জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহ-৭ ত্রিশাল আসন। উপজেলার নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি, কাজির শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লার বাড়ি কিশোর নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত। দরিরামপুর একাডেমিতে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ত্রিশালকে নজরুল অনুরাগীদের কাছে পর্যটনের নগরীর বলা হয়ে থাকে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন হওয়ার পর রাজধানী ঢাকা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের এই উপজেলায় নীরব শিল্পায়ন ঘটেছে।
ত্রিশাল আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাতবার, আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে একবার, বিএনপি দুইবার ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটিকে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ঘাঁটি বলা যায়। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গ্রেপ্তার এড়াতে ঘরছাড়া। জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরাও বেকায়দায়। গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জাতীয় পার্টির নেতাদের ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। জাতীয় পার্টির কোনো নেতাকেই ভোটের মাঠে দেখা যাচ্ছে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের তৎপরতা রয়েছে। সময় যত গড়াচ্ছে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ ততই বাড়ছে। দিন-রাত এক করে প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের বিরোধ না থাকলেও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন দলের একাংশের নেতা-কর্মীরা। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে তারা বিক্ষোভও করেছেন। স্থানীয় বিএনপির সব নেতা-কর্মী যুথবদ্ধ না হলে ভোটের মাঠে এর প্রভাব পড়বে।
এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন। উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল আমিন খসরু মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
জামায়াত থেকে এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির আসাদুজ্জামান সোহেল, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থী ময়মনসিংহ জেলা এনসিপির সদস্য অ্যাডভোকেট এ টি এম মাহবুব উল আলম, ত্রিশাল উপজেলা এনসিপির প্রধান সমন্বয়ক আবুল কালাম ফরাজি, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কদ্দুস শিকদার, মুক্তিজোটের প্রার্থী বাদশাহ দেওয়ান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে হাফেজ মোজাম্মেল হক ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক দলের নেতারা যে যার মতো প্রচার চালাচ্ছেন। তবে এই আসনে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা। এই দুই দলের পক্ষে বেশি ভোট পড়বে। এই দুই দলের প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি প্রচার চালানোর পাশাপাশি শক্তি নিয়ে মাঠে আছেন। পরিচ্ছন্ন তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আসাদুজ্জামান সোহেলের রয়েছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। আগামী নির্বাচনে এটি ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিএনপির কোন্দল নির্বাচনের দিন পর্যন্ত চলমান থাকলে মনোনীত প্রার্থীর ধানের শীষে ভোটে বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এই উপজেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২ হাজার ৪৭৯ জন ও নারী ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৭ জন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল মনুসর আহমেদ। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রিন্সিপাল আব্দুর রশিদ। ১৯৭৯ সালে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী আবুল মনুসর আহমেদ। ১৯৮৬ সালে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস সালাম তরফদার। ১৯৮৮ সালে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুর রহমান মানিক। ১৯৯১ সালে এমপি নির্বাচিত হন বিএনপির প্রার্থী আব্দুল খালেক। ১৯৯৬ সালে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী। ২০০১ সালে এই আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মতিন সরকার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজা আলী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ হান্নান। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাফেজ রুহুল আমিন মাদানী ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম আনিছুজ্জামান।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বছর জুড়েই নেতা-কর্মী-সমর্থদের সঙ্গে নিবিড় ও আত্মিক যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেছি। তাদের অভাব অভিযোগ সমস্যার কথা শুনেছি। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি। নানা সংকটে এলাকাবাসীর পাশে থেকেছি। ফ্যাসিস্টবিরোধী প্রতিটি আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। উপজেলা বিএনপি নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে চেষ্টা করেছি। দলের দুঃসময়ে কখনো রাজপথ ছাড়িনি। আমাকে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের প্রতি কৃতজ্ঞ। বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো বলে আশা করছি।’
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আসাদুজ্জামান সোহেল খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাপক গণসংযোগ করছি। যেখানেই যাচ্ছি ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে। ভোটাররা আমাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্ভাব্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট এ টি এম মাহবুব উল আলম বলেন, ‘এনসিপি একেবারেই নতুন একটি দল। তবুও ভোটারদের যথেষ্ট সমর্থন পাচ্ছি। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমাদের দলটি আত্মপ্রকাশ করেছে। দল থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে প্রচার চালাচ্ছি। শাপলা কলি প্রতীকে মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। বহু আগে থেকেই মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছি, এখনো আছি। যাকে যেভাবে সম্ভব সাহায্য সহযোগিতা করেছি।’
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ বলেন, ‘নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে দিন-রাত ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছি। উঠান বৈঠকেও বিপুল পরিমাণ মানুষ জড়ো হচ্ছেন। তারা পরিবর্তনের পক্ষে। আমাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আমি বিজয়ী হতে পারলে এই উপজেলার ভোটারদের প্রত্যাশা পূরণ করব।’
খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল কদ্দুস শিকদার বলেন, ‘নিয়মিতভাবে হাটবাজারে চা দোকানে গণসংযোগ করছি। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ গণসংযোগকালে ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন। তাই জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’