসা বলতে যে কেবলমাত্র কোরআন, হাদিস, ধর্মশাস্ত্র এবং মুসলিম আইন সমন্ধে পড়তে হবে, এ ধারণার পরিবর্তন হওয়া অনস্বীকার্য। মাদ্রাসাগুলোতে কারিকুলামের আধুনিকীকরণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে করে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান এবং গণিতের প্রাধান্য বজায় থাকে। ইংরেজরা যখন ভারতে মাদ্রাসা শিক্ষা চালু করে, তার মূল্য উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক কাজে মুসলিম আইনের সহায়তা গ্রহণ করা। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত ছোট বয়সে শিশুদের মেধাকে প্রস্তুত করে ভবিষ্যতে তারা যাতে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় জাতীয় জীবনে অবদান রাখতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
অন্যদিকে বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের অনেকে মনে করে ইংরেজিতে দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক। এর কারণ হলো, ইংরেজি ভাষা শিক্ষার গুরুত্বকে ছোট করে দেখা। অথচ বর্তমানে ইংরেজি বিজ্ঞানশিক্ষার এক বৈশ্বিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীতে বিজ্ঞানের আধুনিকতম পাঠ্যপুস্তক এবং জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক কথাসাহিত্য ইংরেজিতেই অধিকাংশ প্রকাশিত হয়ে থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা জ্ঞানের ক্রমপরিবর্তনশীল বিবর্তনের পথে এক বিরাট অন্তরায়।
আমাদের যেসব ছাত্রছাত্রী ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে তাদের সবাই উচ্চমধ্যবিত্ত কিংবা ধনী পরিবারের সন্তান। এ মাধ্যমে বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য একটি সাবজেক্ট রয়েছে, তার মানদণ্ড এতই নিম্ন যে, জাতি হিসেবে যার স্বাধীনতার পুরোধার ছিল মাতৃভাষা, তার ইংরেজি মাধ্যমগুলোতে বাংলার এ ধরনের অবস্থান দেখে দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। এ মাধ্যমের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা প্রথম থেকেই স্বপ্ন দেখে উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দেওয়ার। এ ছাড়া মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ভিন্ন কারিকুলামের ধারায় পড়াশোনা করার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিগ্রির প্রবেশ পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে বেশ বেগ পেতে হয়। এর কারণ হলো, ইংরেজি মাধ্যমগুলোতে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলায় দুর্বল হয়ে থাকে এবং যে ধরনের প্রশ্ন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত, তার সঙ্গে বাংলা মাধ্যমের প্রশ্ন পদ্ধতির মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষা কেবলমাত্র সমাজকে কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। এ কাজটি শিক্ষা করে থাকে বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে। তিনটি মাধ্যমে শিক্ষাপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রী তিনটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং শিক্ষাসংক্রান্ত বৈষম্যকেই আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রকট করে তুলছে। এ বৈষম্য যতদিন দূর না হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, তিন মাধ্যমের শিক্ষার মৌলিক মূলনীতিকে বিসর্জন দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, পরিসংখ্যান এবং সূক্ষ্য চিন্তনকে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এর ফলে ছাত্রদের মধ্যে জ্ঞানীয় দক্ষতা (Cognitive Skill) বৃদ্ধি পাবে। যেমন অক্ষরজ্ঞান এবং সংখ্যাজ্ঞান স্কুল পাঠের প্রথম পদক্ষেপ যা ব্যতীত জীবন কল্পনা করা যায় না, অনুরূপভাবে যুক্তি সম্ভাবনাতত্ত্ব এবং কারণের (Casuality) উপাদানগুলো জ্ঞানচর্চার প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন পড়ে।
বিজ্ঞাননির্ভর জ্ঞান আবেগকে প্রতিস্থাপন করে, সেখানে যুক্তির পরাকাষ্ঠাকে ধারণ করে। বিজ্ঞানভিত্তিক সুপরিকল্পিত পাঠ্যসূচির প্রবর্তন ছাত্রছাত্রীদের নিজ নিজ মাধ্যমগুলোর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সীমিত মানসিকতার ঔদ্ধত্যপনা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। এটা সম্ভব কেবলমাত্র বিজ্ঞানশিক্ষার সর্বজনীন দর্শন মাথায় রেখে STEM পদ্ধতির অনুকূলে কারিকুলাম প্রবর্তনের মাধ্যমে- বাংলা, ইংরেজি এবং আরবি- এ তিন শিক্ষাব্যবস্থার দূরত্বকে কমানো।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা
.jpg)
.jpg)
.jpg)