ট্রাম্প এখন আমেরিকাকে যেমন চালাচ্ছেন, ঠিক তেমনই বিশ্বকে চালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি যতটা ফ্যাসিস্ট নন তার চেয়েও বেশি একজন মাফিয়া বস, যিনি সম্মান এবং অর্থ আত্মসাৎ করার পথ বেছে নিয়েছেন শান্তি পরিষদের নামে।...

প্রায় সবাইকে ট্রাম্প তার শান্তি পরিষদে (বোর্ড অব পিস) আমন্ত্রণ জানালেন। সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও মরক্কোসহ আরও কয়েকটি দেশ এই পরিষদে যোগ দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
শান্তি পরিষদে যোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে দিতে হবে ১ কোটি ডলার। জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে দেশগুলো এতে যোগ দেবে।
শান্তি পরিষদ পরিচালিত হবে প্রতিষ্ঠাকালীন চার সদস্যের দ্বারা গঠিত একটা নির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে। এই চার সদস্য হচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ওয়াল স্ট্রিটের ধনকুবের মার্ক রোয়ান। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকা সত্ত্বেও তারা এক হয়েছেন।
নির্বাহী বোর্ডের একমাত্র ব্যক্তি যার ইরাক দখল, সাত বছরের গৃহযুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে ‘অভিজ্ঞতা’ আছে, তিনি হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের টনি ব্লেয়ার। তিনি যুক্ত হয়েছেন ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিষদের কর্মপদ্ধতি অনুসারে নির্বাহী পরিষদের প্রত্যেক সদস্যের গাজার ওপর কর্তৃত্ব করার আসল ক্ষমতা থাকবে। এই হচ্ছে গাজার নির্বাহী পরিষদ। এর সদস্য সংখ্যা ৭। ওই চার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছাড়াও এই পরিষদে আরও থাকবেন তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের মন্ত্রী আলী আল থাওয়াদি এবং মিসরের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল হাসান রাশাদ। তাদের গাজা সম্পর্কে কমবেশি ধারণা আছে। কিন্তু তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আইওয়াশের মতো বিশ্বের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে তাদের কাজও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বোর্ড ‘কার্যকর শাসন, শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাজার মানুষদের সর্বোত্তম পরিষেবা প্রদানে সহায়তা করবে।’ এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা কিছু করতে পারে, আবার না-ও করতে পারে।
তুরস্ক ও সৌদি আরবের খায়েশ হচ্ছে, ট্রাম্পের একই তাঁবুর মধ্যে থাকা। কিন্তু তারা দারুণ কিছু করে ফেলবে, এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা-নীতির বিরোধিতাকে অব্যাহত রাখতে চায়। তবে সেটা যে তারা অনেক ধীর গতিতে করছে, তাও স্পষ্ট। তাদের সন্দেহ উইটকফ, কুশনার ও ট্রাম্প আদর্শিকভাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে অভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করছে।
এই দেশগুলো মনে করছে, গাজার মাটিতে তুরস্কের সৈন্যরা থাকলে ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ করা যাবে। তবে নেতানিয়াহু বারবার কঠোরভাবে তাদের অন্তর্ভুক্তিকে বিরোধিতা করে যাচ্ছেন।
এসব কারণে ট্রাম্পের শান্তি পরিষদ ক্রমশ নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যার মাধ্যমে পুরোনো সমস্যার সমাধান করা হবে বলে ভাবা হচ্ছে। এত কিছুর পরও তুরস্ক বা কাতারের তুলনায় সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বেশি। সৌদি আরব হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করার পক্ষে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার এই যে বিভাজন, সেটা তলাতেই রয়ে গেছে। ক্ষমতার ভারসাম্য ইসরায়েলের অনুকূলে আনার জন্য আরবের এমন একদল পরামর্শক আছেন, যারা সমস্যা সৃষ্টি করছেন।
ফিলিস্তিনকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ইতিহাস আসলে গভীর সমস্যা-কণ্টকিত ইতিহাস।
ব্যবসায়ী আরিয়েহ লাইটস্টোনের মতো এমন ব্যক্তিও আছেন যারা গাজায় বসতি স্থাপনের কট্টর সমর্থক। তিনি ইসরায়েল-সমর্থিত গাজা তথাকথিত মানবিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারই সাহায্য দেওয়ার জায়গায় জ্বলন্ত আগুনে ২০০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।
ট্রাম্পের শান্তি পরিষদের আড়ালে আসলে গাজাকে শাসন করার মহাপরিকল্পনা করেছেন, আর তা হলো টেকনোক্র্যাটিক (প্রযুক্তিনির্ভর) সরকারের পরিকল্পনা। ফিলিস্তিনের সংঘাতে লিপ্ত উপদলগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের শান্তি পরিষদে দুজনের স্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা সামি নাসমান সমস্যা সৃষ্টি করবেন। তাকে গাজার একটি আদালত ‘বিশৃঙ্খলা’ উসকে দেওয়া এবং হামাস নেতাদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। নাসমান অনেক দিন ধরেই নির্বাসনে আছেন। নিকট ভবিষ্যতে তিনি ফিরে আসবেন, তেমন সম্ভাবনা কম।
এই ধরনের লোক যদি শান্তি পরিষদে যুক্ত হন, তাহলে তা হবে মারাত্মক ভুল। উইটকফ যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের ঘোষণা দিয়েছেন। তখন তিনি সব দোষ হামাসের ওপর চাপিয়েছিলেন। উইটকফ তার বিবৃতিতে বলেছেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। অস্ত্রধারী কর্মীরা এই নিরস্ত্রীকরণের আওতায় পড়বে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে হামাস এই নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি পুরোপুরি মেনে চলবে। তিনি হামাসকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, হামাস সেটা করতে ব্যর্থ হলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ কিন্তু ইসরায়েলের সেখান থেকে সরে আসবে কি না, সেই বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। ইসরায়েল এখন গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড দখল করে আছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি যুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ১০০০ বারের বেশি যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং ৪৫০ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, উইটকফ তাও স্বীকার করেননি।
ব্লেয়ারের কথার সুরও ছিল একই। তিনি বলেছেন, গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের ২০-দফা পরিকল্পনা অসাধারণ একটি দলিল। তিনি ঘোষণা দিয়েই ফেলেছেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গাজায় প্রতিদিন ইসরায়েলি বিমান হামলা হচ্ছে। বন্যায় মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে তীব্র শীতে গাজাবাসী অমানুষিক কষ্ট পাচ্ছে। ১,০০,০০০ বেশি তাঁবু ধ্বংসের মতো অকথ্য কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন তারা। ইসরায়েল গাজার জন্য খাদ্য বা পুনর্গঠন সহায়তা দিচ্ছে না।
বলা হচ্ছে, গাজাকে শাসন করার জন্য গঠিত নতুন টেকনোক্র্যাটিক কমিটি গাজায় নয়, কায়রোতে বৈঠক করবে।
ইসরায়েল ক্রমাগত যুদ্ধবিরতির শর্তা লঙ্ঘন করে চলেছে। বিমান হামলা এবং হলুদ রেখা মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্লেয়ার তবু বিকল্প বিশ্বের কথা বলছেন, যেখানে গণহত্যা ঘটেনি এবং দখলদারিত্ব নেই; কিন্তু তারপরও হামাসকে নিরস্ত্র করতে হবে।
ব্লেয়ারের এই কথার পাল্টা জবাবে হামাস অবশ্য বলেছে, ‘গাজা গাজার মানুষের আবাসভূমি, আমরা এমন এক গাজা চাই যাকে পুনর্গঠন না করে বরং আগে যেমন ছিল তেমনভাবে পুনর্গঠন করা হোক।’
কার নির্দেশে ব্লেয়ার এসব ফালতু কথা বলছেন? ইসরায়েল চায় গাজাকে জীবন্ত নরক হিসেবে ধরে রাখতে, যাতে যতটা সম্ভব ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করা যায়। ইসরায়েলের বিশ্বস্ত দাসানুদাস ব্লেয়ার। তিনি তার ওই বিবৃতিতে কখনো ফিলিস্তিনি বা ফিলিস্তিন শব্দটি উচ্চারণ করেননি।
আসল সত্য হলো, গাজায় কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। আগামীতে যুদ্ধক্ষেত্রগুলো যেমন আছে তেমনই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে হামাস বা ইসলামিক জিহাদি যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরা হবে আত্মহত্যার শামিল। অবরোধও অব্যাহত থাকবে। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার অর্ধেকের বেশি দখল করে রাখবে। বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী আসবে না। এখনকার মতো কুড়ি লাখের বেশি ফিলিস্তিনি তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে থাকবে। সংঘাতের অবসান আশা করা তাই পাগলামির চেয়েও বেশি বলে মনে হচ্ছে। এর সবই অপরাধ করে যাওয়া আর কিছু নয়। গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন চলতেই থাকবে, যেমনটা হয়েছিল বসনিয়ায়। ট্রাম্প কিছুই করতে পারবেন না। করবেনও না।
ট্রাম্প আসলে একজন মাফিয়া-বস। ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অথবা তাঁবুতে ঠান্ডায় মারা যাওয়া শিশুদের জন্য চিন্তিত বলে ভান করেন। বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পল্যান্ডের যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন, শান্তি পরিষদের নামে সেই খাতে তিনি কিছু জমি দখল করে রাখছেন। আর এর সবই করছেন, নিজের বংশদ্বয় পরামর্শ দল তৈরি করে এবং একে শান্তি পরিষদ আখ্যা দিয়ে। ট্রাম্প এখন আমেরিকাকে যেমন চালাচ্ছেন, ঠিক তেমনই বিশ্বকে চালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি যতটা ফ্যাসিস্ট নন তার চেয়েও বেশি একজন মাফিয়া বস, যিনি সম্মান এবং অর্থ আত্মসাৎ করার পথ বেছে নিয়েছেন শান্তি পরিষদের নামে।
যদি এর সবই তিনি পান তাহলে এই পৃথিবীর অকিঞ্চিৎকর মানুষগুলোকে তপ্ত কড়াইতে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন অথবা না-ও পারেন। তবে একসময় তিনি দেখবেন তার পাশে কেউ নেই।
এখন তিনি ছক কষছেন কীভাবে ছলেবলে কৌশলে গ্রিনল্যান্ড দলখ করা যায়। ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখিয়ে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন, আন্তর্জাতিক আদেশ অমান্য করা, নির্বাসন, সামরিক শাসন, বিচ্ছিন্নতা, ধ্বংস, অবরোধ ও গণহত্যাকে উসকে দিচ্ছেন। তবু ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ প্রতিটি ফিলিস্তিনির হৃদয়ে আগের চেয়েও তীব্রভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দেখা যাবে, ফিলিস্তিনিরা শান্তি পরিষদকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে।
(সংক্ষেপিত)
লেখক: মিডল ইস্ট আই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানের সঙ্গেও লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান
.jpg)

