ক্যাশলেস সমাজ বলতে এমন এক সমাজকে বোঝায় যেখানে আর্থিক লেনদেন নগদ মুদ্রা বা ব্যাংকনোট দিয়ে পরিচালিত না হয়ে ডিজিটাল তথ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। ক্যাশলেস বা নগদবিহীন ব্যবস্থায় ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ওয়ালেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো পদ্ধতিসমূহ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট ও লেনদেনের ব্যাপারগুলো ইলেকট্রনিকভাবে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। প্রথাগত বিনিময় পদ্ধতি থেকে শুরু করে মানুষ ধাতব মুদ্রা বা কাগজের নোটের ব্যবহার থেকে বর্তমানে ক্যাশলেস অর্থব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বিনিময়ের কাজগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা ইলেকট্রনিকভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতির প্রাথমিক ধারণা মেলে অ্যাডওয়ার্ড বেলামির ‘লুকিং ব্যাকওয়ার্ড’ নামক উপন্যাসে। এ গ্রন্থে তিনি নগদবিহীন লেনদেন ও দৈনন্দিন জীবনে নিষ্পত্তির প্রবণতার কথা তুলে ধরেন। বর্তমান বিশ্বের কোনো দেশই পুরোপুরি ক্যাশলেস ব্যবস্থায় নেই। তবে তা সত্ত্বেও সুইডেনের নাম উল্লেখ করার মতো। সুইডেনকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকা ক্যাশলেস সমাজ। কারণ সেখানে নগদ অর্থের ব্যবহার প্রায় বন্ধ। সেখানে মোট লেনদেনের মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ লেনদেন নগদ টাকায় হয়। আর বাকি সব হয়ে থাকে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল ব্যবস্থায়। তাদের দ্রুত অগ্রগতির পেছনে কারণ হিসেবে বলা যায়, সরকারি নীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা। ফলে সেখানে লেনদেন হচ্ছে আরও স্বচ্ছ, কমেছে অর্থ পাচার, নগদ টাকা ছিনতাই কিংবা জাল টাকার সমস্যার মতো সমস্যাগুলো অনেকটাই সমাধানের পথে। সুইডেনের মতো চীন, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও রাশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নগদবিহীন লেনদেন। আগে যেসব ক্ষেত্রে নগদ অর্থ দিয়ে লেনদেনগুলো হতো, এখন সেসবের বেশির ভাগই সম্পন্ন হচ্ছে ইলেকট্রনিকভাবে।
এরই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও ধীরে ধীরে ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে ঝুঁকছে। তবে সত্যি বলতে, আমাদের দেশে কাগুজে নোটের প্রচলন বেশি। মানুষজন এ গতানুগতিক নগদ লেনদেন ব্যবস্থা থেকে সহজে বের হতে চায় না। এদিকে এসব কাগুজে নোটের স্থায়িত্ব খুবই কম। এসব নোটের স্থায়িত্ব সাধারণত ৬-৮ মাস। ফলে এ সময়ের মধ্যেই নোটগুলোর বড় অংশই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আর এসব অগ্রহণযোগ্য নোট তুলে নিয়ে বিনষ্ট করে অর্থের প্রবাহ সমুন্নত রাখতে নতুন নোট ছাপতে সরকারের প্রতি বছর প্রায় ৪.৫ থেকে ৫০০ কোটি টাকা খরচ হয়। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ এসব নোটের বিপরীতে নতুন নোট ইস্যু করে। তাছাড়া চলমান চাহিদা অনুযায়ী সরকারকে প্রতি বছর নতুন নোট ছাপাতে আরও কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। ফলে দুয়ে মিলে বেশ বড় অঙ্কের টাকা সরকারকে নোট ছাপানোর পেছনে খরচ করতে হয়। সরকারের এ খরচ কমানোর জন্য ক্যাশলেস লেনদেন হতে পারে সবচেয়ে ভালো অপশন। ইতোমধ্যে লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংক ক্যাশলেস ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তির পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম কিউআর বা কুইক রেসপন্স। ফলে এ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত ব্যাংক এমএফএস বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের গ্রাহক কুইক রেসপন্স কোডের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোম্পানিগুলো অ্যাপভিত্তিক ক্যাশলেস লেনদেনকে আরও জনপ্রিয় করেছে।
ক্যাশলেস সমাজ মূলত একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। যার মূল লক্ষ্য হলো জাল টাকা, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি কমিয়ে একটি স্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন পরিবেশ গড়ে তোলা। পাশাপাশি নগদ টাকার নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি হ্রাস করা। ক্যাশলেস সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্ভব। যেখানে দেশের একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ মোবাইল ব্যাংকিংসহ অন্যান্য ডিজিটাল উপায়ে লেনদেন সম্ভব হবে। তাছাড়া ক্যাশলেস লেনদেনের মাধ্যমে সময়ের সাশ্রয় হয়, ব্যবসায়িক কার্যক্রম দ্রুত হয়। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি হয়, ফলে তারা সহজেই অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করে আয়ের সুযোগ পায়।
ক্যাশলেস সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এমন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন; যেখানে লেনদেন নিরাপদ, স্বচ্ছ ও ডিজিটালভাবে সম্পন্ন হয়। ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখে।
ক্যাশলেস লেনদেন শুধু অর্থনীতিকেই নয় বরং সমাজকেও বদলে দেয়। এটি দুর্নীতি, ঘুষ প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে, কারণ এখানে নগদ অর্থের অদৃশ্য লেনদেন কমে যায়। সরকারি বিভিন্ন ভাতা, শিক্ষাবৃত্তি, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতা প্রভৃতি বিতরণ করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা হ্রাস পায় ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধা পান। যদিও এ ক্ষেত্রেও ডিজিটাল জালিয়াতির ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে তবে সে আলোচনা বাদ থাকুক। ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে সরকার সহজেই অর্থনৈতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারে। স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ ও ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ক্যাশলেস ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে ঠিকই তবুও এ ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলো যেন পিছু ছাড়ছেই না। দেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব প্রকট। অনেক সাধারণ মানুষ এখনো অনলাইন লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেনই না, অনেকে আবার জানলেও ভয় পান। দেশের অনেক অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল বা ক্ষেত্রে বিশেষে অনুপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। ইন্টারনেট ও নেটওয়ার্কের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার ফলে ডিজিটাল লেনদেন নির্বিঘ্নে সম্ভব হয় না। যার ফলে অনেক সময় মানুষের আস্থার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এর পাশাপাশি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সাইবার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার উদ্বেগ। হ্যাকিং, ফিশিং, প্রতারণা প্রভৃতির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। মানুষ তাদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তি ব্যবহারে অনীহা বা বিশ্বাসের ঘাটতি, অনেকেই এখনো নগদ টাকা রাখাকেই নিরাপদ মনে করেন। ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্ট এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যারা ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে জন্মগ্রহণ করেননি, বরং জীবনের একটি পর্যায়ে এসে এটি শিখতে ও মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এসব ডিজিটাল ইমিগ্র্যান্টদের অনেকেই ডিজিটাল লেনদেনের চেয়ে নগদ লেনদেনকেই নিরাপদ ও শ্রেয় মনে করেন। অন্যদিকে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনো ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম গ্রহণে অনাগ্রহী বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। ফলে মানুষ চাইলেও ক্যাশলেস লেনদেন করতে পারে না। বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সারা দিনের প্রয়োজনীয় সব ধরনের লেনদেন ক্যাশলেস করতে চাইলে সম্ভব হয় না। তাকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নগদ অর্থে লেনদেন সম্পন্ন করতে হয়।
বাংলাদেশে ক্যাশলেস ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হলে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ কিরা জরুরি। প্রথমত, ডিজিটাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করে দেশের সর্বত্র নির্বিঘ্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
যেন দেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামেও নির্বিঘ্নে ক্যাশলেস লেনদেন সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করে জনগণকে ক্যাশলেস লেনদেনে সক্ষম করে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করে গোপনীয়তা রক্ষা করে তথ্য সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম গ্রহণে আগ্রহী করতে সরকারি প্রণোদনা ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ক্যাশলেস বাংলাদেশ এখন কোনো কল্পিত বিষয় নয়; বরং এটি এখন বাস্তবমুখী লক্ষ্য, যেটি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত সম্ভব। নগদবিহীন সমাজব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ, ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম করে তুলবে। এ প্রক্রিয়া বা রূপান্তর সফল করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নতকরণ প্রভৃতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা। দেশের সাধারণ নাগরিকরা সচেতনতার সঙ্গে এ রূপান্তরের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারলে হয়তো বাংলাদেশ একদিন সত্যিই ক্যাশলেস সমাজব্যবস্থায় পরিণত হবে। আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেদিন একজন ব্যক্তি কোনো নগদ লেনদেন ব্যতিরেকে অবাধে তার প্রয়োজনীয় সব লেনদেন সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে। এটি সম্ভব হলে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ আর কোনো স্বপ্ন থাকবে না; বরং হবে সত্যিকারের ক্যাশলেস বাংলাদেশ!
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ: ২০২০-২১
[email protected]