বিএনপি সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের পক্ষে থাকলেও এটি বাতিলের বিপক্ষে। এই ইস্যুতে দলটি প্রকাশ্য বিরোধিতা না করলেও এমন মনোভাবের কথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত আছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, এসব কারণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন’ (ঘোষণাপত্র) পিছিয়েছে।
মঙ্গলবার (৩১ ডিসেম্বর) এই ঘোষণাপত্র দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা দেওয়া হয়নি। সবদিক সামাল দিতে এই ইস্যুতে ঘোষণাপত্র তৈরির দায়িত্ব সরকার নিয়েছে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, গত রবিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সাবেক দুই নেতা তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ও উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। ওই বৈঠকে বিএনপির স্পষ্ট অবস্থান ও মনোভাব তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপরই অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র তৈরি করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এর আগেও রাষ্ট্রপতির অপসারণ ইস্যুতে মির্জা ফখরুলের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও অন্যতম সমন্বয়ক জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক ও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম।
গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মো. শফিকুল আলম বলেছিলেন, এই ঘোষণাপত্র তৈরির সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।
গত সোমবার রাতে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামেও এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিলের বিপক্ষে মত দেন স্থায়ী কমিটির নেতারা। তাদের মতে, এই সংবিধানের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে সংবিধান বাতিলের কথা যারা বলছেন, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। সরকারের কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করেন বৈঠকে অংশ নেওয়া দু-একজন নেতা।
তাদের মতে, এর আগে রাষ্ট্রপতি অপসারণ ইস্যুতে এই চক্রটি দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরির চেষ্টা করেছিল। জনমনে সন্দেহ, এই চক্রটি আবারও সংবিধান বাতিলের নামে দেশে সংকট তৈরির পাঁয়তারা চালাচ্ছে। ফলে দেশে নতুন কোনো ক্রাইসিস তৈরি হোক- এটা বিএনপি চায় না। নতুন আরেকটি সমস্যা তৈরি হলে দেশ সংকটে পরতে পারে বলেও বৈঠকে নেতারা মত দেন।
সংবিধান বাতিলের দাবি বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছেলেরা তো অনেক অবেগপ্রবণ। সবকিছু মিলিয়ে তাদের তো একটা আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। আমি মনে করি, তারা তাদের আবেগ থেকেই বলেছে, তারুণ্য থেকে বলেছে। এটাকে (বাহাত্তরের সংবিধান বাতিলের দাবি) এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না। ভবিষ্যতে যদি কখনো সুযোগ আসে, সময় আসে, তখন জাতির চিন্তা করে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি।
বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র স্থগিতের অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে স্বস্তি প্রকাশ করেন স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতারা। বৈঠকে তারা বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। এতে দেশের সংবিধান নিয়ে বিতর্ক এড়ানো গেছে। তবে কেউ কেউ মত দেন, জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র ঘিরে চারদিকে যখন সমালোচনার ঝড় উঠে তখন সরকারই বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে দেখে এখন সরকারই বলছে, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র দেওয়া হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
বৈঠকে ’৭২-এর সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান বলে তা কবর দেওয়া হবে- কেটে ফেলা হবে- ছাত্র নেতাদের এমন বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তারা বলেন, ছাত্ররা ’৭২ সালের সংবিধানকে বাতিল করে নতুন সংবিধান লিখতে চান। তারা বাংলাদেশে নতুন ডেমোক্রেসি ও নতুনভাবে দেশ বিনির্মাণ করতে চান। তাহলে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এসে কি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করবেন? কারণ ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে এখন ২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, ‘দেশের প্রধান ইস্যু নির্বাচন, ভোটের অধিকার আর গণতন্ত্রের পথকে আরও বিলম্বিত করতে একটার পর একটা ইস্যু সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংবিধান হোক, আর যেটাই হোক, সিদ্ধান্ত হবে জনগণের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ও সংসদের মাধ্যমে। এর বাইরে কোনো গোষ্ঠী, দল বা কোনো গ্রুপের কিছু করার সুযোগ নেই।’
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানায়, গণ-অভ্যুত্থানের ‘প্রক্লেমেশন অব জুলাই রেভল্যুশন’ এবং ডিক্লারেশন নিয়ে নানা মতামত উঠে আসে বৈঠকে। স্থায়ী কমিটির দুই জন সদস্য বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের প্রক্লেমেশন এবং ডিক্লারেশন এক কথা নয়। গণ-অভ্যুত্থানের প্রক্লেমেশন আগেই দিতে হয়। রাজপথে নামার আগেই গণ-অভ্যুত্থানের প্রক্লেমেশন জাতির সামনে তুলে ধরতে হতো। তাহলে তাদের অবস্থান সম্পর্কে দেশবাসী পরিষ্কার ধারণা পেত। ৫ আগস্টের পর প্রক্লেমেশন কেন? গণ-অভ্যুত্থানের ৬ মাস পর ব্যাকডেটে প্রক্লেমেশন দেওয়া যায় না।’
বিতর্কের এই আলোচনায় অংশ নিয়ে আরও দুইজন সদস্য বলেন, আগামী দিনে ছাত্ররা দেশ চালাবেন, এতে কারও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে তো তাদের পড়াশোনা শেষ করতে হবে। আমরাও তো একসময় ছাত্র রাজনীতি করেছিলাম। তখন কিন্তু দেশ চালানোর কথা চিন্তা করিনি। এ ছাড়া বর্তমানের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজনের নামে বিভিন্ন চাঁদাবাজি দখলবাজি অপকর্মে জড়িত থাকার কথা শোনা যাচ্ছে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়। তবে একজন নেতা বলেন, তথ্য-প্রমাণ ছাড়া এগুলোর বিষয়ে কথা বলা কঠিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ঢাকায় শহিদ মিনারে ছাত্রদের সমাবেশ করা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। আলোচনায় অংশ নিয়ে কয়েকজন নেতা বলেন, সারা দেশ থেকে বাস ও মাইক্রোবাসে করে লোকজন এনে জমায়েত করা হয়েছে। তাদের খাবার, যাতায়াতসহ অন্য টাকার উৎস কি? তারা নাকি এক দেড় লাখ মানুষ জমায়েত করে সমাবেশ করবে। বিএনপি তো ১ ঘণ্টার নোটিশে এক থেকে দেড় লাখ মানুষ জমায়েত করতে পারে। তবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ও বিভাগীয় মহাসমাবেশগুলোতে তাদের তো বাসে বা মাইক্রোবাসে করে নেতা-কর্মীদের আনতে হয়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের বিষয়ে স্থায়ী কমিটির অন্তত তিনজন নেতা বলেন, রাজনীতি ও কাজ করা কঠিন- কিন্তু সমালোচনা করা সহজ। এটা তাদেরকে বুঝতে হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ছাত্রলীগ বা অন্য কেউ মুখোশ পরে রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখার কথা বলেন দু-একজন নেতা। যারা অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা সুযোগ বুঝে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়াও কেউ কেউ আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ক হয়েছেন। বিএনপির নেতা-কর্মীরা হার্ডলাইনে গেলে আগামী দিনে ছাত্রদের পাশ থেকে লোকজন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করবে বলেও মত দেন নেতারা।
গত সোমবার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ (ভার্চ্যুয়ালি) ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বেগম সেলিমা রহমান, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন প্রমুখ।