ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়ার এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় এবং দূরদর্শী বিনিয়োগ। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে এই মিতালিই হবে আগামীর বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল মন্ত্র।...
বিশ শতকের শেষভাগে যখন বিশ্বজুড়ে শিল্পায়নের ডামাডোল তুঙ্গে, তখন জাপানি উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ‘আকিরা মিয়াওয়াকি’ প্রকৃতির এক অদ্ভুত সমীকরণের কথা শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এমন এক বনায়ন পদ্ধতির কথা, যা প্রথাগত বনের সংজ্ঞাকেই বদলে দেয়। তখন অনেকেই তাকে পরিহাস করে বা ভ্রান্ত ধারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানের জলবায়ুসংকটের যুগে সেই ‘মিয়াওয়াকি পদ্ধতি’ আজ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ রক্ষার এক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দ্রুত নগরায়ণ হতে থাকা দেশে, যেখানে শহরের বুকে এক চিলতে সবুজের জন্য হাহাকার চরমে, সেখানে এই পদ্ধতি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আমাদের শহরগুলো এখন ইট-পাথরের খাঁচা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বুক ভরে নিশ্বাস নেওয়া কষ্টসাধ্যের ব্যাপার এখন। সেখানে এ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে ছোট ছোট ‘নগরবন’ বা ‘পকেট ফরেস্ট’ শহরের প্রকৃত ফুসফুস হিসেবে কাজ করতে পারে।
একটি প্রাকৃতিক বন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে বা শতবর্ষী রূপ নিতে সাধারণত কয়েক দশক বা তারও বেশি সময় পার করে দেয়। অন্যদিকে মিয়াওয়াকি পদ্ধতির মূল জাদুকরী শক্তি নিহিত রয়েছে এর অবিশ্বাস্য বৃদ্ধির গতিতে। এ পদ্ধতিতে স্থানীয় প্রজাতির গাছের চারাগুলোকে অত্যন্ত ঘনভাবে রোপণ করা হয়। সাধারণত প্রতি বর্গমিটারে তিন থেকে চারটি চারাগাছ লাগানো হয়। এর ফলে চারাগুলোর মধ্যে সূর্যের আলো পাওয়ার প্রবল প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘উদ্ভিদ সমাজতত্ত্ব’। এ প্রতিযোগিতার কারণে গাছগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ দ্রুত লম্বা হতে থাকে। এর ফলে যে বন তৈরি হতে ১০০ বছর সময় লাগত, তা মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যেই একটি ঘন ও স্বনির্ভর বনে পরিণত হয়। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানেই আমরা একটি চিরহরিৎ বনের পূর্ণ সুফল পেতে শুরু করি, যা আমাদের দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
মিয়াওয়াকি বনের একটি অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস। এখানে প্রকৃতির একদম আদি রূপকে অনুকরণ করা হয়। একটি বনে যেমন বিভিন্ন উচ্চতার গাছ থাকে, এখানেও তেমনি ছোটবৃক্ষ, মাঝারি বৃক্ষ, দীর্ঘকায় বৃক্ষ এবং গুল্মলতার এক সুপরিকল্পিত সমন্বয় ঘটানো হয়। এই বহুমাত্রিক স্তরবিন্যাস মাটিকে সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করে এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। আর ঝরা পাতাগুলো পচে গিয়ে দ্রুত জৈব সার তৈরি করে, যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আমাদের দেশে গত কয়েক দশকে ইউক্যালিপটাস, মেহগনি বা আকাশমণির মতো বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানোর এক ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা গেছে। অথচ যারা যত্ন করে এ গাছগুলো লাগান, তাদের অনেকেই জানেন না যে এগুলো ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত শুষে নেয় এবং স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের তেমন কোনো উপকারে আসে না। অন্যদিকে মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে শুধু দেশি প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। ফলে এ পদ্ধতির বন স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। বিলুপ্তপ্রায় কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি এবং ছোট ছোট দেশি পাখি খুব দ্রুতই এই বনে নিজেদের বাসস্থানের ঠিকানা খুঁজে পায়।
আসলে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি কেবল ঘন বনায়নের একটি কৌশল নয়; বরং এটি একটি ক্ষুদ্র ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘ইকোসিস্টেম’, যা নিঃশব্দে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
বাংলাদেশেও এ পদ্ধতির কার্যকারিতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা একটি মিয়াওয়াকি বন মাত্র ১৩ মাসের মধ্যেই এমন ঘন ও সবুজ রূপ নিয়েছে যে, দেখে সহজেই মনে হয় এটি যেন এক যুগের পুরোনো বন।
এ ধরনের বন আমাদের ঢাকা মেগাসিটির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। শহরের খালি জায়গাগুলোতে- বিশেষ করে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে ‘পকেট ফরেস্ট’ গড়ে তোলা সময়ের দাবি বলে আমরা মনে করি। জায়গাসংকটের অজুহাতে আর পিছিয়ে থাকলে চলবে না। শহরের পার্ক, স্কুল-কলেজের প্রাঙ্গণ, হাসপাতালের আশপাশ, এমনকি সরকারি পরিত্যক্ত জমিতেও এ পদ্ধতিতে সহজেই বনায়ন করা সম্ভব। এতে কেবল অক্সিজেন সরবরাহই বাড়বে না, বরং নগরের গড় তাপমাত্রা কমিয়ে পরিবেশে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে। পাশাপাশি ঘন গাছপালার সারি শহরের অসহনীয় শব্দদূষণ কমাতেও প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এ সাফল্যের উল্টো দিকটিও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বনায়ন করতে গেলে খরচ সাধারণ বনায়নের চেয়ে কিছুটা বেশি হয়। কারণ এখানে মাটির বিশেষ প্রস্তুতি এবং উন্নত জাতের চারা নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে। চারা লাগানোর পর প্রথম দুই থেকে তিন বছর নিবিড় পরিচর্যা, নিয়মিত পানি দেওয়া এবং আগাছা পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া স্থানীয় প্রজাতির গাছ নির্বাচনে ভুল হলে বনের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অভিজ্ঞ উদ্ভিদবিদদের পরামর্শ এবং মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এ পদ্ধতির অপরিহার্য অংশ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল মাটি খুঁড়ে গাছের চারা লাগানো নয়, এটি হচ্ছে একটি জীবন্ত সত্তাকে ধৈর্যসহকারে ধীরে ধীরে গড়ে তোলার মতো কাজ।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় ওপরের সারিতে রয়েছে। এর ফলে আমাদের নগরগুলো ধীরে ধীরে একেকটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান এ উত্তাপ থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করতে মিয়াওয়াকি পদ্ধতির বনায়নের এখন কার্যত কোনো বিকল্প নেই; বরং এটি সময়োপযোগী ও কার্যকর একটি সমাধান।
এ কারণে সরকারি উদ্যোগে রাজধানীসহ দেশের মফস্বল শহরগুলোর প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে ক্ষুদ্র মিয়াওয়াকি বন গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পাঞ্চলগুলোতে তাদের ‘প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতা’ (সিএসআর) কার্যক্রমের আওতায় এ ধরনের বনায়নকে উৎসাহিত এমনকি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কারখানাসংলগ্ন এলাকায় ঘন সবুজ বনভূমি গড়ে উঠলে তা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কার্বন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিশেষে বলা যায়, মিয়াওয়াকি পদ্ধতি আমাদের সবুজের পথে ফিরে যাওয়ার এক সহজ ও কার্যকর রাস্তা দেখিয়েছে। এখন একটু সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে আমরা আমাদের ধূলিময় শহরগুলোতেও ফিরিয়ে আনতে পারি স্নিগ্ধতা। ফিরে পেতে পারি পাখিদের কলতান আর ভোরের সতেজ হাওয়া। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়ার এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় এবং দূরদর্শী বিনিয়োগ। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে এই মিতালিই হবে আগামীর বাংলাদেশের টিকে থাকার মূল মন্ত্র।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট

