কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটগল্পের সংজ্ঞা নির্ধারণ প্রশ্নে বলেছিলেন, ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ।’ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সমঝোতার কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত আটকে আছে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে। বিএনপি বলছে, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হতেই হবে। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের বক্তব্য আগের অবস্থানেই আছে। জাপানের টোকিওতে ‘ফিউচার অব এশিয়া’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘নির্বাচন ডিসেম্বর অথবা সর্বোচ্চ জুনে অনুষ্ঠিত হবে।’ তবে একটু বাড়তি যোগ করে তার নতুন বক্তব্য সামনে এসেছে। তাহলো, শুধু একটি দলই ডিসেম্বরে নির্বাচন চায়। এই বক্তব্য তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে গতকাল জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘একজন ব্যক্তিই দেশে নির্বাচন দিতে চান না।’ দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের মধ্যে আপাতত সমঝোতার কোনো পথ দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সমঝোতা না হলে দেশে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই সবার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া জরুরি। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব সংস্কারে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হবে, দ্রুত সেসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্রুত জুলাই সনদ প্রস্তুত করতে হবে। এরপর নির্বাচন কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে।’
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে সরকারের সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ টালমাটালের দিকে ধাবিত হবে। সমঝোতা না হলে বাংলাদেশ একটা অন্ধকার যুগে প্রবেশ করবে। তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। এর দায়দায়িত্ব বিএনপিকে বহন করতে হবে। ফলে বিএনপির জন্য কিছুদিন ধৈর্য ধারণ করা হবে বাঞ্ছনীয়।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার পতনের দুই সপ্তাহ পর থেকেই বিএনপি নির্বাচনের দাবি তুলে আসছে। কিন্তু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে গেলেও সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন কমিশন সংস্কার জরুরি। দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিনের জন্য ড. ইউনূসকে শান্তিতে কাজ করতে দেয়নি সাধারণ জনগণ। প্রতিদিন বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে। ড. ইউনূস ব্যর্থ হলে, ব্যর্থ হবে বাংলাদেশ। ড. ইউনূস যদি নির্বাচন না দিয়ে চলে যান, তখন কী হবে? তখন দেশ চরম অনিশ্চয়তা ও চরম অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে। সংকট আরও ঘনীভূত হবে। পরিস্থিতি ভীষণ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।’
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ইশরাক হোসেনের শপথকে কেন্দ্র করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে শাহবাগে অবস্থান-সমাবেশ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের একধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়। কিন্তু বিএনপির হাইকমান্ড বর্তমানে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সূত্রমতে, বিএনপির হাইকমান্ডের পরামর্শে প্রায় দেড় সপ্তাহ পর রাস্তায় মিটিং-মিছিল কর্মসূচি থেকে সরে এসেছেন ইশরাক হোসেন। বিএনপির আশা ছিল, সরকার ইশরাকের শপথ পড়ানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নেবে। এ ছাড়া দুই ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি।
সূত্র জানায়, বিএনপির হাইকমান্ড সরকার-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন হার্ডলাইন কর্মসূচি থেকে সরে যায়। এরপর সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের আলোচনায় টানাপোড়েন কিছুটা দূর হয়েছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। প্রথমত, প্রধান উপদেষ্টা জাপানে গিয়ে ভাষণে বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। দ্বিতীয়ত, ইশরাকের শপথ গ্রহণ এখনো ঝুলে আছে। তৃতীয়ত, দুই ছাত্র উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগের বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে বিএনপি আবারও আস্তে আস্তে কঠোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। জনমনে স্পষ্ট হয়েছে- ইশরাক আবার তার শপথের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এ ছাড়া গত বুধ ও বৃহস্পতিবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছেন। বিশেষ করে গত ২৮ মে বুধবার তারুণ্যের সমাবেশে তারেক রহমান বলেছেন, আমি আবারও বলছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন হতে হবে। এদিকে জাপানে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। প্রধান উপদেষ্টার এমন অনড় বক্তব্যের পরই দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়নের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে বিষয়টি আরও জটিল পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হতে পারে।
নির্ভরযোগ্য আরেকটি সূত্র জানায়, ঈদের আগে অথবা শিগগিরই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টার। ওই ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের দিনক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেন। এ ছাড়া ওই ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা কী বলেন, তার ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অনেক কিছু। বিএনপির পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোসহ সংশ্লিষ্ট সবাই প্রধান উপদেষ্টার ওই ভাষণের দিকে তাকিয়ে আছেন।
জানা গেছে, টানাপোড়েন দূর করার উদ্যোগের সময় বিএনপি আশা করেছিল, প্রধান উপদেষ্টা ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ না বললেও জুলাই সনদের কবে ঘোষণা হবে, সংস্কার কবে নাগাদ শেষ হবে, বিচারপ্রক্রিয়া কবে শেষ হবে- সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মাস উল্লেখ করে অন্তত নির্বাচনের একটা ন্যূনতম রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো আশাও দেখছে না বিএনপি। ফলে কঠোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছে বিএনপি। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইন্টেরিম রিমেম্বার, ইলেকশন ইন ডিসেম্বর’ ক্যাম্পেইন করছে বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা প্রথমে বললেন ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। এরপর তার প্রেস সচিব বললেন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। আমরা কার কথা বিশ্বাস করব। কোনো দিনক্ষণ বলেননি, ভরসা করা কঠিন। আবার গত কয়েক দিন পদত্যাগ নাটক করলেন।’ তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বরে নির্বাচন দিতে হবে, এটা তো কোনো অন্যায় দাবি নয়। গত ১৭ বছর এই নির্বাচনের জন্য আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। দলের বহু নেতা-কর্মী গুম-খুন, আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। তাদের (সরকার) গত ১৭ বছরে অবদান কী?’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার দেওয়া সময়সীমা ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে- আমাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণার দাবি জানানো হয়েছে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন নয়, সংস্কার কার্যক্রমের টাইম নির্ধারণ করা জরুরি। নির্বাচন নিয়ে সব দল আলোচনা করছে, সেই তুলনায় সংস্কারের ব্যাপারে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। এতে সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল আগের কার্যক্রমের পরিবর্তন ঘটানো। রাজনৈতিক দলগুলোর ম্যান্ডেট আর অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট সম্পূর্ণ আলাদা। সংস্কার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে গুণগত পরিবর্তনের জন্য সংস্কার করা খুবই জরুরি। কিন্তু সংস্কারের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো পক্ষপাতিত্ব করছে। এর ফলে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ কাঠামো থেকেও আগামী দিনে আরও বড় ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটতে পারে।’