হাতে প্রচারপত্র, সঙ্গে কয়েকজন কর্মী। কখনও হেঁটে, কখনও অটোরিকশায় চড়ে হাট-বাজার, গ্রাম আর চা বাগানে ঘুরে ঘুরে ভোট চাইছেন সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মৌলভীবাজার জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে রাজনীতির চেনা ছবির বাইরে দাঁড়িয়ে তার এই পথচলা হয়ে উঠেছে সাহস আর দৃঢ়তার এক আলাদা গল্প।
মৌলভীবাজারের রাজনীতির মাঠে সাদিয়া নোশিনের উপস্থিতি অনেকটাই ব্যতিক্রমী। মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া উপজেলা) আসনে বাসদ (মার্ক্সবাদী) মনোনীত ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে তিনি ‘কাঁচি’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার বাড়ি কুলাউড়া উপজেলার লস্করপুর এলাকায়।
জাঁকজমকপূর্ণ বহর বা ব্যয়বহুল প্রচারণা নেই। একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাই তার নির্বাচনি প্রচারের প্রধান বাহন। সঙ্গে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মী। সামনে চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষ, গ্রাম ও বাজারের সাধারণ ভোটার। তাদের কথাই শোনেন, তাদের সমস্যার কথাই বলেন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজারের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সাদিয়া নোশিনই একমাত্র নারী প্রার্থী। মৌলভীবাজার-২ আসনে তিনি ছাড়াও আরও সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- বিএনপির শওকতুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী, স্বতন্ত্র প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান, ফজলুল হক খান, জাতীয় পার্টির আবদুল মালিক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুল কুদ্দুস এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এম জিমিউর রহমান চৌধুরী।
সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী জানান, এমসি কলেজে পড়াশোনার সময় থেকেই তার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। সে সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। বাসদের ছাত্রসংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের এমসি কলেজ শাখার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি সিলেট নগর শাখার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। পড়াশোনা শেষ হলে ছাত্ররাজনীতি থেকে সরে এসে তিনি মূল রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় নারী সংগঠনের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
প্রচারণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাদিয়া নোশিন জানান, তিনি বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন এবং প্রতিদিন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। অনেকেই তাকে সাহস জোগান।
তিনি বলেন, অনেকে বলেন- মেয়ে হয়ে সাহস করে দাঁড়ানোই বড় কথা। এসব কথা থেকেই আমি শক্তি ও সাহস পাই।
এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে এই প্রার্থী বলেন, চা-শ্রমিক, খাসিয়া ও গারো জনগোষ্ঠী দেশের নাগরিক হয়েও এখনও ভূমির মালিকানার অধিকার থেকে বঞ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীগুলো নানাভাবে অবহেলার শিকার হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভবন থাকলেও চিকিৎসক ও পরীক্ষার যন্ত্রপাতির সংকটে মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে, আর রেলযোগাযোগেও অব্যবস্থাপনায় স্টেশন ও লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
নারী উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সাদিয়া নোশিন বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। এই জনগোষ্ঠীকে পেছনে রেখে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নারীর অধিকার ও উন্নয়ন। এই দাবিগুলোকে সামনে রেখেই তারা রাজনীতির মাঠে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি জানান, জয়-পরাজয় বড় বিষয় নয়; মানুষের দাবি তুলে ধরাই তাদের মূল লক্ষ্য।
সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকা, সীমিত সম্পদে প্রচার চালানো এবং শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়াকে সামনে এনে কথা বলার কারণে ভোটারদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে তার প্রচারণা। নির্বাচনি মাঠে এই সরল ও জনসংযোগনির্ভর প্রচার কতটা প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই তাকিয়ে আছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
পুলক পুরকায়স্থ/অমিয়/