বর্ষীয়ান রাজনীতিক, জাতীয় সংসদের সাবেক উপনেতা, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও শেরপুর-২ আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য মতিয়া চৌধুরী মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বুধবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ দলটির নেতারা।
নির্লোভ, নির্মোহ ও সাদামাটা জীবনাচরণে অভ্যস্ত এক ব্যতিক্রমী রাজনীতিক ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। নিজেকে প্রকাশ করতেন সাধারণের মতোই। আওয়ামী লীগ সরকার ও দলে শীর্ষ নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই রাজনীতিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য ২০২১ সালে বাংলা একাডেমি মতিয়া চৌধুরীকে সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
মতিয়া চৌধুরীর জানাজা বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৯টায় রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার বাসভবন এবং বাদ জোহর গুলশান আজাদ মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন মতিয়া চৌধুরীর ভাই মাসুদুল ইসলাম চৌধুরী।
মাসুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নতুন জায়গা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে। জায়গা পেলে সেখানে দাফন করা হবে, না পেলে তার স্বামী বজলুর রহমানের কবরে দাফন হবে। এলাকার মানুষের দাবি থাকলেও মতিয়া চৌধুরীকে শেষ পর্যন্ত তার নিজের নির্বাচনি এলাকা শেরপুরে নেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মতিয়া চৌধুরী দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মাঝে তাকে বাসায় আনা হয়েছিল। কিন্তু শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ায় আবার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই গতকাল দুপুরে তিনি মারা যান।
মতিয়া চৌধুরী ১৯৪২ সালের ৩০ জুন পিরোজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মহিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিণী। ১৯৬৪ সালের ১৮ জুন খ্যাতিমান সাংবাদিক বজলুর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। মৃত্যুর আগে বজলুর রহমান দৈনিক সংবাদের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
ইডেন কলেজে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন মতিয়া চৌধুরী। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয় তাতে মতিয়া চৌধুরী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সে সময় তিনি ঢাকার ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। চারবার কারাবরণ করেন আইয়ুব খানের আমলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মতিয়া চৌধুরী। পরের বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মতাদর্শিক কারণে বিভক্ত হলে মতিয়া চৌধুরী এক অংশের সভাপতি নির্বাচিত হন। অন্য অংশের সভাপতি হয়েছিলেন রাশেদ খান মেনন। সে কারণে ‘ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ’ ও ‘ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ’ নামে পরিচিতি পেয়েছিল। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে পারেননি তিনি।
১৯৬৭ সালে মতিয়া চৌধুরী অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেন। ছাত্রজীবন থেকেই বক্তৃতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন করলে সেখানে যোগ দেন মতিয়া চৌধুরী। তিনি বাকশালের ১১৭ নম্বর সদস্য ছিলেন। এরপর ১৯৭৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন মতিয়া চৌধুরী।
১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দলটির কৃষি সম্পাদকের দায়িত্ব পান। যে দায়িত্বে তিনি ২০০২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ২০০২ সালের সম্মেলনে মতিয়া চৌধুরী দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একই পদে ছিলেন তিনি।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেরপুর-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হন মতিয়া চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে দলটি ক্ষমতায় এলে তাকে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৯ সালেও একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
একাদশ জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী মারা যাওয়ার পর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংসদের উপনেতা হন মতিয়া চৌধুরী। দ্বাদশ জাতীয় সংসদেও একই দায়িত্ব পান তিনি।