ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে ‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানে নিজেদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ইশতেহারে রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গঠন, শিক্ষা সংস্কার, সুশাসন, নারীর মর্যাদা রক্ষাসহ ২৬টি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইশতেহারে ৪১টি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
দলটির ইশতেহার আটটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে জায়গা পেয়েছেন জুলাইযোদ্ধা আবু সাঈদ, শরিফ ওসমান বিন হাদি (ওসমান হাদি) এবং বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ।
ইশতেহারের প্রথম ভাগে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষায় একটি বৈষম্যহীন, শক্তিশালী ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। এতে শাসনব্যবস্থা সংস্কার, রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, কার্যকর জাতীয় সংসদ, নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কার, সুশাসন নিশ্চিতে জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ, স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলার মৌলিক উন্নয়ন, উন্নত আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগে আত্মনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা উল্লেখ করা হয়। বাণিজ্য, শিল্প, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশতেহারের চতুর্থ ভাগে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যুব প্রযুক্তি নেতৃত্বের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইশতেহারের অষ্টম ভাগে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব নিয়ে পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। এতে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার), রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা, শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার কথাও বলা হয়েছে। জুলাই শহিদ এবং যোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে অনুদান ও ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা, তাদের পরিবারের জন্য আবাসন নির্মাণ এবং পুনর্বাসন করার প্রতিশ্রুতি তু্লে ধরেছে দলটি।
জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকটের শান্তিপূর্ণ, টেকসই সমাধান ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে দলটি। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ইশতেহারে।
ইশতেহারের শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন কাঠামো অংশে বলা হয়েছে, স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগের জন্য পৃথক নিয়োগ পদ্ধতি ও বেতন কাঠামো প্রচলন করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষককে উচ্চ গ্রেডে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকারি দপ্তরের সর্বত্র সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। জানিয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী হলে ‘আমার টাকা আমার হিসাব’ অ্যাপ চালুর মাধ্যমে সরকারের আয়-ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।
ইশতেহার ঘোষণায় জামায়াতের আমির বলেন, মন্ত্রী-এমপিসহ সব পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বার্ষিক সম্পদবিবরণী জনসাধারণের সামনে পেশ করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বড় বড় দুর্নীতির উৎসগুলো পর্যালোচনা করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইশতেহারের ২৬ প্রতিশ্রুতি
‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’–এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন; বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন; যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রাধান্য দেওয়া; নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ; সব পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন; প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টরে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ; ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ; সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা; বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত; জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহিদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাইযোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন; কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি; ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্যনিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ‘সবুজ পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া; ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপক ভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি; শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা; প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সকল অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত; সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়; বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত; আধুনিক ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত; শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত; দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা; যাতায়াতব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সঙ্গে বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা; নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত; ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা; সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন নিশ্চিত এবং সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
নারীর অধিকার নিশ্চিতে ১২ প্রতিশ্রুতি
নারীর ন্যায্য সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং শিশুর প্রতি বিনিয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠন করা হবে বলে জানিয়েছে জামায়াত। জাতীয় নারী সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠন; নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস ও গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ইমার্জেন্সি কল নম্বর চালু; প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং নারীবান্ধব নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, আলাদা টয়লেট ও নামাজের ব্যবস্থা করা; সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার বাড়ানো; মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও ক্যানসার সচেতনতায় প্রতিটি জেলায় নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা; নারীর সম্পত্তি অধিকার রক্ষায় ‘সম্পত্তি সুরক্ষা কমিটি’ গঠন; উত্তরাধিকার সম্পত্তির মামলা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের দ্রুত বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন; প্রকৃত হিজড়া শনাক্ত করে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও চাকরির কোটা সংরক্ষণ করা প্রভৃতি।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন, ক্ষমতায় গেলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার সব ক্ষেত্র ও স্তরে নারীর সমান প্রবেশাধিকার ও অধিকার সংরক্ষণ করা হবে, যাতে নারী তার ইচ্ছা অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ ও কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারেন। ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
ইশতেহারে ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে পাঁচটি ‘হ্যাঁ’ এবং পাঁচটি ‘না’ রয়েছে। ‘হ্যাঁ’-এর মধ্যে রয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান। ‘না’-এর মধ্যে আছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলামসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘের প্রতিনিধি।