প্রতি বছর ১ অক্টোবর সারা বিশ্বে পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ২০২৫ সালের এ দিবসে বাংলাদেশে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- একদিন তুমি পৃথিবী গড়েছ, আজ আমি স্বপ্ন গড়ব, সযত্নে তোমায় রাখব আগলে’। এ প্রতিপাদ্য শুধু একটি বাক্য নয়; এটি একটি দায়বদ্ধতার ঘোষণা- যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে প্রবীণদের প্রতি দায়িত্ববান হওয়ার, শ্রদ্ধা জানানোর, আর তাদের মর্যাদা রক্ষায় সোচ্চার ভূমিকা নেওয়ার।
প্রবীণ জনগোষ্ঠী: ক্রমবর্ধমান একটি বাস্তবতা
বাংলাদেশ একটি তরুণ-প্রধান দেশ হলেও প্রবীণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ আদমশুমারির (২০২১) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫%। এ সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। অথচ সামাজিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ভেঙে গিয়ে একক পরিবারপ্রথার প্রসার ঘটেছে। ফলে অনেক প্রবীণ একাকী হয়ে পড়ছেন। শহরাঞ্চলে সন্তানরা চাকরি বা শিক্ষার কারণে বাসা থেকে দূরে থাকায় অনেক প্রবীণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন ভাড়া করা সহায়তাকারী কিংবা প্রতিবেশীদের ওপর। এ পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রবীণদের সুরক্ষা এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে, আমাদের প্রয়োজন একটি সম্প্রদায়ভিত্তিক (কমিউনিটি-ভিত্তিক) সমন্বিত সুরক্ষাব্যবস্থা।
প্রবীণ সুরক্ষায় সরকারি উদ্যোগ
সরকার প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে: ১. ২০১৩ সালের জাতীয় প্রবীণ নীতি (National Policy on Older Persons); ২. সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রবীণ কল্যাণ ফাউন্ডেশন; ৩. বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি; ৪. যার আওতায় ৬২ লাখেরও বেশি প্রবীণ নাগরিক মাসিক আর্থিক সহায়তা (বয়স্কভাতা) পান, যা বর্তমানে ৫০ টাকা বৃদ্ধি করে ৬৫০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের জন্য প্রাধান্য ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এ সুবিধাগুলো অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের কাছে পৌঁছায় না, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। অনেক প্রবীণই জানেন না কীভাবে এসব সেবার জন্য আবেদন করতে হয়, আবার অনেকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ‘সুপারিশ’ ছাড়া সুযোগ পান না।
কেন প্রয়োজন কমিউনিটি ভিত্তিক সুরক্ষা?
শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে প্রবীণদের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে স্থানীয় সম্প্রদায়, এনজিও, যুবসমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি প্রতিবেশীরাও। কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা মানে হলো, প্রবীণ ব্যক্তিটি যেখানে থাকেন, সে জায়গার মানুষজন, প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সরকার যেন সম্মিলিতভাবে তাকে সহায়তা করে, তার চাহিদা বোঝে এবং তার পাশে দাঁড়ায়।
পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের পুনরুদ্ধার
বাংলাদেশে প্রবীণরা ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতেন। আজ সেই মূল্যবোধ কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও পুনরায় সেই বন্ধনকে শক্তিশালী করার সময় এসেছে। সমাজে সচেতনতা বাড়িয়ে প্রবীণদের সম্মান ও যত্নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে নতুন প্রজন্ম প্রবীণদের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। পরিবারে ‘প্রবীণবান্ধব পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন।
এনজিও ও সেবামূলক সংগঠনের ভূমিকা
দেশের বিভিন্ন এনজিও যেমন- হেল্পএজ বাংলাদেশ, ব্র্যাক, কারিতাস ইত্যাদি সংগঠন প্রবীণদের সেবায় ইতোমধ্যে কাজ করছে। তারা প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পরামর্শসেবা, হেল্পলাইন এবং সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তাদের জীবনকে স্বাভাবিক ও সম্মানজনক রাখতে সহায়তা করছে। অনেক জায়গায় ‘প্রবীণ ক্লাব’ চালু হয়েছে, যেখানে প্রবীণরা আড্ডা দেন, পত্রিকা পড়েন, খেলাধুলা করেন এবং একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। এটি প্রবীণদের মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রবীণসেবা
বর্তমানে টেলিমেডিসিন, মোবাইল অ্যাপস ও স্মার্টফোন হেল্পলাইন সেবার মাধ্যমে প্রবীণরা সহজে স্বাস্থ্যসেবা ও সহায়তা পেতে পারেন। অনেকেই অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন, ওষুধ মনে রাখছেন, এমনকি পুলিশ বা অ্যাম্বুলেন্স ডেকেও নিচ্ছেন। সরকার বা বেসরকারি সংস্থা চাইলে প্রবীণদের জন্য সহজবোধ্য অ্যাপ তৈরি করতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য পরামর্শ, আইনি সহায়তা ও জরুরি সেবার নম্বর থাকবে।
প্রতিবেশী ও স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা
একটি প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনে প্রতিবেশীদের ভূমিকা অমূল্য। অনেক প্রবীণই নিঃসঙ্গ অবস্থায় দিন কাটান, যেখানে একজন সহানুভূতিশীল প্রতিবেশী হতে পারেন তার জীবনের আশ্রয়। স্বেচ্ছাসেবক তরুণদের মাধ্যমে প্রবীণদের বাড়িতে গিয়ে সঙ্গ দেওয়া, ওষুধ পৌঁছে দেওয়া বা প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার মতো কার্যক্রম চালানো যেতে পারে।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ
মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা সভা, চিকিৎসা শিবির এবং বিনামূল্যে সেবা দেওয়া যেতে পারে।
প্রবীণ নির্যাতন ও অবহেলা: একটি নীরব সংকট
প্রবীণ নির্যাতন একটি গোপন ও লজ্জাজনক বাস্তবতা, যা সমাজে খুব কম আলোচিত হয়। এটি হতে পারে মানসিক, শারীরিক, আর্থিক এমনকি আইনি অবহেলার রূপে। অনেক প্রবীণ সন্তান বা আত্মীয়স্বজন দ্বারা অবহেলিত হন, তাদের সম্পত্তি জবরদখল করা হয়, এমনকি বাড়ি থেকে বের করেও দেওয়া হয়। এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রবীণদের জন্য আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সমাজে এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া খুব জরুরি।
সবশেষে বলতে হয় যে- প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও যত্ন শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক এবং মানবিক প্রয়োজন। তারা একদিন আমাদের জন্য পৃথিবী গড়েছেন- পরিবার, সমাজ ও দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। আজ আমাদের দায়িত্ব, তাদের গড়া পৃথিবীতে তাদের একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জায়গা নিশ্চিত করা।
লেখক: অধ্যাপক (আইন), বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]