নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টির (জাপা) দুর্গ ছিল রংপুর। অনেক আগেই সেই দুর্গের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে দলটি। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে লড়াই করছে জাতীয় পার্টি। তাই জাপার দায়িত্বশীল নেতারা আশা করছেন, এবার ‘রংপুর দুর্গ’ পুনরুদ্ধার করবে জাপা। তবে ভোটের মাঠের সমীকরণ বলছে, দুর্গ পুনরুদ্ধারের লড়াই এত সহজ হবে না।
জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুরে দলটির জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে মাত্র একটিতে জয় পায় দলটি।
বিভিন্ন সময়ে দলীয় কোন্দল ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের শিকার হয়েছে জাতীয় পার্টি। তার পরও নানা কারণে সেই আওয়ামী লীগকেই বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করেছে জাতীয় পার্টি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাঁচা-মরার লড়াই হিসেবে দেখছে দলটি।
রংপুর বিভাগে সংসদীয় আসনসংখ্যা ৩৩টি। ক্ষয়িষ্ণু জাপা রংপুর বিভাগে এবার ৩১টি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। বাদ পড়েছে পঞ্চগড়-১ (সদর, তেঁতুলিয়া-আটোয়ারী) এবং নীলফামারী-২ (সদর) আসনটি।
দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর-৩ (সদর); মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) ও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি); সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতিবান্ধা) আসনে প্রার্থী হয়েছেন। জাতীয় পার্টি এবার ২৩৯টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। তাদের মধ্যে ২২০ জন নির্বাচন কমিশনে (ইসি) মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। গতকাল রবিবার ইসি সূত্রে জানা গেছে, এই ২২০ জনের মধ্যে এখন ২১৮ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। যে দুজনের আবেদন খারিজ হয়েছে, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পতিত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামীপন্থি ভোটারদের সমর্থন নিজেদের দিকে টানতে জাতীয় পার্টি নানা কৌশল নেবে, যা দলটির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
রংপুর-৩ আসনে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের জনপ্রিয়তা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও দীর্ঘদিন ধরে এটি জাতীয় পার্টির দখলে রয়েছে। রংপুর-৪ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় জাপা প্রার্থীকে ব্যাপক গণসংযোগে নামতে হবে। রংপুর-৫ আসনে ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দিয়েছে দলটি, যেখানে জামায়াত-বিএনপিবিরোধী ভোট পেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে হাড্ডাহাড্ডি। আর রংপুর-৬ আসনে আগের প্রার্থী নুরে আলম যাদুর ওপরই আস্থা রেখেছে জাতীয় পার্টি।
রংপুর-১ আসনে ব্যারিস্টার মঞ্জুম আলীকে মনোনয়ন দিয়ে চমক দেখিয়েছে জাতীয় পার্টি। স্থানীয়ভাবে তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক প্রভাব এবং জাতীয় পার্টি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক একত্রিত হলে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রংপুর-২ আসনে দলটি আস্থা রেখেছে সাবেক এমপি আনিছুল ইসলাম মণ্ডলের ওপর। স্থানীয় নেতারা মনে করছেন, দলীয় ঐক্য বজায় থাকলে এ আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব।
লালমনিরহাট-১ আসনে মসিউর রহমান রাঙ্গার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাসান রাজীব প্রধান ও জামায়াতে ইসলামীর মো. আনোয়ারুল ইসলাম রাজু। রাঙ্গা এর আগে রংপুর-১ (গংগাচড়া) আসন থেকে নির্বাচিত হলেও তাকে লালমনিরহাটে সরিয়ে আনা হয়েছে। এতে দলে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। এই আসনে জাপার জয়লাভ ‘অনেকটাই শঙ্কায় রয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন জাপার নেতা-কর্মীরা।
মনোনয়ন ঘোষণার পর দ্বন্দ্ব বেধেছে দলে। জাপা মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসনের পাশাপাশি গাইবান্ধা-৫ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন। সেখানে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন জাপার ভাইস চেয়ারম্যান এবং সাঘাটা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু। রঞ্জু দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়বেন।
এ ছাড়া রংপুর বিভাগে জাপা যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, রাজনীতির ময়দানে তারা তেমন সক্রিয় নন বলে দলে সমালোচনা রয়েছে। দুর্গ ধরে রাখার কঠিন সমীকরণ মেলাতে তাই হিমশিম খেতে হবে বলে মনে করেন দলের নেতারা।
জাপার ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু সালেক থাকেন পঞ্চগড়ে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে, রংপুর বিভাগে জাপার একটা বড় ভোটব্যাংক আছে। কিন্তু এই ভোট কি জেতার জন্য যথেষ্ট হবে? এটা বলা খুব কঠিন যে জাপা রংপুর বিভাগে এবার আধিপত্য পুনরুদ্ধার করবে। যদি ভোট সুষ্ঠু হয়, কারচুপি না হয়, তবে কিছু কিছু জায়গায় লড়াই হতে পারে।’
ভোটের মাঠে জাপা ছেড়ে কথা বলবে না– এমন প্রত্যয়ের কথা বলেন রংপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি ও জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘রংপুরে জাতীয় পার্টি সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এবার আমাদের জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।’
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির প্রভাবশালী প্রার্থীদের সমর্থকরা ইতোমধ্যে জাপাকে ঠেকানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পার্টি নির্বাচনি প্রচার চালাতে পারবে কি না, এ নিয়ে অনেক সংশয়-শঙ্কা রয়েছে।
মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘জামায়াত, এনসিপি আমাদের বাধা দেবে, এত শক্তি তাদের নেই।’
রংপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি ও জাপার সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের মানুষ অনেক দিন পরে একটা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে নানা অস্থিরতা বিরাজ করছে। ল অ্যান্ড অর্ডারের যে অবস্থা তাতে মানুষের মনে নানা শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। তাই প্রশাসন ও পুলিশকে যথাযথ ভূমিকা রাখতে হবে।’
তবে এত কঠিন অঙ্ক মেলাতে গিয়েও ভড়কে যাচ্ছে না জাতীয় পার্টি। সুষ্ঠু ভোট হলে ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৪০ থেকে ৭০টি আসন পাবে বলে আশা করেছেন দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। গতকাল দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে গিয়ে সাংবাদিকদের এমন কথা বলেছেন তিনি।
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রসঙ্গে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল ঢাকা ও কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্তহীনতার অভাব স্পষ্ট। তার মতে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে ব্যাপকহারে সেনা মোতায়েন, পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।