আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদের সম্মানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহিদ আবু সাঈদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন ‘এ মাটি আবু সাঈদের রক্তে মেশানো মাটি। সেই ত্যাগ আমরা কখনো বৃথা যেতে দেব না। কিন্তু কীভাবে আমরা সেই আবু সাইদের ত্যাগকে মূল্যায়ন করব। আবু সাঈদসহ ১ হাজার ৪০০ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। এই মানুষগুলো ত্যাগের মূল্যায়ন আমরা তখনই করতে পারব, যখন এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৮টার দিকে রংপুর নগরীর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সংস্কার নিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যখন আসল, অন্তর্বর্তী সরকার এসে সংস্কার কমিশন করল এবং বাংলাদেশের প্রায় কম-বেশি রাজনৈতিক দলগুলোকে সেখানে আহ্বান করল। আমরাও গিয়েছি। সেখানে আমাদের সংস্কার প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। মোটামুটিভাবে সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আমরা দিয়েছি, যা আমরা জনগণের সামনে অনেক আগে উপস্থাপন করেছিলাম, সেটাই কম-বেশি তারাও দিয়েছে। হতে পারে কোনো কোনোটির ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কিছু কিছু দ্বিমত আছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যদি দ্বিমত থাকে, আমরা লুকোছাপা করিনি। আমরা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে বলেছি, কোনটিতে আমরা সম্মতি দিয়েছে। কোনটিতে আমাদের অসম্মতি আছে।’
গণভোটে হ্যাঁ-তে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, অধিকার ফেরানোর জন্য আবু সাঈদ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। চট্টগ্রামে ওয়াসিম নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে। এ রকম হাজারও মানুষ যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
তিনি বলেন, ‘তাদের জীবন উৎসর্গকে মূল্যায়ন করতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি সেই জুলাই সনদকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। সে জন্যই আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব যে ধানের শীষে যেমন সিলটা দেবেন, ১২ তারিখে একই সঙ্গে আপনাকে যে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটি দেবে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’, সেখানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দেবেন।’
তারেক রহমান বলেন, ‘অনেকেই বলে থাকেন এই রংপুর এলাকা গরিব অঞ্চল। আমি বিশ্বাস করি, এই অঞ্চল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অঞ্চল। শুধু দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক ব্যক্তির এবং সঠিক নেতৃত্বের। তাহলেই এই বিভাগের আমরা আমূল পরিবর্তন করতে পারব।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনা করেছেন, আমরা দেখেছি এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছিল। ১৬ বছরের উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে। এই অঞ্চলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য সঠিক কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। নতুন মানুষের টিকে থাকার জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য কারখানা কোনো কিছুই এখানে করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘একটু আগে আমি আবু সাঈদের বাড়ি থেকে আসলাম। আমি জানতাম না সেই এলাকা পর্যন্ত কয়লা আছে। আমি জানতাম, দিনাজপুরে কয়লা আছে। আজ আমি শুনলাম যে সেখানেও কয়লা আছে। এই কয়লা যদি আমরা উত্তোলন করতে পারি, তা দিয়ে আমরা অনেক কিছু করতে পারব। আমরা সবাই জানি, এই অঞ্চল কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এ এলাকার ম্যাক্সিমাম মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। সে জন্যই আমরা দেখেছি, বিগত ১৬ বছর অন্যদের সঙ্গে আমাদের কৃষক ভাইয়েরা কীভাবে অত্যাচারিত-নির্যাতিত হয়েছে, কীভাবে কৃষিজাতীয় দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে কৃষকদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আপনারা ১২ তারিখ ভোট দিতে যাবেন। কখন যাবেন? ১৬ বছর যেমন নিশিরাতে নির্বাচন হয়েছিল, আমরা এবার করতে দেব? দেব না। এবার হচ্ছে জনগণের পালা। জনগণ এবার সিদ্ধান্ত নেবে তারা আবার কী করবে। জনগণ সব হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান যে যে ধর্মের হোক না কেন, প্রত্যেককে ভোরবেলায় গিয়ে ভোটের মাঠে লাইন ধরে দাঁড়াতে হবে। যাতে করে কেউ কোনো ষড়যন্ত্র করতে না পারে। এ জন্য সতর্ক থাকতে হবে।’
এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাত ৮টা ৩১ মিনিটে রংপুর নগরীর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় পৌঁছালে নেতা-কর্মীরা আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান। নির্বাচনি জনসভা সভাপতিত্ব করেন রংপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু।
তারেক রহমানের কাছে শহিদ আবু সাঈদের বাবার ৩ দাবি বিএনপি ক্ষমতায় এলে জুলাই বিপ্লবে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আগে করতে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ওই ঘটনার প্রথম শহিদ রংপুরের আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন। গতকাল সন্ধ্যায় তারেক রহমান রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুরে শহিদ আবু সাঈদের বাড়ি গেলে তিনি এ আবেদন জানান।
সেখানে মকবুল হোসেন ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নিয়ে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। পরে তিনি দোয়া-মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর তিনি বাড়ির উঠানে যান। সেখানে মকবুল হোসেন, আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম, ভাই রমজান আলী, আবু হোসেনসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসেন। তাদের খোঁজখবর নেন। এ সময় তাদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
এ সময় তারেক রহমানকে শহিদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাকে ক্ষমতায় আনেন, তাহলে প্রথমেই আবু সাঈদসহ জুলাই বিপ্লবে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করবেন। আহতদের সুচিকিৎসাসহ পুনর্বাসন করবেন। পীরগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।’
এ সময় তারেক রহমান মকবুল হোসেনকে প্রতিশ্রুতি দেন যে শহিদ আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন এবং দেশের সব সূচকে উন্নয়ন করবেন।