সম্প্রতি দেশের কিছু মিডিয়া ও দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদের মুখে একটি নাম বারবার পুনরুচ্চারিত হচ্ছে - ‘এস. আলম গ্রুপের মালিক সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন, দেশে তাদের কিছুই নেই।’
এই বক্তব্য শুধু তথ্যভিত্তিক বিভ্রান্তি নয়, বরং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমনে ঘৃণা ও আস্থাহীনতা ছড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তাই বিষয়টি তথ্যের আলোয় বিশ্লেষণ করা জরুরি।
নাগরিকত্ব নেওয়া আইনসম্মত, অপরাধ নয়
মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা ২০১১ সালে সিঙ্গাপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের (Permanent Residency) অনুমতি পান। পরবর্তীতে ২০২০ সালে তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, যা একটি সম্পূর্ণ আইনগত ও স্বীকৃত প্রক্রিয়া।
অনেক আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তার মতো তারাও গ্লোবাল ব্যবসা, নিরাপত্তা ও কর-কৌশলগত কারণে এই সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল না। বাংলাদেশের পাসপোর্ট তারা নিয়ম মেনে সরকারের কাছে ফেরত দেন।
সিঙ্গাপুর যেহেতু দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না, তাই এটি ছিল একটি স্বাভাবিক নিয়ম মাফিক পদক্ষেপ।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কী বোঝায়?
কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ। কেউ নাগরিক পরিবর্তন করলেই তাকে ‘অপরাধী ’ বা ‘পলাতক’ বলা চলে না।
বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি (BIT, 2004) রয়েছে। এই চুক্তির আওতায়, সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে এস. আলম গ্রুপের কর্ণধাররা বাংলাদেশে ব্যবসা চালালে সেই বিনিয়োগের উপর জোরপূর্বক দখল, রাজনৈতিক হয়রানি বা বৈষম্যমূলক আচরণ করলে তারা আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের আশ্রয় নিতে পারবেন।
তাহলে দেশে তাদের কী কিছু নেই?
যারা বলছেন ‘তারা লুট করে পালিয়েছে ’, তাদের কাছে প্রশ্ন - তাহলে কেন এস. আলম গ্রুপের দেশে ২ দশমিক ৫ লাখ কোটি (আড়াই লাখ কোটি) টাকার বেশি বিনিয়োগ এখনো বহাল আছে?
তাদের ব্যাংকে স্থিতির পরিমান প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা; আবাসন, শিল্প ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা; বিভিন্ন কোম্পানিতে শেয়ার ও অংশীদারত্ব প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্যই প্রমাণ করে, তারা দেশ থেকে অর্থ পাচার করে পালাননি, বরং দেশের ভেতরেই সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে অর্থনীতির একটি বড় অংশে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন।
দূরভিত্তিক প্রচারণার উদ্দেশ্য কী?
এস. আলম গ্রুপের নাগরিকত্ব, সম্পদ ও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ ঘিরে একটি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যপ্রসূত প্রচারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরই হঠাৎ ‘অপরাধী’ হিসেবে মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। ৯ বছরের ব্যাংক পরিচালনায় যখন গ্রাহকদের কোনো অভিযোগ ছিল না, তখন কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এখন যখন নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে, তখন দায় চাপানো হচ্ছে আগের মালিকদের ঘাড়ে - যারা ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
আমরা চাই আইনভিত্তিক তদন্ত হোক, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ আছে তাদের বিচার হোক। কিন্তু নাগরিকত্বকে অস্ত্র বানিয়ে কাউকে সামাজিকভাবে নিঃশেষ করার অপপ্রয়াস গ্রহণযোগ্য নয়। একজন ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক নাগরিক হতে পারেন, বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিতে পারেন - তাতে তার দেশপ্রেম বা দায়িত্ববোধ কমে না। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব সঠিক তথ্য দিয়ে জনমনে আস্থা ফেরানো, গুজব না ছড়ানো।
উপসংহার:
তথ্যের ওপর ভিত্তি হোক আলোচনার
একটি দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় - আস্থাহীনতা ও বিভ্রান্তি। এস. আলম গ্রুপের মতো যেকোনো বৃহৎ বিনিয়োগকারীকে মূল্যায়ন করতে হলে সেটা হোক আইনের আলোকে, বাস্তবতার ভিত্তিতে - not through whispers of populist outrage। সত্য বলুন। বিভ্রান্তি নয়। গণমিথ্যা কিংবা ঘৃণার রাজনীতি মাতৃভূমি তথা আমাদের কারও জন্যই ভালো নয়।
আরিফ রেজা: বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বিনিয়োগ বিষয়ক লেখক