ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার যে আন্দোলন ঈদের কারণে বিরতি দেওয়া হয়েছিল, সেই আন্দোলন আবার শুরু হয়েছে। ঈদের ছুটির মধ্যে শপথ পড়ানোর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় আবারও রবিবার সকাল থেকে ঢাকাবাসীর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নগর ভবনে বিরতিহীনভাবে চলবে এই অবস্থান কর্মসূচি। আন্দোলন থেকে আর ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তবে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে জরুরি সেবা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রশাসকসহ অন্য কর্মকর্তাদের নগর ভবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে। জরুরি সেবা ছাড়া অন্য কর্মকর্তারা অফিস করতে পারবেন না। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাকে আবারও নগর ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে।
কর্মসূচি ঘোষণার পর দুপুরে ইশরাক হোসেন নগর ভবনে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে সাংবাদিকদের জানান, জোনাল অফিসে অস্থায়ী জরুরি সেবা বুথ অথবা প্রতি ওয়ার্ডের সচিবের মাধ্যমে আবেদন সংগ্রহ করে প্রসেসিং করে দেওয়া হতে পারে। মশকনিধন, বর্জ্য পরিষ্কার, ড্রেনেজ, লাইট-ইলেকট্রিসিটি ইত্যাদি সেবা শুরু থেকে চালু আছে। বন্ধ করা হয়নি। মশক নিয়ে যা যা করা হয়, সব করা হচ্ছে। লাইভ মনিটরিংসহ ওয়ার্ডভিত্তিক ডেঙ্গু সংক্রমণ মনিটরিং সেল স্থাপন করা হবে। এর বাইরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে কিছু পরামর্শ এসেছে, তার কিছু কিছু গ্রহণ করা হতে পারে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগ ও কনজারভেন্সি বিভাগের সঙ্গে আগামীকাল এবং পরশু সভা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে গত ১৪ মে থেকে ঈদের ছুটির আগ পর্যন্ত ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা নগর ভবনে আন্দোলন করে আসছিলেন। ১৪ মে থেকে নগর ভবনের সব গেটে তালা লাগানো ছিল। ঈদের কারণে আন্দোলনে বিরতি দেওয়া হয়। ঈদের আগে আন্দোলনকালে নগর ভবনের কোনো কার্যক্রম চালু ছিল না। কর্মকর্তা-কর্মাচারীরা এক প্রকার অঘোষিত ছুটি কাটিয়েছেন।
গতকাল রবিবার সকালে নগর ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উপস্থিত আন্দোলকারীরা ‘দাবি মোদের একটাই, মেয়র ছাড়া অফিস নাই’ স্লোগান দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরে সেখান উপস্থিত হন ইশরাক হোসেন। তিনি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আদালতের রায় পুরোপুরি কার্যকর করার জন্য যেভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের যে আন্দোলন, সেটি অবশ্যই চলমান থাকবে। এখান থেকে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, বিভিন্নভাবে আন্দোলন করেছি, বোঝানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু কেন যেন বোঝানো যাচ্ছে না। এই লড়াইয়ে আমরা হারার জন্য আসিনি। জেতার জন্য এসেছি। কারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি।’ এ সময় তিনি বিষয়টি সরাসরি প্রধান উপদেষ্টাকে তত্ত্বাবধান করার আহ্বান জানান।
বিরতিহীনভাবে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না জনগণের ভোগান্তি হোক। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দৈনন্দিন যে সেবাগুলো রয়েছে সেই সেবাগুলো আমাদের তত্ত্বাবধানে চালু রাখা হবে। এর বাইরে অন্য বিভাগ বা অন্য উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যারা আছেন, তারা অফিস করতে পারবেন না। প্রধান ফটকের তালা, এটা প্রতীকী। আমরা এটা খুলতে পারছি না। কিন্তু জনগণের যে দৈনন্দিন সেবাগুলো রয়েছে- জন্মনিবন্ধনসহ যেসব জরুরি বিষয় রয়েছে, সেগুলো আমাদের তত্ত্বাবধানে চালু করা হবে।’
ইশরাক হোসেন বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতে রিট নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে সব আইনি বাধা সেদিনই অতিক্রম করা হয়েছে। এই সরকারের ওপর সাংবিধানিক দায়িত্ব এসে পড়েছে আমার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে বাংলাদেশের আইন, সংবিধান, নির্বাচন কমিশনসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান দেখানো।’
স্থানীয় সরকার যে কাজটি করছে, ভবিষ্যতে তারাই আইনি জটিলতায় পড়বে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা যে শপথ ভঙ্গ করেছেন, যে শপথ নিয়ে উপদেষ্টা হয়ে গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেই সংবিধানকে তিনি লঙ্ঘন করেছেন। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগকে তিনি অবমাননা করে চলেছেন।’
প্রধান উপদেষ্টাকে ভুল বোঝানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা তাকে ভুল বুঝিয়েছেন। আদালতের রায় কার্যকর করা হলে নাকি হাসিনা আমলের সব নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়ে যাবে। অথচ ঠিক তার উল্টোটা হচ্ছে। আমার রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, হাসিনার আমলে যে নির্বাচনটি হয়েছিলে তার ফলাফল চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এখন আমার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। রায় কার্যকর করাকে ব্যাহত করা হচ্ছে। তারা অবৈধ তাপসকে বৈধতা দিচ্ছে।’
আইন উপদেষ্টার একটি টক শোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আইন উপদেষ্টা যে যুক্তিগুলো দিয়েছেন তা থেকে আসলে বোঝা যায়, সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল যে ইশরাককে বসতে দেওয়া যাবে না।’ এখন অজুহাত খুঁজে বের করার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তারা একেক সময় একেক কথা বলছে উল্লেখ করে ইশারক হোসেন বলেন, ‘আমাকে বসালে নাকি অতীতের সব নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হবে। কখনো বলছে ত্রুটিযুক্ত রায় দেওয়া হয়েছে। কখনো বলছে আমাকে যদি মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে দেওয়া হয়, তাহলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না কি ৬ হাজার তালিকা করে রেখেছে; সেসব তাদের দিতে হবে। এই ধরনের কথার মধ্য দিয়ে কিন্তু বোঝা যায়, আসল কারণটি তারা বলছে না। আসল কারণটি হলো রাজনৈতিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত বলে দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন শপথের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি এনসিপির একটি বিপথগামী ক্ষুদ্র অংশ নির্বাচন কমিশনের সামনে মব তৈরি করে সেখানে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করল। পরে দেখলাম নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে রাজি হলো না। জনগণের মাঝে তাহলে কি বার্তা পৌঁছাচ্ছে? যদি তাদের পছন্দনীয় কিছু না হয় তাহলে সেখানে গিয়ে তারা মব তৈরি করবে এবং পরে তাদের পছন্দ মতো সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তারা নির্বাচন কমিশনকেও বাইরে থেকে প্রভাবিত করছে, আদালত-সংবিধান মানতে চাচ্ছে না। যখন প্রয়োজন তখন বলছে তারা সংবিধান মানে না, অতীতের কিছু মানে না। আবার যখন প্রয়োজন মনে করছে তখন এই সংবিধানেরই অজুহাত দিচ্ছে।’