প্রায় দেড় দশক পর মঙ্গলবার (৩ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে খুলনা মহানগরের দৌলতপুর থানা বিএনপির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এর একদিন পর খানজাহান আলী থানা বিএনপির সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠেয় সম্মেলনকে ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মী, সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। সড়কের পাশে শোভা পাচ্ছে শীর্ষ তিনটি পদে নেতৃত্বপ্রত্যাশী ও দলীয় শীর্ষ নেতাদের ছবিসংবলিত রঙ-বেরঙের প্যানা, ব্যানার, ফেস্টুন আর পোস্টার।
তবে মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু সমর্থিত দলের একটি বিরাট অংশ এ সম্মেলন থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের শেষদিনেও এই গ্রুপের কেউ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদের জন্য ফরম সংগ্রহ করেননি। তারা ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে গঠিত’ সব কমিটি বাতিল করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। জানা গেছে, খুলনা মহানগর বিএনপিতে নেতৃত্বের বিরোধ দীর্ঘদিনের। মূলত কমিটি গঠন নিয়ে এমন সংকট তৈরি হয়। ত্যাগী নেতাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে একপক্ষ কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়ে এলেও অন্যপক্ষ এই কমিটির কার্যক্রমকে ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আনুষ্ঠানিক সম্মেলনে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিতে কাজ চলছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৫ নভেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত চিঠিতে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমানকে খুলনা বিভাগের মহানগর ও জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিতে ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌর, থানা কমিটি থেকে শুরু করে মহানগর ও জেলা কমিটি সম্মেলন ও কাউন্সিলের মাধ্যমে ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। তবে এর আগেই ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠনের কাজ শেষ করেছে এসএম শফিকুল আলম মনা ও শফিকুল আলম তুহিনের নেতৃত্বে মহানগর বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি। এখন চলছে সম্মেলনের মাধ্যমে থানা পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খানজাহান আলী থানার ফুলবাড়ী গেট ও শিরোমনির খুলনা-যশোর মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকা বিএনপির নেতৃত্বপ্রত্যাশীদের প্যানা, ব্যানার আর ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। সম্মেলনকে স্বাগত জানিয়ে খুলনা-যশোর মহাসড়কের ফুলবাড়ী গেটে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ। সেখানে শোভা পাচ্ছে দলের শীর্ষ নেতাদের ছবি। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের কর্মীরাও ব্যাপকভাবে উচ্ছ্বসিত।
এদিকে সম্মেলনকে শতভাগ সফল ও বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিতির লক্ষ্যে খানজাহান আলী থানা কমিটির আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমান, সদস্যসচিব আবু সাঈদ হাওলাদার আব্বাসসহ আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে খানজাহান আলী থানা বিএনপির আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমান বলেন, ‘সম্মেলন সফল করার শেষপর্যায়ে প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। সম্মেলনে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী উপস্থিতির টার্গেট নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
অন্যদিকে গত ২৭ নভেম্বর মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সভাপতিত্বে তার অনুসারীরা জরুরি সভা করেন। সেখান থেকে জানানো হয়, ২০২১ সালে তিন মাসের জন্য গঠিত মহানগর আহ্বায়ক কমিটি তিন বছরেও সম্মেলন করতে ব্যর্থ হয়েছে। গত দেড় মাসে তড়িঘড়ি করে ৩১টি ওয়ার্ড কমিটি গঠন, পছন্দমতো নিজেদের লোক দিয়ে কাউন্সিলর তৈরি ও আন্দোলন-সংগ্রামে জেলখাটা নেতা-কর্মী বাদ দিয়ে আজ্ঞাবহদের দিয়ে মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে।
তবে এর পরদিন অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল আলম মনা ও সদস্যসচিব শফিকুল আলম তুহিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে মহানগর বিএনপি নিয়ে ‘ষড়যন্ত্র থেকে’ বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। তারা বলেন, তৃণমূলে ত্যাগী-পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা দিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে ওয়ার্ড কমিটি গঠন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রত্যক্ষ ভোটে থানা বিএনপির আহ্বায়ক/সদস্যসচিবসহ শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচিত করা হয়েছে। এ সময় তিনি দাবি করেন, নেতা-কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে ওয়ার্ড ও থানা কমিটি গঠন খুলনা মহানগর বিএনপির জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
জানা গেছে, খুলনা মহানগর বিএনপিতে নেতৃত্বের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর মহানগরে বিএনপির দাপুটে সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে সরিয়ে সাবেক জেলা সভাপতি শফিকুল আলম মনাকে আহ্বায়ক ও শফিকুল আলম তুহিনকে সদস্যসচিব করে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়। এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে মঞ্জুর অনুসারীরা। সেই থেকে বিএনপির মঞ্জু ও মনা-তুহিনের নেতৃত্বে দুই পক্ষ মহানগরে আলাদা কর্মসূচি পালন করে আসছে।