কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম কালিদাসপুর। ওই গ্রামের পাশেই মিরপুর উপজেলার আমলা ইউনিয়নের আর একটি গ্রামের নাম কচুবাড়িয়া পাশাপাশি দুটি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে সাগরখালী নদী। নদীকে ঘিরে অনেক ঘটনা রয়েছে, এলাকার নির্যাতিত কৃষক প্রজাদের ইংরেজবিরোধী এবং অন্যান্য বহু সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত। নির্যাতিত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে নীলকর ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন আমলার জমিদার কন্যা প্যারী সুন্দরী। সেই সঙ্গে অত্র এলাকার সংগ্রামী জনতাকে করেছে গৌরবান্বিত। এই এলাকার এক কৃতীসন্তান সময়ের সাহসী বীর জাতীয় পতাকার রূপকার, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও নিউক্লিয়াস সদস্য কাজী আরেফ আহমেদ। তার দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের কিছু সময়ে সঙ্গী হিসেবে আমার জানা কিছু তথ্য অতি সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করছি।
কাজী আরেফ আহমেদ আমলার কচুবাড়িয়া গ্রামে কাজী পরিবারে জন্ম নেওয়া কৃতীসন্তান। তিনি শৈশব থেকে এলাকায় খুব স্বল্প সময় কাটিয়েছেন। তিনি গ্রামীণ শৈশবে দেখেছেন গ্রামের অসহায় মানুষের দুঃখ, দুর্দশা ও জীবনকাহিনি এবং সমাজচিত্র। দেশ ও মানুষের কথা তিনি এখান থেকেই ভাবতে থাকেন। উল্লেখিত সাগরখালী নদীর পূর্ব পাড়ে বাল্য স্মৃতিবিজড়িত কচুবাড়িয়া গ্রামটি জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদের পৈতৃক ভিটেবাড়ি। ১৯৪২ সালে ৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে নানারবাড়িতে। সাগরখালী নদীর পশ্চিম পাড়ের কালিদাশপুর গ্রামটি বাংলার মুক্তি ও স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সেনানীর জীবন ট্র্যাডেজির ঠিকানা। এই গ্রামেরই প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ১৯৯৯ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারিতে এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশ ও জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন মহান এই নেতা।
ঢাকায় এককালে অতি সম্ভ্রান্ত এলাকা গোলাপবাগ-সংলগ্ন টিকাটুলিতে তার বাবা একটি ছোট্ট বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন। আগে তার বাবা কাজী আব্দুল কুদ্দুছ সাহেব ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, ১৯৪৭ দেশ ভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এখানে রয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন ও রেড রোজ নামের ঐতিহাসিক বাড়িটি। গোলাপবাগের এই বাড়িটি পাকিস্তান আমলে সর্বপ্রথম সিনেমা তৈরির শুটিং স্টুডিও হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এর নাম ছিল বেঙ্গল স্টুডিও।
বাড়িটি ঢাকার নবাবরা বাগানবাড়ি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ‘রেড রোজ’ নামকরণ করেন। ওই বাগানবাড়ির নামে এলাকার নাম হয় গোলাপবাগ। সেই সময়ে শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-ব্যবসায়িক-প্রগতিশীল ব্যক্তিদের আবাসস্থল ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ওই এলাকায়। কাজী আরেফ আহমেদ এবং সৈয়দ আলতাফ হোসেনসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়ার অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন ওখানে বসবাস করতেন।
ষাটের দশকের শুরুতে কাজী আরেফ আহমেদ জগন্নাথ কলেজের একজন প্রভাবশালী ছাত্রনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। অত্যন্ত মেধাবী, ত্যাগী ও নিবেদিত ছাত্রনেতা হিসেবে কাজী আরেফ আহমেদ অতিদ্রুত খ্যাতি অর্জন করেন। উক্ত এলাকার প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গে ছিল গভীর সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্ব। তিনি সব সময়ই প্রগতিশীল রাজনীতির চিন্তা করতেন, তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজী আরেফ আহমেদের ঘনিষ্ঠতা হয় তার আত্মীয় আমিনুল হক বাদশা ভাইয়ের মাধ্যমে। বাদশা ভাই এবং কাজী আরেফ আহমেদ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ১৯৬২, ১৯৬৪ ও ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচণ্ড ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যে যেসব ছাত্রনেতা বিকশিত হয়েছিলেন তাদের সঙ্গে শেখ মুজিব ও বাঙালি প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-চেতনায় বাঙালির স্বাধীনতার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এই চেতনা থেকেই গঠিত হয় স্বাধীনতা নিউক্লিয়াস। ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীনতা নিউক্লিয়াস অতি গোপনে কার্যক্রম শুরু করে। প্রথম পর্যায় থেকে সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কুষ্টিয়ার কৃতীসন্তান কাজী আরেফ আহমেদের নেতৃত্বের কথা জানা যায় সংগঠনটিতে।
শেখ মুজিবের ৬ দফা, পাশাপাশি ছাত্রসমাজের তথা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবিভিত্তিক আন্দোলন বিকশিত হতে থাকে। সৃষ্টি হয় ১৯৬৯-এর মহান ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান। বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশ এবং শেখ মুজিবের কারামুক্তির আন্দোলনে ছাত্র-শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম আব্দুর রব, মার্শাল মনি, শাহজাহান সিরাজসহ প্রগতিশীল নেতারা। তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল এক দফা-দাবি, বাংলার স্বাধীনতা।
জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিস্থিতি জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদরা আগে থেকে তৈরি করে রেখেছিলেন। স্বাধীনতা নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ দেশব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য কাজ করতে থাকে গোপনে। ২ মার্চ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব। সেই পতাকার রূপকার ছিলেন জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ।
মুক্তিযুদ্ধের পর বিপ্লবী জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান ও কাজী আরেফ আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসর নেতারা। শেখ মুজিব গ্রহণ না করায় মুক্তিযোদ্ধারা মিলিত সৃষ্টি করেন জাসদের। দলের মুখপত্র হিসেবে গণকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। গণকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশনায় কাজী আরেফ আহমেদ বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন।
জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদ ২৭তম হত্যা দিবসে তার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান হবে পলাতক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা।
লেখক: রাজনৈতিক কর্মী ও লেখক