গত ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে নিউইয়র্ক সিটির এস্টোরিয়া ওয়ার্ল্ড মেনারে কোয়ালিশন অব বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে কর্মজীবী নারীদের দৈনিক কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করা হবে। যা অনেকের চমকপ্রদ লাগলেও আবার অনেকে আশ্চর্যও হয়েছেন। আমি বিষয়টি নিয়ে দিক নিদের্শনামূলক সমালোচনা করতে চাই। যদিও আমি একজন ক্ষদ্র জ্ঞানের মানুষ।
নারীদের কর্ম ঘণ্টা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে জামায়াতে আমির যুক্তি দেখিয়েছেন, একজন নারী সন্তান জন্ম দেন, লালন-পালন করেন, আবার অনেক সময় পেশাজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পুরুষ যদি ৮ ঘণ্টা কাজ করেন, তাহলে নারীরও সমান সময় দেওয়া কি ন্যায্য? আমরা ক্ষমতায় এলে নারীদের কর্মঘণ্টা বর্তমানের ৩ ঘণ্টা কমিয়ে ৫ ঘণ্টা করব, যাতে তারা পরিবার ও সমাজের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
যুক্তিটি প্রণিধানযোগ্য কিন্তু আইন বলে অন্য কথা। বাংলাদেশ শ্রম আইন ,২০০৬ এর ১০০ ধারায় বলা হয়েছে, কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত দৈনিক আট ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করতে পারবেনা। তবে ১০৮ ধারা বলে একজন শ্রমিক দৈনিক ১০ ঘণ্টা কাজ করতে পারবে। আবার ১০৮ ধারায় অতিরিক্ত ভাতার কথা বলা আছে। অপরদিকে ১০৯ ধারায় বলা আছে, কোন মহিলা শ্রমিককে বিনা অনুমতিতে কোন প্রতিষ্ঠানে রাত দশটা হতে ভোর ছয়টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোন কাজ করতে দেওয়া যাবে না। এছাড়ও জাতীয় সংবিধানের ১৯(৩), ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ গুলো নারীদের এবং সমতার কথা বলা হয়েছে। নারীকে কিছু অগ্রাধিকার দিতে হবে এরকম কথা বলা হয়েছে কিস্তু নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য শ্রমঘণ্টা কমিয়ে প্রাধান্য দিতে হবে এমনটা কোথাও বলা নেই। সুতরাং অগ্রাধিকার দিতে গেলে আইনের এই ধারাগুলো সংশোধন ও পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। যা অনেকটাই সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। রাজনৈতিক দলগুলো চমকপ্রদক কথা বলতে গিয়ে নিজেরাই বিপদে পড়বে নাতো। যদি তাই হয় তাহলে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই নারী কর্মী নিয়োগে উৎসাহিত হবে না। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বদাই শ্রমঘণ্টাকে হিসাব করবে। তবে এটি সত্য যে, দলটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং তাদের প্রতি এক ধরনের মানুষের আস্থা রয়েছে সেই দলটি অন্তত মিথ্যা আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি দিবেনা। তবে এটি যেন মিথ্যা আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতি হিসেবে গণ্য না হয়ে একটি রাজনৈতিক নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে পরিণত হয় তার একটি রোড ম্যাপ দেয়ার চেষ্টা করছি। এটি যেভাবে নির্বাচনী ইস্তেহার হতে পারে –
বাংলাদেশ একটি জনবহুল রাষ্ট্র। ছোট্ট এই দেশটিতে বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা বসবাস করে। ইউএনএফপিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। এই জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের মানুষ আছেন ৬৫ শতাংশের বেশি। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষ প্রায় ৭ শতাংশ। আবার বাংলাদেশে প্রায় ২৭ লক্ষ বেকার রয়েছে। বাংলাদেশে বিশালসংখ্যক নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন। এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। যেকোনো দেশে এ বয়সের তরুণ-তরুণীরা হয় পড়াশোনায় থাকার কথা নতুবা কাজের মধ্যে থাকার কথা। কিংবা প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা। কিন্তু তারা কোন কাজ কর্ম করে না, তারা মূলত ‘ছদ্মবেকার’ নামেই পরিচিতি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এমন নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ।
এই বিশাল জনসংখ্যা কে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে কখনোই কোন অবস্থায় দেশ সমৃদ্ধশালী হবে না। তাই জনসংখ্যাকে কাজে লাগানোর জন্য তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিনিয়োগ। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত দূরূহ। প্রত্যেকটি অফিস কে আট ঘণ্টা কাজের বিপরীতে দশ ঘণ্টায় কাজের পরিধি বা কর্ম ঘণ্টা বৃদ্ধি করলে এর সমস্যার সমাধান হতে পারে। প্রতিটি অফিসে মোট শ্রমঘণ্টা কে দুটি শিফটে বিভক্ত করা যেতে পারে। একটি মর্নিং শিফট অন্যটি ইভিনিং শিফট। সকালের শিফটা সকাল আটটা হতে দুপুর একটা পর্যন্ত এবং বিকেলের শিফটটা দুপুর দুইটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত করা যেতে পারে। একটা থেকে দুইটা এই সময়টুকু নামাজের বিরতি সহ মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এতে করে বর্তমান কর্মসংস্থানের যে পরিমাণ আছে তার দ্বিগুণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমান কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন ভাতা চল্লিশ শতাংশ কমানো যেতে পারে এবং প্রত্যেক পরিবারের শিক্ষিত জনগণের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি করা আবশ্যক হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোও শ্রমঘণ্টা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি হবে আবার বেতন বাবদ খরচও ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং এতে করে প্রতিষ্ঠান বা সরকারের খরচের দিক থেকে একই থাকবে বিপরীতে যেটা হবে এই পাঁচ ঘণ্টা প্রত্যেকেই মনোযোগ সহকারে কাজ করবেন। ফলে উৎপাদন এবং দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। যা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে এবং বেকারত্বর অভিশাপ থেকে দেশ রক্ষা পাবে। অপরদিকে পরিবারগুলোতে দুজনে কর্মরত থাকায় তাদের অর্থের যোগানও বৃদ্ধি পাবে।
ধরুন একটি পরিবারে সদস্য সংখ্যা তিন থেকে চারজন, মা বাবা ও তাদের সন্তান। এখানে মা এবং বাবা যদি সকালে শিফটে কাজ করেন তাহলে সন্তানকে বিকেলের শিফটে স্কুলে পাঠাবেন। অথবা দুজন যদি দু শিফটে কাজ করেন তাহলে সন্তান কখনোই মা-বাবা ছাড়া থাকবে না অর্থাৎ সকালে মা অফিসে গেলে বাবা বাসায় থাকবে আবার বিকেলে বাবা অফিসে গেলে মা বাসায় থাকবে। এতে করে সান্ত্বনা তার নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠবে। যা ধীরে ধী সমাজের প্রতি একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রচলিত আছে,' অর্থই অনর্থের মূল' অর্থাৎ দারিদ্রতা বা পেটে ক্ষুধা থাকলে একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি অপর ব্যক্তির উপর চুরি বা চাকু ধরতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। অথচ যদি তার কর্মসংস্থান থাকে এবং পেটে খাবার থাকে তাহলে কখনোই সমাজ বিপথে যাবে না। তাই সঠিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে পাল্টে ফেলা সম্ভব হবে। দেশে বেকারত্ব ঘুচলে খুঁজবে অপরাধ প্রবণতা। সুতরাং বেকারত্ব দূর করা এটি রাষ্ট্রের জন্য যেমন নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা দিয়েছে তেমনি অপরাধ প্রবণতাও দূর করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরী। সতরাং এই প্রক্রিয়াটি বিচার বিশ্লেষণ করে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রক্রিয়াটি গ্রহণ করা গেলে, দেশে এক দিকে যেমন বেকারত্ব দূর হবে অপরদিকে অপরাধ প্রবণতাও কমে আসবে। একই সাথে রথ দেখা ও কলা বেচা দুটোই সম্ভব হবে।
তবে এখানে একটি সংশয়ের বিষয় হলো, অলস বা বেকার যুবক যদি না থাকে তাহলে রাজনীতির ময়দান জনশূন্য হবে। যদিও একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানের মন্তব্য হলো, নারীদের শ্রমঘণ্টা কমানো হবে। এটিকে শুধু নারী শ্রমঘণ্টাকে না দেখে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা যায় কিনা এবং রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে গণ্য করা যায় কিনা। যা দেশ ও জাতির কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। যদিও বর্তমান সময়ে সচেতন নাগরিক থেকে শুরু করে প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যেই এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। তাদের এই হতাশাগুলো অবান্তর নয়, এটি এক ধরনের খাঁটি দেশ প্রেমিকের লক্ষণ। প্রত্যেকটি নাগরিকের ভেতর দেশ প্রেম জাগ্রত হোক। বেকারত্ব সহ সকল অসংগতি দূর হোক, এটাই সবার কাম্য।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
[email protected]