জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে পর্দার আড়ালে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সমঝোতার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের দু-একজন উপদেষ্টা, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দু-একজন সদস্য এবং মধ্যপন্থি কয়েকটি দলের নেতারা। তারা বিএনপি ও জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলছেন, পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদেও এমনই আলোচনা চলছে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি (ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে আসন বণ্টন) বিএনপিকে মেনে নিতে হবে। তাহলেই কেবল গণভোট প্রশ্নে অন্য দলগুলো ছাড় দিতে পারে।
নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে পারে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেনে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন দলটির দায়িত্বশীল নেতাদের। জানা গেছে, নির্বাচনের দিন গণভোট হলে বাকি বিষয়গুলো মেনে নিতে পারে বিএনপি।
তবে বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দলের নেতারা মনে করছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এর আগে গণভোট করার সক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সেই ধরনের কোনো তৎপরতা বা প্রস্তুতিও নেই। এ ছাড়া প্রশাসনকে নির্বাচন করার জন্যও তৈরি করা হয়নি।
এদিকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়ী বলে মনে করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের দিনই গণভোট হবে- দুটি ব্যালট থাকবে, একটি গণভোটের জন্য ও আরেকটি জাতীয় সংসদের জন্য। এ বিষয়ে কারও দ্বিমত থাকার কথা নয়।
এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশে সঠিক সময়ে জাতীয় নির্বাচন হোক- সেটিই আমাদের চাওয়া।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপির লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন চায় বিএনপি। এই চাওয়াকে অন্তর্বর্তী সরকার ও ঐকমত্য কমিশন দুর্বলতা হিসেবে ভাবছে। কিন্তু আমরা ধীরে ধীরে সরকারের ওপর চাপ বাড়াব।’
ওই নেতা আরও বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টাকে ইসলামপন্থি দলগুলো, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ঘিরে ধরেছে। এ ছাড়া কয়েকজন উপদেষ্টাও তাদের কথামতো চলছে। অথচ জামায়াতে ইসলামী মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে।’
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিরোধের সূত্র ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মতবিরোধ সহিংসতায় রূপ নিলে বেশি লাভবান হবে আওয়ামী লীগ। এমনকি তারা রাজনীতিতে ফিরেও আসতে পারে। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইবে। যদি রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব দলই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, এ কারণেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, অন্তর্বর্তী সরকার ও কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি তারা লন্ডনেও যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে বেশির ভাগ দলই উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতির পক্ষে মতামত দিয়েছিল। শুধু বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল। সাধারণত যেকোনো সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া মেজরিটি (সংখ্যাগরিষ্ঠ) দেখা হয়। সেই হিসাবে কমিশনের সংলাপে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি মেজরিটি পেয়েছে, এটি সব দলকেই মানতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দিতে হবে। কারণ জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট হলে সনদের গুরুত্ব কমে যাবে। সুতরাং ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশমতো জুলাই সনদ কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে সব দলকেই সনদ বাস্তবায়ন করতে ছাড় দেওয়া লাগলে তা দিতে হবে।’
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে সব দলের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। আমাদের পক্ষ থেকেও দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছি। জুলাই সনদে বিএনপি যদি ছাড় না দেয়, তাহলে সরকার তার সিদ্ধান্ত নেবে। দেখা যাক কী হয়।’
জুলাই জাতীয় সনদ বা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আগে থেকেই বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জমা দেওয়ার পর দলগুলোর মধ্যে পরস্পবিরোধী অবস্থান আরও তীব্রভাবে সামনে এসেছে। বিএনপি বলছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারির এখতিয়ার সংবিধান অনুযায়ী সরকারের নেই। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তুলে দিয়ে তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আর জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত বলেও মনে করে দলটি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি দল নভেম্বরের মধ্যে গণভোটসহ পাঁচ দফা দাবিতে রাজপথের কর্মসূচিতে রয়েছে। তাদের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগেই নভেম্বরে গণভোট দিতে হবে এবং সনদের ভিত্তিতেই জাতীয় নির্বাচন হবে। অন্যদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ দেখার পরই এনসিপি সনদে স্বাক্ষরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচনকে প্রধান্য দিয়ে সামনে এগোনোর চিন্তাভাবনা করেছে বিএনপি। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন যাতে সময়মতো হয়, সে জন্য কৌশলগতভাবে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে দলটি। এ জন্য বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দু-এক দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ড. ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। সেই সময়ে আপত্তির বিষয়গুলো মীমাংসার দাবি জানাবে বিএনপি। পাশাপাশি কমিশনের সুপারিশ নিয়ে সরকারের দিক থেকে যদি আলোচনার নতুন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়, বিএনপি তাতে অংশ নিয়ে তাদের যুক্তি ও শক্ত অবস্থান দেখাবে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল এক আলোচনা সভায় বলেছেন, সনদ স্বাক্ষরের পর গায়ের জোরে মূর্খের মতো সনদ সংশোধন করে প্রস্তাব থেকে নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি একটি প্রতারণা। এ ছাড়া সনদ সইয়ের দিন ৫ নম্বর দফা পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার ঐকমত্য কমিশন ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সনদে পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করার কথা বলেছে। কিন্তু সনদ স্বাক্ষরের পর সংশোধনের অধিকার অন্তর্বর্তী সরকারকে কেউ দেয়নি। সংস্কার করতে গিয়ে পুরো বিষয়টি এলোমেলো করে ফেলেছে সরকার। তিনি বলেন, যারা পিআর পদ্ধতি চায় তাদের চেহারায় শান্ত মনে হলেও ভেতরে তুষের আগুন পুষে রেখেছে।
ঐকমত্য কমিশন চাইলে আরও তিন মাস আগেই গণভোটের আলোচনা শেষ করতে পারত বলে মনে করেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে গণভোট করা সম্ভব নয়, জাতীয় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে জানুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে।’