জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জি এম কাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে (জাপা) নতুন করে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দলের চেয়ারম্যানের সর্বময় ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি দলের আয়-ব্যয় নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া, ইচ্ছামতো দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে কাউকে ঠাঁই দেওয়া বন্ধ করা এবং বিভিন্ন সময়ে দল ছেড়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেতাকে ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠায় সম্প্রতি এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, দলের দু-একজন কো-চেয়ারম্যান ও বর্তমান মহাসচিব এসব দাবি উত্থাপন করেছেন।
তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে চেয়ারম্যান জি এম কাদের নিজেই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি কো-চেয়ারম্যানদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। পাশাপাশি দল থেকে বহিষ্কৃত বেশ কয়েকজন নেতাকে আবার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে কিছুটা নমনীয় হলেও আরও কিছুদিন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে সর্বশেষ গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাপা চেয়ারম্যানের উদ্যোগের কারণে দলে ভাঙনের মতো যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। দলটির অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন, জি এম কাদেরকে বাদ দিয়ে জাতীয় পার্টির পরিচালনা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কাদের ছাড়া দলে বর্তমানে এমন কোনো নেতাও নেই, যার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি চলতে পারে। পাশাপাশি দলে এমন আলোচনাও আছে, নিজেদের রক্ষা করার জন্য জাপার কিছু নেতা সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে জাতীয় পার্টিকে দুর্বল করতে চাইছে। তবে দল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জবাব দিতে জি এম কাদের শিগগির সংবাদ সম্মেলন করবেন।
যা নিয়ে দ্বন্দ্ব
জাপার গঠনতন্ত্রে দলের চেয়ারম্যানকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যান যেকোনো পদে যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ, অপসারণ ও স্থলাভিষিক্ত করতে পারেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই ধারার অপপ্রয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে দলের সব পর্যায়ের নেতাদের। দলটির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মতে, এ ধারাটি একনায়কতান্ত্রিক ও অগণতান্ত্রিক। এ ধারায় তো পার্টি চলতে পারে না। যখন-তখন চেয়ারম্যান যে কাউকে বের করে দিতে পারেন। তাই আমরা পার্টির সংস্কার চাই।
এদিকে চেয়ারম্যান জি এম কাদের নিজেও এই ধারাটির বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের পরামর্শ শুনছেন। জাপার অতিরিক্ত মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে বারবার ভাঙন এসেছে, অনেকে দলকে ভেঙে ফেলতে নানা ষড়যন্ত্র করেছেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে দলের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতার বিধান রাখা হয়েছে। জি এম কাদের এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এমনটি আমরা মনে করি না। যেকোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি পার্টি ফোরামে আলোচনা করেন। প্রেসিডিয়াম সদস্যদের পরামর্শ ছাড়া তিনি কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেন না।’
চলতি জুন মাসে জাতীয় পার্টির যে দশম জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল, তা নিয়েও সংকট দেখা দিয়েছে জাপায়। আগামী ২৮ জুন ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ অধিবেশন আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু পরে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির কারণে হল বরাদ্দ বাতিল করা হয়। কো-চেয়ারম্যানরা চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের বদলে কাকরাইলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এই কাউন্সিল আয়োজনের দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, জি এম কাদের সেই দাবিতে সায় দেননি। তাদের অভিযোগ, জাপা চেয়ারম্যান কো-চেয়ারম্যান বা প্রেসিডিয়াম সদস্য কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে এই সম্মেলন স্থগিত ঘোষণা করেছেন।
গত ১৭ জুন বিকেলে জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে সে কথা প্রকাশ্যে জানান। যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘আমরা মনে করি, ২৮ জুনের জাতীয় সম্মেলন দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং নির্বাচন কমিশনের গঠনতন্ত্র ও আরপিও অনুযায়ী বৈধতা নিশ্চিতের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্মেলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সম্মেলনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে গণতান্ত্রিকভাবে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা দলীয় গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
জানা গেছে, দলের নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জুলাইয়ের মধ্যে সুবিধাজনক স্থানে জাতীয় পার্টি কাউন্সিল অধিবেশনের আয়োজন করবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি। সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন। এ নিয়ে জাপার কিছু নেতার ক্ষোভ রয়েছে।
তারা মনে করছেন, চেয়ারম্যানের এত কড়া বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি।
জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও কো-চেয়ারম্যান এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার জানান, জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার কথা দল থেকে বলা হলেও তা করা যায়নি। জি এম কাদেরকে রয়ে-সয়ে মন্তব্য করতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জাপায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল যখন ফের দানা বাঁধছে, তখন জাপার কো-চেয়ারম্যানরা দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। গুরুতর সাংগঠনিক অপরাধে অভিযুক্ত নন; এমন গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতাকে ফিরিয়ে আনতে কো-চেয়ারম্যানরা একযোগে চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
জানা গেছে, ৮১ বছর বয়সী রওশন এরশাদ বার্ধক্যজনিত কারণে এখন এতটাই অসুস্থ যে তার রাজনীতিতে আসার সম্ভাবনা খুব কম। রওশন এরশাদ অনুসারী দলটির কো-চেয়ারম্যান সুনীল শুভ রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘ম্যাডাম খুবই অসুস্থ। তিনি রাজনীতিতে আসবেন এমন সম্ভাবনা নেই। তার ছেলে সাদ এরশাদও রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রওশনপন্থি দলের মহাসচিব কাজী মামুনুর রশিদের সঙ্গেও কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়া চাঙা করার চেষ্টা করছেন এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘অনেক তো হলো। এবার সবাই একসঙ্গে থাকতে চাই।’ আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘হ্যাঁ, তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। তারা সবাই জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত। আমরা যদি সবাইকে ফিরিয়ে এনে দলকে আবার ঐক্যবদ্ধ করতে পারি, তবে তা দলের জন্যই মঙ্গল হবে।’
রওশনপন্থি নেতা সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘আমরা এতদিন সবাই একসঙ্গে রাজনীতি করছি। আমাদের রাজনীতির আদর্শিক জায়গা তো এক। আমাদের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ আছে।’
তবে জাতীয় পার্টি থেকে জি এম কাদেরকে মাইনাস করা বা বের হয়ে গিয়ে নতুন দল গঠন করার প্রসঙ্গ উড়িয়ে দেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘সে রকম কিছু করার প্রশ্নই আসে না। আমরা আগে কাউন্সিল অধিবেশন করব। আমাদের লক্ষ্য একতা। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে আমাদের দলটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। দলে গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করতে চাই।’
জি এম কাদের খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি এখনই কোনো মতামত জানাব না। সংবাদ সম্মেলন করব শিগগির। সেখানেই আমি সব বলব।’