আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ জেলার আসনগুলো নিজেদের দখলে নিতে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনহ বিভিন্ন দল মরিয়া হয়ে উঠেছে। ভোটারদের মন জয় করতে এসব দলের প্রার্থীরা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর দিকে ভোটাররা ঝুকবেন তা জানতে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী দিলেও অন্য দলগুলো এখনো তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। সবগুলো আসনে নির্বাচনি মাঠ স্বাভাবিক থাকলেও গোপালগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। মনোনয়নবঞ্চিত পাঁচজন এই আসন পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে নেতা-কর্মীদের নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
গোপালগঞ্জ সদর ও কাশিয়ানী উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-২ আসন। এ আসনে রয়েছে একটি পৌরসভা ও ২৮টি ইউনিয়ন। মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯৬ হাজার ৯৪০ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৯১ হাজার ৭১৩ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫১টি ও কক্ষের সংখ্যা ৭৬১টি।
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এ আসনের রাজনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
সেনাবাহিনীর গাড়ি পোড়ানো মামলা, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা দিদার হত্যা মামলা, ১৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনায় মোট ১৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ২০ হাজার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকাছাড়া হওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের তেমন কোনো রাজনৈতিক সক্রিয়তা নেই। তবে অভিজ্ঞ মহলের মতে, বাস্তবতা ও ভোটের হিসাব ভিন্ন। যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, তবে ভোটের ভাগাভাগিতে এ অঞ্চলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের কিছু ভোট বিভক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ভোটার উপস্থিতি নিয়ে সংশয় রয়েছে সবার মধ্যে।
এই আসনে বিগত ৯টি সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিম। তার নির্বাচনি এলাকায় একই সময়ে বিএনপি বা অন্যদলের যারা নির্বাচন করেছেন তারা সবাই জামানত হারিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে এই আসনে বিএনপি থেকে ড্যাব নেতা ডা. কে এম বাবর, জামায়াতে ইসলামী থেকে জেলার সাবেক আমির অ্যাডভোকেট আজমল হোসেন সরদার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে দলটির জেলা সভাপতি মাওলানা তসলিম হুসাইন সিকদারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি থেকে ডা. কে এম বাবর মনোনয়ন পাওয়ার পর ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নিয়মিত প্রচার চালাচ্ছেন। অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে এলাকাজুড়ে স্থাপন করেছেন ব্যানার-ফেস্টুন।
জেলার অন্য দুই আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবি না উঠলেও গোপালগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে মাঠে নেমেছেন মনোনয়নবঞ্চিত পাঁচ প্রার্থী। তারা হলেন জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি এফ-ই-শরফুজ্জামান জাহাঙ্গীর, এম এইচ খান মঞ্জু, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান তাজ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি সরদার নুরুজ্জামান। তারা গত ২৭ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে গোপালগঞ্জের গেটপাড়া সড়ক ভবনের সামনে থেকে মোটরসাইকেল ও যানবাহনের দীর্ঘ মিছিল নিয়ে নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন ইউনিয়নে শোডাউন করেন।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, এ আসনে বিএনপির গ্রুপিং থাকায় নেতা-কর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একাধিক পক্ষ নির্বাচনের সময় দলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দলীয়ভাবে প্রাথমিক প্রার্থী দিলেও চূড়ান্ত মনোনয়নের প্রত্যাশায় মনোনয়নবঞ্চিতরা নিজ এলাকায় নিজস্ব স্টাইলে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, বসে নেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট আজমল হোসেন সরদার। তিনি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জামায়াতকে একবার দেশ পরিচালনার সুযোগ দিতে জনগণের কাছে আহ্বান জানাচ্ছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী দলটির জেলা সভাপতি মাওলানা তসলিম হুসাইন সিকদারও গণসংযোগ চালু রেখেছেন। দিনরাত সংসদীয় আসনের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশ করছেন। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট টানার চেষ্টা করছেন।
বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী ডা. কে এম বাবর বলেন, ‘স্কুলজীবন থেকে আমি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নের তালিকায় ছিলাম। এরপর থেকে আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে কাজ করেছি। বিগত সরকারের সময়ে অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম সহ্য করে গোপালগঞ্জের মাঠে ছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষের বিপদে পাশে থাকবো। গোপালগঞ্জের স্বাস্থ্যবিভাগ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করব। সাধারণ মানুষ যেন হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা পায় তা নিশ্চিত করব। জরুরি যেসব অপারেশন আছে, তা যেন এই হাসপাতালেই হয় তার ব্যবস্থা করব।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আজমল হোসেন সরদার বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে আমরা গোপালগঞ্জে কোনো সভা-সমাবেশ করতে পারিনি। ৫ আগস্ট তাদের পতনের পর আমরা নির্বিঘ্নে এগুলো করতে পারছি। আমরা মানুষের কাছে গিয়ে ভোট চাচ্ছি। আশা করি, এখানকার ভোটাররা আমাকে জয়যুক্ত করবেন।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা তসলিম হুসাইন সিকদার বলেন, ‘বিগত নির্বাচনগুলোতে নতুন ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি। তারা জানে না ভোট কী জিনিস? ভোট কীভাবে দিতে হয়? বিগত দিনে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা শক্তি প্রয়োগ করে তাদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করেছে। দেশ, ইসলাম ও মানবতার স্বার্থে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের হাতকে শক্তিশালী করতে সবাই হাতপাখা প্রতীকে ভোট দেবেন এমনটাই আশা আমার।’