প্রায় ৭ বছর পর অনুষ্ঠিত বিএনপির বর্ধিত সভায় দ্রুত জাতীয় নির্বাচনসহ তৃণমূল নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে ১০টি প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্ততিতে এ তথ্য জানানো হয়।
যদিও সভায় গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় পর্বের শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তৃণমূলের কাছ থেকে মতামতের ভিত্তিতে ২০টিও বেশি সিদ্ধান্ত উত্থাপন করেছিলেন।
প্রস্তাবগুলো হল- মহান একুশে, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহিদ ও আহতদের প্রতি গভীর ও সমবেদনা জানানো এবং প্রকৃত শহিদদের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রদানসহ শহিদ-আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও সুচিকিৎসার দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বেগম খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন-২০৩০ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সব দল ও সংগঠনের ঐকমত্যর ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফার আলোকে যে সব সংস্কার প্রস্তাব নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন সম্ভব তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং যে সব সংস্কারের জন্য আইন কিংবা সংবিধান পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নির্বাচিত জাতীয় সংসদে অনুমোদনের লক্ষ্যে পেশ করার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে শিগগিরই নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, দ্রব্যমূল্য জনগণের ক্রয়সীমার মধ্যে রাখতে, আওয়ামী সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রস্তাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আস্থা এনে সম্মিলিতভাবে পতিত সরকারের সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের পাশাপাশি দেশের ঘোলাটে পরিবেশ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনামলে গুম-খুন-গায়েবি মামলাসহ সীমাহীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মুল অবৈধ সরকারপ্রধানসহ (শেখ হাসিনা) অন্যান্যরা কীভাবে নির্বিঘ্নে দেশ থেকে পালিয়ে গেলেন, তার একটি ব্যাখ্যা সরকারের কাছে দাবি করা হয়েছে এবং এই সমস্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরেও তাদের বিচার ও শাস্তিদানে বিলম্বে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়েছে প্রস্তাবে।
১০ দফায়ে আরও বলা হয়, বিদেশে বসে যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং অপপ্রচার চালাচ্ছে তাদের এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে এবং পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারসহ তাদের সহযোগী এক-এগারোর সরকারের করা সব মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়।
মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বিএনপিকে আরও ঐক্যবদ্ধ, শক্তিশালী, কার্যকর ও জনপ্রিয় করার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে এবং অবহেলিত জনগণকে তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক মর্যাদায় ফিরিয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে বিএনপি।
প্রস্তাবে বলা হয়, বিএনপিকে জনআকাঙ্খা পূরণের জন্য দলের এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের জনবান্ধব কর্মসূচি জনগণের মাঝে সক্রিয় করার এবং কথা ও কাজে জনগণের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি-অনাচারসহ গণবিরোধী সব কর্মকাণ্ড ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে বিরত থাকতে দলের সবাইকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া এবং জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়’ এই আদর্শকে ধারণ করে দলের সৎ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করে বিজয়ের পথে এগিয়ে চলার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্ধিত সভায় মিথ্যা অভিযোগে কারারুদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আপোষহীন থেকে দেশকে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ মুক্ত করে নিজে মুক্ত হয়েছেন এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কৌশল ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গণতন্ত্রকামী জনগণের প্রশংসা অর্জন করেছে। তাই তাদের দুজনকেই অভিনন্দন জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
এই সভায় উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্র মেরামতের বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নে আগামীদিনে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন ও সফল ধারার সূচনা করবে।
দলটি স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে বিএনপির নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলনের পথ ধরে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের জন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছে।
শফিকুল ইসলাম/সুমন/