ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কুরাসাওকে ৭-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল ম্যাচের স্মৃতি ফেরাল জার্মানি কুরাসাওয়ের জালে ৭ গোল জার্মানির খুদে বিজ্ঞানীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন ডা. জুবাইদা রহমান প্রথমার্ধে ইতিহাস গড়ল কুরাসাও, ৩ গোল দিল জার্মানি মমতার দলে সংকট আরও গভীর, বিদ্রোহী এমপি বেড়ে ২২ জোটার স্মরণে বিশ্বকাপে বিশেষ উদ্যোগ নিল পর্তুগাল হোম অব ক্রিকেটে লিটনের অন্য রকম প্রথম ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রামে চাঁদপুরের তিন প্রতিষ্ঠানের কৃতিত্ব চট্টগ্রামে মা-মেয়েকে হত্যা, নেপথ্যে অটোরিকশার চুক্তিপত্র নিয়ে বিরোধ বেরোবির রাজস্ব বাজেট ৮২ কোটি ৮১ লাখ টাকা ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন আজ ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টে গ্রেপ্তারের কথা শুনে চোখ খুলছেন না শিবির নেতা জিসান ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিল বাংলাদেশ ব্যাংক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন মেনে না নিলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হতো: শফিকুর রহমান গাংনীতে কুকুরের কামড়ে শিশুসহ আহত ১৭ পাবনায় স্কুলছাত্রীকে শ্লীলতাহানি, অভিযুক্তের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ ফটিকছড়িতে বায়তুল ক্বোবা তৈয়্যবিয়া জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠার জন্য ভূমি হস্তান্তর শ্রমিক অবরোধে আড়াই ঘণ্টা স্থবির ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বন্দরে বেতনের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ আইএইচএফ ট্রফিতে দুই বিভাগে রূপা জিতল বাংলাদেশ আলু সংরক্ষণাগারে কেজিপ্রতি ৫ টাকা ভাড়ার দাবি, ৭ দিনের আল্টিমেটাম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫.৬৩ বিলিয়ন ডলার ইরান-মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে রবিবার, খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালী সোনারগাঁয় সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার গৃহবধূ আতঙ্কে ঘর ছাড়া, নিরাপত্তার আশ্বাস পুলিশের ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে অভিযান ইতিহাসের দুয়ারে গিয়ে থামল বাংলাদেশ, রক্ষা পেল অজিরা চুয়াডাঙ্গায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ জব্দ করল বিজিবি গফরগাঁওয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু বরগুনায় চিরকুট লিখে পুলিশ সদস্যের আত্মহত্যা নরসিংদীবাসীর জন্য সুখবর, অনুমোদন পেল সরকারি মেডিকেল কলেজ
Nagad desktop

কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
কন্যাশিশু নির্যাতন: আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকট
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ধর্ষণ একটি জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সামাজিক ব্যাধি, যা ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক অস্তিত্বকে ধ্বংস করার পাশাপাশি সমাজে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পুরুষ কীভাবে আচরণ করতে পারবেন এবং নারী কীভাবে আচরণ করবেন–এই দ্বিমুখী শিক্ষার মধ্যেই ধর্ষণের বীজ লুকিয়ে থাকে। শুধু আইন প্রয়োগ বা অপরাধীদের শাস্তির মধ্যে এ সমস্যার সমাধান নেই, কারণ এ সহিংসতা মূলত সমাজের গভীরে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যদিয়েই পুনরুৎপাদিত হয়। সুতরাং, এ সংকট নিরসনে আমাদের সামাজিকীকরণ, ধর্ম-সংস্কৃতি, আইনি কাঠামো, মিডিয়া, অর্থনীতি এবং শিক্ষা প্রতিটি স্তরে বৈপ্লবিক পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায় যে, পরিবার ভুক্তভোগীর জন্য প্রথম সুরক্ষা বলয় হওয়া উচিত, সেই পরিবারই অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা, সম্মান রক্ষার দোহাই দিয়ে অপরাধীর পক্ষ নেয়, যা নারীর ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে একটি নীরব সহযোগিতামূলক কাঠামো তৈরি করে। এখানে শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয় কাজ করে, যেখানে সম্মান ধারণাটি নারীর যৌন পরিচ্ছদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। ফলে, ভুক্তভোগী নারীকে অপরাধের শিকার হওয়ার পরও সমাজ ও পরিবার উভয়ের কাছে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আবার বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় যৌন হয়রানি নিয়ে শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকে গেছে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট জ্ঞানের ঘাটতি নয়, বরং একটি কাঠামোগত উপেক্ষা, যা অপরাধীদের সহায়ক এবং ভুক্তভোগীদের নিঃস্ব করে তোলে।

শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ ও অনিরাপদ স্পর্শ, ব্যক্তিগত সীমারেখা এবং সম্মতির ধারণা দেওয়া না হলে তারা জানতেই পারে না কখন, কোথায় এবং কীভাবে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। শুধু তাই নয়, এ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা নির্যাতন চালাতে আরও সাহস পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক দিন থেকেই সমাজপতিদের প্রত্যক্ষ প্রচেষ্টায় ধর্ষকের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কিশোরী-নারীকে ধরে-বেঁধে বিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে। সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার কারবারে এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের ভরসাস্থল হিসেবে যারা কাজ করছেন, তারাও এমন দীক্ষা নিচ্ছেন, চর্চা করছেন। ঠিক করে দিচ্ছেন, কখন কোথায় কীভাবে কত টাকা দেনমোহরে এসব অসহ্য ‘বিয়ে’ হবে। সাম্প্রতিককালে নানারকম আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যদিয়ে আমাদের সমাজও যে চরম অবক্ষয়ে পতিত হয়েছে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

সমাজে কেবল নারী ও শিশুর ওপর বহুমাত্রিক নির্যাতনের বিষয়টি বিবেচনা করলেও এ বিষয়ে কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়। দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের সাম্প্রতিক যেকোনো পরিসংখ্যানই আঁতকে ওঠার মতো। তবে, পরিসংখ্যান বিবেচনায় না এনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের প্রবণতাগুলো দিয়েও বিষয়টি অনুধাবন করার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেকোনো সমাজেই শিশুসন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা মা-বাবার কাছে। কিন্তু খোদ বাবাই যখন সন্তানের ধর্ষক হয়ে ওঠে তখন সন্তান-বাৎসল্যের চিরায়ত ধারণাটিই ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ‘বাবার হাতে মেয়ে ধর্ষিত’ এখন আর নতুন কোনো সংবাদ শিরোনাম নয়। এ সমাজে ‘মায়ের সহযোগিতায় বাবার বিরুদ্ধে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ’-এর মতো শিরোনামও হয়েছে। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের পরিসংখ্যানের মতোই তাই সমাজের মানবিকসংকটের দিকটাও বিশ্লেষণ করা জরুরি। ধর্ষণ রোধ করতে না পারা নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিককালের ভয়াবহতম এক সামাজিকসংকট। শহর-গ্রাম-মফস্বল, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-হাসপাতাল-বিপণিবিতান থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট-স্টেশন-টার্মিনাল-গণপরিবহন কোথায় ধর্ষণ হচ্ছে না। মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া এ জঘন্য অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে না পারার কারণে নারীর অগ্রগতি ও সামাজিক প্রগতি দুটোই মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে। বহু স্তরে বিভক্ত সমাজে ক্ষমতা-সম্পর্কের ভারসাম্যহীন বিন্যাসের সঙ্গে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি এ ক্ষেত্রে এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সামাজিক কাঠামোয় প্রকৃত অর্থেই নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য বিলোপ একটি অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার ছাড়া তা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশু সংগঠন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সম্প্রতি ধর্ষণের প্রতিবাদে সমাজে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ আগের চেয়ে বেড়েছে। ছাত্রছাত্রী তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে নাগরিক সমাজকেও এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হতে হবে। না হলে সমাজে মহামারি আকারে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ার এ মানবিকসংকটের দায় পুরো সমাজকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের জটিল বিচারিক প্রক্রিয়া দূর করে এ-সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতাগুলো দূর করতে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে আমাদের সবাইকে।

সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ১৭৯ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর ২৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী। দেশে নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এর মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই এর ভয়াবহ শিকার হচ্ছেন কন্যাশিশুসহ সব বয়সী নারী। নৃশংসতার মাত্রা ও সংখ্যা বিবেচনায় সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতায় দেশবাসী আতঙ্কগ্রস্ত সময় অতিবাহিত করছে। এ পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পাওয়া, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি কারণে সামাজিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হচ্ছে; যা সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার অন্তরায়। নারীর প্রতি এ ধরনের আচরণ দূর করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুপরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী, যাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যা, ঠাকুরগাঁওয়ে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা, নাটোরে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণসহ সম্প্রতি দেশজুড়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধারাবাহিক যৌন সহিংসতা ও হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও শোক প্রকাশ করছে সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস। উদ্বেগজনকভাবে, শুধু চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই ৩০টি শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর দুটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপরিসর, কোনোটিই যথেষ্ট নিরাপদ নয়।

পত্রিকা কিংবা অনলাইন পোর্টাল–গণমাধ্যমে চোখ রাখতে গেলেই কোথাও কিশোরী ধর্ষণ, কোথাও নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কোথাও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার খবর। ঘটনাগুলোও এত ঘন ঘন ঘটছে যে বেশির ভাগ সময় এসব খবর আর আমাদের চমকে দেয় না। অথচ এই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ভয়াবহতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সংকেত। বাংলাদেশে ধর্ষণ আর কেবল অপরাধ নয়, ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকসংকটে পরিণত হচ্ছে। সম্প্রতি সংবাদ প্রতিবেদনগুলো সে উদ্বেগকেই স্পষ্ট করেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সংবাদমাধ্যমে ৪৮১টি ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে, যা আগের পুরো বছরের সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যানের আরও ভয়াবহ দিক হলো, ভুক্তভোগীদের বড় অংশই শিশু। ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই তিন শতাধিক শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে সহিংসতা শুধু বাড়ছে না, ক্রমশ শিশুদের আরও বেশি গ্রাস করছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো দেখলে বোঝা যায়, এ ঘটনাগুলো দেশের প্রায় সব প্রান্তেই ঘটছে–গ্রাম থেকে শহর, স্কুল থেকে কর্মক্ষেত্র। এমনকি পরিচিত মানুষের মাধ্যমেই ঘটে এসব অপরাধ। একটি সমাজের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। যদি নারীরা রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে না পারেন, যদি শিশুরা স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনা সমাজের একেকটি ব্যর্থতার গল্প। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও–সমস্যাটি স্বীকার করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়।

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় কেঁপে উঠেছে দেশবাসী। ক্ষোভ, শোক আর বিক্ষোভে আগুন ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ধরণী দ্বিধা হও! কোনো ঘরে আর কন্যাসন্তান জন্ম না নিক। কন্যা-জায়া-জননী কোনো মায়াভরা শব্দের মানুষ আর না থাকুক...!’। আট বছরের মেয়েও যাদের কাছে নিরাপদ না, মানুষ নয়–তারা নরপিশাচ। এসব নৃশংসতার মাত্রা কমিয়ে আনার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঘটনার পর থেকেই ফেসবুক, টুইটার ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রামিসা হত্যার প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মী ও অভিভাবকরা সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এ ধরনের অপরাধে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাদের নিজের সন্তান আছে, তাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভ আরও বেশি কাজ করে।

গত মাসে রাজধাণীর পল্লবীতে ছোট্ট শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেয়। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট–এটি কেবল অপরাধের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা ভুক্তভোগীকে ভয় দেখিয়ে, সামাজিক অপমানের আশঙ্কা তৈরি করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কিংবা মামলা না করার জন্য চাপ তৈরি করে। ধর্ষণ কেবল শারীরিক সহিংসতা নয়, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশে ধর্ষণের জন্য আইনগত শাস্তি যথেষ্ট কঠোর।

২০২০ সালে আইনে সংশোধন এনে ধর্ষণের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। শিশু–যাদের হাসিতে ভরে ওঠার কথা প্রতিটি ঘর, যাদের হাতে থাকার কথা রঙিন খাতা, খেলনা আর স্বপ্নের ভবিষ্যৎ। সেই শিশুরাই এখন একের পর এক সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছ বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি–এসব কারণেই এমন ভয়াবহ অপরাধ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ায় অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ছে। শিশু সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়–এর পেছনে আছে একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবন, একটি পরিবারের ভাঙা স্বপ্ন এবং এক মায়ের বুকভরা কান্না। ধর্ষণ গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুক না কেন, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ-জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিকসংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এ সংকট নিরসনে প্রবলভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সবারই। এ সংকট উত্তরণে দলমতনির্বিশেষে সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজ করে চলেছেন। তাদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের জগৎ। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, বিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড় মাত্রায়। জীবনের মুখ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বাড়িয়ে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে সহজতর করে জাতীয় সীমানা পেরিয়ে পুঁজি ও ধারণার নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামীতে স্মার্ট শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভূমিকা রাখবে। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে নতুন শিল্প সৃষ্টি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রযুক্তি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারনেট, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর কোনো বাধা নয়। যে কোনো দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোগও এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির কারণে সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ই-কমার্সেরমতো বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন শিল্প সৃষ্টি এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বেড়েছে। এটি মানুষের শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি সময় ও খরচ কমিয়ে গুণগত মান উন্নত করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমে অনেক কাজ একসঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বিশ্বের অগ্রগামী জাতিসমূহ। তারা সর্বদাই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই। এজন্যই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল তৈরি, দূরদর্শী নেতৃত্ব, তরুণদের অংশগ্রহণ ও দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রাধান্যের ভিত্তিতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে যেসব মানুষ পারদর্শী ও পেশাদার, তাদের কদর পৃথিবীব্যাপী বেড়েই চলেছে। তাই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে স্মার্ট ইকোনমির ধারণা বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ ছাড়া কোনো দেশই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে না। সমৃদ্ধশালী ও উন্নত অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো বিকল্প নেই। 

লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ
ডা. তিমির কুমার সাহা

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।

কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।

ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।

NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।

ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।

রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিকমাধ্যমে একটা কথা বেশ ঘুরছে। কেউ কেউ বলছেন, এবারের বাজেট ‘উচ্চাভিলাষী’। কেউ আবার বলছেন, ‘একই বাজেট, নতুন মোড়ক।’ এই দুই মেরুর মাঝখানে বসে আমি যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল কাঠামোটা পড়লাম, মনে হলো আলোচনাটা আসলে অনেক গভীরে যাওয়া দরকার।

সরকার এবারের বাজেটে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখেছে। তালিকায় আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, সৃজনশীল অর্থনীতিসহ আরও কিছু। লক্ষ্যও বড়। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই অগ্রাধিকার তালিকাটা কি আসলে কার্যকর পরিকল্পনা, নাকি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?

সরাসরি বলছি, ১৩টি খাত একসঙ্গে অগ্রাধিকার পেলে কোনটি আসলে কার্যকর মনোযোগ পাবে, সেটা নিয়েই আমার মূল সংশয়। বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক থেকে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বছরের পর বছর ধরে অব্যয়িত অর্থের অভিযোগ নতুন নয়। 

এবারের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এই বড় বাজেটের পেছনে যুক্তি আছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, আর নতুন বেতন কাঠামোর বোঝা সামলানো। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের চিত্র যদি আগের বছরগুলোর মতো হয়, তাহলে ঘাটতির চাপটা কোথায় গিয়ে পড়বে?

আমার মতে, বাজেটের আকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বড় সংখ্যা মানুষকে আশাবাদী করে, কিন্তু মাঠে পৌঁছানোটাই আসল কাজ।

এবারের অগ্রাধিকারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবার আগে রাখা হয়েছে। এটা সময়োচিত। গত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে আছে। বাজারে গেলে এ বাস্তবতা বোঝা যায়। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, সবার জন্যই বাজার করার হিসাবটা এখন আগের চেয়ে কঠিন। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। লক্ষ্যটা বাস্তবসম্মত, কিন্তু পথটা কঠিন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করতে হয়, বাজার তদারকি জোরদার করতে হয়, আর আমদানি নীতিতে নমনীয়তা আনতে হয়। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নামানোর চেষ্টা চলছে। এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়। ঋণের সুদ বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে আসেন। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থানের বিষয়টাও আলাদাভাবে ভাবার আছে। দেশে প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে বা সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়িয়ে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর তার জন্য ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এগুলো যতক্ষণ না কমবে, বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পাবেন না। বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মনোযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এটা কাগুজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এবারও বরাদ্দ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। দেশে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা অনেকেই আছেন যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া টিকতে পারেন না। কিন্তু এই খাতের দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা হলো উপকারভোগীদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা। প্রকৃত অভাবীরা তালিকায় নেই, অথচ সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সুবিধা পাচ্ছেন, এই অভিযোগ পুরোনো। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে বছরের পর বছর। বাস্তবায়নের গতি এখনো যথেষ্ট দ্রুত নয়।

স্বাস্থ্য আর শিক্ষা, দুটো খাত নিয়ে আলাদাভাবে একটু বলতে চাই। স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বেড়েছে, ভালো কথা। কিন্তু মোট বাজেটের অনুপাতে এটা এখনো যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় করা উচিত। আমরা এখনো সেখানে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে বোঝা যায় বাস্তবতা। অনেক জায়গায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ওষুধ নেই। যন্ত্রপাতি থাকলেও চালানোর লোক নেই। টাকা বরাদ্দ হলেই সব ঠিক হয় না। ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হলে বরাদ্দের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সর্বত্র কিছু না কিছু সমস্যা আছে। শিক্ষকের মান, পাঠ্যক্রমের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এগুলো নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তনটা এখনো দৃশ্যমান নয় সব জায়গায়।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। এটা সবচেয়ে দরকারি পদক্ষেপ, আমার মতে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুল। এই টাকাগুলো আটকে থাকার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। ব্যাংকের সুদের হার কমে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত থাকে। এই সমস্যাটার সমাধান না হলে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হবে না।
এবারের বাজেটে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দেখার বিষয় হলো, এটা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সেটার জন্য শুধু বাজেটের আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার, শাসনব্যবস্থার উন্নতি, আর দুর্নীতি কমানো না হলে লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই থাকবে। এবারের বাজেটের সুযোগ হলো, নতুন সরকারের প্রতি মানুষের একটা প্রত্যাশা আছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জানালা বেশি দিন খোলা থাকে না।

বাজেটের পরিকল্পনা ভালো হলেই সব হয় না। মাঠপর্যায়ে যারা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী অর্থবছরের শেষে যদি এই ১৩টি খাতের অর্ধেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়, সেটাই হবে বড় অর্জন।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নানা হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকার যেহেতু ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, তাই প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন; পরে সে অনুযায়ী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের দিক থেকে সরকার চেষ্টা করে কতটা সংকোচন করা যায়, অর্থাৎ ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব। অপরদিকে, আয়ের ক্ষেত্রে সরকার চেষ্টা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায়। আয়ের খাত যত বৃদ্ধি পাবে, সরকার তত বেশি আর্থিকভাবে নিশ্চয়তা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার অগ্রিম কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন ভ্যাট ও আয়কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে? একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আদৌ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু বর্তমান অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলেও আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এ কারণেই যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। আবার যারা ভ্যাট প্রদান করে, তারা সবাই সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আড়াই লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদান করে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়, এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করা কতটা সম্ভব হবে? আর যদি তা সম্ভবও হয়, তাহলে সবাই কি সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করবে? আমাদের দেশে যারা ভ্যাট বা আয়কর প্রদান করেন, তাদের শনাক্ত করা এবং অডিট করার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যারা ভ্যাট বা আয়কর দেন না, অথচ যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা উভয়ই রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্র কিংবা এনবিআরের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভ্যাট দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই যেন সুবিধাজনক। অন্যদিকে, যারা আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করেন, তারাও সব সময় যে সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের ভিত্তিতে তা দেন, এমনটিও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভুল বা শুদ্ধ–যেভাবেই হোক, তারা অন্তত কর ও ভ্যাট প্রদান করছেন। তাহলে যারা একেবারেই ভ্যাট বা আয়কর দেন না, তাদের কেন আমরা কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারছি না?

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের কল্যাণে কতটুকু নিবেদিত? রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজের অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রয়্যালটি কমিয়ে ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবতা অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে, অনেক করদাতাও ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদান করার কথা কোনো বড় বিষয় হওয়ার কথা নয়। তার পরও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই পথ খোঁজেন। দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত হিসাবে যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া আছে, অনেকেই বাস্তবে সেই হিসাবে লেনদেন করেন না। আবার যারা রাষ্ট্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও একটি উদাহরণ হলো–গত মে ৫, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতিকে চিঠি দেয় এনবিআর। প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি বলেন, যারা সংগঠনের সদস্য নন তাদের তথ্য আমরা দিতে পারব না। আর সদস্যরা বলবেন, ‘সদস্য হয়ে আমরা বিপদে পড়েছি।’ এতে সমিতি দুর্বল হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এ ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। ঠিক যেন রাষ্ট্রের চেয়ে সংগঠন বড়, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি।

অপরদিকে, সরকার যদি আয়কর বৃদ্ধির তুলনায় ভ্যাট বৃদ্ধি করাকে সহজতর মনে করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিও এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব থেকে একজন দিনমজুরও রেহাই পান না। আবার ভ্যাট বৃদ্ধি করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সরকারের সাফল্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বছরে যে আয় করেন, তার করযোগ্য আয়ের অংশ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তিনি আয়কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ তার আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী সরকার তথা এনবিআরকে আয়কর প্রদান করবেন। কিন্তু সরকার যদি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে, তবে তা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা একজন দিনমজুরও এড়াতে পারবেন না। অথচ আয়কর আদায় বৃদ্ধি পেলে মূলত যারা আয়কর দেওয়ার যোগ্য, তারাই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করবেন। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী এ ধরনের করের প্রভাব থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই এমন কৌশল খোঁজে, যার মাধ্যমে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কর-সুবিধা কিংবা আয়কর মওকুফের সুযোগ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারও ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের সেই সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গত কয়েক দশকে বিত্তবান শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হয়েছে, অথচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি।

সরকারের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে রাষ্ট্রের এই কঠিন সময়ে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবেই হয়তো আমাদের দেশেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করতে উৎসাহিত হবে। যখন নাগরিকরা দেখবেন যে তাদের প্রদত্ত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তখন কর প্রদানের প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকার ও নাগরিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে দেশের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি নাগরিক।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
[email protected]