ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভাগ ও জেলা সফর শুরু করতে যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এই সফরে তিনি বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি জনগণ ও দলীয় প্রার্থীদের সামনে তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিএনপির ১০ সাংগঠনিক বিভাগ–ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর এবং কুমিল্লা বিভাগ সফর করার পরিকল্পনা রয়েছে। যার শুরু হচ্ছে রংপুর থেকে, আর শেষ হবে ঢাকায়। তারেক রহমান আগামী ১১ জানুয়ারি তিন দিনের সফরে নিজ জেলা বগুড়ায় যাবেন। ঢাকার বাইরে এটিই তার প্রথম সফর। এরপর রংপুর-দিনাজপুর-লালমনিরহাট হয়ে আবার বগুড়া আসবেন। বগুড়া হয়ে ঢাকায় ফিরবেন। এ সফরে নির্বাচনি প্রস্তুতি ও ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেবেন।
১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে নিজের একটি পরিকল্পনা থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকার ৩০০ ফুটে সংবর্ধনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান, ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি’।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এবারের সফরে দেশ পুনর্গঠনে তার পরিকল্পনার কিছু অংশ জনগণের সামনে হয়তো তুলে ধরবেন। তার বক্তব্যও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে জনগণ। ব্যাপক সাড়াও ফেলেছে। তাদের মতে, মা হারানোর শোক কাটিয়ে তারেক রহমানের দ্রুত সক্রিয় হওয়া বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং দলকে তৃণমূল পর্যায়ে সুসংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে তার এই এই ব্যস্ততা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আসন্ন নির্বাচনে দলকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন বলেও মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
জানা গেছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুশোক বুকে চেপে এখন পুরোপুরি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করছেন। তিনি প্রায় প্রতিদিনই গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অফিস করছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গেও ধারাবাহিক বৈঠক বা সাক্ষাৎ করছেন। পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়েও নির্বাচনি কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দলের যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন তাদের ঢাকায় তলব করে সরাসরি কথা বলবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার জন্য নির্দেশ দেবেন।
দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ২১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের প্রতীক বরাদ্দের পর সময় বিবেচনায় রেখে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিভাগীয় পথসভায় নামবেন। কারণ এবার নির্বাচনি বড় জনসভা বা সমাবেশ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ জন্য এবার জেলা বা বিভাগে পথসভার আয়োজন করার ভাবছে বিএনপি। বিভাগগুলোতে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জেলায় পথসভায় অংশ নেবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এসব পথসভায় তিনি নির্বাচনি লিফলেট বিতরণ করবেন। তবে এখনো শিডিউল ঠিক করা হয়নি।
বিএনপির আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে দেশব্যাপী নির্বাচনি সফর শুরু করবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এই সফরকালে তারেক রহমান বিভিন্ন জেলা ভ্রমণ করে জুলাই বিপ্লবের শহিদদের পরিবার ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। দীর্ঘ ১৯ বছর পর আগামী ১১ জানুয়ারি রবিবার তার নিজ জেলা বগুড়ায় যাবেন। ঢাকার বাইরে এটিই হবে তার প্রথম সফর। পরদিন ১২ জানুয়ারি সোমবার সকালে বগুড়ার শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত গণ-দোয়ায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তারেক রহমান রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাট যাবেন। রংপুরে যাওয়ার পথে মহাস্থানে হজরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী মাহী সাওয়ারের (রহ.) মাজার শরিফ জিয়ারত করবেন তিনি। আগামী ১৩ বা ১৪ জানুয়ারি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করতে যাবেন তারেক রহমান। এরপর তার চট্টগ্রাম সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১৮ জানুয়ারি কক্সবাজার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করতে যাবেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। আগামী ২০-২১ জানুয়ারি তারেক রহমানের সিলেট সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলায় আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার নামবে বিএনপি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রেস সচিব সালেহ শিবলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের জেলা সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে শিডিউল চূড়ান্ত করে দলের পক্ষ থেকে প্রেসের মাধ্যমে সবাইকে জানানো হবে।’
গতকাল সন্ধ্যায় বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও ‘আমরা বিএনপির পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন বলেন, ‘বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক হচ্ছে। দ্রুতই তা জানানো হবে।’
জানা গেছে, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর বিএনপির ৮ দফার লিফলেট নিয়ে ব্যাপক আকারে সারা দেশে প্রচারে নামবে বিএনপি। যেমন কৃষক কার্ড; ফ্যামিলি কার্ড; আনন্দময় শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশ, স্বাস্থ্য খাত, খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়ন, ক্রীড়া, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ এবং নদী-খাল ও পরিবেশ রক্ষায় বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসংলিত লিফলেট নিয়ে প্রচারে নামবে বিএনপি।
জেলা সফরের খবরে উজ্জীবিত তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা
সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জেলা সফরকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘সাজ সাজ রব’ লক্ষ করা যাচ্ছে। নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এই জেলা সফরের ফলে দলের সাংগঠনিক শক্তি এবং নির্বাচনি প্রচারে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লাল সবুজে মোড়ানো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বাসে করে কক্সবাজারে যেসব স্থানে যাবেন; সেসব স্থান পরিদর্শন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কী কী কর্মসূচি থাকবে—সেগুলো দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের জানানো হবে। এর পরই দলীয়ভাবে তারেক রহমানের কক্সবাজারের সফরসূচি ঘোষণা করা হবে।
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর দেশে আসা তারেক রহমান কক্সবাজারের মাটিতে পা রাখতে চলেছেন, এটা জেলার বিএনপি পরিবারের জন্য অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়।’
তারেক রহমান সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর বগুড়ায় গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ১৯ বছর ১৮ দিন পর তারেক রহমানের আগমন কেন্দ্র করে নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। তারেক রহমান বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেল জানান, ১২ জানুয়ারি সকালে গণ-দোয়া শেষে তারেক রহমান শহরের সাতমাথা, তিনমাথা ও মাটিডালি হয়ে মহাস্থানে হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহী সাওয়ারের (রহ.) মাজার জিয়ারত করতে যাবেন। তবে নির্বাচনি আচরণবিধির জন্য গণসংবর্ধনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে বিরত রয়েছি।