ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে বৈশ্বিক যোগসূত্র স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশর ঐতিহাসিক জয় পদ্মা সেতুতে সৌরবিদ্যুতের ইতিবাচক প্রভাব, এক মাসেই সাড়ে ৪ লাখ টাকা সাশ্রয় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে বয়স বৃদ্ধি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন কাঠামোর সুপারিশ হেডফোন লাগিয়ে হাঁটার সময় ট্রেনের ধাক্কায় কিশোরের মৃত্যু গাজীপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গ্রেপ্তার সিলেটে স্কুলছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু, মরদেহর ময়নাতদন্ত না করতে চিরকুট! রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ পাকিস্তানে টিটিপি’র হামলায় ৬ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, শৃঙ্খলা ফেরাতে ৬ নির্দেশনা জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সালাম চীনের পরিবেশবান্ধব গাড়ি রপ্তানি দ্বিগুণ বেড়েছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ১৪৯৬ কোটি টাকা জরিমানা: অর্থমন্ত্রী ঝিনাইদহে ভাতিজার লাঠির আঘাতে চাচার মৃত্যু ডাক সেবায় আসছে অটোমেশন পদ্ধতি: ডাক ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী চীনের উসিতে চালু হলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সিনেমা হল প্রশিক্ষণ মাঠেই থেমে গেল এসআই জীবন রহমানের জীবনযাত্রা তানিয়া বৃষ্টির মৃত্যুর খবরে যা জানা গেল বাড়ি নির্মাণে ঋতুপর্ণাকে অর্থ সহায়তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নীরবতার কণ্ঠস্বর ‘ভাসানে উজান’ মুক্তি পেল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ট্র্যাক ‘সির সির’ ঝিনাইদহে ছাত্রলীগের ২৪ নেতাকর্মীর নামে মামলা, আটক ৩ টেলিমেডিসিনের গুরুত্ব বর্তমানে বৈধ সিমের সংখ্যা ৩২ কোটি ৮২ লাখ: টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সংসদ সদস্যের পদ ছাড়ছেন কোয়েল বিচার চাইব কার কাছে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক আরও ঝলমলে রঙিন হচ্ছে পাহাড়ি শহর ছোংছিংয়ের রাত আয় বাড়ছে কিন্তু বরকত কমছে কেন?
Nagad desktop

জাতীয় শিক্ষক দিবসের ভাবনা

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
জাতীয় শিক্ষক দিবসের ভাবনা
মাছুম বিল্লাহ

শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নিরস ও প্রাণহীন। শিক্ষার গুণগত মান কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে পরিমাপ যায় না, এটি নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধ চর্চা, গবেষণার স্বতন্ত্র পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণমুখী সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে।…

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষা খাত, যা জন্মকাল থেকে অবহেলিত। এটির ছিল না কোনো সার্ভিস রুলস, বেতন, নিয়মিত অনুদানপ্রাপ্তি অথচ এই খাত থেকেই তৈরি হচ্ছে দেশের সব বিভাগের মানবসম্পদ। মানবসম্পদ তৈরির আঁতুড়ঘর যেহেতু দুর্বল তাই রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রই কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সেবা দেওয়ায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা বিভাগের অবহেলিত অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বলা যায় শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৫-১৯৮১) বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। তার প্রশাসন একটি বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসে, যা সমাজতান্ত্রিক মডেল থেকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের দিকে মুভ করে এবং শিক্ষায় ‘প্রদান পদ্ধতির বহুত্ব’কে গ্রহণ করে। ১৯৮০ সালে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য মাসিক বেতন আদেশ (এমপিও) ব্যবস্থার প্রবর্তন একটি যুগান্তকারী নীতি ছিল, যা বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি সারা দেশে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষাগত প্রবেশাধিকার প্রসারে শিক্ষকদের অপরিহার্য ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়। এ ব্যবস্থাটি প্রথমবারের মতো শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় বেতন কাঠামোর অধীন নিয়ে আসে। প্রাথমিকভাবে এমপিও ব্যবস্থা বেসরকারি শিক্ষকদের সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া শুরু হয়, এটি তখন তিন মাস পরপর বিতরণ করা হতো। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য চাকরিবিধি প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে চাকরির নিশ্চয়তা, শৃঙ্খলা ও শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়। মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মাদরাসা শিক্ষকতা পেশাকে সুসংহত করা হয়। ১৯৮০ সালে নিরক্ষরতা দূরীকরণে গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। যার মাধ্যমে ৪০ লাখের অধিক মানুষ অক্ষরজ্ঞান লাভ করে।

১৭ সেপ্টেম্বর আমরা পালন করি ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ আর ৫ অক্টোবর ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’। প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান বলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্তি ও জাতীয় কোষাগার থেকে বেতনের ৫০ শতাংশ দেওয়া এবং চাকরিবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নসহ শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষকদের কল্যাণে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অনন্য অবদানের জন্য তিনি এ দেশের শিক্ষক সমাজের মধ্যমণি হয়ে আছেন। তাই তার জন্মদিন ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস সরকারিভাবে পালনের দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ। জিয়ার স্মৃতিকে অম্লান রাখতে বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি এবং বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিয়াম মিলনায়তনে শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার প্রথম চেক বিতরণী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শহিদ জিয়ার জন্মদিবস ১৯ জানুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার নিয়ে তৎকালীন সরকার এ দিবসটি চালু করে। কিন্তু দিবসটি সেভাবে প্রচার-প্রচারণা ও গুরুত্ব পায়নি। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং জাতি সুদিনের অপেক্ষায় দিন গুনছে যেটির সূত্রপাত আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে হবে বলে সবাই আশা করছে।

শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলেন বেসরকারি শিক্ষকরা তখন সরকার থেকে বেতন পেতেন না। জিয়াউর রহমান শিক্ষকদের জন্য ৩০ শতাংশ বেনিফিট চালু করেন। ২০০২ সালে বেগম খালেদা জিয়া সেটিকে ১০০ শতাংশে উন্নীত করেন। তার আগের সরকারও ধাপে ধাপে এটি বৃদ্ধি করে। তিনি নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বেতন মওকুফ ও উপবৃত্তি চালু করেন, যা নারী শিক্ষায় এক অনন্য অবদান রেখে চলেছে। বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার বিস্তারের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে সেটিও বেগম খালেদা জিয়ার আমলে।

শিক্ষাবিদ ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, আমাদের দেশে ন্যূনতম ভালো একটা শিক্ষাব্যবস্থা এ পর্যন্ত তৈরি হয়নি যে দাবিটি সেই ১৯৪৮ সাল থেকেই উঠে এসেছে। আমাদের শিক্ষায় নানা ধরনের বৈষম্য রয়েছে। অল্প লোক ইংরেজিতে শিক্ষিত হয়েছে। শতকরা তিন থেকে চার ভাগ লোক ইংরেজিতে কথাবার্তা বলতে পরেন। তার মানে দেশটা দুই ভাগে বিভক্ত। একইভাবে ভালো কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা তৈরি হয়নি সেটাও শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্বলতার জন্য। নিরক্ষরতা দূর করতে জিডিপির কমপক্ষে ছয় ভাগ খরচ করতে হয়, যা ইউনেস্কো বলেছে সেই ১৯৬৮ সালে। কিউবা ১০ থেকে ১১ ভাগ জিডিপি খরচ করে তার নিরক্ষরতা দূর করেছে। আমরা সেই দুই ভাগের কাছাকাছি। বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন যে উদ্দেশ্যে, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি এবং মাধ্যমিক শিক্ষকরা বঞ্চিত বলে সমস্যা যেন আরও বেড়ে গেছে।

শিক্ষা ও গণতন্ত্রকে অপরিহার্যভাবে একত্রিত করেছেন মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই। তার মতে শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অভাবের কারণে শিক্ষা হয়ে ওঠে যান্ত্রিক, নিরস ও প্রাণহীন। এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি শিক্ষাকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছে নাকি কেবল উন্নয়ন সূচকের একটি পরিসংখ্যানমূলক খাত হিসেবে দেখছে? ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি তার পেডাগজি অব দ্য আপ্রেসড বইয়ে বলেছেন শিক্ষা মানুষকে কেবল তথ্যগ্রাহী ক্রীড়নক হিসেবে নয়, সচেতন ও দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এই সময়ে জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে উপরোক্ত বিষয়গুলোর সুস্পষ্টতা নির্ধারণে সহায়তা করতে হবে।

জাতীয় শিক্ষক দিবস পালনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে, শিক্ষার শক্তি রাষ্ট্র ও সমাজকে আলোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে যাতে তার সম্ভাবনাকে সীমিত করে একটি স্বার্থপর, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে বন্দি করে না ফেলে। শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আরও সুস্পষ্ট ও সুসংহত হতে হবে, সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার গুণগত মান কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে পরিমাপ যায় না, এটি নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের মানবিকতা, পেশাগত নৈতিকতা ও আত্মসম্মানবোধ চর্চা, গবেষণার স্বতন্ত্র পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণমুখী সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে। শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন, শিক্ষার দর্শন ও নৈতিক কাঠামো নিয়ে যদি নীরবতা বজায় থাকে, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত বাহ্যিক, অস্থায়ী এবং গভীর মানসিক ও সামাজিক প্রভাবশূন্য হয়ে পড়ে। শিক্ষা তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে প্রশাসনিক খাতের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সেটি যাতে না হয়, শিক্ষক সমাজকে সেই প্রতিজ্ঞাই গ্রহণ করতে হবে আজ। 

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
[email protected]

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৪:৪৫ পিএম
ট্রাম্পের চুক্তি যে কারণে নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু
সামি আল-আরিয়ান

ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে।...


ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না। তার পুরো রাজনৈতিক ক্যারিয়ারজুড়ে ইসরায়েলি আধিপত্য বজায় রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধের কৌশলকেই তিনি পছন্দ করেন বেশি।

বর্তমানে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রাখা। এ সংকটের কূটনৈতিক বিজয় ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি তা নস্যাৎ করার জন্য রাজনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক, গণমাধ্যম এবং লবিংয়ের মতো হাতিয়ার ব্যবহার করবেন।

তথাকথিত ‘চূড়ান্ত বিজয়’ নিয়ে তিনি অনমনীয় এবং আপস করতে নারাজ। তার কাছে কোনো সমঝোতাই গ্রহণযোগ্য নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না গাজায় হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ, লেবাননে হিজবুল্লাহকে খতম এবং স্বয়ং ইরানকে নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হচ্ছে।

গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরানজুড়ে চলা যুদ্ধগুলো কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত ছিল না। এসব যুদ্ধ ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠা এবং এ অঞ্চলে ইসরায়েলি হেজিমনি বা আঞ্চলিক আধিপত্য সুসংহত করার আগ্রাসনের অংশ হয়ে ওঠে। নেতানিয়াহু ভালো করেই জানেন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও তার এই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগ না করার কারণে তার লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়াতে প্ররোচিত করার পর, নেতানিয়াহু এখনো আত্মবিশ্বাসী তিনি আবারও সেই একই চাল চালতে পারবেন। তবে এবার তার লক্ষ্য সীমিত হামলা নয়, বরং চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধ, যা এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।

নেতানিয়াহু অবশ্য যা-ই মনে করেন না কেন, ট্রাম্পকে আরও জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন, ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ও বাইরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণভাবে, মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই এসব যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পক্ষে জনসমর্থন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব ট্রাম্পের নিজের জোটের মধ্যেই ফাটল ধরাচ্ছে। তার সমর্থকরা নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও সৈন্যদের রক্ত দেওয়ার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

আমেরিকানরা এখন আরও বেশি করে জানতে চাচ্ছেন কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি আঞ্চলিক যুদ্ধের অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক বোঝা বইতে হবে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হচ্ছে। জ্বালানি বাজার এখনো নাজুক এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ছে, যা মার্কিন ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে এবং হোয়াইট হাউসের জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

ট্রাম্প জানেন, অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কোনো বৈদেশিক অভিযান চালানো সম্ভব নয়। আর যেহেতু মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে তাই যেকোনো ভুলের মাশুল তাৎক্ষণিকভাবে দিতে হবে। তিনি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারান, তাহলে তাকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে।

আন্তর্জাতিক চাপ ট্রাম্পের ওপর আরও তীব্রভাবে চেপে বসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৌশলগত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এ সংকট যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। ৩৯ দিনব্যাপী চলা যুদ্ধে ইরান এবং তাদের মিত্রদের হামলায় আটটি দেশজুড়ে থাকা অন্তত ১৬টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার কয়েকটি প্রায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর ভিত্তি করে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরানি হামলায় ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর অন্তত ২২৮টি স্থাপনা ও সরঞ্জাম ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হ্যাঙ্গার, জ্বালানি ডিপো, যুদ্ধবিমান, রাডার নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের পুরো কাঠামোকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত মারাত্মকভাবে ফুরিয়ে এসেছে।

পেন্টাগন সতর্ক করেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের এ মজুত আগামী দশকের আগে পূরণ করা সম্ভব হবে না। রাশিয়ার এবং চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের পরিকল্পনা করতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুর্বলতা। ট্রাম্পের যুদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল নিজের আধিপত্য জাহির করা, কিন্তু এখন তা উল্টো আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব সর্বোচ্চ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধে নেমেছিল। সেটা হলো ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা, তার পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করা, প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানি রাষ্ট্রের উৎখাত বা একে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা। কিন্তু এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। ইরান আত্মসমর্পণ করেনি, তার সরকার ভেঙে পড়েনি এবং তীব্র চাপের মধ্যেও আঞ্চলিক জোটগুলোকে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। ইরান এবং তার মিত্ররা আঘাত সয়েছে, কিন্তু পরাজিত হয়নি।

ইরান যুদ্ধক্ষেত্রকে প্রসারিত করেছে, বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সহজ বিজয় থেকে বঞ্চিত করেছে। আত্মসমর্পণের বিকল্প হিসেবে তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথ বেছে নেয়, যা পুরো পরিস্থিতিকে ঘুরিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিকে পরাস্ত করার ক্ষমতা ইরানের ছিল না। কিন্তু পাল্টা আক্রমণ করে তারা আত্মরক্ষা করতে পেরেছে। ইরানের জন্য পরাজয় এড়ানো, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং শত্রুকে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে বঞ্চিত করাই যথেষ্ট ছিল। একটি রাষ্ট্র যখন প্রবল পরাক্রমশালী শক্তির মুখোমুখি হয়, তখন নিজের অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারাটাই এক ধরনের বিজয়। ইরান সেটা পেরেছে।

নেতানিয়াহু তার সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পের হুমকিটা এখন বুঝতে পারছেন। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল কখনই মেনে নিতে পারবে না। কেননা তাহলে যুদ্ধটি ইসরায়েলের বিজয়ের মধ্যদিয়ে শেষ হবে না, শেষ হবে ইরানের টিকে থাকার মধ্যদিয়ে।

বর্তমান আলোচনা, যা জানা গেছে যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করছে এবং বেশ কয়েকটি আরব ও ইসলামিক রাষ্ট্র এতে সমর্থন দিচ্ছে। চুক্তির প্রায়-চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে অন্তত ৬০ দিনের জন্য লেবাননসহ বহুমাত্রিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এবং উত্তর আমেরিকায় আসন্ন বিশ্বকাপের মতো বড় ইভেন্টগুলোকে বিঘ্নিত করতে পারে এমন একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে ওয়াশিংটনের এখন শান্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই পিছুটান কোনো বিজয়ের ফসল নয়, বরং পরিস্থিতি তাকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করছে।

যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সময়ে এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্যে একগুচ্ছ পদক্ষেপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির মধ্যদিয়ে নৌচলাচল নিরাপদ করা, ইরানের শিপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ইরানের অবরুদ্ধ করে রাখা সম্পদের আংশিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করা।

এ রূপরেখা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটি দাবি মেনে নেবে। কিন্তু নেতানিয়াহুর কাছে এটা একেবারেই অসহ্য লাগছে। কারণ, এরকম চুক্তি হলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে স্বস্তিতে থাকবে। তার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক অটুট থাকবে। এতে তেহরান ভবিষ্যতে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যাবে। ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর তীব্র চাপ দেওয়ার কারণ এটাই। দুজনের মধ্যে যে কথা চালাচালি হচ্ছে তা এ কারণেই উত্তপ্ত ও অস্বাভাবিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হচ্ছে। নেতানিয়াহু কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং গাজা ও লেবাননজুড়ে নতুন করে হামলা বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর সামনে এখন সীমিত ও বিপজ্জনক কিছু পথ খোলা আছে। তিনি যদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে সরাসরি আটকে দিতে না পারেন তাহলে এ চুক্তি যাতে বাস্তবায়িত না হয় সেজন্য নাশকতা করার চেষ্টা করবেন। এ জন্য তিনি লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়া এবং ফিলিস্তিনে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারেন। নেতানিয়াহু হয়তো হিসাব কষছেন, গাজায় নতুন করে গণহত্যা, অবরোধ জোরদার করা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোতে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতেতে ট্রাম্প তখন ইসরায়েলের দাবির পক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হবেন।

আসলে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আরববিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো অর্থপূর্ণ পথ নেই। তবে নেতানিয়াহু তার মূল বিশ্বাসের পরিপন্থি কোনো চুক্তি মুখ বুজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা হবে সবার জন্য বিপজ্জনক বিভ্রম। তবে এর চেয়েও গভীরতর বিভ্রম হলো, পাশবিক শক্তি দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে। আদর্শিক অন্ধত্ব এবং কৌশলগত ব্যর্থতার মাঝে আটকা পড়ে নেতানিয়াহু হয়তো শেষ পর্যন্ত মারাত্মক জুয়া খেলতে পারেন এবং পুরো ব্যবস্থাটি তার সঙ্গে ভেঙে পড়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারেন। এরকম শঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। (সংক্ষেপিত)

লেখক: ইস্তাম্বুল জাইম ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স’-এর পরিচালক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়
রাজেকুজ্জামান রতন

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা?...

রামিসার নৃশংস হত্যার খবরে শিউরে উঠেছিলেন দেশের মানুষ। একটা শিশুর গলা কেটে বালতিতে রেখেছে খুনি। যখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে মা ডাকছেন, তখন ঘরের ভেতর তার সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। নৃশংসতা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু না, আরও ভয়ংকর বর্বরতার চিত্র দেখেছেন মানুষ। শিশুর শরীর ক্ষত-বিক্ষত, এতটুকু শরীরে নির্মম আঘাতের চিহ্ন, আর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এই ঘটনার বিবরণ পড়ে সুস্থ থাকতে পারেন? তার সন্তান, তার স্বজন অথবা চারপাশের উচ্ছল শিশুদের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর কি হাহাকার তৈরি হবে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সারা দেশ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যেই এই নৃশংসতার বিচার হবে।

৭ জুন বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ১৯ দিন এবং মামলা দায়েরের ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিদের সাফাই সাক্ষ্যসহ যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা দেশের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক। মানুষ বলতে পারবেন অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

রামিসা আমাদের সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আমাদের সমাজ, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। আয়না কখনো মিথ্যা দেখায় না। প্রতিবিম্ব দেখানোর জন্য শুধু উল্টো হয়ে আসে ছবিটা। মানুষের মাথা তাকে আবার সোজা করে দেখে। মুখের ময়লা দূর না করে শুধু আয়না মুছলে চেহারা পরিষ্কার দেখা যাবে না।

কারণ এসব নতুন ঘটনা নয়। রামিসার আগে যেমন পরেও তেমনি ধর্ষণ, হত্যা চলছেই। কিছু ঘটনায় মানুষ উত্তাল হয়ে ওঠেন আর বাকিগুলো কী হয়? শত শত ঘটনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পায়, আড়ালে থেকে যায় যে কত তার সংখ্যা অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তখনো মানুষের বিক্ষোভের কারণে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি কতটুকু, তা আজ অজানা। অথচ ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে আলোচিত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছিল। শুধু আছিয়া হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন বহু বেদনাকাতর সংবেদনশীল মামলার কাগজ আদালতে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। ধর্ষণের দায় স্বীকার করার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, নিষ্পত্তি হয় না। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হয় না, উল্টো অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আসে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় নির্যাতিত পরিবারগুলোকে। কেউ যখন দেখেন তার প্রিয় সন্তানের খুনি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কি ধিক্কার তৈরি হয় না সমাজ ও বিচারের প্রতি?

আছিয়ার বেদনা না ভুলতেই রাজধানীতে নির্মমতার শিকার হলো দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা। নারী ও শিশুর জীবন, নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা যেন অপরাধীদের কাছে একধরনের প্রশ্রয়ের বার্তা দেয়। নির্যাতিতার দোষ খুঁজে বের করা, পোশাকের দোহাই দেওয়া, সাজগোজ করাকে অজুহাত করা এবং শয়তান ভর করার মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করার নানা দৃষ্টান্ত দেখা হয়েছে ইতোমধ্যে। কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো শাস্তি না থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।

সব খবর পত্রিকায় আসে না, পরিসংখ্যান সব বলে না; কিন্তু যা বলে তা কি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন গত ২ মে প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। প্রতিবার শুনানিতে স্বজনরা অপমানিত হন, বেদনায় ভারাক্রান্ত হন আর বাড়তে থাকে ক্ষোভ কিংবা অসহায়ত্ব।

এই এক পরিসংখ্যানেই যথেষ্ট আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি এবং চিত্র বুঝতে পারার জন্য। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর মামলা হওয়া, আসামি ধরা পড়া এবং সাজা হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কোনো কোনো মামলায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় রায় হওয়ার আগেই মামলার বাদী মারা যান। শুধু তা-ই নয়, আসামি জামিনে বের হয়ে এসে বাদীকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। এ ছাড়া এটা কে না জানে যে, থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসন, প্রভাব এবং পয়সার কী গুরুত্ব। কিছু আপাত নিরীহ পরামর্শ দেওয়া হয়, যেমন মামলা করে কী লাভ? কোনো ফল পাবে না, শুধু টাকা খরচ। বিপদ বাড়বে ইত্যাদি। আবার গ্রাম্য মাতব্বর বা প্রভাবশালী মহল সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে লোক দেখানো শাস্তি, জরিমানা করে মীমাংসা করা আর বাদীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও কম নয়।

কয়েকটা ঘটনা মনে করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসও লাগেনি। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামিকেই সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গহিন জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার রক্তাক্ত ছবিটি ভোলার নয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা শেষে গলা কেটে জঙ্গলে রেখে যাওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় এখনো অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি পুলিশ।

কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরেও। ওই ঘটনাও সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফেনীতে ২০১৯ সালে আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর পরও ওই মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। ফলে কমছে না হত্যা ও ধর্ষণ। মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৩১ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। ভাবা যায়! কতটা নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা? অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি শিশুদের স্বস্তির সমাজ কি তৈরি হবে না? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
জাতিসংঘ: উন্নয়ন অংশীদার নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
ড. খলিলুর রহমান

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।...

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অভিযোগ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং আবারও একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে–একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বৈধ আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং হস্তক্ষেপের সীমারেখা কোথায় টানা উচিত? এ বিতর্ক শুধু বাংলাদেশের নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু দেশে বিভিন্ন সময়ে সরকার, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের নির্ধারিত ম্যান্ডেট অতিক্রম করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, সুশাসন বা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নামে পরিচালিত কিছু কার্যক্রমকে সমালোচকরা এমন ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন, যা মূলত জাতীয় সরকার ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একান্ত এখতিয়ারভুক্ত।

বর্তমান বিতর্ককে বুঝতে হলে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সম্পর্কের বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও ফলপ্রসূ অংশীদারি বজায় রাখছে। রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বিভিন্ন সরকার জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, দারিদ্র্যবিমোচন, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, মানবিক সহায়তা এবং সামাজিক উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি জাতিসংঘের প্রায় সব প্রধান সংস্থারই বাংলাদেশে কার্যক্রম চলমান।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। শিশুমৃত্যু হ্রাস, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগ প্রস্তুতি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন কিংবা মানবিকসংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ফলে এ সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ঐতিহ্যগতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা মূলত কারিগরি সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

যদিও এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রসার, তবুও এগুলো বিতর্কেরও জন্ম দেয়। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে পর্যবেক্ষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে যে, জাতিসংঘের কিছু সংস্থা কি কারিগরি বা মানবিক বিষয়ের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিষয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে জড়িয়ে পড়ছে?

বাংলাদেশে জাতিসংঘের কথিত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ দেখা যায় ২০০৭ সালের ১/১১-পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সংকটের সময়। সে সময় বিভিন্ন মহলে এ ধরনের খবর প্রচারিত হয় যে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব প্রতিবেদনের সত্যতা যাই হোক না কেন, জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে, বহিরাগত শক্তিগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।

পরবর্তী বছরগুলোতে এ ধারণা বিভিন্ন মাত্রায় অব্যাহত থেকেছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাড়তি নজরদারির বিষয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে ২০১৭ সালে মায়ানমার থেকে ১০ লক্ষাধিক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার আগমন দেশে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপস্থিতি ও কার্যক্রম বহু গুণে বৃদ্ধি করে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এসব উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। সংস্কার, শাসনব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনায় কিছু জাতিসংঘ কর্মকর্তার দৃশ্যমান সক্রিয়তা সমালোচকদের এ যুক্তিকে শক্তিশালী করে যে, কারিগরি সহায়তা ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের মন্তব্যের পরও প্রশ্ন দেখা দেয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, বিক্ষোভ ও সহিংসতা মোকাবিলা নিয়ে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে বার্তা পৌঁছানো হয়েছিল। যদিও বাংলাদেশের সামরিক কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে জানায় যে, এ ধরনের কোনো যোগাযোগ তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি, তবুও ঘটনাটি চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর প্রস্তুতকৃত প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর একটি। সমর্থকদের মতে, এটি জবাবদিহি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, প্রতিবেদনটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানকে প্রতিফলিত করেছে এবং এটি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিতর্ক শুধু প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমালোচকদের মতে, ঢাকায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সংসদীয় পর্যালোচনা, অনুমোদন ও অনুসমর্থন এবং কোনো সংরক্ষণ (রিজার্ভেশন) ছাড়াই বাংলাদেশের জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগদান এই দুটি পদক্ষেপ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তা উভয় উদ্যোগের প্রক্রিয়া নিয়েই আপত্তি বা সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু প্রভাবশালী উপদেষ্টার ভূমিকা–বিশেষ করে আইন উপদেষ্টা, তিনজন নারী উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন উপদেষ্টা যিনি আগে মানবাধিকার বিষয়ক একটি এনজিওর কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সমালোচকদের মতে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও শাসনবাবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের মতে, বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এসব অঙ্গীকার ও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা।

জাতিসংঘের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ের কথিত নির্বাচনি বা বাছাইকৃত সক্রিয়তা। সমালোচকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার বিষয়ে জাতিসংঘ অভান্ত সক্রিয় থাকলে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অনেক কম সরব ছিল। তাদের মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরবর্তী ঘটনাবলির বিষয়ে জাতিসংঘের সক্রিয়তার পরিবর্তে এর কার্যক্রমের গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে মূলত ভলকার তুর্কের প্রতিবেদন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী এবং ইউএন উইমেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। উদ্দেশ্য ছিল ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষায় জাতিসংঘ কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা। ইউএন উইমেনের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর প্রতিক্রিয়া আমাকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। তার অগ্রাধিকার যেন নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা মোকাবিলার পরিবর্তে আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন কনসেনসাস কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল।

রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে তৎকালীন আবাসিক সমন্বয়কারীর কিছু প্রকাশ্য মন্তবা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলকতা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এবং জাতিসংঘের সামগ্রিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। ফলে এমন কোনো বক্তব্য, যা প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণের গুরুত্বকে খাটো করে দেখায়, তা জাতিসংঘের নিজস্ব নীতির সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। অনেকেই তার বক্তব্যকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ইউনূস প্রশাসনের অবস্থানের প্রতি সমর্থন হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

রাজনীতির বাইরেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কিছু পদক্ষেপ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ ঢাকাকে ‘নন-ফ্যামিলি ডিউটি স্টেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

একইভাবে ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দেয়। কিছু জাতিসংঘ সংস্থা শুরুতে এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে এবং কক্সবাজার ও টেকনাফে বিদ্যমান শিবির সম্প্রসারণের পক্ষে মত দেয়। সমালোচকদের মতে, পরিবেশগত অবক্ষয়, বন উজাড় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নেও হতাশা রয়েছে। অনেক বাংলাদেশির বিশ্বাস, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ ব্যবস্থার কিছু অংশ, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে মায়ানমারের ওপর পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করতে পারেনি। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের অংশীদারির ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি পুরোনো। বাংলাদেশের জনগণ জাতিসংঘের কাছে কোনো নির্দিষ্ট সরকার, রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন প্রত্যাশা করে না। বরং তারা আশা করে, সংস্থাটি ভার সর্বজনীন নীতিমালা সমুন্নত রেখে সমগ্র জাতির স্বার্থে কাজ করবে।

আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে জাতিসংঘ যদি তার বিশ্বাসযোগ্যতা, কার্যকারিতা এবং জনআস্থা অটুট রাখতে চায়, তাহলে সম্পৃক্ততা ও নিরপেক্ষতার মধ্যকার এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা হবে তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব এবং সাবেক সিনিয়র জনস্বাস্থ্য নীতি উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্থাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি

মেধার কঙ্কাল ও মায়াহীন সভ্যতা নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ
ড. দিপু সিদ্দিকী

সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে।...

মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচাগলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি স্রেফ কোনো প্রাত্যহিক ক্রাইম রিপোর্টের খতিয়ান নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও পচনের এক জীবন্ত ময়নাতদন্ত। ১ জুন রাতে ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ যখন মিরপুর-৬ নম্বরের সি-ব্লকের সেই অন্ধকার কক্ষটিতে প্রবেশ করে, তখন সেখানে সভ্যতার এক বীভৎস কঙ্কাল পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অবহেলা, অনাহার আর চরম অমানবিক পরিবেশে পড়ে থাকার কারণে শরীরটিতে পচন ধরেছিল।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম এবং কুৎসিত অধ্যায়টি উন্মোচিত হয় যখন মৃতার সন্তানদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় সামনে আসে। নূরজাহান বেগম কোনো গৃহহীন বা অনাথ বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি সেই ফ্ল্যাটটিতে নিজের মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তার অন্য সন্তানদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডাপ্রবাসী। সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জন্মদাত্রীর এই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সামাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার গভীরতা কতটুকু? এটি কি সাময়িক হুজুগ, নাকি সমাজ পরিবর্তনের কোনো আন্তরিক তাগিদ–তা নিয়ে আজ নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নূরজাহানের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের খণ্ডচিত্র মাত্র। যখন কোনো বাবা বা মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন সমাজ খুব দ্রুত সন্তানদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। চারদিকে রব ওঠে–‘সন্তানরা অকৃতজ্ঞ এবং অমানুষ ছিল।’ কিন্তু আমরা কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি না–যে সন্তানকে আজ অকৃতজ্ঞ বলছি, তাকে কৃতজ্ঞতা শেখানো হয়েছিল কবে? যে সন্তানকে আজ হৃদয়হীন বলছি, তার হৃদয়টা ভেঙেছিল কে?

একটা শিশু পৃথিবীতে আসে মায়া নিয়ে। তার পর ধীরে ধীরে আমরা তাকে বদলে দিতে শুরু করি। আমরা বলি–ওকে হারাতে হবে, ওর চেয়ে বেশি নম্বর পেতে হবে, ওর চেয়ে বড় হতে হবে। আমরা তার হাতে বই দিই, কিন্তু মানবতা দিই না। আমরা তাকে অঙ্ক শেখাই, কিন্তু সম্পর্কের হিসাবের বাইরে ভালোবাসতে শেখাই না। আমরা তাকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিই, কিন্তু কারও চোখের জল মুছে দেওয়ার শিক্ষা দিই না। বছরের পর বছর আমরা তার ভেতরের কোমল মানুষটাকে হত্যা করি, তার পর একদিন আশা করি–সে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে। এ যেন একটি গাছের শেকড়ে প্রতিদিন বিষ ঢেলে, শেষ বয়সে এসে মিষ্টি ফল খুঁজে বেড়ানোর মতো।

আধুনিক শিক্ষার ভ্রান্তি: মেশিন বনাম মানবিক সত্ত্বা
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং আর করপোরেট ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে জ্ঞানলাভের এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের চারপাশে। নতুন প্রযুক্তি আসছে–এটি নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু এসব অগ্রগতির কেন্দ্রে যে উপাদানটি থাকার কথা ছিল, তা হলো ‘মানুষ’। মানুষের সেবায়, মানুষের আত্মিক কল্যাণে কীভাবে এ বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হবে, সেই পরিমিতিবোধ মানুষকে কে দেয়? এই চেতনা কোনো ল্যাবরেটরি বা কোডিং ক্লাসরুম থেকে আসে না; এটি আসে কলা (Arts), সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক দর্শনবিষয়ক চর্চা থেকে।

দর্শনহীন বিজ্ঞান আর মূল্যবোধহীন উচ্চশিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না, বরং তাকে পরিণত করে একেকটি দক্ষ, সংবেদনহীন, স্বার্থপর রোবটে। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা বুয়েটে পড়াতে পারেন, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে পারেন, ক্লাসরুমে শিশুদের পাঠ দিতে পারেন–কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের খবর রাখার, অসুস্থ জন্মদাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিক বোধটুকু তাদের ভেতর গড়ে ওঠেনি। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ‘সফল’ হতে শিখিয়েছে, ‘মানুষ’ হতে শেখায়নি।

আত্মকেন্দ্রিক পরিবার ও করপোরেট দাঁড়িপাল্লা 
এ সংকটের শেকড় আরও গভীরে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থ আর চরম ভোগবাদের ওপর। আমাদের সনাতন যৌথ পরিবারের সুরক্ষামূলক কাঠামো ভেঙে আমরা এখন ‘আমি, আমার সঙ্গী আর আমার চার দেয়াল’–এই আত্মকেন্দ্রিক অণু-পরিবার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়।

ড. সুকোমল বড়ুয়ার দর্শন ও বাস্তবায়নের শূন্যতা
কারিগরি শিক্ষার এই নৈতিক মহামারি থেকে সমাজকে বাঁচাতে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর সুকোমল বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আত্মিক রূপান্তরের কথা বলে আসছেন। তার মতে, কেবল বস্তুগত শিক্ষা মানুষকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এর বিপরীতে তিনি আমাদের পাঠ্যক্রমে অহিংসা, পারস্পরিক মৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক সামাজিক দর্শনের মেলবন্ধনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মূলত ‘মানবিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত শিক্ষা মডেল’ প্রস্তাব করেন। বিভিন্ন ফোরামে তার এই দূরদর্শী চিন্তাধারা প্রশংসিত হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা কারিকুলাম বোর্ড তা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা যায়নি বলেই আজ সমাজ এমন মানবিক শ্মশানে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে তৈরি হচ্ছে ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’।

উত্তরণের পথ: আইন বনাম মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার
এই সামাজিক মড়ক থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ সংকটের সমাধান কেবল একতরফা আইনি প্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী নীতি। বলা যেতে পারে-
আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে। এটি একটি ভালো আইন হলেও সচেতনতার অভাব ও আইনি জটিলতার কারণে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। এ আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর ও গতিশীল করা সময়ের দাবি। মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার: আইন দিয়ে রাষ্ট্র কাউকে শারীরিকভাবে পাশে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু মনের ভেতরের সহানুভূতি জোর করে তৈরি করতে পারবে না। সেটার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আমূল সংস্কার। প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন নিয়ম হলো–যা বপন করবে, একদিন তাই ফিরে আসবে। তাই সন্তানকে শেখান–একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দিতে, একটা কান্নারত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে, একটা সম্পর্ককে আগলে রাখতে। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে–এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়, সবচেয়ে বড় অভাব ভালোবাসার।

সবচেয়ে করুণ মৃত্যু সেটা নয়, যখন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সবচেয়ে করুণ মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন জীবিত অবস্থাতেই একটি হৃদয়ের ভেতর থেকে মায়া, ভালোবাসা আর মানবিকতা মারা যায়। সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মা হলেন, কাল সেই একই ভয়াবহ নিয়তি আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

লেখক: প্রাবন্ধিক এবং কবি; ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা