বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলামুক্ত হয়ে আজ দেশে ফিরছেন। দীর্ঘ ১৭ বছরে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল ৮৪টি। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে তার বিরুদ্ধে মামলা হয় ১৩টি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় এসে আরও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ৭১টি মামলা করে। এর মধ্যে ৬ মামলায় যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে তারেক রহমানের সাজা হয়। আইনি প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে সব সাজা থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন তিনি। অন্যান্য মামলায় তার অনুপস্থিতিতেই অভিযোগ খারিজ বা বাতিলের মধ্য দিয়ে তিনি মামলামুক্ত হয়েছেন। সব অভিযোগ মুক্ত হয়ে ১৭ বছর ৩ মাস ১৪ দিন পর তিনি আজ দেশে ফিরছেন।
তারেক রহমানের মামলামুক্ত হওয়ার ব্যাপারে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি জয়নুল আবেদীন খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিনি (তারেক রহমান) যখন বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলেন, তখন তার অবস্থাটা কেমন ছিল, তা সবাই জানেন, সবাই দেখেছেন। তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। মেরুদণ্ডের হাড় পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় চিকিৎসার জন্য তার বিদেশে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না। তিনি আইনগতভাবেই বিদেশে গিয়েছিলেন, পালিয়ে যাননি। আইনগতভাবেই সব মামলা মোকাবিলা করেছেন। তিনি সব মামলায় খালাস পেয়েছেন।’
২০০৭ সালের ৭ মার্চ ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে আটক করা হয়েছিল তারেক রহমানকে। অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে চোখ বেঁধে তার ওপর ১৮ ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। রিমান্ডের নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নিয়ে তাকে নির্মম নির্যাতন করা হয়। ওই বছরের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার ওপর অমানবিক নিপীড়নের বর্ণনা করেছিলেন। তিনি ৫৫৪ দিন বা ১৮ মাস কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্যারোলে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য ১১ সেপ্টেম্বর সপরিবারে লন্ডনে যান। লন্ডনে যাওয়ার পরও তার ওপর থামেনি মামলার খড়্গ। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আয়কর ফাঁকি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১৩টি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৭১টি মামলা হয়। এর মধ্যে অন্তত ৬টি মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদ সাজা দেওয়া হয়েছিল। সেই ৬ মামলার মধ্যে রয়েছে–
অবৈধ সম্পদ অর্জন :
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা এই মামলায় ২০২৩ সালের ২ আগস্ট এক রায়ে তারেককে ৯ বছর ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান। রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করলে চলতি বছরের ২৮ মে বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের একক বেঞ্চ।
অর্থ পাচারের মামলা :
তারেক রহমান ও তার বন্ধু ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি করে দুদক। ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর এক রায়ে তারেক রহমানকে খালাস দিলেও গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। তারেক রহমানকে খালাস দেওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে দুদক। আপিলের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ২১ জুলাই খালাসের আদেশ বাতিল করে তারেক রহমানকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন আপিল বিভাগে আপিল করলে শুনানি শেষে চলতি বছরের ৬ মার্চ হাইকোর্টের পুরো রায় বাতিল করেন সর্বোচ্চ আদালত। ফলে এ মামলায় তারেক রহমানও খালাস পান।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা :
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই মামলাটি করে দুদক। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বিশেষ জজ আদালত-৫ মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর এবং তারেক রহমান, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্য সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়া। কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে কাজী সালিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদ পৃথক আপিল করেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়াতে দুদকও আপিল করে। তিনটি আপিলের শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর দুদকের আপিল মঞ্জুর করে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। অন্য আপিল দুটি খারিজ করা হয়। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর পৃথক আপিল করেন শরফুদ্দিন আহমেদ ও কাজী সালিমুল হক। শুনানি শেষে আপিল দুটি মঞ্জুর করে সাজার পুরো রায় বাতিল করেন সর্বোচ্চ আদালত। চূড়ান্ত রায় অনুসারে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ সবাই খালাস পান।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার দুই মামলা :
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় একটি হত্যা ও আরেকটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সিআইডি মামলা দুটির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয়, যেখানে তারেক রহমানকে আসামি করা হয়নি। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই মামলায় অধিকতর তদন্তে হত্যা, হত্যা চেষ্টা, ষড়যন্ত্র, ঘটনায় সহায়তাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তারেক রহমানসহ আরও নতুন ৩০ জনকে যুক্ত করে মোট ৫২ জনকে (অন্য মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় পরবর্তী সময়ে আসামি সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯) আসামি করা হয়। একই ঘটনায় ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্যাদি আইনে (সংশোধনী-২০০২) আরেক মামলায় তারেক রহমানসহ আসামি করা হয় ৩৮ জনকে। হত্যা মামলায় বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায় ঘোষণা করেন। এতে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই দিনে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায়ও রায় দেওয়া হয়। এ মামলায় তারেক রহমানকে ২০ বছর ও অন্য আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের দেড় মাসের মাথায় ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্সসহ মামলার নথি হাইকোর্টে আসে। দুটি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে গত বছরের ১ ডিসেম্বর সব আসামিকে খালাস দেন হাইকোর্ট। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের আপিল খারিজ করে খালাসের রায় বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত।
মানহানির মামলায় কারাদণ্ড :
২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত এক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজাকার ও পাকবন্ধু আখ্যা দিয়ে বক্তব্য দেওয়ায় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে নড়াইলের একটি আদালতে মামলা করেন স্থানীয় এক মুক্তিযোদ্ধা। এ মামলায় ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন নড়াইল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বাদী নিজেই ওই রায়ে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করলে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শুনানি শেষে পুরো মামলাটি খারিজ করেন নড়াইলের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক মেহদী হাসান।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশে অবস্থান করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কটূক্তি করাসহ রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে করা ৭১টি মামলা বাতিল অথবা খারিজ হয়েছে। এ ছাড়া ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে চাঁদাবাজির মামলাগুলোও দেশের বিভিন্ন আদালত গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের বিভিন্ন আদালত মামলাগুলো বাতিল করেছেন বলে জানা গেছে।