কৌশলগত আত্মগোপন বা ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নেওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতিতে। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় কমিউনিজমে বিশ্বাসীরা মওলানা ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর মধ্যে অবস্থান করে তাদের মতাদর্শের প্রচার ও গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতেন।...
‘গুপ্ত’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ গোপন, অদৃশ্য বা অজানা বিষয়। এ গুপ্ত থেকেই ‘গুপ্তচর’ শব্দের উৎপত্তি। গুপ্তচরের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এরা এমন এক ধরনের ব্যক্তি, যারা নিজের পরিচয় গোপন রেখে তথ্য সংগ্রহ করে পাচার করে। এজন্য ধারণ করে ছদ্মবেশ। গুপ্তচররা একটি পক্ষের দ্বারা নিযুক্ত হয়। ইংরেজিতে এদের বলা হয় ‘স্পাই’। এ গুপ্ত বার্তাবাহকরা অতিগোপনে তাদের কাজ করে থাকেন। প্রাচীনকালে যখন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি আবিষ্কার হয়নি, তখন এক দেশ আরেক দেশের তথ্য সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করত। এরা বিরুদ্ধপক্ষের সংবাদ গোপনে সংগ্রহ করে তা স্বপক্ষকে জানিয়ে দিত। সিরাজউদদৌলা সিনেমায় একটি নারী চরিত্র ছিল ‘আলেয়া’। প্রকাশ্যে তার পরিচয় ছিল নতর্কী। তবে সে ছিল আসলে নবাবের একজন গুপ্তচর। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের (১৭৬১) ওপর শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরী রচিত ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকে গুপ্তচর ছিল আতা খাঁ। তবে তথ্য সংগ্রহের জন্য সে যখন মারাঠা শিবিরে প্রবেশ করত বেশ বদলে হয়ে যেত ‘অমরেন্দ্রনাথ বাপ্পাজি’। এক রাত সে মুসলিম শিবিরে থাকত, আরেক রাত থাকত মারাঠা শিবিরে। একদিন রোহিলার নবাব সুজাউদ্দৌলা তাকে জিজ্ঞেস করলেন- আতা খাঁ কাল রাতে তুমি কোন শিবিরে ছিলে? আাতা খাঁ জবাব দিল- মারাঠা শিবিরে। তার আগের রাতে? মুসলিম শিবিরে। এভাবে কয়েকবার প্রশ্নোত্তরের পর নবাব সুজাউদ্দৌলা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা আতা খাঁ, তুমি কি আমাদের শিবির থেকে মারাঠা শিবিরে যাও, নাকি মারাঠা শিবির থেকে আমাদের শিবিরে আসো? আতা খাঁ মাথা চুলকাতে চুলকাতে জবাব দিল, ‘জি, জি’। আসলে গুপ্তচরদের স্বরূপ সন্ধান বড়ই কঠিন। এরা কখন যে কার পক্ষে কাজ করবে, তা সে নিজে ছাড়া অন্য কারও পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়।
গুপ্ত কিন্তু সবসময় গুপ্ত, মানে গোপন থাকে না। যাদের নামের সঙ্গে ‘গুপ্ত’ পদবি আছে তারা বিচরণ করেন প্রকাশ্যেই। এই গুপ্ত পদবিধারী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম শ্রী গুপ্ত; যিনি ভারতবর্ষে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। আনুমানিক ৩২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত ছিল এ গুপ্ত সাম্রাজ্য। বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ইতিহাসে বর্ণিত আছে, গুপ্ত শাসকদের সময়ে ভারতবর্ষে বিরাজিত ছিল শান্তি, অর্জিত হয়েছিল সমৃদ্ধি। শিল্প, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, ন্যায়শাস্ত্র, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, ধর্ম ও দর্শনে উৎকর্ষ লাভ করেছিল সে সাম্রাজ্য। শ্রী গুপ্ত ওই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হলেও প্রথম চন্দ্রগুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সফল শাসক। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পরিধি ছিল প্রায় ৩৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার বা ১৪ লাখ বর্গমাইল। গুপ্ত সম্রাটদের আমলে বহু পণ্ডিত ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের মধ্যে কালিদাস, আর্যভট্ট, বরাহমিহির এবং বিষ্ণু ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত।
গুপ্ত এখনো আমাদের দেশের অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীর পদবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে একজন বাঙালি কবি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (জন্ম; ৬ মার্চ, ১৮১২, মৃত্যু; ২৩ জানুয়ারি ১৮৫৯)। কবির পাশাপাশি একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক-সাহিত্যিকও ছিলেন তিনি। তার হাত ধরেই বাংলা কাব্য-জগৎ মধ্যযুগীয় সীমানা পেরিয়ে আধুনিক যুগের মহাপ্রান্তরে পা রাখে। তিনি ‘গুপ্ত কবি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তবে গুপ্ত মানে গোপন নয়। কাব্যচর্চা, সাংবাদিকতা সবই করেছেন প্রকাশ্যে। বিংশ শতাব্দীতে আমরা দেখতে পাই গুপ্ত পদবিধারী আরেকজন প্রথিতযশা সাংবাদিককে। তিনি সন্তোষ গুপ্ত। জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ৯ জানুয়ারি, পরলোক গমন করেছেন ২০০৪ সালের ৬ আগস্ট। বাংলাদেশের যে কজন সাংবাদিক প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে আছেন, সন্তোষ গুপ্ত তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। দেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদের সিনিয়র সহকারী সম্পাদক ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।
ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার সংগ্রামে আত্মদানকারী যে তিন অকুতোভয় বিপ্লবী আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে দুজনের বংশপদবি গুপ্ত। তারা হলেন বিনয় কৃষ্ণ বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ চন্দ্র গুপ্ত। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ইংরেজ শাসকদের হটিয়ে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার প্রত্যয়ে তারা ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং (সচিবালয়) আক্রমণ করে ইংরেজ ইন্সপেক্টর জেনারেল এন এস সিম্পসনকে হত্যা করেন। বন্দুকযুদ্ধের একপর্যায়ে গ্রেপ্তার এড়াতে বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন। আর বিনয় বসু ও দীনেশ গুপ্ত নিজেদের পিস্তলের গুলিতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে তাদের গ্রেপ্তার ও পরে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর বলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারের নামকরণ করা হয় ‘বিবাদী বাগ’ (বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ)। এই তিন বাঙালি বিপ্লবীর সাহস ও আত্মত্যাগ সংগত কারণেই আমাদের গর্বিত করে। বিশেষ করে আমি গর্ব অনুভব করি এজন্য যে, তাদের দুজন বিনয় বসু ও বাদল গুপ্তের বাড়ি আমাদের বিক্রমপুরে। অপরজন দীনেশ গুপ্তের বাড়ি ছিল নেত্রকোনায়। এ ছাড়া ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিযুগের অন্যতম বিপ্লবী অন্নপূর্ণা দাসগুপ্ত, আশা দাসগুপ্ত তাদের দেশপ্রেমের জন্য ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ব্রিটিশ আমলে ঢাকার একজন পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন শরৎ চন্দ্র গুপ্ত নামে। বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র পদমর্যাদার। তার নামানুসারে পুরান ঢাকার নারিন্দায় শরৎ গুপ্ত রোড নামে একটি রাস্তা আছে।
ষাটের দশকে বামপন্থি রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী অন্যতম কবি ও সাংবাদিক আবদুল মান্নান ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন ‘সমুদ্র গুপ্ত’। সে সময়ে সরকারের কোপদৃষ্টি এড়াতে বামপন্থি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অনেকেই ছদ্মনাম গ্রহণ করতেন। সমুদ্রদাও তা-ই করেছিলেন। তিনি গুপ্ত সাম্রাজের সফল শাসক সমুদ্র গুপ্তের মতো বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন কি না জানা হয়নি। তবে তার কবিতা তাকে বেশ খ্যাতি দিয়েছিল। সমুদ্র গুপ্তের একটি কবিতার শিরেনাম ‘তোমার পতন দেখি’। তার শেষ লাইন কটি এরকম- ‘নামতে নামতে তুমি কত নিচে নামো আমি দেখবো/ তুমি তো ওপরে নিক্ষিপ্ত ঢিল/ নিচে নামা ছাড়া তোমার আর কোনো গত্যন্তর নাই।’ কবিতার কথাগুলোর তাৎপর্য নিয়ে এখানে আলাপ সংগত নয়। আজকের গুপ্তবিষয়ক আলোচনায় তা প্রাসঙ্গিকও হবে না। তবে ওপরে যেটুকু কাসুন্দি ঘটলাম, তা অনেকটা পালাগানের গায়কদের মূল গান শুরুর আগে ‘বন্দনা’র মতো।
সবাই অবগত আছেন, আমাদের দেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি বেশ জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। বড় বড় দলের ততধিক বড় নেতারা গুপ্ত নিয়ে এখন মুক্ত বিতর্কে গলদঘর্ম। অভিযোগের ঝড় বইছে এক সংগঠনের ভেতরে আরেক সংগঠনের কর্মী-নেতাদের গুপ্ত অবস্থানের। অবস্থা বেগতিক দেখে ভিন্ন দলের কর্মীর ছদ্মবেশ ধারণ করে আত্মরক্ষা এবং নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে পরিবর্তিত সময়ে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি পক্ষের বিরুদ্ধে। একটি দলের প্রধান অপর দলটির কর্মীদের প্রকাশ্য জনসভায় ‘গুপ্ত’ বলে অভিহিত করে শ্লেষাত্মক উক্তি করছেন। অপর দলের শীর্ষনেতা প্রতিপক্ষের ওই নেতাকে ‘সতেরো বছর গুপ্ত থাকার’ কটাক্ষ করছেন। গুপ্ত নিয়ে এ উন্মুক্ত আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ সচেতন নাগরিকদের ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। তাদের আশঙ্কা রাজনীতি পুনরায় এক সময়ের জনপ্রিয় ‘হাজেরা বেগম-পরেশ আলী দেওয়ানের’ পালাগানের রূপ ধারণ করে কি না। কারণ এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চা অতীতে অনেক হয়েছে এবং তা দেশের জন্য শুভকর হয়নি।
রাজনীতিতে আত্মগোপন বা গুপ্ত অবস্থান গ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কৌশলগত কারণেই অনেক সময় রাজনীতিকদের গোপন অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক সময় দেশত্যাগ করে বিদেশেও আশ্রয় নিতে হয়। ইতিাহাসে এর ভুরি ভুরি প্রমাণ আছে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ সরকারের কোপানলে পড়ে প্রথমে আত্মগোপন ও পরে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার পর কীভাবে তিনি ব্রিটিশদের শত্রু জার্মানির ফ্যাসিস্ট শাসক অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে দেখা করেন, তার সহায়তায় কীভাবে সাবমেরিনে করে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় এসে সিঙ্গাপুর হয়ে জাপানে গিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্বভার নেন, ইতিহাসে তার সবিস্তার বর্ণনা রয়েছে। অথচ আজ একপক্ষ আরেক পক্ষের দিকে রাজনীতির কর্দম নিক্ষেপ করতে গিয়ে রাজনীতিকরা সে গৌরবময় ইতিহাস যেন বিস্মৃত হয়েছেন। বিস্ময়কর হলো, যারা একটি বৃহৎ দলের প্রধান নেতাকে সতেরো বছর ‘গুপ্ত ছিলেন’ বলে কটাক্ষ করছেন, তারা ভুলেই গেছেন, এ দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় নাগরিকত্ব হারিয়ে তাদের দলের সাবেক আমির বিদেশে আত্মগোপনে ছিলেন।
কৌশলগত আত্মগোপন বা ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নেওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতিতে। পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্ট রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। সে সময় কমিউনিজমে বিশ্বাসীরা মওলানা ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর মধ্যে অবস্থান করে তাদের মতাদর্শের প্রচার ও গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতেন। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক, আবদুল মতিন, আলাউদ্দিন ছিলেন অন্যতম।
আমাদের দেশের রাজনীতিকদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা যে খুব একটা ইতিবাচক নয়, তা না বললেও চলে। এ নেতিবাচক ধারণার প্রধান কারণ তারা ইতিবাচক বক্তব্যের চেয়ে প্রতিপক্ষের দিকে ঢিল ছুড়তে বেশি আগ্রহী। তবে সে ঢিল ছোড়ার সময় তারা এটা খেয়াল করেন না, নিজেরা দাঁড়িয়ে আছেন কাচের ঘরে। সেখানে দাঁড়িয়ে অপরের প্রতি ঢিল ছোড়া যে মোটেই শুভবুদ্ধির পরিচায়ক নয়, সেটাও স্মরণে রাখেন না। সমস্যাটা এখানেই।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
.jpg)
.jpg)
