ঢাকা ২ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পূবালী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পুনর্নির্বাচিত হলেন মনজুরুর অসুস্থ হনুমান নিজেই হাজির হলো প্রাইভেট ক্লিনিকে প্রস্তাবিত বাজেটের সফল বাস্তবায়ন কঠিন হবে মুক্তিতে বাধা নেই আবুল বারাকাতের বিজনেস এলিট ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হলেন সাদী-উজ-জামান মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান: টেকনাফে ইয়াবাসহ আটক ১ সরকারি বাঙলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের প্রথম মিলনমেলা ১০ জুলাই মেসিকে থামাতে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই আলজেরিয়ার পাঁচ তারকার স্মৃতিময় একদিন হাওরে ডাকাতির রহস্য উদ্ঘাটন, আন্তঃজেলা চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার সিলেটে ট্রাফিক আইন মানলেই করানো হচ্ছে মিষ্টিমুখ বিয়ের দিনই সন্তানের আগমনের ঘোষণা, ভাইরাল দম্পতি বাংলাদেশের বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১টি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ১ম পত্র নেটওয়ার্কের খোঁজে গাছের চূড়ায় শিক্ষক, ছবি ভাইরাল বেরোবি ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ গার্সিয়ার হুঙ্কার: ইরানকে হারাতেই হবে বেলজিয়ামকে মাতামুহুরিতে নিখোঁজের ২ দিন পর ডোবা থেকে শিশুর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার, আটক ৩ বানেশ্বর আম হাট পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাগেরহাটের ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, মামলা না করতে বিএনপি নেতার চাপ বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণ মামলার রায় বুধবার উমরাহ পালনে গেলেন ‘নগদ ইসলামিক’ ক্যাম্পেইনের ৫ বিজয়ী ভোলায় মাল্টিমিডিয়া, এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং বিষয়ক কর্মশালার উদ্বোধন দিল্লি এয়ারপোর্টের ঘটনার বিস্তারিত জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ কলকাতায় হেনস্তার অভিযোগে যা বললেন মোশাররফ করিম সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে: ডা. জাহেদ রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ যুবক নিহত চাঁদপুরে বাসের ধাক্কায় বৃদ্ধা নিহত রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলা: রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ ‘আমি কোনো মডেল নই’, বিশ্বকাপের ফটোশুট নিয়ে ক্ষুব্ধ বিয়েলসা ব্যাপন, অভিস্রবণ ও প্রস্বেদন অধ্যায়ের ৬টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান
Nagad desktop

রাষ্ট্রও শ্রমিকদের পক্ষে থাকে না

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৫, ০৩:৪১ পিএম
আপডেট: ০১ মে ২০২৫, ০৩:৪৯ পিএম
রাষ্ট্রও শ্রমিকদের পক্ষে থাকে না
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমাদের দেশে গার্মেন্টশ্রমিকরা যে মজুরি পায় তা যে যৎসামান্য, এবং তাদের শ্রমের ওপরই যে ওই শিল্পের বিশ্ববাজারটা টিকে রয়েছে, সে সত্যটা সাধারণত প্রকাশ পায় না। শ্রমিকরা দাবি করেছে, তাদের ন্যূনতম মজুরি হওয়া চাই মাসে ১৬ হাজার টাকা। এটা কোনো মামাবাড়ির আবদার নয়। ভারতে শ্রমিকদের দাবি, মজুরি দিতে হবে মাসে ১৮ হাজার রুপি; বাংলাদেশের হিসাবে সেটা দাঁড়ায় ২৬ হাজার টাকা। বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক গবেষকরাও হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, শ্রমিকদের মানবোচিত জীবনধারণে কমপক্ষে ২৬ হাজারই দরকার, তার কমে চলে না। বাংলাদেশের শ্রমিকরা ২৬ হাজার চায়নি, চেয়েছিল ১৬ হাজার। তাদের দাবির সমর্থনে গার্মেন্টশ্রমিকদের সংগঠনগুলো একটি কনভেনশন করেছিল, তাতে সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নাগরিক সমাজেরও কেউ কেউ উপস্থিত ছিলেন। কনভেনশনের খবর তেমন একটা প্রচার পায়নি। প্রচার না পাওয়াটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ গার্মেন্টসশিল্পের মালিক, মিডিয়ার মালিক এবং রাষ্ট্রের মালিক সবাই এক ও অভিন্ন পক্ষ; তারা মালিকপক্ষ। পরস্পরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়; একে অপরের মাসতুতো ভাই-ই, যথার্থরূপে। মালিকপক্ষের দাবি যে শিল্পটিকে তারা সন্তানের মতো লালনপালন করে থাকেন সেখানে বাগড়া দেয় শ্রমিকরা, আবার তার সঙ্গে এসে জুটেছে তথাকথিত নাগরিক সমাজের মাসিরা। এই মাসিদের নিশ্চয়ই মতলব আছে, হয়তো শিল্পের ধ্বংসই তারা চায়। বিদেশিদের এজেন্ট হওয়া বিচিত্র নয়। ‘মাসি’ কথাটা আমাদের বানানো নয়; ওই কনভেনশনের দুই দিন পরে মালিকপক্ষ একটি পাল্টা সভা করেছিল, এবং সেখানে তারা বলেছিল যে, তাদের অতিযত্নে প্রতিষ্ঠিত, আদরে লালিত-পালিত, প্রাণের চেয়েও প্রিয় শিল্প সম্পর্কে যারা কোনো জ্ঞানই রাখে না সেই মাসিরা এখন দরদ দেখাচ্ছে। হ্যাঁ, এটা তো ঠিকই যে, সাধারণ নাগরিকরা এবং শ্রমিকরাও, ওই শিল্পের আয়-ব্যয়ের ব্যাপারে অজ্ঞ; কিন্তু এটা তো সবাই জানে যে, ওই শিল্প থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় সেটাই দেশের উন্নতির প্রধান ভরসা; এবং বাংলাদেশের জামাকাপড়ের যে বিদেশি বাজারে ভালো চাহিদা রয়েছে তার কারণ বাংলাদেশের প্রতি বিদেশিদের ভালোবাসা নয়, কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের সস্তা শ্রম। এত সস্তায় এমন শ্রম দুনিয়ার অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। আর এই শ্রমিকদের অধিকাংশই হচ্ছে নিরুপায় নারী, যারা কারখানায় আসে বেঁচে থাকার অন্য কোনো উপায় নেই বলেই। আর এই মেয়েরা যে কেবল দেশের কারখানাতেই যায় তা নয়, সৌদি আরবে পর্যন্ত চলে যায়, এমনই তারা দুঃসাহসী ও কর্মঠ। সৌদি আরবে তারা পবিত্র হজের জন্য যায় না, জীবিকার খোঁজে যায়। সেখানে গিয়ে কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় তার বিবরণ তারা দিতে পারে না; ভাষার অভাবে এবং স্বাভাবিক লজ্জায়। সৌদি মালিকরা তো বটেই, বাংলাদেশের দূতাবাসের লোকেরাও এই মেয়েদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে কার্পণ্য করে না। 

অসহায় শ্রমিকদের পক্ষে বললে মালিকরা যে রেগে যাবে সেটা তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কই রাষ্ট্রও তো শ্রমিকদের পক্ষে বলে না। বিদেশি ক্রেতাদের সমিতি তবু মাঝে মধ্যে চক্ষুলজ্জায় পড়ে, তারা বলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দাও, কাজের পরিবেশ কিছুটা উন্নত করো; জিজ্ঞেস করে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার আছে কি না। রাষ্ট্র নির্বিকার। অথচ বাংলাদেশে যে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সে তো সাধারণ মানুষের প্রাণদানের বিনিময়েই, যাদের ভেতর অধিকাংশই ছিল কৃষক ও শ্রমিক। এরাই শহিদ হয়েছে, এদের ঘরের মেয়েরাই লাঞ্ছিত হয়েছে সবার আগে। সেই মেহনতি মানুষ যখন তাদের বাঁচার অধিকারের কথা বলে তখন রাষ্ট্র ও মালিক সবাই তাদের ওপর ক্ষেপে যায়, সবাই একত্র হয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন চরম শত্রুর মোকাবিলা করছে। মা বলে যারা নিজেদের দাবি করেন তাদের তখন মা তো নয়ই, মাসি বলেও মনে হয় না। 

রাষ্ট্রীয় কর্তাদের শাসনে দেশের মানুষ যে ভালো নেই তা বলার অপেক্ষা আগেও রাখত না, বর্তমানে আরও বেশি পরিমাণে রাখে না। মেহনতি মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার মালিকদের আয়ের যেকোনো রকমের তুলনাই জানিয়ে দেবে মেহনতিদের দশাটা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে; ধরিয়ে দেবে বিজ্ঞাপিত উন্নতির আসল রহস্যটা। অনুৎপাদক খাতের লোকদের আয়ের সঙ্গে উৎপাদক খাতের মেহনতিদের তুলনাটাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সামরিক ও অসামরিক আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে মেহনতি মানুষের আয়-ব্যয়ের তুলনা করুন, পরিষ্কার ধরা পড়বে রাষ্ট্রের পক্ষপাত কোন দিকে এবং কেন। ধরা পড়বে উন্নতি কোন দিকে ঘটছে এবং কীভাবে ঘটছে।

ঢাকা শহর এখন পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহরে পরিণত হয়েছে। ঢাকার নিচে আছে আর একটি মাত্র শহর সেটি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে, তাই দামেস্কের ওই দশা। কিন্তু বাংলাদেশে তো কোনো যুদ্ধ নেই, তাহলে বাংলাদেশের রাজধানীর কেন এই দুর্দশা? হ্যাঁ, যুদ্ধ একটা অবশ্যই আছে, যুদ্ধ চলছে এই বাংলাদেশেও; সেটা দরিদ্রের সঙ্গে ধনীর যুদ্ধ। তার নাম শ্রেণিযুদ্ধ। আমরা ওই যুদ্ধের খবর রাখি না, খবর রাখতে চাইও না, রাখলে বুঝতাম ঢাকা কেন এতটা নিচে নেমে গেল। উন্নতি? হ্যাঁ, হচ্ছে, অবশ্যই উন্নতি হচ্ছে। উন্নতির দৃশ্য ও গল্প তো কোনো নতুন ব্যাপার নয়। উন্নতি ব্রিটিশ শাসনে হয়েছে, পাকিস্তান আমলেও কম হয়নি। ব্রিটিশরা তো বলতেই পারে যে, তারা আমাদের জন্য রেলের গাড়ি, টেলিগ্রাফের সংযোগ, স্টিমারে যাতায়াত, এসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, শিল্পকারখানা তৈরি করেছে, ইংরেজি ভাষা শিখিয়েছে এবং চা কীভাবে খেতে হয় সেটা পর্যন্ত হাতে ধরে দেখিয়ে দিয়েছে; আর আইয়ুব খান তো দশ বছর ধরে মনের সুখে উন্নতির গান গাইতে গাইতে রাজত্ব করে গেলেন, উন্নয়নের দশক পালন শেষে সবচেয়ে সুন্দর গানটি গাইবার সময়েই তার পতন ঘটল। কিন্তু ওইসব উন্নতি নিয়ে আমরা তো সন্তুষ্ট ছিলাম না; উন্নতির ওই দাতাদের আমরা মেরে ধরে বিদায় করেছি। কারণ? কারণ হলো উন্নতিটা ছিল পুঁজিবাদী ধরনের, তাতে উন্নতির সঙ্গে সমানতালে বাড়ছিল বৈষম্য ও বঞ্চনা, দেশের সম্পদ চলে যাচ্ছিল বিদেশে। এখনকার উন্নতিরও তো ওই একই দশা। উন্নতি অল্প কিছু মানুষের, যারা চেপে বসে আছে বাদবাকিদের ঘাড়ের ওপর, আর উন্নতির সব রসদ জোগাচ্ছে ওই বাদবাকিরাই। এই উন্নতরা উন্নতি করেছে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে। দেশের সব দৈনিকেই বেরিয়েছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর খবরটা যে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ধনীরা যে গতিতে ও যে হারে উন্নতি করেছে তার তুলনা সারা বিশ্বের কোথাও নেই। উন্নতির উন্মাদনায় অধুনা চীন ছুটছে বুলেটের গতিতে। কিন্তু উন্নতির দৌড়ে বাংলাদেশের ধনীরা চীনের ধনীদেরও পেছনে এবং লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। প্রতিযোগিতায় প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের ধনীরা হার মেনেছে। রণেভঙ্গ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ধনীরাও। এই উন্নতির অবিশ্বাস্য গতির উল্টো পিঠে লেখা রয়েছে মানুষের দুর্দশা, শঙ্কা ও কান্না। মায়ের আসল কান্না, মাসি বা মাসতুতো ভাইদের মায়া কান্না নয়।

হঠাৎ-উন্নতরা এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ আছে বলে বিশ্বাস করে না, তারা তাই মহাব্যস্ত হয়েছিল দেশের সম্পদ লুণ্ঠনে ও পাচারে। সম্পদ মোগলরা নিয়ে যেত দিল্লিতে, ইংরেজরা নিয়ে গেছে লন্ডনে, পাকিস্তানিরা নিত রাওয়ালপিন্ডিতে; আমাদের বাঙালি ভাইরা পাঠিয়েছে সুইজারল্যান্ডে, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায়। এদের কারও জবাবদিহির সামান্যতম দায় নেই। কার কাছে দায় থাকবে? রাষ্ট্র তো এদেরই করতলগত। 

উন্নতি কাদের শ্রমে ও ঘামে সম্ভব হচ্ছে তাও আমরা জানি। কাজী নজরুল ইসলাম তার ছোট্ট একটি কবিতা লিখেছিলেন ‘কুলি-মজুর’ নামে। ওই কবিতায় পুঁজিবাদী উন্নতির ভেতরকার খবরটা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়ে গেছেন তিনি। ওটি লেখা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ১০৭ বছর আগে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন রাজপথের মোটর, সাগরের জাহাজ, রেললাইনের রেলগাড়ি, জমিতে অট্টালিকা, এসব কাদের দান, এগুলো কার খুনে রাঙা? জবাবটা তার ওই প্রশ্নের ভেতরেই বসে আছে। সব উন্নতিই শ্রমিকের শ্রম দিয়ে দিয়ে তৈরি, উন্নতি মাত্রেই শ্রমিকের খুনে রাঙা। বিনিময়ে শ্রমিক কী পেয়েছে? বেতন? কত টাকা? নজরুলের ভাষায়, ‘বেতন দিয়েছ? চুপ্ রও যত মিথ্যাবাদীর দল্/ কত পাই দিয়ে কুলিরে তুই কত ক্রোর পেলি বল্।’

কত দিলেন আর কত পেলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আমাদের গার্মেন্টসশিল্পের মালিকরা কী বলবেন? কত দিচ্ছেন? বিনিময়ে কত আদায় করে নিচ্ছেন? পয়লা মে আসা-যাওয়া করে কিন্তু শ্রমিকের ভাগ্য বদল হয় না।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের (Demographic dividend) সবচেয়ে সুবিধাজনক সময় প্রায় শেষের দিকে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করার বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পড়ানোর জন্য ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা-ভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা বলেছে। স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় ব্যবস্থায় এ উদ্যোগ কত দ্রুত, কত গভীরভাবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে পৌঁছাবে?

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের শেষ বা পরিণত পর্যায়ে আছে। সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। তবে সেটি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই সুবিধা বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগকে শুধু পাঠ্যক্রম সংশোধনের বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। একে উচ্চশিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান কৌশল এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সমস্যাটি গভীর। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বলা হয়েছে। পাঠ্যক্রম অনেকাংশে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত। স্থানীয় শ্রমবাজার, নিয়োগদাতা, শিল্প খাত ও পেশাজীবী সংগঠনের মতামত নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত হয় না। অনেক বিষয় এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও তত্ত্বনির্ভর। ব্যবহারিক কাজ, ল্যাব, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, সমস্যা সমাধান, দলীয় কাজ এবং পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেও কাজের পরিবেশে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না।

এই দুর্বলতার সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও যুক্ত। বহু কলেজে আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরি, জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা ও ডিজিটাল শেখার পরিবেশ পর্যাপ্ত নয়। যেখানে কিছু সুবিধা আছে, সেখানেও তা শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে সব সময় যুক্ত হয় না। ২০১৭ সালের কলেজ গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি দেখায়, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার তিন থেকে চার বছর পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ১৯ শতাংশ কর্মরত ছিল। ৪৬ শতাংশ ছিল বেকার। ৩৪ শতাংশ আরও পড়াশোনায় ছিল। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজের বাজারে প্রবেশ কঠিন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজ থেকে আসে। অনেকের ইংরেজি, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা দুর্বল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি প্রক্রিয়া, ক্যাম্পাস-ভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা পায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে চাকরির পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং পেশাগত আত্মপ্রকাশে তারা পিছিয়ে পড়ে।

তবে এ দুর্বলতার ভেতরেই বড় সম্ভাবনা আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর শিক্ষার্থী আছে। এই নেটওয়ার্ককে দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ডিজিটাল কাজ এবং সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাঠ্যক্রম পরিবর্তন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রকল্প।

সংস্কারের শুরু হতে হবে সাধারণ অনার্স ও ডিগ্রি কোর্সের ভেতর থেকে। আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু একটি আলাদা কোর্স যোগ করলেই হবে না। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সব বিষয়ের সঙ্গে কাজের দক্ষতা যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীকে ডেটা ব্যবহার, যোগাযোগ, ইংরেজি, সমস্যা সমাধান, রিপোর্ট লেখা, ডিজিটাল টুল, উপস্থাপনা এবং নৈতিকতার চর্চা শেখাতে হবে। দক্ষতা যেন সিলেবাসের প্রান্তে না থাকে; মূল শিক্ষার ভেতরেই ঢুকে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষকে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। প্রতিটি অনার্স শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত তিন মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে। সরকারি অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, গণমাধ্যম, আইটি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রশিল্প, কৃষি উদ্যোগ বা স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবই হতে পারে শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্র। ইন্টার্নশিপকে নম্বর ও ক্রেডিটের সঙ্গে যুক্ত করলে কলেজ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, তিন পক্ষই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে।

শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতা কাটাতে আলাদা ‘ফাউন্ডেশন স্কিল প্যাকেজ’ দরকার। প্রথম বর্ষ থেকেই ইংরেজি যোগাযোগ, বাংলা ও ইংরেজি রিপোর্ট লেখা, কম্পিউটার ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন, চাকরির প্রস্তুতি এবং পেশাগত আচরণ শেখাতে হবে। শেষ বর্ষে থাকতে পারে ‘জব রেডিনেস সেমিস্টার’। সেখানে সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার, গ্রুপ ডিসকাশন, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির প্রস্তুতি এবং ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন কাজের বাস্তব প্রশিক্ষণ থাকবে।

কলেজগুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে রাখলে চলবে না। প্রতিটি কলেজে কার্যকর ক্যারিয়ার সেল থাকতে হবে। সেখানে চাকরির তথ্য, সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, উদ্যোক্তা সহায়তা, অনলাইন কাজের প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডিজিটাল জব-ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ভাষা জ্ঞান ও কাজের আগ্রহের তথ্য সেখানে থাকবে। নিয়োগদাতারাও সেখান থেকে প্রার্থী খুঁজে নিতে পারবেন।

এ পরিবর্তনের প্রাণ হবেন শিক্ষকরা। ১২ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হতে হবে শ্রেণিকক্ষ বদলে দেওয়া। শিক্ষককে কেস স্টাডি, প্রজেক্ট, দলীয় কাজ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষক কীভাবে পাঠদান বদলালেন, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

সংস্কারের সাফল্য মাপার জন্য তথ্য দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি বছর গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি করতে হবে। কোন বিষয়ের কত শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে, কতজন বেকার, কতজন উদ্যোক্তা হয়েছে, কতজন সরকারি চাকরিতে গেছে, কতজন বিদেশে কাজ পেয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও নির্বাচিত প্রার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করলে উচ্চশিক্ষার বাস্তব ফলাফল বোঝা সহজ হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার পূর্ণতা পাবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নারী শিক্ষার্থী সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমবাজারে ঢুকতে পারেন না। তাদের জন্য নিরাপদ ইন্টার্নশিপ, অনলাইন কাজের সুযোগ, স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ দরকার।

উদ্যোক্তা তৈরির কথাও বাস্তব সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বলা যথেষ্ট নয়। কলেজভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্ভাবন তহবিল, স্থানীয় ব্যবসা পরামর্শক, হিসাবরক্ষণ সহায়তা, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ঋণের সঙ্গে সংযোগ দরকার। এতে চাকরিপ্রার্থী তৈরির পাশাপাশি চাকরিদাতাও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা নয়, দক্ষ মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তাই শুধু শিক্ষা সংস্কার নয়; এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন। জনমিতিক লভ্যাংশের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু দরজাটি ধীরে ধীরে সরু হচ্ছে। দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও কর্মমুখী সংস্কার করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান শক্তি।

লেখক: সিনিয়র ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক

রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সম্প্রতি রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে–আওয়ামী লীগ যদি আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক পড়াশোনাই নাকি ব্যর্থ বলে ধরে নিতে হবে। বক্তব্যটি চিন্তার খোরাক দেয়, সন্দেহ নেই। তবে আমার সীমিত বোঝাপড়া অনুযায়ী, এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অতিসরলীকৃত।

রাজনীতি কখনো গণিতের সরল সমীকরণ নয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ১+১ সাধারণত ২ হয়; কিন্তু সমাজবিজ্ঞানে একই সমীকরণের ফল সবসময় একরকম হয় না। এখানে মানুষ আছে, ইতিহাস আছে, ক্ষমতার সম্পর্ক আছে, স্মৃতি আছে, ভয় আছে, আশা আছে, স্বার্থ আছে এবং পরিচয়ের রাজনীতি আছে। তাই রাজনীতিকে কেবল তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিচার করলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

অ্যারিস্টটল বহু আগেই মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ রাজনীতি মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। মানুষ শুধু যুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় না; আবেগ, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাবোধ, পরিচয় এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কও তার রাজনৈতিক অবস্থান গঠনে ভূমিকা রাখে। সে কারণেই কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না শুধু বর্তমান সংকট বা ক্ষমতার অবস্থান দেখে।

বাস্তব রাজনীতিতে দুই পক্ষকে পাশাপাশি রাখলেই কোনো সরল যোগফল তৈরি হয় না। ওবামা ও ওসামা–দুই নাম পাশাপাশি থাকলেও তা কোনো মিলনের সমীকরণ নয়; বরং সংঘাতের প্রতীক। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানও বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণের প্রতীক। আবার ট্রাম্প ও খামেনির রাজনৈতিক বাস্তবতাও কোনো সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থাৎ রাজনীতিতে যোগ, বিয়োগ, সংঘাত, মেরুকরণ, পুনর্গঠন–সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করে।

সুতরাং, কোনো রাজনৈতিক দল একবার বিপর্যয়ে পড়লেই তা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে–এমন ধারণা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের শিক্ষা নয়। বরং রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, একটি দলের সামাজিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক ভূমিকা, সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি এবং জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলে তাকে সহজে মুছে ফেলা যায় না।

প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের বহুল উদ্ধৃত ধারণা অনুযায়ী, রাজনীতি হলো শক্ত কাঠে ধীরে ধীরে ছিদ্র করার মতো কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি হলো ধৈর্য, সংগঠন, সময়, কৌশল এবং সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কোনো দল সংকটে পড়তে পারে, ভুল করতে পারে, ক্ষমতায় থেকে বিতর্কিত হতে পারে, জনবিচ্ছিন্নতার মুখেও পড়তে পারে–কিন্তু এগুলো কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির স্বয়ংক্রিয় মৃত্যু নির্দেশ করে না।

আওয়ামী লীগকে বোঝার ক্ষেত্রেও শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখা যথেষ্ট নয়। দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তি, সাংগঠনিক শিকড়, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক, গ্রাম-শহরে বিস্তৃত সামাজিক উপস্থিতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কেবল একটি নির্বাচনি দল নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বহু মানুষের আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি।

আমার পর্যবেক্ষণে, আওয়ামী লীগ, ১৪ দল এবং সমমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে দেশের প্রায় ৫০ ভাগ মানুষের মধ্যে এ ধারার প্রতি কোনো না কোনো মাত্রায় সমর্থন, আবেগ, ঐতিহাসিক সংযোগ বা রাজনৈতিক আস্থা রয়েছে বলে বলা যায়। এ ধরনের বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তিকে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিকসংকট দিয়ে বিচার করা যায় না। তাই আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও সমমনা রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত সামাজিক ভিত্তিকে কোনো সাময়িক বিপর্যয়, প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ বহুবার চাপ, দমন, সংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু বারবার নতুনভাবে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনি বিজয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি পর্যায়েই আওয়ামী লীগ নিজেকে নতুন রাজনৈতিক ভাষায় সংগঠিত করেছে এবং জনসমর্থনের ভেতর দিয়ে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কিন্তু সেখান থেকেও দলটি হারিয়ে যায়নি। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক উত্তরণ, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনি বিজয়–এসব ঘটনা দেখায় যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ইতিহাস একবারের নয়, বহুবারের।

অবশ্যই কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ এবং নতুন সময়ের উপযোগী রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা জরুরি। কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দলটি শেষ হয়ে গেছে। বরং সংকট অনেক সময় রাজনৈতিক শক্তিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে, নিজেকে সংশোধন করতে এবং পুনর্গঠিত হতে বাধ্য করে।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি রাজনৈতিকসংকট নিয়ে বলেছিলেন, পুরোনোটি মরে যাচ্ছে, কিন্তু নতুনটি জন্ম নিতে পারছে না–এই মধ্যবর্তী সময়েই নানা অস্থিরতা তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিও আজ তেমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সংকট মানেই কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির মৃত্যু নয়; অনেক সময় সংকটই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

অতএব, আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়ালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই ফেলে দিতে হবে, কিংবা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা ব্যর্থ হয়ে যাবে–যেটা সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খানসহ আরও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন–এই ধারণা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আওয়ামী লীগ যদি আবার সংগঠিত হয়, তা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পাঠকেই আরও স্পষ্ট করবে। কারণ রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, যে দলের সামাজিক ভিত্তি আছে, ঐতিহাসিক স্মৃতি আছে, সাংগঠনিক কাঠামো আছে এবং রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি আছে, তাকে কেবল প্রশাসনিক চাপ, সাময়িক বিপর্যয় বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না।

কোনো দল ভুল করতে পারে, বিতর্কিত হতে পারে, জনসমর্থনের ওঠানামার মধ্যদিয়ে যেতে পারে–এসবই রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে ‘শেষ’ ঘোষণা করা অনেক সময় বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ বেশি।

আমার মূল্যায়নে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে সেই থাকা কতটা শক্তিশালী, কতটা সংগঠিত এবং কতটা জনসম্পৃক্ত হবে–তা নির্ভর করবে দলটির আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর।

রাজনীতিতে শেষ কথা কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক বক্তব্য কিংবা কোনো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বলে না। শেষ কথা বলে ইতিহাস, সংগঠন, জনগণ এবং সময়।

লেখক: নির্বাহী চেয়ারম্যান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান-গ্রোয়িং টুগেদার ওপিসি
গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজ করে চলেছেন। তাদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের জগৎ। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, বিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড় মাত্রায়। জীবনের মুখ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বাড়িয়ে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে সহজতর করে জাতীয় সীমানা পেরিয়ে পুঁজি ও ধারণার নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামীতে স্মার্ট শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভূমিকা রাখবে। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে নতুন শিল্প সৃষ্টি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রযুক্তি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারনেট, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর কোনো বাধা নয়। যে কোনো দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোগও এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির কারণে সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ই-কমার্সেরমতো বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন শিল্প সৃষ্টি এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বেড়েছে। এটি মানুষের শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি সময় ও খরচ কমিয়ে গুণগত মান উন্নত করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমে অনেক কাজ একসঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বিশ্বের অগ্রগামী জাতিসমূহ। তারা সর্বদাই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই। এজন্যই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল তৈরি, দূরদর্শী নেতৃত্ব, তরুণদের অংশগ্রহণ ও দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রাধান্যের ভিত্তিতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে যেসব মানুষ পারদর্শী ও পেশাদার, তাদের কদর পৃথিবীব্যাপী বেড়েই চলেছে। তাই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে স্মার্ট ইকোনমির ধারণা বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ ছাড়া কোনো দেশই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে না। সমৃদ্ধশালী ও উন্নত অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো বিকল্প নেই। 

লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ
ডা. তিমির কুমার সাহা

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।

কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।

ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।

NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।

ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।

রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন