ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান সরকার আ.লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধই রাখতে চায়: তথ্য উপদেষ্টা দুইজনের মৃত্যুর পর ডেঙ্গুর টিকা স্থগিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব বাতিল অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনের লাল বাহাদুর দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিল শিবিরে ওজন কমানোর অনুমোদনহীন ওষুধের নতুন ক্রেজ এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনায় সম্মতি রাশিয়ার পাঠকের গল্প : বিষ খেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার চায়নিজ জামাই চাকরি দেবে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে চলছে একনেক সভা বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ফ্রি গুগল এআই প্রো নিয়ে এল টেকনো ব্রাজিলিয়ানদের সুখবর দিলেন নেইমার রংপুরে ওয়ার্ডভিত্তিক অপরাধচক্র শনাক্তের নির্দেশ আরপিএমপির ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের লিফলেট তৈরির সময় আটক ২ দেশের ১৬ জেলায় বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস পড়ে পাওয়া গল্প থেকে ৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বাংলা হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত ইরান-ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হলেও হুমকি চলছে দিনাজপুরে বেড়ার হোটেলে নিম্নমানের খাবারসহ একাধিক অভিযোগ ইরানে হামলা চালালে একাই লড়তে হবে: নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু বিশ্বকাপ নিয়ে অনারের ক্যাম্পেইন, ফোন-ট্যাবলেটসহ পুরস্কার জেতার সুযোগ বিশ্বকাপের আগে জয়ের ধারায় ফিরল স্পেন ইরান ও হিজবুল্লাহ আগের চেয়েও দুর্বল: নেতানিয়াহু বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস আজ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় জোর: বাতিল হতে পারে ৬ বিষয়ে অনার্স কোর্স টিভিতে আজকের খেলা
Nagad desktop

গাজা প্রশ্নে ট্রাম্প মাফিয়া বস হয়ে গেছেন

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
গাজা প্রশ্নে ট্রাম্প মাফিয়া বস হয়ে গেছেন
ডেভিড হার্স্ট

ট্রাম্প এখন আমেরিকাকে যেমন চালাচ্ছেন, ঠিক তেমনই বিশ্বকে চালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি যতটা ফ্যাসিস্ট নন তার চেয়েও বেশি একজন মাফিয়া বস, যিনি সম্মান এবং অর্থ আত্মসাৎ করার পথ বেছে নিয়েছেন শান্তি পরিষদের নামে।...

প্রায় সবাইকে ট্রাম্প তার শান্তি পরিষদে (বোর্ড অব পিস) আমন্ত্রণ জানালেন। সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও মরক্কোসহ আরও কয়েকটি দেশ এই পরিষদে যোগ দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো এ ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

শান্তি পরিষদে যোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে দিতে হবে ১ কোটি ডলার। জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে দেশগুলো এতে যোগ দেবে।

শান্তি পরিষদ পরিচালিত হবে প্রতিষ্ঠাকালীন চার সদস্যের দ্বারা গঠিত একটা নির্বাহী পরিষদের মাধ্যমে। এই চার সদস্য হচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ওয়াল স্ট্রিটের ধনকুবের মার্ক রোয়ান। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকা সত্ত্বেও তারা এক হয়েছেন।

নির্বাহী বোর্ডের একমাত্র ব্যক্তি যার ইরাক দখল, সাত বছরের গৃহযুদ্ধ আর ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে ‘অভিজ্ঞতা’ আছে, তিনি হচ্ছেন যুক্তরাজ্যের টনি ব্লেয়ার। তিনি যুক্ত হয়েছেন ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে।

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি পরিষদের কর্মপদ্ধতি অনুসারে নির্বাহী পরিষদের প্রত্যেক সদস্যের গাজার ওপর কর্তৃত্ব করার আসল ক্ষমতা থাকবে। এই হচ্ছে গাজার নির্বাহী পরিষদ। এর সদস্য সংখ্যা ৭। ওই চার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছাড়াও এই পরিষদে আরও থাকবেন তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হাকান ফিদান, কাতারের মন্ত্রী আলী আল থাওয়াদি এবং মিসরের গোয়েন্দা প্রধান মেজর জেনারেল হাসান রাশাদ। তাদের গাজা সম্পর্কে কমবেশি ধারণা আছে। কিন্তু তুরস্ক, কাতার ও মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে আইওয়াশের মতো বিশ্বের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য।

হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে তাদের কাজও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বোর্ড ‘কার্যকর শাসন, শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাজার মানুষদের সর্বোত্তম পরিষেবা প্রদানে সহায়তা করবে।’ এর অর্থ দাঁড়ায়, তারা কিছু করতে পারে, আবার না-ও করতে পারে।

তুরস্ক ও সৌদি আরবের খায়েশ হচ্ছে, ট্রাম্পের একই তাঁবুর মধ্যে থাকা। কিন্তু তারা দারুণ কিছু করে ফেলবে, এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শুধু গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা-নীতির বিরোধিতাকে অব্যাহত রাখতে চায়। তবে সেটা যে তারা অনেক ধীর গতিতে করছে, তাও স্পষ্ট। তাদের সন্দেহ উইটকফ, কুশনার ও ট্রাম্প আদর্শিকভাবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে অভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করছে।

এই দেশগুলো মনে করছে, গাজার মাটিতে তুরস্কের সৈন্যরা থাকলে ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল অভিযান বন্ধ করা যাবে। তবে নেতানিয়াহু বারবার কঠোরভাবে তাদের অন্তর্ভুক্তিকে বিরোধিতা করে যাচ্ছেন।

এসব কারণে ট্রাম্পের শান্তি পরিষদ ক্রমশ নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠছে, যার মাধ্যমে পুরোনো সমস্যার সমাধান করা হবে বলে ভাবা হচ্ছে। এত কিছুর পরও তুরস্ক বা কাতারের তুলনায় সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বেশি। সৌদি আরব হামাসকে পুরোপুরি নির্মূল করার পক্ষে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যকার এই যে বিভাজন, সেটা তলাতেই রয়ে গেছে। ক্ষমতার ভারসাম্য ইসরায়েলের অনুকূলে আনার জন্য আরবের এমন একদল পরামর্শক আছেন, যারা সমস্যা সৃষ্টি করছেন।

ফিলিস্তিনকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক ইতিহাস আসলে গভীর সমস্যা-কণ্টকিত ইতিহাস।

ব্যবসায়ী আরিয়েহ লাইটস্টোনের মতো এমন ব্যক্তিও আছেন যারা গাজায় বসতি স্থাপনের কট্টর সমর্থক। তিনি ইসরায়েল-সমর্থিত গাজা তথাকথিত মানবিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারই সাহায্য দেওয়ার জায়গায় জ্বলন্ত আগুনে ২০০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন।

ট্রাম্পের শান্তি পরিষদের আড়ালে আসলে গাজাকে শাসন করার মহাপরিকল্পনা করেছেন, আর তা হলো টেকনোক্র্যাটিক (প্রযুক্তিনির্ভর) সরকারের পরিকল্পনা। ফিলিস্তিনের সংঘাতে লিপ্ত উপদলগুলোর মধ্যে ট্রাম্পের শান্তি পরিষদে দুজনের স্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মকর্তা সামি নাসমান সমস্যা সৃষ্টি করবেন। তাকে গাজার একটি আদালত ‘বিশৃঙ্খলা’ উসকে দেওয়া এবং হামাস নেতাদের হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। নাসমান অনেক দিন ধরেই নির্বাসনে আছেন। নিকট ভবিষ্যতে তিনি ফিরে আসবেন, তেমন সম্ভাবনা কম।

এই ধরনের লোক যদি শান্তি পরিষদে যুক্ত হন, তাহলে তা হবে মারাত্মক ভুল। উইটকফ যুদ্ধবিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপের ঘোষণা দিয়েছেন। তখন তিনি সব দোষ হামাসের ওপর চাপিয়েছিলেন। উইটকফ তার বিবৃতিতে বলেছেন, দ্বিতীয় ধাপে গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করা হবে। অস্ত্রধারী কর্মীরা এই নিরস্ত্রীকরণের আওতায় পড়বে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আশা করে হামাস এই নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি পুরোপুরি মেনে চলবে। তিনি হামাসকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, হামাস সেটা করতে ব্যর্থ হলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ কিন্তু ইসরায়েলের সেখান থেকে সরে আসবে কি না, সেই বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। ইসরায়েল এখন গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড দখল করে আছে। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি যুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ১০০০ বারের বেশি যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং ৪৫০ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, উইটকফ তাও স্বীকার করেননি।

ব্লেয়ারের কথার সুরও ছিল একই। তিনি বলেছেন, গাজায় যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্পের ২০-দফা পরিকল্পনা অসাধারণ একটি দলিল। তিনি ঘোষণা দিয়েই ফেলেছেন, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গাজায় প্রতিদিন ইসরায়েলি বিমান হামলা হচ্ছে। বন্যায় মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে তীব্র শীতে গাজাবাসী অমানুষিক কষ্ট পাচ্ছে। ১,০০,০০০ বেশি তাঁবু ধ্বংসের মতো অকথ্য কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন তারা। ইসরায়েল গাজার জন্য খাদ্য বা পুনর্গঠন সহায়তা দিচ্ছে না।

বলা হচ্ছে, গাজাকে শাসন করার জন্য গঠিত নতুন টেকনোক্র্যাটিক কমিটি গাজায় নয়, কায়রোতে বৈঠক করবে।

ইসরায়েল ক্রমাগত যুদ্ধবিরতির শর্তা লঙ্ঘন করে চলেছে। বিমান হামলা এবং হলুদ রেখা মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্লেয়ার তবু বিকল্প বিশ্বের কথা বলছেন, যেখানে গণহত্যা ঘটেনি এবং দখলদারিত্ব নেই; কিন্তু তারপরও হামাসকে নিরস্ত্র করতে হবে।

ব্লেয়ারের এই কথার পাল্টা জবাবে হামাস অবশ্য বলেছে, ‘গাজা গাজার মানুষের আবাসভূমি, আমরা এমন এক গাজা চাই যাকে পুনর্গঠন না করে বরং আগে যেমন ছিল তেমনভাবে পুনর্গঠন করা হোক।’

কার নির্দেশে ব্লেয়ার এসব ফালতু কথা বলছেন? ইসরায়েল চায় গাজাকে জীবন্ত নরক হিসেবে ধরে রাখতে, যাতে যতটা সম্ভব ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করা যায়। ইসরায়েলের বিশ্বস্ত দাসানুদাস ব্লেয়ার। তিনি তার ওই বিবৃতিতে কখনো ফিলিস্তিনি বা ফিলিস্তিন শব্দটি উচ্চারণ করেননি।

আসল সত্য হলো, গাজায় কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। আগামীতে যুদ্ধক্ষেত্রগুলো যেমন আছে তেমনই থাকবে। এই পরিস্থিতিতে হামাস বা ইসলামিক জিহাদি যোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরা হবে আত্মহত্যার শামিল। অবরোধও অব্যাহত থাকবে। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার অর্ধেকের বেশি দখল করে রাখবে। বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী আসবে না। এখনকার মতো কুড়ি লাখের বেশি ফিলিস্তিনি তাঁবুর বাইরে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে থাকবে। সংঘাতের অবসান আশা করা তাই পাগলামির চেয়েও বেশি বলে মনে হচ্ছে। এর সবই অপরাধ করে যাওয়া আর কিছু নয়। গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন চলতেই থাকবে, যেমনটা হয়েছিল বসনিয়ায়। ট্রাম্প কিছুই করতে পারবেন না। করবেনও না।

ট্রাম্প আসলে একজন মাফিয়া-বস। ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, অথবা তাঁবুতে ঠান্ডায় মারা যাওয়া শিশুদের জন্য চিন্তিত বলে ভান করেন। বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পল্যান্ডের যে পরিকল্পনা তিনি করেছেন, শান্তি পরিষদের নামে সেই খাতে তিনি কিছু জমি দখল করে রাখছেন। আর এর সবই করছেন, নিজের বংশদ্বয় পরামর্শ দল তৈরি করে এবং একে শান্তি পরিষদ আখ্যা দিয়ে। ট্রাম্প এখন আমেরিকাকে যেমন চালাচ্ছেন, ঠিক তেমনই বিশ্বকে চালানোর চেষ্টা করছেন। তিনি যতটা ফ্যাসিস্ট নন তার চেয়েও বেশি একজন মাফিয়া বস, যিনি সম্মান এবং অর্থ আত্মসাৎ করার পথ বেছে নিয়েছেন শান্তি পরিষদের নামে।

যদি এর সবই তিনি পান তাহলে এই পৃথিবীর অকিঞ্চিৎকর মানুষগুলোকে তপ্ত কড়াইতে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন অথবা না-ও পারেন। তবে একসময় তিনি দেখবেন তার পাশে কেউ নেই।

এখন তিনি ছক কষছেন কীভাবে ছলেবলে কৌশলে গ্রিনল্যান্ড দলখ করা যায়। ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখিয়ে সেখানে উপনিবেশ স্থাপন, আন্তর্জাতিক আদেশ অমান্য করা, নির্বাসন, সামরিক শাসন, বিচ্ছিন্নতা, ধ্বংস, অবরোধ ও গণহত্যাকে উসকে দিচ্ছেন। তবু ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ প্রতিটি ফিলিস্তিনির হৃদয়ে আগের চেয়েও তীব্রভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে দেখা যাবে, ফিলিস্তিনিরা শান্তি পরিষদকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে।
(সংক্ষেপিত)

লেখক: মিডল ইস্ট আই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানের সঙ্গেও লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান

 

রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
রামিসার মৃত্যু, অপরাধীর শাস্তি এবং সমাজের দায়
রাজেকুজ্জামান রতন

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা?...

রামিসার নৃশংস হত্যার খবরে শিউরে উঠেছিলেন দেশের মানুষ। একটা শিশুর গলা কেটে বালতিতে রেখেছে খুনি। যখন দরজায় ধাক্কা দিয়ে মা ডাকছেন, তখন ঘরের ভেতর তার সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে। নৃশংসতা বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু না, আরও ভয়ংকর বর্বরতার চিত্র দেখেছেন মানুষ। শিশুর শরীর ক্ষত-বিক্ষত, এতটুকু শরীরে নির্মম আঘাতের চিহ্ন, আর তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে। কোনো মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ এই ঘটনার বিবরণ পড়ে সুস্থ থাকতে পারেন? তার সন্তান, তার স্বজন অথবা চারপাশের উচ্ছল শিশুদের মুখের দিকে তাকালে বুকের ভেতর কি হাহাকার তৈরি হবে না? এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? এই ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল সারা দেশ, বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যেই এই নৃশংসতার বিচার হবে।

৭ জুন বেলা ১১টায় রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা ও স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন আদালত। হত্যাকাণ্ড সংঘটনের ১৯ দিন এবং মামলা দায়েরের ১৮ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন, অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও আসামিদের সাফাই সাক্ষ্যসহ যাবতীয় বিচারিক কার্যক্রম শেষে মামলাটির রায় ঘোষণা দেশের বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটা মাইলফলক। মানুষ বলতে পারবেন অন্তত একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হলো।

রামিসা আমাদের সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই আমাদের সমাজ, যেখানে শিশুরা সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। আয়না কখনো মিথ্যা দেখায় না। প্রতিবিম্ব দেখানোর জন্য শুধু উল্টো হয়ে আসে ছবিটা। মানুষের মাথা তাকে আবার সোজা করে দেখে। মুখের ময়লা দূর না করে শুধু আয়না মুছলে চেহারা পরিষ্কার দেখা যাবে না।

কারণ এসব নতুন ঘটনা নয়। রামিসার আগে যেমন পরেও তেমনি ধর্ষণ, হত্যা চলছেই। কিছু ঘটনায় মানুষ উত্তাল হয়ে ওঠেন আর বাকিগুলো কী হয়? শত শত ঘটনা পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পায়, আড়ালে থেকে যায় যে কত তার সংখ্যা অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন ২০২৪ সালের মার্চে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় পুরো দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। তখনো মানুষের বিক্ষোভের কারণে দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। এর চার দিন পর ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পৌঁছায়। রায় ঘোষণা এবং ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানোর এক বছর পূর্ণ হলেও পরবর্তী অগ্রগতি কতটুকু, তা আজ অজানা। অথচ ছুটির দিন বাদে টানা শুনানি করে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে আলোচিত এই মামলার বিচারকাজ শেষ হয়েছিল। শুধু আছিয়া হত্যাকাণ্ডই নয়, এমন বহু বেদনাকাতর সংবেদনশীল মামলার কাগজ আদালতে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। ধর্ষণের দায় স্বীকার করার পরও বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে, নিষ্পত্তি হয় না। আবার রায় হলেও তা কার্যকর হয় না, উল্টো অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে আসে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরও শাস্তি না হওয়ার আক্ষেপ বুকে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয় নির্যাতিত পরিবারগুলোকে। কেউ যখন দেখেন তার প্রিয় সন্তানের খুনি তার চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন কি ধিক্কার তৈরি হয় না সমাজ ও বিচারের প্রতি?

আছিয়ার বেদনা না ভুলতেই রাজধানীতে নির্মমতার শিকার হলো দ্বিতীয় শ্রেণি পড়ুয়া সাত বছরের শিশু রামিসা। নারী ও শিশুর জীবন, নিরাপত্তা তাহলে কোথায়? আমাদের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা যেন অপরাধীদের কাছে একধরনের প্রশ্রয়ের বার্তা দেয়। নির্যাতিতার দোষ খুঁজে বের করা, পোশাকের দোহাই দেওয়া, সাজগোজ করাকে অজুহাত করা এবং শয়তান ভর করার মতো আত্মপক্ষ সমর্থন করার নানা দৃষ্টান্ত দেখা হয়েছে ইতোমধ্যে। কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো শাস্তি না থাকায় নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।

সব খবর পত্রিকায় আসে না, পরিসংখ্যান সব বলে না; কিন্তু যা বলে তা কি আতঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন গত ২ মে প্রকাশ করা হয়। সেই প্রতিবেদনের তথ্য অত্যন্ত ভয়াবহ: দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পেয়ে যাচ্ছে আসামিরা। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে সময় লাগছে ৩ বছর ৭ মাস। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে। প্রতিবার শুনানিতে স্বজনরা অপমানিত হন, বেদনায় ভারাক্রান্ত হন আর বাড়তে থাকে ক্ষোভ কিংবা অসহায়ত্ব।

এই এক পরিসংখ্যানেই যথেষ্ট আমাদের বিচারব্যবস্থার গতি এবং চিত্র বুঝতে পারার জন্য। কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটার পর মামলা হওয়া, আসামি ধরা পড়া এবং সাজা হওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কোনো কোনো মামলায় ১০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। অনেক সময় রায় হওয়ার আগেই মামলার বাদী মারা যান। শুধু তা-ই নয়, আসামি জামিনে বের হয়ে এসে বাদীকে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। এ ছাড়া এটা কে না জানে যে, থানায় মামলা করতে গেলে প্রশাসন, প্রভাব এবং পয়সার কী গুরুত্ব। কিছু আপাত নিরীহ পরামর্শ দেওয়া হয়, যেমন মামলা করে কী লাভ? কোনো ফল পাবে না, শুধু টাকা খরচ। বিপদ বাড়বে ইত্যাদি। আবার গ্রাম্য মাতব্বর বা প্রভাবশালী মহল সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে লোক দেখানো শাস্তি, জরিমানা করে মীমাংসা করা আর বাদীকে নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার নজিরও কম নয়।

কয়েকটা ঘটনা মনে করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে গণধর্ষণ ও হত্যায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। ওই মামলার বিচার থেকে রায় পর্যন্ত ছয় মাসও লাগেনি। রায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানি শেষে তিন আসামিকেই সাজা কমিয়ে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ১ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গহিন জঙ্গলে উদ্ধার হওয়া সাত বছরের শিশু জান্নাতুল নাইমা ইরার রক্তাক্ত ছবিটি ভোলার নয়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বাবু শেখ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা শেষে গলা কেটে জঙ্গলে রেখে যাওয়া হয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে। কিন্তু তিন মাস পার হলেও ওই ঘটনায় এখনো অভিযোগপত্রই দিতে পারেনি পুলিশ।

কুমিল্লার তরুণী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়নি দীর্ঘ ১০ বছরেও। ওই ঘটনাও সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফেনীতে ২০১৯ সালে আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়। সাত বছর পরও ওই মামলা হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় আটকে আছে। ফলে কমছে না হত্যা ও ধর্ষণ। মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১১ হাজার ৯৩৪টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা করা হয়েছে ৬ হাজার ১৩৫টি। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬ হাজার ৩১ জন শিশু, যার মধ্যে ৫ হাজার ৬৩১ জন মেয়ে এবং ৪০০ জন ছেলে শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৩১০ জন শিশুকে। ভাবা যায়! কতটা নিরাপত্তাহীন আমাদের শিশুরা।

একটা দেশ তার ভবিষ্যৎ তৈরি করে শিশুদের মাধ্যমে। শিশুদের চোখে স্বপ্ন তৈরি করা সমাজের কাজ, কিন্তু আমাদের শিশুরা পথ চলছে, বড় হচ্ছে দুঃস্বপ্ন আর আতঙ্ক নিয়ে। রামিসার খোলা চোখ যেন তাকিয়ে আছে আর প্রশ্ন করছে, আমাদের জন্য কেমন বাংলাদেশ তৈরি করছ তোমরা? অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি শিশুদের স্বস্তির সমাজ কি তৈরি হবে না? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

মেধার কঙ্কাল ও মায়াহীন সভ্যতা নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ
ড. দিপু সিদ্দিকী

সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে।...

মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচাগলা লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি স্রেফ কোনো প্রাত্যহিক ক্রাইম রিপোর্টের খতিয়ান নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সর্বোপরি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক দেউলিয়াত্ব ও পচনের এক জীবন্ত ময়নাতদন্ত। ১ জুন রাতে ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন কলের সূত্র ধরে পুলিশ যখন মিরপুর-৬ নম্বরের সি-ব্লকের সেই অন্ধকার কক্ষটিতে প্রবেশ করে, তখন সেখানে সভ্যতার এক বীভৎস কঙ্কাল পড়ে ছিল। দীর্ঘদিন অবহেলা, অনাহার আর চরম অমানবিক পরিবেশে পড়ে থাকার কারণে শরীরটিতে পচন ধরেছিল।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম এবং কুৎসিত অধ্যায়টি উন্মোচিত হয় যখন মৃতার সন্তানদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় সামনে আসে। নূরজাহান বেগম কোনো গৃহহীন বা অনাথ বৃদ্ধা ছিলেন না। তিনি সেই ফ্ল্যাটটিতে নিজের মেয়ের সঙ্গেই থাকতেন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তার অন্য সন্তানদের মধ্যে একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক এবং অপরজন কানাডাপ্রবাসী। সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের সফল, প্রতিষ্ঠিত এবং উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জন্মদাত্রীর এই পরিণতি একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজকে এক চরম আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সামাজমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া ও দ্বিমুখী দ্বন্দ্ব
এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তুলেছে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল প্রতিক্রিয়ার গভীরতা কতটুকু? এটি কি সাময়িক হুজুগ, নাকি সমাজ পরিবর্তনের কোনো আন্তরিক তাগিদ–তা নিয়ে আজ নির্মোহ বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, নূরজাহানের এই চলে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকা এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত সংকটের খণ্ডচিত্র মাত্র। যখন কোনো বাবা বা মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন, তখন সমাজ খুব দ্রুত সন্তানদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। চারদিকে রব ওঠে–‘সন্তানরা অকৃতজ্ঞ এবং অমানুষ ছিল।’ কিন্তু আমরা কখনো নিজেকে প্রশ্ন করি না–যে সন্তানকে আজ অকৃতজ্ঞ বলছি, তাকে কৃতজ্ঞতা শেখানো হয়েছিল কবে? যে সন্তানকে আজ হৃদয়হীন বলছি, তার হৃদয়টা ভেঙেছিল কে?

একটা শিশু পৃথিবীতে আসে মায়া নিয়ে। তার পর ধীরে ধীরে আমরা তাকে বদলে দিতে শুরু করি। আমরা বলি–ওকে হারাতে হবে, ওর চেয়ে বেশি নম্বর পেতে হবে, ওর চেয়ে বড় হতে হবে। আমরা তার হাতে বই দিই, কিন্তু মানবতা দিই না। আমরা তাকে অঙ্ক শেখাই, কিন্তু সম্পর্কের হিসাবের বাইরে ভালোবাসতে শেখাই না। আমরা তাকে সফল হওয়ার শিক্ষা দিই, কিন্তু কারও চোখের জল মুছে দেওয়ার শিক্ষা দিই না। বছরের পর বছর আমরা তার ভেতরের কোমল মানুষটাকে হত্যা করি, তার পর একদিন আশা করি–সে আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসবে। এ যেন একটি গাছের শেকড়ে প্রতিদিন বিষ ঢেলে, শেষ বয়সে এসে মিষ্টি ফল খুঁজে বেড়ানোর মতো।

আধুনিক শিক্ষার ভ্রান্তি: মেশিন বনাম মানবিক সত্ত্বা
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে। ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং আর করপোরেট ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয়ে জ্ঞানলাভের এক অন্ধ প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের চারপাশে। নতুন প্রযুক্তি আসছে–এটি নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি। কিন্তু এসব অগ্রগতির কেন্দ্রে যে উপাদানটি থাকার কথা ছিল, তা হলো ‘মানুষ’। মানুষের সেবায়, মানুষের আত্মিক কল্যাণে কীভাবে এ বিজ্ঞানকে কাজে লাগানো হবে, সেই পরিমিতিবোধ মানুষকে কে দেয়? এই চেতনা কোনো ল্যাবরেটরি বা কোডিং ক্লাসরুম থেকে আসে না; এটি আসে কলা (Arts), সাহিত্য, ইতিহাস এবং সামাজিক দর্শনবিষয়ক চর্চা থেকে।

দর্শনহীন বিজ্ঞান আর মূল্যবোধহীন উচ্চশিক্ষা মানুষকে মানুষ বানায় না, বরং তাকে পরিণত করে একেকটি দক্ষ, সংবেদনহীন, স্বার্থপর রোবটে। নূরজাহান বেগমের সন্তানরা বুয়েটে পড়াতে পারেন, সরকারের নীতিনির্ধারণ করতে পারেন, ক্লাসরুমে শিশুদের পাঠ দিতে পারেন–কিন্তু মায়ের জীর্ণ ঘরের খবর রাখার, অসুস্থ জন্মদাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিক বোধটুকু তাদের ভেতর গড়ে ওঠেনি। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাদের ‘সফল’ হতে শিখিয়েছে, ‘মানুষ’ হতে শেখায়নি।

আত্মকেন্দ্রিক পরিবার ও করপোরেট দাঁড়িপাল্লা 
এ সংকটের শেকড় আরও গভীরে, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরে। বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বার্থ আর চরম ভোগবাদের ওপর। আমাদের সনাতন যৌথ পরিবারের সুরক্ষামূলক কাঠামো ভেঙে আমরা এখন ‘আমি, আমার সঙ্গী আর আমার চার দেয়াল’–এই আত্মকেন্দ্রিক অণু-পরিবার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সম্পর্কগুলোও এখন লাভ-ক্ষতির করপোরেট দাঁড়িপাল্লায় পরিমাপ করা হয়।

ড. সুকোমল বড়ুয়ার দর্শন ও বাস্তবায়নের শূন্যতা
কারিগরি শিক্ষার এই নৈতিক মহামারি থেকে সমাজকে বাঁচাতে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডক্টর সুকোমল বড়ুয়া দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আত্মিক রূপান্তরের কথা বলে আসছেন। তার মতে, কেবল বস্তুগত শিক্ষা মানুষকে অহংকারী ও বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এর বিপরীতে তিনি আমাদের পাঠ্যক্রমে অহিংসা, পারস্পরিক মৈত্রী এবং অসাম্প্রদায়িক সামাজিক দর্শনের মেলবন্ধনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি মূলত ‘মানবিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানের একটি সমন্বিত শিক্ষা মডেল’ প্রস্তাব করেন। বিভিন্ন ফোরামে তার এই দূরদর্শী চিন্তাধারা প্রশংসিত হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক মহল, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা কারিকুলাম বোর্ড তা বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা যায়নি বলেই আজ সমাজ এমন মানবিক শ্মশানে পরিণত হয়েছে, যেখানে কাগজের সার্টিফিকেটের আড়ালে তৈরি হচ্ছে ‘উচ্চশিক্ষিত অমানুষ’।

উত্তরণের পথ: আইন বনাম মনস্তাত্ত্বিক সংস্কার
এই সামাজিক মড়ক থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ সংকটের সমাধান কেবল একতরফা আইনি প্রয়োগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন দ্বিমুখী নীতি। বলা যেতে পারে-
আইনের কঠোর প্রয়োগ: বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন’ রয়েছে। এটি একটি ভালো আইন হলেও সচেতনতার অভাব ও আইনি জটিলতার কারণে এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। এ আইনের ধারাগুলো আরও কঠোর ও গতিশীল করা সময়ের দাবি। মা-বাবাকে অবহেলাকারী সন্তানদের চাকরি, পদোন্নতি বা রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধা বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে।

পারিবারিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংস্কার: আইন দিয়ে রাষ্ট্র কাউকে শারীরিকভাবে পাশে দাঁড় করাতে পারবে, কিন্তু মনের ভেতরের সহানুভূতি জোর করে তৈরি করতে পারবে না। সেটার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আমূল সংস্কার। প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন নিয়ম হলো–যা বপন করবে, একদিন তাই ফিরে আসবে। তাই সন্তানকে শেখান–একটা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খাবার দিতে, একটা কান্নারত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে, একটা সম্পর্ককে আগলে রাখতে। কারণ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে মানুষ বুঝতে পারে–এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অভাব অর্থের নয়, সবচেয়ে বড় অভাব ভালোবাসার।

সবচেয়ে করুণ মৃত্যু সেটা নয়, যখন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। সবচেয়ে করুণ মৃত্যু তখনই ঘটে, যখন জীবিত অবস্থাতেই একটি হৃদয়ের ভেতর থেকে মায়া, ভালোবাসা আর মানবিকতা মারা যায়। সন্তানদের শুধু আমলা বা প্রকৌশলী বানানোর অন্ধ ইঁদুরদৌড় বন্ধ করে, সবার আগে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার যৌথ প্রতিজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্র, শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবারকে নিতেই হবে। নয়তো আজ যে অবহেলা আর নির্মমতার শিকার এই মা হলেন, কাল সেই একই ভয়াবহ নিয়তি আমাদের প্রত্যেকের দরজায় এসে কড়া নাড়বে।

লেখক: প্রাবন্ধিক এবং কবি; ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং শত্রু-মিত্র খেলা
আনু মুহাম্মদ

যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।...

পুঁজিবাদের সম্প্রসারণে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা খুবই সহায়ক হয়েছিল। আর উপনিবেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে পশ্চিমা মিশনারিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, ভূমিকা ছিল স্থানীয় এক ধরনের ধর্মীয় নেতা ও ক্ষমতাবানদেরও। আবার ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী অবস্থানেও কোনো কোনো মিশনারি ও স্থানীয় কোনো কোনো ধর্মীয় নেতার ভূমিকা দেখা গেছে। উত্তর উপনিবেশকালে প্রান্তস্থ দেশগুলোতে খুঁটি ধরে রাখতে, বিপ্লব ঠেকাতে পুঁজিবাদীকেন্দ্র বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ধর্মীয় শক্তি ব্যবহারে ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। মূলধারার চার্চ সাম্রাজ্যবাদের খুঁটি হিসেবে বরাবরই কাজ করেছে। তারা একদিকে মুসলিম রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সবরকম ব্যবস্থা নিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে একটি বিষফোঁড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে তাদের অনুগত ইসলামপন্থি দল ও ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে বিপ্লববিরোধী আতঙ্ক সৃষ্টি করার কাজ সহজ ছিল। বস্তুত, এই ধর্মপন্থিরা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে জনগণের মুক্তির লড়াই ঠেকাতে সামরিক বেসামরিক স্বৈরশাসকদের সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের পথই সুগম করেছে।

এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আশির দশক পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক ধর্মপন্থি সংগঠন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ধর্মরক্ষার নাম করে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করেছে। এর একটি বড় উদাহরণ আফগানিস্তান। প্রথমে মুজাহিদিনদের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত সরকার উচ্ছেদ করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় আফগান মুজাহিদিনদের সবরকম পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে, প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, অর্থ দিয়েছে। এর অংশীদার ছিল সৌদি আরবও। ইউএসএইড সরবরাহ করেছে ইসলামের নামে সহিংস উন্মাদনা সৃষ্টির মতো বই, শিশুদের পাঠ্যপুস্তক। যার মধ্যে সোভিয়েত সৈন্যের চোখ উপড়ে ফেললে বেহেশতে যাওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল।  আফগানিস্তানে সিআইএর এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নে মাঠের ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সামরিক শাসনের মাধ্যমে জেনারেল জিয়াউল হকের মতো এক বাধ্য নিষ্ঠুর  সামরিক জেনারেলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাজে দিয়েছে।

মুজাহিদিনদের অস্থিতিশীল শাসনের সময়েই একপর্যায়ে আকস্মিকভাবে বিশাল শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয় তালেবান। মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে যাদের অস্ত্র, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত সমর্থন সবই জোগান দিয়েছে সেই একই যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দফায় তালেবানরা আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের সূচনা করে ১৯৯৭ সালের ২৪ মে। ঠিক তার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ ব্যবসা জগতের মুখপাত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল আফগানিস্তান নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানে লেখা হয়: আফগানিস্তান হচ্ছে মধ্য এশিয়ার তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানির প্রধান পথ।... তাদের পছন্দ কর বা না কর ইতিহাসের এই পর্যায়ে তালেবানরাই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। দুই দিন পর অর্থাৎ ১৯৯৭ সালের ২৬ মে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস লেখে: ক্লিনটন প্রশাসন মনে করে যে, তালেবানদের বিজয় ইরানের পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে... এমন একটি বাণিজ্য পথ উন্মুক্ত করবে যা এই অঞ্চলে রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে দুর্বল করবে।

মার্কিন তেল কোম্পানি ইউনোকল, যারা ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সময়ে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস ভারতে রপ্তানির জন্য অনেক চেষ্টা করেছে, ক্লিনটন প্রশাসন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অবস্থানকে ‘খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি’ বলে অভিহিত করে। এই কোম্পানি বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস ও অপরিশোধিত তেল নেওয়ার প্রকল্প নিয়ে অপেক্ষা করছিল।

১৯৯০-এর শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব আধিপত্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শত্রুপক্ষ দরকার হয়। ১৯৯১ সালে প্রথম দফা ইরাক আক্রমণের মধ্যদিয়ে পরবর্তী কয়েক দশকের যাত্রাপথ নির্মিত হয়। একদিকে ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’র প্রতিপক্ষ ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সবরকম বিদ্বেষী প্রচারণা, বৈষম্য ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হতে থাকে মধ্যপ্রাচ্য, আরব ও মুসলমান পরিচয়ের মানুষ। অন্যদিকে রাজা-বাদশাসহ মুসলিমপ্রধান দেশের শাসকদের দেখা যায় সাম্রাজ্যবাদী এ নকশা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালনে। এ সময় থেকে ‘ইসলামি সন্ত্রাসী’র তৎপরতাও বেশি বেশি দেখা যায়, যা এই নকশা এগিয়ে নিতে খুবই প্রয়োজনীয় ছিল।

২০০১ সালে নিউইয়র্কের ‘টুইন টাওয়ার’ হামলার পর থেকে এই কর্মসূচির অধিকতর সামরিকীকরণ ঘটে। ফুলিয়ে-ফাপিয়ে তোলা স্পষ্ট-অস্পষ্ট, ঘোষিত-অঘোষিত, ‘সন্ত্রাসী’দের  বিরুদ্ধে ২০০১ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ একটি বৈশ্বিক এজেন্ডার রূপ দেয়। আরব বিশ্বে রাজতন্ত্রকে ভর করেই এ সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তৃত হয়। পাশাপাশি পুরোনো মিত্রদেরই সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র, মিডিয়াসহ তাদের নানা সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা জোরদার হয়। এ প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনীতির ক্ষেত্রও উর্বর হতে থাকে। অন্যদিকে অপমান, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষোভের ওপর ভর করে বিশ্বজুড়ে ইসলামপন্থি রাজনীতির নতুনভাবে প্রসার ঘটে।

এ সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নারী-পুরুষ-শিশুসহ বহু নিরীহ মানুষ খুন হয়েছে। মসজিদ, মন্দির গির্জা, মেলা, উৎসব, ভাস্কর্য আক্রান্ত হয়েছে। ইসলামের নাম নিয়ে এসব গোষ্ঠীর বর্বর দিগভ্রান্ত সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে বিশ্বব্যাপী মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা আরও বেড়েছে। রাষ্ট্রের দমনপীড়ন, সহিংসতা বেড়েছে, বিশ্বে অশান্তি বেড়েছে। এগুলোকে কেউ ‘জিহাদ’, কেউ ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই’ বলে মহিমান্বিত করতে চান। মোহমুক্ত থাকলে এসব বয়ান যে কত ভ্রান্ত তা উপলব্ধি কঠিন নয়। কারণ এসব আক্রমণ-সন্ত্রাস বিশ্বের ক্ষমতাবান রাষ্ট্র, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার বিরুদ্ধে দেখা যায় না। সে কারণে তাদের দুর্বলও করে না, বরং তাদের দমনপীড়ন ব্যবস্থার পক্ষে আরও বিস্তৃত যুক্তি তুলে ধরে। সেই সূত্র ধরেই গত আড়াই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিভাবকত্বে পরিচালিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে দেশে দেশে জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-জুলুম আরও বেড়েছে। রাষ্ট্র আরও সশস্ত্র এবং নৃশংস হয়েছে।

অনেকে এও যুক্তি দিতে চেষ্টা করে যে, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন এই ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে সেকুলার শক্তির পক্ষে। এটিও আরেকটি বড় ভ্রান্তি। বস্তুত, নির্বাচিত এবং সেক্যুলার সরকার উচ্ছেদে মার্কিনি রেকর্ড অনেক। চিলিসহ ল্যাটিন আমেরিকায় এর দৃষ্টান্ত অনেক, বিশ্বের অন্য প্রান্তেও। যেমন, ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে আফগানিস্তানে সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল, কিন্তু তাদের অপরাধ তারা ছিল মার্কিনবিরোধী। অথচ এ সরকারগুলো আফগানিস্তানে ভূমি সংস্কার, নারী অধিকার, শিক্ষা ও চিকিৎসা সংস্কারে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল। এদের উচ্ছেদ করে মার্কিন রাষ্ট্র এমন শক্তিকে একের পর এক ক্ষমতায় এনেছে যারা এগুলোর ঘোর বিরোধী।  ইরাক ও লিবিয়াতেও সেক্যুলার সরকারই ক্ষমতায় ছিল। তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সমস্যা থাকলেও জাতীয় সক্ষমতা, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানিসহ জনঅধিকারের ক্ষেত্রে সেখানে অনেক সাফল্য ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে সাদ্দাম ও গাদ্দাফির শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদের পর সেসব ব্যবস্থা তছনছ হয়েছে। আর সেখানে বিভিন্ন ধর্মপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব, সংঘাত বেড়েছে। সর্বশেষ সিরিয়াতেও তাই ঘটল।

এ রকমও কেউ কেউ বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এসব দেশে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। শতভাগ ভুল কথা।  স্বৈরাচার সাম্রাজ্যবাদের জন্য কখনোই সমস্যা না, বরং বিশ্বে স্বৈরাচারী শাসকদের প্রধান অংশ তাদেরই তৈরি কিংবা তাদেরই লোক। স্বৈরশাসক তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা বিরক্ত হয়।

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৬ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম-অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদে দুই অধ্যাপককে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

শনিবার (৬ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামকে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলমকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ধারা ১৩(১) অনুযায়ী তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসরের তারিখ- যেটি আগে ঘটবে, ততদিন তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। উপ-উপাচার্য হিসেবে তারা তাদের বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাবেন।

এছাড়া বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা ভোগ করবেন এবং সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত এবং উপাচার্য দ্বারা অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।

আমানউল্লাহ/ আজহার 

চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
রাজেকুজ্জামান রতন

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে?

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে দুর্গতির শেষ কি হবে না? নাকি এটা এক পরিকল্পিত দুর্দশা, যার কবলে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা? প্রতিবছর ঈদুল আজহা এলে এই প্রশ্ন আর হাহাকার তৈরি হয় দেশের মানুষের মধ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার দাম আবারও মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও চামড়া সংগ্রহকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন, যার ফলে দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। লাভের আশায় চামড়া কিনে অনেক ব্যবসায়ী কোনো ক্রেতা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু এবার নয়, প্রায় এক দশক ধরে সংকটে বন্দি থাকা এই চামড়া খাতের স্থায়ী অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঈদের সংকটে।

এর কারণ কী? দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কিন্তু সমাধানহীন সমস্যা হলো, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্‌লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে চামড়া খাতটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না, এ জন্য বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হচ্ছে না। ফলে রপ্তানির সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।

ধারণা করা হয়, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া থেকে তৈরি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার আয় করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বর্তমানে তার চামড়াশিল্পের সম্ভাবনার মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। সম্ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক! রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ এক দশকে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয় আর চামড়াশিল্পের কাঁচামাল দেশেই মজুত এবং নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। কারণ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার উদ্বেগের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনেন না। কিন্তু অন্যান্য দেশ কী করছে? ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামের চামড়া রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনাম ২৯ বিলিয়ন ডলারের জুতা রপ্তানি করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুতা রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের চামড়া খাতের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এটা কি জাদুমন্ত্রে সম্ভব হয়েছে? তা নয়। ভিয়েতনাম তাদের অবকাঠামো তৈরি করেছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর বাংলাদেশ কোনো বর্জ্য শোধনাগার বা স্যুয়ারেজ প্ল্যান্ট ছাড়াই একটি ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ এই কাঁচা চামড়াকে মাটিতে পুতে, নদীতে ফেলে ধ্বংস করে ফেলেছি।

সরকার-নির্ধারিত দাম এবং বাজারের মধ্যে বিরাট ফারাক। সরকার এ বছর ঢাকার জন্য লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। মাঝারি মানের একটি গরুতে সাধারণ ১৮-২০ বর্গফুট ও বড় গরু থেকে ২৪-২৬ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। ফলে সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম প্রতি বর্গফুট ৬৭ টাকা হিসাবে মাঝারি মানের লবণযুক্ত একটি চামড়ার দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, আর বড় চামড়ার ক্ষেত্রে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।

বাজারের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকায় আকার ও গুণমানের ওপর ভিত্তি করে এবার বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র পোস্তার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি দাম দিয়ে কোনো চামড়া কেনেননি। অথচ দুই দশক আগে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন একই ধরনের চামড়ার দাম ৫০০ টাকারও কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমানে এই দাম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল।

আড়তদাররা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সস্তায় চামড়া কিনে তা সংরক্ষণ করার পর ট্যানারিগুলোর কাছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন। তার মতে, প্রতি পিস চামড়া সংরক্ষণে খরচ হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে ৪০০ টাকায় কেনা একটি চামড়া যখন ট্যানারিতে পৌঁছায়, তখন সব মিলিয়ে তার ৮০০ টাকা হয়ে যায়।

আড়তদাররা সারা বছর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেন। কাঁচা এবং ওয়েট-ব্লু (আংশিক প্রক্রিয়াজাত) চামড়া রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজার সীমিত, ফলে ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ চামড়া ধরে রাখতে পারছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে তার মূল্য আছে। লবণ ছাড়া চামড়ার গুণ ও মান রক্ষা করা যায় না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে চামড়া খাতের সংকটকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার ট্যানারি মালিকদের সাভারে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। তবে শিল্প-মালিকদের প্রতিনিধিদের দাবি, সাভার শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। ফলে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিক সংকট ও ঋণখেলাপির মুখে পড়েছেন। আর পরিবেশ দূষণ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এখন ধলেশ্বরী নদীতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

ঈদুল আজহায় প্রতিবছর যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদিত হয়, তা ধারণ বা প্রক্রিয়াজাত করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত কাঁচা বা লবণযুক্ত এবং ওয়েট-ব্লু চামড়া আমদানি করে। চামড়া রপ্তানি বন্ধে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না, ফলে চোখের সামনে এই মূল্যবান কাঁচামাল পচে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নজরে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা ছিল ঈদের পর সাত দিন রাজধানী অভিমুখে পরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু কে মানে সেই নিষেধাজ্ঞা! বিসিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন যে, বিপুল পরিমাণ চামড়া ঈদের পর পরই সাভারে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর থেকে পরদিন বেলা ১১টার মধ্যে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৯টি কোরবানির পশুর চামড়া এই শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২টি। গত বছর ঈদের প্রথম তিন দিনে শিল্পনগরীতে মোট কোরবানির পশুর চামড়া প্রবেশ করে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭ পিস। যেখানে এ বছর ৩০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিল্পনগরীতে মোট চামড়া প্রবেশ করেছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫ পিস। ফলে এটি ধারণা করলে ভুল হবে না যে, সঠিক সংরক্ষণ বা লবণ দেওয়া ছাড়াই ঢাকার বাইরের একটি বড় অংশের চামড়া সরাসরি শিল্পনগরীতে ঢুকে পড়েছে। এই চামড়ার ভবিষ্যৎ কী?

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। সংরক্ষণের অভাবে চামড়া পচে নষ্ট হয়, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার তৈরি না করার কারণে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, কিন্তু দেশের বাজারে জুতা সস্তায় পাওয়া যায় না। সবাই বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি 
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]