বরিশাল নগরীর পাশাপাশি বিভাগের ছয় জেলায় নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা জমে উঠেছে। নিজেদের পক্ষে ভোট টানতে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন পেতে অনেক হেভিওয়েট নেতা সরব হয়েছেন। গণগ্রেপ্তারের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন। দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার না করতে বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন। মিথ্যা মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার না করতেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেছেন। না হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়বে বলেও অনেকে দাবি করেছেন।
জানা গেছে, পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) আসনে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর। এর আগে তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিলেন। তবে সম্প্রতি নির্বাচনি এলাকায় আওয়ামী লীগের ভোটারদের সমর্থন পেতে ও দলটির নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রকাশ্যে বক্তব্য দিচ্ছেন।
এক জনসভায় নুর বলেন, ‘নৌকার সাধারণ ভোটাররা আমাকে সমর্থন করবেন। কারণ এলাকার কারও সঙ্গে কখনো খারাপ আচরণ করিনি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর মামলা হলেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। গণহারে গ্রেপ্তারের পক্ষেও নই।’ তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচিত হলে সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া কেউ গ্রেপ্তার হবেন না।’
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। তিনিও নির্বাচনি প্রচারে কৌশলে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি ফেসবুক লাইভ ও জনসভায় বলেন, ‘নিরীহ ও সাধারণ কাউকে যেন গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার করা না হয়। যারা আমার পক্ষে কাজ করছে বা ভোট দেবে, তাদের মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হচ্ছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে না। জুলাই বিপ্লবের পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার ক্ষেত্রেও আমার একই কথা।’
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও আওয়ামী লীগের ভোট টানতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলটির নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম নির্বাচনি জনসভা ও সংবাদ সম্মেলনে একাধিকবার বলেছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ভীতিহীন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য কোনো দলের সাধারণ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে না। কেবল যাদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে, তাদের গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। না হলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।’
বরিশাল-৫ (সদর) এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে নির্বাচনি প্রচার চালানোর সময় মুফতি ফয়জুল করীম উল্লেখ করেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে সব ভোটারের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’ নির্বাচনি এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও হয়রানি রোধে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানান।
বরিশাল সদর আসনের বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমানও বিভিন্ন জনসভায় একই সুরে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দলীয় নেতা-কর্মী বা ভোটার হয়রানির শিকার হলে নির্বাচন নিরপেক্ষ থাকবে না।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশালের সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেছেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কার্যত ভোটের মাঠে নেই। প্রায় সব আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামি আন্দোলন-সমর্থিত ভোটাররাই মূল শক্তি। এ কারণে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব প্রার্থীকেই কৌশলে আওয়ামী লীগের ভোটার টানার চেষ্টা করতে দেখা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের নিরাপদে রাখার আশ্বাস দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ভোট না দিলে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার হুমকিও দিচ্ছেন। এটি ভোটের রাজনীতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ভোটের পর এসব মানুষের কী অবস্থা হবে, তা তখনই বোঝা যাবে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু আসনে এনসিপির নেতা-কর্মীরা জাতীয় পার্টির প্রার্থীর কর্মী ও সমর্থকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, যা নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করছে। এ বিষয়ে প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ২১টি আসন থেকে ১২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। পুরো বিভাগ থেকে ৭৯ লাখ ৮১ হাজার ১০৪ জন ভোটার এবার ভোট দেবেন।