ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে তার সহপাঠী-শিক্ষকসহ রাজনীতির সহযোদ্ধারা বিক্ষোভ করে আসছেন। বৃহস্পতিবারের (২২ মে) মধ্যে হত্যাকাণ্ডের চলমান তদন্তে আশানুরূপ অগ্রগতি না হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাম্যের বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া সাম্য হত্যাকাণ্ডের বিচার অতিদ্রুত না করা হলে দেশ অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা।
মঙ্গলবার (২০ মে) শাহবাগে অবরোধ কর্মসূচি থেকে এ হুঁশিয়ারি দেন নেতারা।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে মঙ্গলবার বেলা ৩টা থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও রাজধানী মহানগর উত্তর-দক্ষিণের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতা-কর্মীরা। বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রায় আড়াই ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন তারা। এতে শাহবাগের আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
অবরোধ কর্মসূচিতে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের নেতা-কর্মীদের গায়ে যদি আর একটি আঁচড় দেওয়া হয়, আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারা দেশে প্রতিবাদ গড়ে তুলব। আমরা দেখেছি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে কিছু গুপ্ত সংগঠন সাম্যকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত। খুনি শেখ হাসিনার মতো ফিতা মেপে সাম্য হত্যাকাণ্ড আলাদা করে রাখা হয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে বলতে চাই, অতিদ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে এবং একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যর্থ প্রশাসনে যারা ফিতা মেপে হত্যাকারীদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তাদেরও পদত্যাগ করতে হবে। আমি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রক্টর ও ভিসির পদত্যাগ দাবি করছি।’
হত্যাকাণ্ডে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়নি অভিযোগ তুলে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘সাম্য হত্যাকাণ্ডে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়নি যে এই তিনজন প্রকৃত খুনি কি না। কেন এত দেরিতে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের বলতে পারছে না, সাম্য হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত খুনি কারা। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলতে চাই, ঢাবি শিক্ষার্থী হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি নিশ্চিতই করতে না পারেন, এতে বোঝা যায়, আপনারা কোন ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।’
বিচার না হলে বাংলাদেশ অচলের হুঁশিয়ারি দিয়ে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ‘আগামীতে যদি কোনো অশান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে হয়, এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী থাকবে। আমরা ঢাকা শহর অচল করে দেব, বাংলাদেশকে অচল করে দেব, যদি সাম্য হত্যাকাণ্ডের বিচার না হয়।’
ছাত্রদল সভাপতির বক্তব্যের পর পরই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শাহবাগ-চারুকলা-টিএসসি হয়ে শহিদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
প্রকৃত খুনি এখনো অন্তরালে: সাম্যের বাবা
প্রকৃত খুনি এখনো অন্তরালে রয়েছে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাম্যের বাবা ফখরুল আলম। একই সঙ্গে তিনি অবিলম্বে হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করে ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার ছাত্রদলের অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন সাম্যের বাবা। কর্মসূচির একপর্যায়ে খবরের কাগজসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘প্রথম দিন ওই তিনজনকে ধরা হয়েছে, ওই তিনজনই রয়েছে। ভিসি-প্রক্টর স্যার আমাকে ফোন দিয়েছেন, তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমিও বলেছি, সুষ্ঠু বিচার হোক। এখন যাদের ধরছে, আমার মনে হয় এরা প্রকৃত খুনি নয়। প্রকৃত খুনি এখনো অন্তরালে রয়ে গেছে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চের হুঁশিয়ারি
বৃহস্পতিবারের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রমের অধিকতর অগ্রগতি দেখতে না পেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ হুঁশিয়ারি দেন তারা।
এ সময় ইনস্টিটিউটটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘আমাদের ছাত্ররা সাম্য হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে যে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন, আমরা সবাই তাতে সমর্থন প্রকাশ করছি। আমরা চাই, অনতিবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাকি আসামিদের খুঁজে বের করে যেন বিচার নিশ্চিত করা হয়।’
রাজনৈতিক দলাদলির ঊর্ধ্বে গিয়ে সাম্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে এক থাকার আহ্বান জানান সাম্যের বন্ধু এস এম নাহিয়ান ইসলাম। এ সময় হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ ৮ দফা দাবি উত্থাপন করেন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মশিউর আলম শুভ।
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্যকে ছুরিকাঘাত করে একদল দুর্বৃত্ত। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় তামিম হাওলাদার (৩০), সম্রাট মল্লিক (২৮) ও পলাশ সরদার (৩০) নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরিফ জাওয়াদ/মাহফুজ