ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা নিয়ে গঠিত ময়মনসিংহ-২ আসন। আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে বিভক্ত ও আর কোন্দলে জর্জরিত বিএনপি। ইতোমধ্যে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছে উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। তবে তার মনোনয়ন মেনে নিতে পারছে না একই দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তারা তাদের মতো ধানের শীষের প্রচার চালাচ্ছেন। বিপরীতে মোতাহার হোসেন তালুকদারের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে। আওয়ামী লীগের এই দুর্গে বিএনপির প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার হানা দিয়ে যেমন আসন পুনরুদ্ধার করতে চান, তেমনি আসনটি পেতে মরিয়া জামায়াতও। জামায়াতের প্রার্থী কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মাঠ-ঘাট দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।
এর আগে বিগত ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ভাষাসংগ্রামী এম শামছুল হক। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন তালুকদার, ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী স্বাধীনতাবিরোধী রজব আলী ফকির, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল বাশার আকন্দ, ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রয়াত রজব আলী ফকিরের ছেলে বিএনপির প্রার্থী শাহ শহিদ সারোয়ার, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হায়াতুর রহমান খান বেলাল এবং গত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হন প্রয়াত এম শামছুল হকের ছেলে শরীফ আহমেদ।
গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী অসংখ্য নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগের এই দুর্গে আওয়ামী লীগই নেই। নির্বাচনি মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। এই আসনে ভোটারদের কাছে এখনো অনেকটা অচেনাদের কাতারে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীরা। এমন অবস্থায় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্থানীয়রা।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া মোতাহার হোসেন তালুকদারের সরাসরি বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন একই আসনের সাবেক এমপি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল বাশার আকন্দ। তিনি প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জামায়াতের ময়মনসিংহ মহানগরের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. আনোয়ার হোসেন সুজন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থী এনসিপি তারাকান্দা উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল ইসলাম ও ময়মনসিংহ মহানগর এনসিপির সংগঠক প্রফেসর হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ হুমাইদী, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি গোলাম মাওলা ভূঁইয়া, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মতিউর রহমান এবং গণঅধিকার পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থী শাহ সুলতান মৃর্ধা ও ওয়াসকুরুনী।
স্থানীয়রা জানান, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী সবচেয়ে বেশি প্রচার চালাচ্ছেন। তারা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাচ্ছেন। তবে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা তাদের দলের কাছে পরিচিত থাকলেও ভোটারদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রার্থীরা ভোটের মাঠে কাজ শুরু করেছেন। এলাকায় এলাকায় গিয়ে ভোট চাচ্ছেন। তবে শেষ লড়াইটা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী মোহাম্মদ সুজাউদ্দৌলা সুজা বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন ও ভোটারদের ইচ্ছায় মনোনয়ন চেয়েছি। কিন্তু প্রাথমিক মনোনয়ন পাইনি। আমি কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করিনি। শেখ হাসিনার শাসনামলে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। তবুও কখনো রাজপথ থেকে সরে যাইনি। চূড়ান্ত মনোনয়ন আমার পক্ষে আসবে বলে আশা করছি।’
বিএনপি থেকে চূড়ান্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি আবুল বাশার আকন্দ বলেন, ‘বিগত শেখ হাসিনার শাসনামলে আমার বলয়ে রাজনীতি করা অসংখ্য নেতা-কর্মী মিথ্যা মামলার আসামি হয়েছে। তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছি। সাধারণ ভোটাররা আমাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাচ্ছে। নিশ্চয়ই শেষ মুহূর্তে হলেও চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়ে দল আমাকে মূল্যায়ন করবে।’
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার বলেন, ‘আমি তারাকান্দা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলাম। আমার মেয়াদে তারাকান্দার ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকসহ সামাজিকভাবেও এলাকায় আমার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করেই আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।’
এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের পছন্দের দল এনসিপি। প্রতীক হিসেবে শাপলা কলিকেও সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পছন্দ করছে। এর পক্ষে ভোট চেয়ে প্রচার চালাচ্ছি, ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি।’ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ হুমাইদী বলেন, ‘এক এক করে বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছি। নিয়মিত উঠান বৈঠক করছি। ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে আমার আলাদা ভোটব্যাংক রয়েছে।’
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মো. আনোয়ার হোসেন সুজন বলেন, ‘মসজিদ, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ হাট ও বাজারে নিয়মিত গণসংযোগ করছি। এলাকার উন্নয়নবঞ্চিত মানুষ পরিবর্তনের আশায় আমাকে বেছে নিতে সাড়া দিয়েছেন।’