নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আগামী মাস থেকে মাঠে নামবে বিএনপি। গত সোমবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলটির একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে কোনো রাজনৈতিক দলের রাজপথে নামার এটিই প্রথম কর্মসূচি। প্রায় ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি সারা দেশে দুই দফার এই কর্মসূচি পালন করবে। দলটি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন দাবি করেছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে সে বিষয়ে এখনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। নির্বাচন নিয়ে এই অনিশ্চয়তার কারণে গত ২৩ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোটের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।
প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখতে বিএনপি এই কর্মসূচি পালন করবে। দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়াও পণ্যের দাম কমানোর দাবিতেও রমজানের আগে ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ করবে বিএনপি। শিগগিরই বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে করে কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ৬ মাস পূর্তির মাথায় এই প্রথম কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে নামতে যাচ্ছে বিএনপি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি চলমান রয়েছে। শীতবস্ত্র বিতরণ, আন্দোলনে আহতদের পুনর্বাসন এবং মহানগর থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ে রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব ইস্যুতে আমরা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছি। গত ১৬ বছর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু জনগণ গণতন্ত্র এখনো ফিরে পায়নি। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে পারলে এই সরকার কেন আগামী ৬ মাসের মধ্যে পারবে না? সরকারের ইচ্ছা থাকলে জুলাই-আগস্টের মধ্যে নির্বাচন দেওয়া সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার চাইলে কোনো আইন পরিবর্তন বা সংবিধানের ধারা-উপধারা পরিবর্তন করতে পারে না। তারা অধ্যাদেশ জারি করতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার এসে তা বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই আগামীতে জনগণের নির্বাচিত সংসদ যুগের চাহিদা অনুযায়ী আইনের ধারা-উপধারা পরিবর্তন বা সংশোধন করবে। অন্তর্বর্তী সরকার বা ছাত্ররা প্রোক্লেমেশনও (ঘোষণাপত্র) দিতে পারে না।’
গত কয়েক মাস ধরে ন্যূনতম সংস্কার শেষে একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়ে আসছে বিএনপি। দলটি মনে করে, চলতি বছরের জুলাই-আগস্টের মধ্যেও নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব এবং এ ব্যাপারে তাদের অবস্থানও ইতোমধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে যেকোনো সময় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। তবে বিএনপি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়কে নির্বাচনের জন্য ‘খুবই অতিরিক্ত সময়’ বলে মনে করছে।
সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কোনো কোনো সদস্য মতামত দেন, নির্বাচনের জন্য এত সময়ের প্রয়োজন নেই। ন্যূনতম সংস্কার শেষে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট সময়ই যথেষ্ট। অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনে নির্বাচন করতে পারলে এরা কেন না পারার কথা বলছে? তবে বিএনপি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের আশা করছে।
সূত্র আরও জানায়, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ছাত্ররা বিএনপির কাছে ওই ঘোষণাপত্রের যে খসড়া পাঠিয়েছে, সেটা নিয়ে বিএনপি নেতারা আলোচনা করেছেন। সেখানে কী ধরনের পরিমার্জন, পরিবর্ধন আনা যায়, সেগুলো নিয়ে দলের ভেতরে কাজ চলছে। এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন রয়েছে। তবে ছাত্রদের এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যানও করতে চায় না দলটি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই ঘোষণাপত্রের কোথায় পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া যায়, সেটা তারা করবে। খসড়া ঘোষণাপত্র নিয়ে ছাত্রদের পক্ষ থেকে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি বাতিলের ব্যাপারে যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি যুক্তিসংগত নয় বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা।
বৈঠকে অংশ নিয়ে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, মুক্তিযুদ্ধই হবে বাংলাদেশের ভিত্তি। এরপরে বাংলাদেশের আরও অনেক অর্জন রয়েছে। এগুলো রেখেই ঘোষণাপত্র তৈরি করতে হবে। ছাত্ররা এটাকে ব্যাকডেটেড প্রোক্লেমেশন আকারে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তবে বিএনপি মনে করে, এভাবে ঘোষণার কোনো সুযোগ নেই।
ছাত্রদের খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে। তবে এটা এভাবে দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করেন না বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। তাদের অভিমত, এটা অপ্রয়োজনীয়। এটাকে ডিক্লারেশন আকারে দিতে হবে। আর যখন এটা নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হবে, তখন এটা ঘোষিত হয়েছে বলে গণ্য হবে।
সূত্র জানায়, ছাত্রদের খসড়া ঘোষণাপত্র ইতোমধ্যে পুনর্বিন্যাস (সংশোধন) করেছে বিএনপি। আজ বুধবার জরুরি ভিত্তিতে আবার স্থায়ী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে এগুলো চূড়ান্ত হতে পারে। এরপর সংশোধন করা খসড়া নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে বিএনপি। পরবর্তী সময়ে এ ইস্যু নিয়ে সরকার আলোচনায় ডাকলে ‘শরিকদের সঙ্গে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা খসড়া’ সেখানে তুলে ধরবে বিএনপি।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠক রাত ৮টা ১০ মিনিটে শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ১০টার দিকে। এতে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (ভার্চুয়ালি), বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন (ভার্চুয়ালি)।