ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় একযোগে নগরী ও জেলার বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু হয়। ভোর থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়েই সব কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয় এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। কোথাও কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোটাররা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নগরী ও উপজেলাজুড়ে জোরদার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন রয়েছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ টিম মাঠে কাজ করছে।
সকাল থেকেই নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটারদের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে।
চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৭ জন, নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৬০ জন এবং হিজড়া ভোটার ৭০ জন। প্রবাসীদের মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোটার রয়েছেন ৯৪ হাজার ৯৪১ জন। এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রে মোট ১২ হাজার ৬০১টি বুথ রয়েছে।
কয়েকজন ভোটার জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে তারা সন্তুষ্ট।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণভোট নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। এরপর কেন্দ্রভিত্তিক গণনা শেষে ফলাফল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হবে এবং পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রামের ৭৫ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ৪৯১টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোটকেন্দ্রগুলোকে ‘রেড’, ‘ইয়েলো’ ও ‘গ্রিন’ এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছে পুলিশ। ‘রেড’ চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৬৫৪টি -এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ৩১০টি এবং জেলায় ৩৪৪টি। ‘ইয়েলো’ চিহ্নিত কেন্দ্র ৮৩৭টি- নগরীতে ১৫১টি ও জেলায় ৬৮৬টি। আর ‘গ্রিন’ চিহ্নিত কেন্দ্র রয়েছে ৪৭৪টি, যার মধ্যে নগরীতে ১৪৬টি এবং জেলায় ৩২৮টি।
চট্টগ্রাম মহানগরের কোতোয়ালি আসনের কাজীর দেউরি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডের মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে এ ওয়ার্ডে পুরুষ ভোটারের তুলনায় মহিলা ভোটারের উপস্থিতি কম মাত্র ৬ জন।
চট্টগ্রাম মহানগরের ১০ আসনের এ জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কিছু দুষ্কৃতকারী রাতে ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেছিল। এ ঘটনায় যৌথ বাহিনী ৮ জনকে আটক করেছে। কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ফজলুল হক বলেন, রাতে একটি পক্ষ কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। সকালে ভোটারদের উপস্থিতি সন্তোষজনক।
চট্টগ্রাম-৬ রাউজানের পূর্ব গুজরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৭টা ১০ মিনিট পর্যন্ত কোনো ভোটারের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
সকাল ৭টায় আনোয়ারা সদরের আনোয়ারা সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মো. ইউসুফ (৭৫) প্রথম ভোটার হিসেবে ভোট দেন। ভোট দিতে এসে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন,‘সবশেষ কবে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে জানা নেই। তবে এবার মনে হচ্ছে নিজের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করতে পারব।’ এ সময় কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারাও ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
চট্টগ্রাম-২ আসনের ফটিকছড়ি সরকারি কলেজ কেন্দ্রে শান্ত পরিবেশে ভোট শুরুর প্রস্তুতি চলে। সকাল ৭টার পর থেকেই ভোটার নম্বর সংগ্রহকে ঘিরে কেন্দ্রের বাইরে ছোটখাটো জটলা দেখা গেছে। বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর ও জামায়াত প্রার্থী মো. নুরুল আমীনের নেতা-কর্মীরা কেন্দ্র এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন। প্রার্থীদের এজেন্টরাও কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, ব্যালট বক্স ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল অব্যাহত আছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলম শফি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট শুরুর ১০ মিনিট আগেই ভোটাররা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যান। সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হবে এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রিফাত/