ঢাকা ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কুমিল্লায় মহাসড়কে পুলিশের গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান ছয় বিষয়ের অনার্স কোর্স কি আসলেই বাতিল হচ্ছে? যা জানালেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গফরগাঁওয়ে কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হত্যা সরকার আ.লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধই রাখতে চায়: তথ্য উপদেষ্টা দুইজনের মৃত্যুর পর ডেঙ্গুর টিকা স্থগিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় নিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব বাতিল অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনের লাল বাহাদুর দুধ দিয়ে গোসল করে আর্জেন্টিনা ছেড়ে ব্রাজিল শিবিরে ওজন কমানোর অনুমোদনহীন ওষুধের নতুন ক্রেজ এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনায় সম্মতি রাশিয়ার পাঠকের গল্প : বিষ খেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার চায়নিজ জামাই চাকরি দেবে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে চলছে একনেক সভা বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ফ্রি গুগল এআই প্রো নিয়ে এল টেকনো ব্রাজিলিয়ানদের সুখবর দিলেন নেইমার রংপুরে ওয়ার্ডভিত্তিক অপরাধচক্র শনাক্তের নির্দেশ আরপিএমপির ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের লিফলেট তৈরির সময় আটক ২ দেশের ১৬ জেলায় বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস পড়ে পাওয়া গল্প থেকে ৭টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বাংলা হরমুজ প্রণালীর কাছে মার্কিন সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত ইরান-ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হলেও হুমকি চলছে দিনাজপুরে বেড়ার হোটেলে নিম্নমানের খাবারসহ একাধিক অভিযোগ ইরানে হামলা চালালে একাই লড়তে হবে: নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের ময়মনসিংহে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু বিশ্বকাপ নিয়ে অনারের ক্যাম্পেইন, ফোন-ট্যাবলেটসহ পুরস্কার জেতার সুযোগ বিশ্বকাপের আগে জয়ের ধারায় ফিরল স্পেন ইরান ও হিজবুল্লাহ আগের চেয়েও দুর্বল: নেতানিয়াহু
Nagad desktop

তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন উত্তরবঙ্গের মানুষের ন্যায় ও অস্তিত্বের লড়াই

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৫:৩৩ পিএম
তিস্তা বাঁচাও আন্দোলন উত্তরবঙ্গের মানুষের ন্যায় ও অস্তিত্বের লড়াই
মো. শামীম মিয়া

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী এবং গাইবান্ধা- এই অঞ্চল শুধু দেশের ভৌগোলিক মানচিত্রে নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। নদী, চর এবং জলাধারের অগণিত স্রোত দ্বারা সমৃদ্ধ এই অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এখানকার কৃষি, মৎস্য চাষ, নৌপরিবহন এবং অর্থনীতি- সবই নদীর স্রোতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা, প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং অবহেলার শিকার হয়েছে। নদীভাঙন, চর উত্থান, জলাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার ফলে মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং পরিবেশ ক্রমশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে।

উত্তরবঙ্গের এই সংকটের শিকড় শুধু প্রাকৃতিক নয়; বরং এটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উদাসীনতার ফল। নদী রক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় অধিকার বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিলম্ব, কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা না থাকা- সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করেছে। বিশেষ করে তিস্তা নদী, যা রংপুর, লালমনিরহাট এবং কুড়িগ্রাম জেলায় প্রবাহিত, এই অঞ্চলের কৃষি ও মানুষের জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তিস্তার জলবাহী শক্তি এবং চরভূমি স্থানীয় কৃষি উৎপাদন ও বাস্তুসংস্থানকে সমৃদ্ধ করে, তবে নিয়মিত নদীভাঙন এবং চর উত্থান এ অঞ্চলের অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্রমশ ধ্বংস করছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘তিস্তা বাঁচাও’ আন্দোলন দীর্ঘদিনের অবহেলার বিরুদ্ধে জনগণের সুসংগঠিত প্রতিরোধের বহিঃপ্রকাশ। নদীর ভাঙন, চর উত্থান এবং জলাবদ্ধতা লক্ষাধিক মানুষকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কৃষিজমি বিলীন, বাড়িঘর ধ্বংস এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণে মানুষ রাস্তায় নামছে। বিশেষ করে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি, গণমিছিল ও পদযাত্রা- যা রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলায় একযোগে ১১টি স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করছে যে, তিস্তা রক্ষা আন্দোলন শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং মানুষের জীবন, মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

নদী শুধু পানি বহন করে না; এটি অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ এবং রাজনীতির এক জটিল সমন্বয়। নদীভাঙনের ফলে কৃষিজমি বিলীন হচ্ছে, বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এটি শুধু স্থানীয় প্রশাসনের বা প্রকল্পের অভাবে ঘটে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক নীরবতা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অগ্রাধিকারহীনতার ফল। নদী রক্ষা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের ভূমিকা থাকলেও, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। সরকারের ধীরগতি, প্রকল্প বিলম্ব এবং রাজনৈতিক অনীহা- সবই নদীর জীববৈচিত্র্য, কৃষি এবং মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে।

উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ‘দীর্ঘ ১৬ বছর এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন রংপুরের মানুষের বুকের ভেতরে জগদ্দল পাথরের মতো বসিয়ে দিয়েছে।’ এটি নির্দেশ করে যে, রাজনৈতিক কারণে প্রকল্প বিলম্ব, স্থানীয় অধিকার অবহেলা এবং সরকারের উদাসীনতা- সবই উত্তরবঙ্গের জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকারের এই ধীরগতি শুধু স্থানীয় আন্দোলনকে জোরদার করেছে না, বরং নদী সংরক্ষণে জনগণের সচেতনতা ও উদ্যোগকেও শক্তিশালী করেছে।

উত্তরবঙ্গের জনগণ এখন নদী রক্ষার দাবিকে শুধু পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে দেখছে। আন্দোলনের মাধ্যমে দেখা গেছে, নদী রক্ষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জনগণ রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে সক্রিয় হয়েছে। ছাত্র, যুব, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় নেতা- সবাই একসঙ্গে এই আন্দোলনের অংশ হয়েছেন। মশাল প্রজ্বালন, গণমিছিল, পদযাত্রা এবং স্মারকলিপি প্রদান- সব মিলিয়ে এটি প্রমাণ করছে যে, নদী রক্ষা এখন মানুষের জীবন, অধিকার এবং ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

নদীভাঙন ও চর উত্থান শুধু স্থানীয় মানুষের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে না; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংসেরও কারণ। ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদীর বিভিন্ন স্থানে চর উত্থানের কারণে শতাধিক কৃষিজমি বিলীন হয়েছে। কৃষকরা মৌসুমি ফসল হারাচ্ছেন, যা স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। ভাঙনের কারণে বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবারগুলো অবিরাম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয় নদী তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

এই পরিস্থিতিতে নদী রক্ষা আন্দোলনের ভেতরে জনগণের সচেতনতা এবং সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় একযোগে মশাল প্রজ্বালন, গণমিছিল, পদযাত্রা এবং স্মারকলিপি প্রদান- সবই প্রমাণ করেছে যে, জনগণ নদী রক্ষা, ন্যায়বিচার এবং অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ। আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে রংপুর বিভাগের মানুষ বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।

সরকারের ধীরগতির কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি ও মৎস্যজীবী জনগণের ক্ষতি, বন্যা নিয়ন্ত্রণের অকার্যকর ব্যবস্থা এবং নদীভাঙনের ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। নদী সংরক্ষণ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন আর দেরি করতে পারবে না; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। আন্দোলনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ শুধু সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন না, বরং তারা আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির সঙ্গে নিজেদের দাবিকে মিলিয়ে দেখাচ্ছেন। বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক নদী রক্ষা প্রক্রিয়ার তুলনা দেখায়, নদী সংরক্ষণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ অপরিহার্য। অন্য দেশগুলোর নদী সংরক্ষণ প্রকল্প যেমন নেপাল ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর উদ্যোগ দেখায় যে, স্থানীয় জনগণকে অবহেলা করলে প্রকল্প ব্যর্থ হয় এবং পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতি বাড়ে। উত্তরবঙ্গের নদীভাঙন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিলম্বের কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে যাবে, স্থানীয় মানুষের আয় হ্রাস পাবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। বন্যা ও চর উত্থান, নদীর স্রোত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, এবং সরকারি উদ্যোগের অভাব- সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে একটি গভীর মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।

সামাজিক দিক থেকেও দেখা যায়, নদী ও পরিবেশের অবনতি স্থানীয়দের মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অগ্রাহ্যতার কারণে জনগণ আন্দোলনে নামছে। নদী রক্ষা আন্দোলন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি নয়, এটি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখার চূড়ান্ত মাধ্যম।

চূড়ান্তভাবে বলা যায়, তিস্তা নদী এবং উত্তরবঙ্গের মানুষদের অধিকার রক্ষা এখন আর স্থানীয় বা আঞ্চলিক ইস্যু নয়। এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব, যা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নদী সংরক্ষণ, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই অঞ্চল এবং দেশের বৃহত্তর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করছে যে, জনগণ সচেতন, সক্রিয় এবং নিজের অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শক্তিশালী ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকবে। সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের এই আন্দোলনকে সম্মান করা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং নদী সংরক্ষণ ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা।

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কেবল নদীর জন্য নয়; এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক শান্তি এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি অবিচ্ছেদ্য সংগ্রাম। এই আন্দোলনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, জনগণ আর নীরব থাকবে না। তারা সচেতন, একজোট এবং নিজের অধিকার রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, নাহলে নদী, কৃষি, জীবন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে।

উত্তরবঙ্গের ভাঙনপ্রবণ নদী, চর, কৃষি ক্ষতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সরকারের ধীরগতি এবং জনগণের আন্দোলন- সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি করেছে। তিস্তা নদী সংরক্ষণ এবং মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে, শুধু নদী নয়, মানব জীবন, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হবে। জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, নদী রক্ষা এখন আর স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের ইস্যু।

উত্তরবঙ্গের মানুষ আর নীরব থাকবে না। তারা সচেতন, সক্রিয় এবং নিজের অধিকার আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই আন্দোলন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী ন্যায়বিচার, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে থাকবে। সরকারের দায়িত্ব হলো এই আন্দোলনকে সম্মান করা এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে নদী, কৃষি, মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ ও কলামিস্ট, আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা
[email protected]

নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

আমাদের দেশে পত্রিকান্তরে নারী নির্যাতনের যে খবর প্রায়ই  সামনে আসে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এরই অংশ হিসেবে দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা আলোচনার মধ্যেও এ বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার সব নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। সে জায়গায় আমরা যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছি।

পুলিশের দেওয়া এক মাস আগের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। এ সংখ্যাগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের কষ্ট, একটি পরিবারের দুঃখ এবং একটি সমাজের দায়। একটি মেয়ে বা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

২০২৫ সালে দেশে নারী নির্যাতনের প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে। গড় হিসাবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তব সংখ্যা হয়তো আরও বেশি। অনেক ঘটনা থানায় পৌঁছায় না। সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকোচ কিংবা অপমানের ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

এই নীরবতাই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অপরাধীরা তখন আরও সাহসী হয়ে ওঠে। তারা ধরে নেয়, শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি বাড়তে থাকে।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দৃশ্য অনেক কিছুই বলে দেয়। আদালতের করিডরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। কেউ মেঝেতে বসে আছেন। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকের সঙ্গে স্বজন রয়েছে। আবার অনেকেই একা। তাদের চোখে ক্লান্তি। মুখে উদ্বেগের ছাপ। কেউ হয়তো প্রথমবার আদালতে এসেছেন। কেউ বছরের পর বছর ধরে একই পথে হাঁটছেন।

অনেক সময় আদালতের ভেতরে জায়গা হয় না। বিচারপ্রার্থীদের বাইরে বসে থাকতে হয়। কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কেউ উদ্বেগে আইনজীবীর দিকে তাকান। এই অপেক্ষা শুধু মামলার ডাকের জন্য নয়। এটি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। অনেকের কাছে এটি মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।

আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু আইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বাস্তবতা আরও জটিল। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আইন কাগজেই থেকে যায়। তদন্তে ধীরগতি বা প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা থাকলে মামলার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও মামলা করতে পারেন না। পরিবার থেকে চাপ আসে। সমাজের ভয় থাকে। কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। তখন ভুক্তভোগীর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় আপসের চাপ তৈরি হয়। কখনো অর্থের প্রলোভন দেওয়া হয়। কখনো আবার ভয় দেখানো হয়।

যেসব মামলা আদালতে আসে, সেগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ছে। কিন্তু অগ্রগতি খুব কম।

বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে দূরে সরে যান। কেউ ভয় পান। কেউ আর ঝামেলায় জড়াতে চান না। ফলে মামলার অগ্রগতি থমকে যায়। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঝেমধ্যে নৃশংস ঘটনার খবর সামনে আসে। কোথাও কিশোরী ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কোথাও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কোথাও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ঘটনা সমাজকে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভও দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষোভ ম্লান হয়ে যায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারী নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মানসিকতার সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক অপরাধী মনে করে শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। এ ধারণাই অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।

এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। নারীর প্রতি সম্মান এবং সমতার ধারণা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ শেখানো জরুরি। 

গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের ঘটনা সামনে আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করাও প্রয়োজন। সংবাদ কেবল তথ্য দেয় না। এটি সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায় রয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের পর অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। এ সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তারা দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারী অধিকার কোনো স্লোগান নয়। এটি মৌলিক মানবাধিকার।

প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব এবং প্রত্যেক নারীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম
গণতন্ত্রে হতাশা এবং নেতৃত্বে অসন্তোষ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি, তা কখনোই ওয়াশিংটনকে সামরিক স্বৈরশাসক এবং স্বৈরাচারী শাসকদের সমর্থন করতে বাধা দেয়নি। অথচ ওয়াশিংটনের নীতি ছিল এতে বাধা দেওয়া। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে, উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বের কাছে একের পর এক আত্মসমর্পণ করে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো। সে সময় ওয়াশিংটন এবং তার মিত্রদের কাছে এসব উন্নয়নশীল দেশ ব্যাপক সামরিক কর্তৃত্ববাদের শিকার হয়। আজও সে পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু নয়। পৃথিবীতে এমন মানুষ আছেন, যারা মনে করেন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের পেছনে ভয় বা সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং অন্যান্য দেশের প্রতি অবজ্ঞাই প্রধান প্রেরণা। এক সময় রাশিয়া ছিল বিশ্বের দুই পরাশক্তির একটি; কিন্তু সেই মর্যাদা সে হারিয়েছে। রাশিয়া জানে, অন্যান্য দেশের সম্মান সে আর পায় না। বারাক ওবামা একসময় রাশিয়াকে কেবল একটি আঞ্চলিক শক্তি বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইউক্রেন যুদ্ধ সেই হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারেরই একটি প্রচেষ্টা। যা কিছুটা বিস্ময়কর, তা হলো ইউরোপের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানও একই ধরনের প্রেরণায় চালিত। পুরোনো ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৃষ্টি ছিল আধুনিক ইউরোপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা করে, উদারপন্থি দলগুলোর সাফল্যকে উৎসাহ দেয় এবং প্রয়োজনে নীরবে সেই শক্তিগুলোকে দুর্বল করে, যাদের তারা খুব বেশি বাম বা ডান বলে মনে করত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে মার্শাল পরিকল্পনার মাধ্যমে বিতরণ করা মার্কিন সহায়তা সমন্বয়ের জন্য গড়ে তোলা এক ব্যবস্থায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বেড়ে উঠে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা, আইনের গুরুত্ব ও উদার গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ইউরোপের জন্য এক নতুন শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। 

পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আধিপত্য ভেঙে পড়ার পর, গণতান্ত্রিক নীতিমালা আত্মস্থ করার শর্তে ইইউ দক্ষিণ ও পূর্বের দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত হয়। বহু দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রসৃষ্ট উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল্যবোধকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি করে ধারণ করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এখন ট্রাম্প প্রশাসন পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়ে ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন ব্যবস্থায় তা প্রতিস্থাপন করতে চায়। বিশ্বের অবস্থা দেখে মন খারাপ লাগছে? এর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে? এমনটা শুধু আপনারই নয়–অনেক মানুষই এখন এভাবেই ভাবছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনীতি নিয়ে হতাশা এখন খুব সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, ডান আর বামপন্থিদের চরমপন্থা বাড়ছে, অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে না, ধনী-গরিবের ফারাক বাড়ছে। তার সঙ্গে আছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বর্ণবাদ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব, প্রাণী ও প্রকৃতির ধ্বংস আর জলবায়ুসংকট। সব মিলিয়ে মানুষ মনে করছে পৃথিবীটা যেন ক্রমেই কঠিন আর অস্থির হয়ে উঠছে। অনেকেই এখন খবরের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। কারণ, খবর তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০টি দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছে, তারা মাঝেমধ্যে বা নিয়মিত খবর এড়িয়ে চলে। ২০১৭ সালের তুলনায় এ সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। ইউরোপে রাজনৈতিক মনোভাবের ক্ষেত্রে তীব্র নেতিবাচকতা স্পষ্ট। ফ্রান্সে ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ব্রিটেনে এই হার ৭৯ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ। বৈশ্বিক চিত্র নিয়েও ইউরোপীয়দের হতাশা প্রবল। এর বিপরীতে চীন, সৌদি আরব বা নাইজেরিয়ার মানুষ তুলনামূলক আশাবাদী। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে অনেক দেশই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক হুমকি হিসেবে দেখে। 

তবে চিত্রটা সবখানেই এক নয়। তুরস্কে ইসরায়েলকে প্রধান হুমকি মনে করা হয় আর গ্রিসে তুরস্ককে। কানাডার মতো কিছু দেশে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে প্রধান মিত্র ও প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হয়। গণতন্ত্র নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এখন পশ্চিমা সমাজে সর্বব্যাপী। বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। ব্রিটেনের নেতা কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা মাত্র ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর অবস্থা আরও দুর্বল। তাদের জনপ্রিয়তা যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ শতাংশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন এখন প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ৫৪ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের উচ্চ জনপ্রিয়তাও এখন ধাক্কা খেয়েছে। চীনে শি জিনপিং সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখনো অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করে। এই অন্ধকার পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? তার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক উদাহরণ। আশার কথা হলো, রাশিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র–এই তিন দেশে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পুতিন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প–এই তিন নেতার প্রভাব কমে গেলে বৈশ্বিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসতে পারে।

রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার পর পুতিনের অবস্থান এখন সবচেয়ে দুর্বল। তিনি দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। অনুমান করা হয়, অন্তত সাড়ে ৩ লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দ্রব্যমূল্য ও কর বেড়েছে, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে সমালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। এদিকে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। রেড স্কয়ারের বিজয় দিবসের প্যারেডও নিরাপত্তা শঙ্কায় ছোট করে আয়োজন করতে হয়েছে। 

পুতিনের প্রকাশ্য উপস্থিতি কমেছে, ক্ষমতার অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের খবরও শোনা যাচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থান বা হত্যার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। সত্য-মিথ্যা যা-ই হোক, সম্প্রতি পুতিনের বক্তব্য–যুদ্ধ শেষের পথে–এই চাপেরই প্রতিফলন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও কঠিন সময়ের মুখে। অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে এবং সেটি মূলত তার ওপর গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় হামাসকে ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ এবং দুর্নীতির মামলা–সব মিলিয়ে তার অবস্থান নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে ব্যর্থতা, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং লেবাননে সংঘাত। এসবই ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে নির্বাচনে টিকে থাকা তার জন্য কঠিন হতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। তার নীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, জলবায়ুসংকট অস্বীকার, ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ, সামরিক হুমকি–সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে হতাশা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিই নির্ধারক। অর্থনীতি যদি খারাপ থাকে, তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে, এমনকি অভিশংসনের পথও খুলতে পারে। যেকোনো দেশের মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ীই চলবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব দেশ-জাতির চিন্তাচেতনা-পছন্দ-আকাঙ্ক্ষার মানের উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটানো। তাদের দায়িত্ব সেভাবেই সেখানে শাসন কাঠামো ও পদ্ধতির পরিবেশ তৈরি করা। একটি অগ্রসর রাজনৈতিক ধারা বা সংস্কৃতির বিস্তার ও সমাজের গুণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা। 

কিন্তু নীতিহীন, দুর্নীতিবাজ শাসকদের পাল্লায় পড়ে দেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পিছিয়ে যায়, সংকটপূর্ণ হয়। যদি পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হন, নেতানিয়াহু পরাজিত হন এবং ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। অবশ্য রাশিয়ায় নতুন নেতৃত্ব এলেও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা থাকতে পারে। তবু নতুন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিদায়ে নিরাপত্তা ইস্যু থাকবে, তবে চরম ডানপন্থি দলগুলো সরকারে না এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমনপীড়ন কমতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি হবে। ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি অপসারিত হতে পারেন, আবার ক্ষমতায় থেকেও প্রভাব হারাতে পারেন। ইতিহাসে যেমন অনেক ক্ষমতাবান নেতাই শেষ পর্যন্ত পেছনে পড়ে গেছেন, তেমনটাই ঘটতে পারে তাঁর ক্ষেত্রেও। একটি বিষয় নিশ্চিত–ট্রাম্পের প্রভাব কমলে বিশ্বরাজনীতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। পুতিন ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার যে জোটসুলভ অবস্থান, তা ভেঙে গেলে পশ্চিমা বিশ্বের হতাশ মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে। একইভাবে ট্রাম্পও এমন এক সামাজিক ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চান, যা তাকে ও তার বিশ্বদৃষ্টিকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তার কর্মকর্তারা স্বৈরশাসক ও রাজাদের কাছ থেকে সম্মান পান; কিন্তু তারা জানেন, বহু গণতান্ত্রিক দেশের নেতাই তাদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন। বিদ্যমান সম্মানের শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে এখন যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্ব গড়তে চায়, যেখানে ট্রাম্প নিঃশর্ত আনুগত্য পাবেন। আইনের শাসন ও বহুপক্ষীয়তার ওপর জোর দেওয়া ইউরোপই হলো সেই অবশিষ্ট অংশের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ–একটি সম্পূর্ণ মর্যাদা ও মূল্যবোধের ব্যবস্থা, যা ট্রাম্প প্রশাসন ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু এর শেষ পরিণতি কী হবে তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে 
[email protected]

কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ধর্ষণ একটি জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক ব্যাধি, যা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করার পাশাপাশি সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুরুষ কীভাবে আচরণ করতে পারবেন এবং নারী কীভাবে আচরণ করবেন–এই দ্বিমুখী শিক্ষার মধ্যেই ধর্ষণের বীজ লুকিয়ে থাকে। শুধু আইন প্রয়োগ বা অপরাধীদের শাস্তির মধ্যে এ সমস্যার সমাধান নেই, কারণ এ সহিংসতা মূলত সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যদিয়েই পুনরুৎপাদিত হয়। সুতরাং, এ সংকট নিরসনে আমাদের সামাজিকীকরণ, ধর্ম-সংস্কৃতি, আইনি কাঠামো, মিডিয়া, অর্থনীতি এবং শিক্ষা প্রতিটি স্তরে বৈপ্লবিক পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় যে, পরিবার ভুক্তভোগীর জন্য প্রথম সুরক্ষা বলয় হওয়া উচিত, সেই পরিবারই অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা, সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে অপরাধীর পক্ষ নেয়, যা নারীর ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একটি নীরব সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করে। এখানে শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় কাজ করে, যেখানে সম্মান ধারণাটি নারীর যৌন পরিচ্ছদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ফলে, ভুক্তভোগী নারীকে অপরাধের শিকার হওয়ার পরও সমাজ ও পরিবার উভয়ের কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় যৌন হয়রানি নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকে গেছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানের ঘাটতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত উপেক্ষা, যা অপরাধীদের সহায়ক এবং ভুক্তভোগীদের নিঃস্ব করে তোলে।

শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং সম্মতির ধারণা দেওয়া না হলে তারা জানতেই পারে না কখন, কোথায় এবং কীভাবে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। শুধু তাই নয়, এ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নির্যাতন চালাতে আরও সাহস পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক দিন থেকেই সমাজপতিদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ধর্ষকের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কিশোরী-নারীকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে। সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার কারবারে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের ভরসাস্থল হিসেবে যারা কাজ করছেন, তারাও এমন দীক্ষা নিচ্ছেন, চর্চা করছেন। ঠিক করে দিচ্ছেন, কখন কোথায় কীভাবে কত টাকা দেনমোহরে এসব অসহ্য ‘বিয়ে’ হবে। সাম্প্রতিককালে নানারকম আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে আমাদের সমাজও যে চরম অবক্ষয়ে পতিত হয়েছে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

সমাজে কেবল নারী ও শিশুর ওপর বহুমাত্রিক নির্যাতনের বিষয়টি বিবেচনা করলেও এ বিষয়ে কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়। দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের সাম্প্রতিক যেকোনো পরিসংখ্যানই আঁতকে ওঠার মতো। তবে, পরিসংখ্যান বিবেচনায় না এনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রবণতাগুলো দিয়েও বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেকোনো সমাজেই শিশুসন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা মা-বাবার কাছে। কিন্তু খোদ বাবাই যখন সন্তানের ধর্ষক হয়ে ওঠে তখন সন্তান-বাৎসল্যের চিরায়ত ধারণাটিই ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ‘বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষিত’ এখন আর নতুন কোনো সংবাদ শিরোনাম নয়। এ সমাজে ‘মায়ের সহযোগিতায় বাবার বিরুদ্ধে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ’-এর মতো শিরোনামও হয়েছে। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের পরিসংখ্যানের মতোই তাই সমাজের মানবিকসংকটের দিকটাও বিশ্লেষণ করা জরুরি। ধর্ষণ রোধ করতে না পারা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিককালের ভয়াবহতম এক সামাজিকসংকট। শহর-গ্রাম-মফস্বল, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-হাসপাতাল-বিপণিবিতান থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট-স্টেশন-টার্মিনাল-গণপরিবহন কোথায় ধর্ষণ হচ্ছে না। মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া এ জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারার কারণে নারীর অগ্রগতি ও সামাজিক প্রগতি দুটোই মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। বহু স্তরে বিভক্ত সমাজে ক্ষমতা-সম্পর্কের ভারসাম্যহীন বিন্যাসের সঙ্গে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এ ক্ষেত্রে এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক কাঠামোয় প্রকৃত অর্থেই নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু সংগঠন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সম্প্রতি ধর্ষণের প্রতিবাদে সমাজে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আগের চেয়ে বেড়েছে। ছাত্রছাত্রী তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে নাগরিক সমাজকেও এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। না হলে সমাজে মহামারি আকারে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ার এ মানবিকসংকটের দায় পুরো সমাজকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া দূর করে এ-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতাগুলো দূর করতে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। দেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন কন্যাশিশুসহ সব বয়সী নারী। নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বিবেচনায় সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় দেশবাসী আতঙ্কগ্রস্ত সময় অতিবাহিত করছে। এ পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে; যা সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার অন্তরায়। নারীর প্রতি এ ধরনের আচরণ দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নাটোরে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ সম্প্রতি দেশজুড়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছে সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস। উদ্বেগজনকভাবে, শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০টি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোনোটিই যথেষ্ট নিরাপদ নয়।

পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল–গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘন ঘন ঘটছে যে বেশির ভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না। অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকসংকটে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সে উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এ ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে–গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ। একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের একেকটি ব্যর্থতার গল্প। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও–সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়।

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছে দেশবাসী। ক্ষোভ, শোক আর বিক্ষোভে আগুন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ধরণী দ্বিধা হও! কোনো ঘরে আর কন্যাসন্তান জন্ম না নিক। কন্যা-জায়া-জননী কোনো মায়াভরা শব্দের মানুষ আর না থাকুক...!’। আট বছরের মেয়েও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়–তারা নরপিশাচ। এসব নৃশংসতার মাত্রা কমিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘটনার পর থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামিসা হত্যার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও অভিভাবকরা সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এ ধরনের অপরাধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের নিজের সন্তান আছে, তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ আরও বেশি কাজ করে।

গত মাসে রাজধাণীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেয়। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট–এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে। ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর।

২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। শিশু–যাদের হাসিতে ভরে ওঠার কথা প্রতিটি ঘর, যাদের হাতে থাকার কথা রঙিন খাতা, খেলনা আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুরাই এখন একের পর এক সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি–এসব কারণেই এমন ভয়াবহ অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ছে। শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়–এর পেছনে আছে একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন এবং এক মায়ের বুকভরা কান্না। ধর্ষণ গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুক না কেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ-জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিকসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এ সংকট নিরসনে প্রবলভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সবারই। এ সংকট উত্তরণে দলমতনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি

অবৈধ অভিবাসন কিছু মানুষের কারণে কেন অপমানিত হবে ১৮ কোটি বাংলাদেশি?

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম
কিছু মানুষের কারণে কেন অপমানিত হবে ১৮ কোটি বাংলাদেশি?
কাজী আসমা আজমেরী

আমি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের ১৬১টি দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম বার ভিয়েতনাম গিয়েছিলাম। তখন রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং না থাকায় আমাকে ভিয়েতনামের ইমিগ্রেশন হেফাজতে থাকতে হয়েছিল।

পরবর্তীতে একই বছরের ১ মে সাইপ্রাসে যাই। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য তখন দেশটিতে ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ ছিল। দূতাবাস থেকে আমাকে জানানো হয়েছিল, রিটার্ন টিকিট ও হোটেল বুকিং থাকলে আমি সেখানে যেতে পারব। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই ভ্রমণে যাই। কিন্তু বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী হওয়ায় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, আমি হয়তো ইউরোপের অন্য কোনো দেশে অবৈধভাবে থেকে যাব। সেই সন্দেহে আমাকে প্রায় ২৭ ঘণ্টা ইমিগ্রেশন হেফাজতে রাখা হয়।

সেই অভিজ্ঞতা আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছিল। তখনই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই বিশ্ব ভ্রমণ করব এবং প্রমাণ করব যে বাংলাদেশের নাগরিকরাও সম্মানজনকভাবে পৃথিবী ঘুরে দেখতে পারেন। গত ১৬ বছরে আমি ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করেছি। কিন্তু ব্যক্তিগত এই অর্জনেও একটি বাস্তবতা বদলায়নি- এখনো অনেক বাংলাদেশি পর্যটক ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে আর দেশে ফেরেন না, কেউ সমুদ্রপথে ঝুঁকি নিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন, আবার কেউ অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করেন। এমনকি অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশ কম্বোডিয়াতেও বাংলাদেশিদের অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা রয়েছে।

দীর্ঘ ভ্রমণজীবনে অসংখ্য দেশের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা, সাধারণ মানুষ ও ভ্রমণপ্রেমীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। একটি বিষয় আমাকে বারবার ব্যথিত করেছে- বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের চোখে তাকানো হয়। এর জন্য দায়ী বাংলাদেশের কোটি কোটি সৎ নাগরিক নন; দায়ী অবৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করা কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড।

সমুদ্রপথে, দালালের মাধ্যমে কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে গিয়ে আর দেশে না ফেরার প্রবণতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটি দেশের পাসপোর্টের মর্যাদা শুধু সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি সেই দেশের নাগরিকদের আচরণ ও দায়িত্ববোধের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভ্রমণের সময় মালাউইতে আমার একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছিল। প্রথমে আমার অনলাইন ভিসা আবেদন বাতিল করা হয়। পরে সরাসরি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভিসা পাই। সেখানে ইমিগ্রেশন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় জানতে পারি, বহু বাংলাদেশি দেশটিকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে অন্য দেশে অবৈধভাবে চলে গেছেন। ফলে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখলেই তারা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা ইতালি, কেনিয়া এবং আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশেও হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে দেখেছি।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর প্রভাব পড়ছে সেই লাখো বাংলাদেশির ওপর, যারা বৈধভাবে পৃথিবী দেখতে চান, পর্যটন করতে চান, শিক্ষা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণ করতে চান। কয়েক হাজার মানুষের অবৈধ কর্মকাণ্ডের দায় পুরো জাতিকে বহন করতে হচ্ছে।

অবৈধ অভিবাসন কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতীয় সমস্যা। দালালচক্র শুধু মানুষের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয় না, তারা দেশের মর্যাদাকেও ক্ষুণ্ন করে।

আমাদের প্রয়োজন আরও কঠোর আইন প্রয়োগ, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান এবং সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে তরুণরা বুঝতে পারে যে শর্টকাটে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপমান, প্রতারণা এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজ বাংলাদেশে লাখো তরুণ-তরুণী আছেন, যারা বিশ্বকে জানতে চান, বৈধভাবে ভ্রমণ করতে চান এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিচয় তুলে ধরতে চান। তাদের স্বপ্নকে সম্মান জানাতে হলে অবৈধ অভিবাসনের সংস্কৃতি বন্ধ করতেই হবে।

কারণ, একটি পাসপোর্ট শুধু ভ্রমণের দলিল নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়, মর্যাদা ও আত্মসম্মানের প্রতীক।

লেখক: আন্তর্জাতিক পর্যটক (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ১৬১টি দেশ ভ্রমণ করেছেন)।

বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস আজ
ছবি: সংগৃহীত

৩ জুন ‘বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস’ বা বিশ্ব মুগুর পা দিবস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের রূপকার, আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ড. ইগনাচিও পনসেটি-এর জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে প্রতি বছর এই দিনটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ড. পনসেটি এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন, যা কোনো ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়াই মুগুর পা বা ক্লাবফুট সম্পূর্ণ সারিয়ে তুলতে সক্ষম। বর্তমানে সারা বিশ্বে এই পদ্ধতিটি ‘পনসেটি মেথড’ বা পনসেটি পদ্ধতি নামে সমাদৃত।

এ দিবসের মূল লক্ষ্যই হলো— ক্লাবফুট সম্পর্কে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর জন্য সঠিক ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

২০২৬ সালের বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসের বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে সুর মিলিয়ে আমাদেরও মূল লক্ষ্য হলো— কোনো শিশু যেন চিকিৎসার অভাবে পঙ্গুত্ব বরণ না করে এবং কোনো মাকে যেন এই জন্মগত ত্রুটির কারণে সামাজিক বঞ্চনার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করা।

দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে, বিশেষ করে ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে সমাজের অনেক গভীর ও করুণ বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। জন্মগত মুগুর পা বা ক্লাবফুট নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম দেশে বহুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় একটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবারকে বাস্তব জীবনে যে ভয়াবহ মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তা আজও অত্যন্ত করুণ এবং হতাশার।

আমি আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি— ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের আর্থিক অবস্থা যদি বেশ সচ্ছল ও বিত্তশালী হয়, তবে এই শারীরিক ত্রুটিটি তাদের জীবনে তেমন কোনো বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কারণ, তারা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে শিশুটিকে সুস্থ করে তোলেন। কিন্তু এর বিপরীতে, পরিবারটি যদি আর্থিকভাবে অনটন আর অভাবের দুষ্টচক্র দ্বারা আবর্তিত থাকে, তবে তাদের কষ্ট আর বঞ্চনার কোনো সীমা থাকে না। দারিদ্র্যের কশাঘাতের সঙ্গে যখন সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হয়, তখন একটি শিশুর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়।

সবচেয়ে বড় আশ্চর্যের এবং ব্যথিত হওয়ার বিষয় হলো— আমাদের সমাজে শুধুমাত্র ক্লাবফুট আক্রান্ত বাচ্চা প্রসব করার অপরাধে (!) দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ নেমে আসে। একটি জন্মগত ত্রুটির জন্য সম্পূর্ণভাবে মাকে দোষারোপ করা হয় এবং তাকে কলঙ্কিত করা হয়।

আমরা ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের কথা বলছি; আমরা মনে করি এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, ইন্টারনেটের যুগ। মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনেক প্রশ্নের সমাধান এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক ক্লিকেই জুটে যায়। অথচ, এত কিছুর পরও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ অনেক কুসংস্কার আর বদ্ধমূল ধারণার দাস হয়ে আছে। এই তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগেও আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বুকের ভেতরের চাপা কান্নাগুলো যেন অনেকাংশেই অব্যক্ত থেকে যায়। পেশাগত কারণে যখন আমি তাদের মনের কষ্টের কথাগুলো জানতে চাই, তখন অনেকেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন। তারা জানান, সমাজের মানুষ, এমনকি তাদের নিজ পরিবারের সদস্যরাও আজও মনে করেন— এটি মায়ের কোনো পাপ বা বাবার কোনো খারাপ কাজের ফল!

মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় আমরা যখন ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের মায়েদের বিভিন্ন চিকিৎসাতথ্য ও ইতিহাস সংগ্রহ করি, তখন এক ভিন্ন বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে।

দেখা যায়, একজন মা তার গর্ভকালীন সময়ে অত্যন্ত নিয়ম মেনে চলেছেন। তিনি গর্ভকালীন পরিচর্যার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করেছেন, নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেয়েছেন এবং তার গর্ভাবস্থায় কোনো ধরনের বড় জটিলতাও ছিল না। তারপরও তার গর্ভের সন্তানটি ক্লাবফুট নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। আবার এমন ঘটনাও দেখেছি যে, একজন মায়ের তিনটি সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানটি ক্লাবফুট আক্রান্ত হয়ে জন্মেছে, দ্বিতীয় সন্তানটি সম্পূর্ণ সুস্থভাবে জন্মেছে, কিন্তু তৃতীয়বার যখন তিনি আবার সন্তান প্রসব করেছেন, তখন সেই সন্তানটিও আবার ক্লাবফুটে আক্রান্ত হয়েছে।

এ ঘটনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানাটা আমাদের সবার জন্যই জরুরি। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ বলছে, মুগুর পা বা ক্লাবফুট মূলত একটি জন্মগত কাঠামোগত ত্রুটি (কনজেনিটাল ডিফরমিটি)। বিশ্বব্যাপী প্রতি এক হাজার জীবিত জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে গড়ে এক থেকে দুজন শিশু এই ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর কয়েক হাজার শিশু এই সমস্যা নিয়ে পৃথিবীর আলো দেখে। এর সুনির্দিষ্ট কোনো একক কারণ আজও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ইডিওপ্যাথিক’।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত এবং গর্ভকালীন পরিবেশগত কিছু অজানা কারণের সংমিশ্রণে এ সমস্যাটি তৈরি হয়। পরিবারে কারও এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে এটি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তাই প্রথম ও তৃতীয় সন্তানের ক্লাবফুট হওয়া এবং মাঝের সন্তানের সুস্থ থাকার বিষয়টি সম্পূর্ণ জিনগত বিন্যাসের একটি স্বাভাবিক গাণিতিক সম্ভাবনা মাত্র। এর সঙ্গে মায়ের খাদ্যাভ্যাস, তার কোনো কাজ বা কল্পিত কোনো ‘পাপ’-এর দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু আমাদের সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে জমে থাকা এই অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণাগুলোর সঙ্গে যখন পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপড়েন যুক্ত হয়, তখন ওই মা ও শিশুর দুর্দশার যেন কোনো শেষ থাকে না। এ অন্ধকার দূর করার লক্ষ্যেই আমরা ‘ওয়ার্ক ফর লাইফ’ প্রকল্পের মাধ্যমে ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আধুনিক চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। 

শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করছি। সমাজে ক্লাবফুটকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যে বদ্ধমূল ধারণা ও কুসংস্কারগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিপরীতে আমরা তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত পরামর্শ প্রদান করছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, মানুষের ভেতরের এই ভুল ধারণাগুলো ভেঙে দিয়ে একটি সহানুভূতিশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা।

তবে আজও আমাদের খুব আক্ষেপের সঙ্গে লক্ষ করতে হয় যে, ক্লাবফুটকে এখনও গ্রামাঞ্চলে একটি ‘অভিশাপ’ হিসেবেই দেখা হয়। আমরা নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছি, একটি মাকে অকারণে কলঙ্কিত করার এই যে নিষ্ঠুর সামাজিক রীতি— তা যেন চিরতরে বদলে যায়। আমরা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে চাই যে— ক্লাবফুট কোনো অভিশাপ নয়, এটি কেবলই একটি নিরাময়যোগ্য জন্মগত ত্রুটি।

এই ত্রুটি নিরাময়ে বর্তমানে ‘পনসেটি পদ্ধতি’ ম্যাজিকের মতো কাজ করে। এটি একটি অত্যন্ত সহজ, নিরাপদ এবং শতভাগ কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে কোনো বড় সার্জারির প্রয়োজন হয় না; বরং ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি প্লাস্টার (কাস্টিং) এবং পরবর্তীতে একটি বিশেষ জুতো বা ব্রেস ব্যবহারের মাধ্যমে বাঁকা পা সম্পূর্ণ সোজা ও স্বাভাবিক করে তোলা যায়। তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি যেটি প্রয়োজন, সেটি হলো— সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা। জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে) শিশুকে নিকটস্থ ক্লাবফুট ক্লিনিকে নিয়ে চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে ফলাফল সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়।

আর এ দ্রুত চিকিৎসার নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা। সেই সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, সেসব স্বাস্থ্যকর্মীদের (যেমন: পরিবার কল্যাণ সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী ও কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোভাইডার) একটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তারা যেহেতু সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের সঙ্গে কাজ করেন, তাই জন্মের পরপরই যদি তারা কোনো শিশুর পায়ের পাতায় সন্দেহজনক বাঁকাভাব বা ক্লাবফুটের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেন, তবে যেন কালক্ষেপণ না করে দ্রুত তাকে সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রেফার করেন।

একটি সুস্থ, সুন্দর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আসুন, ৩ জুন বিশ্ব ক্লাবফুট দিবসে আমরা এই শপথ নিই— বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের প্রসার ঘটিয়ে আমরা সমাজের সব কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে দেব। কোনো মা যেন আর অকারণে চোখের জল না ফেলেন এবং প্রতিটি ক্লাবফুট আক্রান্ত শিশু যেন সঠিক সময়ে চিকিৎসার মাধ্যমে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনের অধিকারী হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।

লেখক: সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক। ই-মেইল: [email protected]