ঢাকা ২ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
আত্মঘাতী গোলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে জয়বঞ্চিত মিসর ২৬ বছরে অভিষেক, বিশ্বকাপে স্পেনকে স্তব্ধ করে দেওয়া কে এই গোলরক্ষক? প্রথমার্ধে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এগিয়ে মিসর বিশ্বকাপ ইতিহাসে নাম লেখালেন ভোজিনিয়া-ইয়ামাল শক্তিশালী স্পেনকে রুখে দিল নবাগত কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ অভিষেকে রেকর্ড গড়ল কেপ ভার্দে দুই ছেলের নামে ২ ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যা জানালেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মানবিক রাষ্ট্র গঠনে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী প্রথমার্ধে স্পেনকে আটকে দিল কেপ ভার্দে চট্টগ্রামে মেরিন সার্ভেয়ারদের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত মতলবে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিকে স্বাগত জানাল বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের নিচে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ বিশ্বকাপে শুরুতেই বড় হার, ম্যাচ শেষ হতেই কোচ বরখাস্ত নবজাতকের মরদেহ টানাটানি করছিল কুকুর, উদ্ধার করল পুলিশ গোপালগঞ্জে যৌতুকের জন্য স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হুইলচেয়ারে মাঠ ছাড়লেন কুবো, জাপান শিবিরে উদ্বেগ মৌলভীবাজারে তিন মাসের ভোগান্তির পর চিকিৎসাসেবা পেল চা-বাগানবাসী শার্শায় প্রবাসীর স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৩ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামেও বসবে এআই ক্যামেরা: চসিক মেয়র স্পেনের একাদশে নেই ইয়ামাল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত জন প্রত্যাশা পূরণ হয়নি’ রাজশাহীকে বাসযোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত শহর গড়ার প্রত্যয় আরডিএ’র নতুন চেয়ারম্যানের কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না ইস্তিগফারের এমন ক্ষমতা জানলে আপনি অবাক হবেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সালিশ বৈঠকে প্রতিপক্ষের হামলায় শ্রমিক দল নেতা নিহত জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী পর্তুগালের পতাকা টানাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কিশোর আইসিইউতে
Nagad desktop

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রয়োজন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তির খোঁজ করে চলেছেন। তাদের নিত্যনতুন আবিষ্কারে প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে আমাদের জগৎ। প্রযুক্তির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব, বদলে যাচ্ছে গতানুগতিকতা, বিবর্তন ঘটছে মানুষের জীবনধারায়। মানুষের জীবন সহজ, আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তি অবদান রাখছে বড় মাত্রায়। জীবনের মুখ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি। প্রযুক্তি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এটি উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বাড়িয়ে, নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যকে সহজতর করে জাতীয় সীমানা পেরিয়ে পুঁজি ও ধারণার নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আগামীতে স্মার্ট শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভূমিকা রাখবে। 

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিক যুগে নতুন শিল্প সৃষ্টি, উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থান বাড়াতে প্রযুক্তি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারনেট, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির কল্যাণে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন আর কোনো বাধা নয়। যে কোনো দেশের ছোট ও মাঝারি উদ্যোগও এখন প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারছে। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনীতির কারণে সফটওয়্যার, ডিজিটাল মার্কেটিং, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ই-কমার্সেরমতো বিশাল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, নতুন শিল্প সৃষ্টি এবং ব্যবসার খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বহু গুণ বেড়েছে। এটি মানুষের শারীরিক শ্রমের পাশাপাশি সময় ও খরচ কমিয়ে গুণগত মান উন্নত করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। 

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি সবচেয়ে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং অটোমেশন উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে। প্রতিটি দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অপরিহার্য। বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তি মাধ্যমে অনেক কাজ একসঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে বিশ্বের অগ্রগামী জাতিসমূহ। তারা সর্বদাই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই। এজন্যই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনবল তৈরি, দূরদর্শী নেতৃত্ব, তরুণদের অংশগ্রহণ ও দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। 

বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনায় প্রাধান্যের ভিত্তিতে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে যেসব মানুষ পারদর্শী ও পেশাদার, তাদের কদর পৃথিবীব্যাপী বেড়েই চলেছে। তাই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে স্মার্ট ইকোনমির ধারণা বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে তথ্যপ্রযুক্তি এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ ছাড়া কোনো দেশই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারে না। সমৃদ্ধশালী ও উন্নত অর্থনীতি গড়তে প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো বিকল্প নেই। 

লেখক: নেটওয়ার্ক টেকনিশিয়ান (আইসিটি সেল), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম
কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনই হোক অর্থনৈতিক রূপান্তরের শক্তি
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের (Demographic dividend) সবচেয়ে সুবিধাজনক সময় প্রায় শেষের দিকে। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তিকরণ’ শীর্ষক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উদ্যোগ তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করার বড় রাজনৈতিক ও নীতিগত বার্তা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোতে স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স পড়ানোর জন্য ১২ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতা-ভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা বলেছে। স্নাতক পর্যায়ে আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো সময়োপযোগী উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত বড় ব্যবস্থায় এ উদ্যোগ কত দ্রুত, কত গভীরভাবে এবং কতটা ফলপ্রসূভাবে পৌঁছাবে?

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশের শেষ বা পরিণত পর্যায়ে আছে। সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। তবে সেটি দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ কর্মশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে এই সুবিধা বেকারত্ব, হতাশা ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগকে শুধু পাঠ্যক্রম সংশোধনের বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। একে উচ্চশিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান কৌশল এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

সমস্যাটি গভীর। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদা থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বলা হয়েছে। পাঠ্যক্রম অনেকাংশে কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত। স্থানীয় শ্রমবাজার, নিয়োগদাতা, শিল্প খাত ও পেশাজীবী সংগঠনের মতামত নিয়মিতভাবে পাঠ্যক্রমে প্রতিফলিত হয় না। অনেক বিষয় এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও তত্ত্বনির্ভর। ব্যবহারিক কাজ, ল্যাব, প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ, সমস্যা সমাধান, দলীয় কাজ এবং পেশাগত যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। ফলে শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেও কাজের পরিবেশে নিজেকে দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না।

এই দুর্বলতার সঙ্গে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও যুক্ত। বহু কলেজে আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞান ল্যাব, লাইব্রেরি, জার্নাল, অডিও-ভিজ্যুয়াল সুবিধা ও ডিজিটাল শেখার পরিবেশ পর্যাপ্ত নয়। যেখানে কিছু সুবিধা আছে, সেখানেও তা শিক্ষণ-পদ্ধতির সঙ্গে সব সময় যুক্ত হয় না। ২০১৭ সালের কলেজ গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি দেখায়, গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার তিন থেকে চার বছর পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজের গ্র্যাজুয়েটদের মাত্র ১৯ শতাংশ কর্মরত ছিল। ৪৬ শতাংশ ছিল বেকার। ৩৪ শতাংশ আরও পড়াশোনায় ছিল। অর্থাৎ ডিগ্রি আছে, কিন্তু কাজের বাজারে প্রবেশ কঠিন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতাও বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাধারণ কলেজ থেকে আসে। অনেকের ইংরেজি, যোগাযোগ দক্ষতা, ডিজিটাল দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা দুর্বল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি প্রক্রিয়া, ক্যাম্পাস-ভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ, অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুবিধা পায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে চাকরির পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার, কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ এবং পেশাগত আত্মপ্রকাশে তারা পিছিয়ে পড়ে।

তবে এ দুর্বলতার ভেতরেই বড় সম্ভাবনা আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় এর শিক্ষার্থী আছে। এই নেটওয়ার্ককে দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, ডিজিটাল কাজ এবং সরকারি-বেসরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পাঠ্যক্রম পরিবর্তন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রকল্প।

সংস্কারের শুরু হতে হবে সাধারণ অনার্স ও ডিগ্রি কোর্সের ভেতর থেকে। আইসিটি কোর্স বাধ্যতামূলক করা ভালো উদ্যোগ। তবে শুধু একটি আলাদা কোর্স যোগ করলেই হবে না। বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সব বিষয়ের সঙ্গে কাজের দক্ষতা যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীকে ডেটা ব্যবহার, যোগাযোগ, ইংরেজি, সমস্যা সমাধান, রিপোর্ট লেখা, ডিজিটাল টুল, উপস্থাপনা এবং নৈতিকতার চর্চা শেখাতে হবে। দক্ষতা যেন সিলেবাসের প্রান্তে না থাকে; মূল শিক্ষার ভেতরেই ঢুকে পড়ে।

শ্রেণিকক্ষকে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করাও জরুরি। প্রতিটি অনার্স শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত তিন মাসের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ চালু করা যেতে পারে। সরকারি অফিস, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, এনজিও, গণমাধ্যম, আইটি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্রশিল্প, কৃষি উদ্যোগ বা স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সবই হতে পারে শিক্ষার্থীর শেখার ক্ষেত্র। ইন্টার্নশিপকে নম্বর ও ক্রেডিটের সঙ্গে যুক্ত করলে কলেজ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, তিন পক্ষই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে।

শিক্ষার্থীদের কৌশলগত দুর্বলতা কাটাতে আলাদা ‘ফাউন্ডেশন স্কিল প্যাকেজ’ দরকার। প্রথম বর্ষ থেকেই ইংরেজি যোগাযোগ, বাংলা ও ইংরেজি রিপোর্ট লেখা, কম্পিউটার ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রেজেন্টেশন, চাকরির প্রস্তুতি এবং পেশাগত আচরণ শেখাতে হবে। শেষ বর্ষে থাকতে পারে ‘জব রেডিনেস সেমিস্টার’। সেখানে সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার, গ্রুপ ডিসকাশন, সরকারি ও বেসরকারি চাকরির প্রস্তুতি এবং ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন কাজের বাস্তব প্রশিক্ষণ থাকবে।

কলেজগুলোকে শুধু পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্র হিসেবে রাখলে চলবে না। প্রতিটি কলেজে কার্যকর ক্যারিয়ার সেল থাকতে হবে। সেখানে চাকরির তথ্য, সিভি লেখা, সাক্ষাৎকার প্রস্তুতি, উদ্যোক্তা সহায়তা, অনলাইন কাজের প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয়ভাবে একটি ডিজিটাল জব-ম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। শিক্ষার্থীর দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ, ভাষা জ্ঞান ও কাজের আগ্রহের তথ্য সেখানে থাকবে। নিয়োগদাতারাও সেখান থেকে প্রার্থী খুঁজে নিতে পারবেন।

এ পরিবর্তনের প্রাণ হবেন শিক্ষকরা। ১২ হাজার শিক্ষক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশিক্ষণের লক্ষ্য হতে হবে শ্রেণিকক্ষ বদলে দেওয়া। শিক্ষককে কেস স্টাডি, প্রজেক্ট, দলীয় কাজ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং সমস্যাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষক কীভাবে পাঠদান বদলালেন, সেটিও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।

সংস্কারের সাফল্য মাপার জন্য তথ্য দরকার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতি বছর গ্র্যাজুয়েট ট্রেসার স্টাডি করতে হবে। কোন বিষয়ের কত শতাংশ শিক্ষার্থী চাকরি পেয়েছে, কতজন বেকার, কতজন উদ্যোক্তা হয়েছে, কতজন সরকারি চাকরিতে গেছে, কতজন বিদেশে কাজ পেয়েছে, এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও নির্বাচিত প্রার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করলে উচ্চশিক্ষার বাস্তব ফলাফল বোঝা সহজ হবে।

নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার পূর্ণতা পাবে না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক নারী শিক্ষার্থী সামাজিক বাধা, নিরাপত্তা, যাতায়াত এবং পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমবাজারে ঢুকতে পারেন না। তাদের জন্য নিরাপদ ইন্টার্নশিপ, অনলাইন কাজের সুযোগ, স্থানীয় উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ দরকার।

উদ্যোক্তা তৈরির কথাও বাস্তব সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বলা যথেষ্ট নয়। কলেজভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্ভাবন তহবিল, স্থানীয় ব্যবসা পরামর্শক, হিসাবরক্ষণ সহায়তা, ডিজিটাল মার্কেটিং প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংক ঋণের সঙ্গে সংযোগ দরকার। এতে চাকরিপ্রার্থী তৈরির পাশাপাশি চাকরিদাতাও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে, যেখানে ডিগ্রির সংখ্যা নয়, দক্ষ মানুষের সংখ্যা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তাই শুধু শিক্ষা সংস্কার নয়; এটি কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন। জনমিতিক লভ্যাংশের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু দরজাটি ধীরে ধীরে সরু হচ্ছে। দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও কর্মমুখী সংস্কার করলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান শক্তি।

লেখক: সিনিয়র ফ্রীল্যান্স সাংবাদিক

শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
শ্রমিকদের ‘চাকরি’ স্থায়ী করুন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখতে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক মাস্টারোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীরা। প্রায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে যারা শ্রম দিচ্ছেন সেই শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন অনিশ্চিত।  রাষ্ট্রের সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার পরও এই বিশাল কর্মজীবী জনগোষ্ঠী আজও চাকরির স্থায়িত্ব, ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত।

সম্প্রতি প্রণীত ‘দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা, ২০২৫’ এবং আউটসোর্সিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এ কর্মীদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থি। এটা বঞ্চিত মানুষদের অধিকারকে আরও বেশি সংকুচিত করে ফেলেছে। একে আর যাই বলা হোক, কোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি বলা চলে না। এটি আসলে নীতিমালার মোড়কে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈধ শোষণ। যা ‘নো-ওয়ার্ক, নো-পে’র নামে তাদের শোষণ করা হচ্ছে।

লম্বা সময় ধরে একটা মানুষ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজ করছেন, টেবিলটা একই আছে, তার খাটুনিও কমেনি। অথচ দুই দশক পরেও খাতাকলমে তার পরিচয় তিনি স্রেফ একজন ‘অস্থায়ী’ দিনমজুর। একই দপ্তরে, পাশাপাশি দুটো টেবিলে বসে দুজন মানুষ বছরের পর বছর প্রায় একই কাজ করে যাচ্ছেন। মাসের শেষে একজন পাচ্ছেন সুনির্দিষ্ট বেতন, উৎসব ভাতা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা এবং অবসরের পর পেনশনের সুরক্ষাজাল। আর অন্যজন? তিনি প্রতিদিন সকালে ডেস্কে বসেন এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে–আজ কাজ শেষে হাজিরা খাতাটা সই হবে তো? মাস শেষে কি ঠিকমতো দিনমজুরিটা মিলবে? এই দ্বিতীয় মানুষটি কোনো বেসরকারি কারখানার শ্রমিক নন; তিনি আমাদের ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেরই একজন ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক মজুরিভিত্তিক’ কর্মচারী-শ্রমিক।

আজ কাজ আছে তো টাকা আছে, কাল শরীর খারাপ হলে ঘরে চুলা জ্বলবে না। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের আনাচে-কানাচে প্রতিদিন এমন হাজার হাজার মানুষের নীরব দীর্ঘশ্বাস জমা হচ্ছে। ডাক বিভাগ, রেলওয়ে, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়-সবখানেই নিচের সারির এই কর্মীরাই আসল চাকা, অথচ তাদের জীবনটাই আটকে আছে এক অন্তহীন অনিশ্চয়তার বৃত্তে।

১০, ১৫ বা ২০ বছর ধরে রাষ্ট্রের চাকা সচল রেখেও যারা নিজেদের ‘অস্থায়ী’ পরিচয়ের বৃত্ত থেকে বের করতে পারলেন না, তাদের এই যাপন কেবল একটুকরো প্রশাসনিক ফাইল আটকে থাকা নয়। এটি আসলে একটি নীরব মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের এক সুগভীর কাঠামোগত ফাঁদের গল্প।

আমলাতন্ত্র প্রায়ই একটা চেনা অজুহাত দেখায়–‘বাজেটসংকট’ কিংবা ‘রাজস্ব খাতে পদের অভাব’। কিন্তু এই নতুন নীতিমালার আড়ালে আসল খেলাটা কেমন নিষ্ঠুর, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে খোদ সরকারেরই অফিশিয়াল নথিতে। গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের প্রবিধি অনুবিভাগ থেকে জারিকৃত একটি পরিপত্রের (স্মারক নম্বর: ০৭.০০.০০০০.১৭৬.৬৬.০৫৯.১৫-অংশ-৭-২৬) দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই চিঠিতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন অফিসে মোট ১৯৭৩ জন সাময়িক শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে যে শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নীতিকে আরও ক্রূর করে তুলেছে।

সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই ১৯৭৩ জন শ্রমিক কাজ পাবেন ‘মাসিক ২২ দিন ভিত্তিতে’। এর আসল মানে কী? মাস ৩০ দিনে হলেও রাষ্ট্র শুরুতেই একজন শ্রমিকের জীবন থেকে ৮ দিনের কাজ ও মজুরি আইনিভাবে কেটে রাখছে। বাকি ৮ দিন শ্রমিক কাজ করতে চাইলেও রাষ্ট্র তাকে কাজ দেবে না, আর ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ নিয়মের দোহাই দিয়ে ওই দিনগুলোর মজুরিও দেবে না। উপরন্তু, এই শ্রমিকদের মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো, পরিপত্রের ‘ক’ শর্তে স্পষ্ট লিখে দেওয়া হয়েছে ‘আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছর থেকে আর কোনো দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণের সম্মতি প্রদান করা হবে না।’ এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, রাষ্ট্র এই শ্রমিকদের ধাপে ধাপে স্থায়ী করার পরিবর্তে পুরো প্রথাটিকেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়, যাতে পেনশন, ভবিষ্যৎ তহবিল বা গ্র্যাচুইটির দীর্ঘমেয়াদি কোনো আর্থিক দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে না চাপে। কিন্তু যে মানুষগুলো এক-দেড় দশক ধরে এই দপ্তরে ঘাম ঝরিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসন বা স্থায়ীকরণের কোনো রূপরেখা না রেখে এই আইনি চাতুরী স্রেফ অমানবিক।

যদিও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় শূন্য পদের বিপরীতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়া এই বিশাল মাস্টাররোল ও দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের স্থায়ী করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অথচ বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার পর, তারা আইনি সুরক্ষা ও মানবিক অধিকারটুকুও পাচ্ছে না। ছুটি নেই, উৎসব ভাতা নেই, চিকিৎসা সুবিধা নেই, অবসরের কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুধু আছে প্রতিদিনের হাজিরা এবং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তা।

আইএলও কনভেনশন নম্বর ৯৮ এবং ১৫৮ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে যদি একই প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করানো হয়, তাহলে তাকে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব ও সুরক্ষা দিতে হবে। নিয়মিত পদে যে কাজ হচ্ছে, সেই কাজে নিরন্তর অস্থায়ী শ্রমিক ব্যবহার করা মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের নীতির বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ আইএলওর সদস্য রাষ্ট্র এবং বেশ কিছু সনদে স্বাক্ষরকারী। কিন্তু স্বাক্ষর আর বাস্তবায়নের মাঝখানে যে দূরত্ব, সেটাই এই অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের জীবনের মূল সংকট।

শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪ এবং ২ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিক একই প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্নভাবে এক বছর বা তার বেশি সময় কাজ করলে তিনি স্থায়ী কর্মচারীর মর্যাদা পাওয়ার আইনি অধিকারী। কিন্তু ‘মাস্টাররোল’ বা ‘দৈনিক ভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক’ এবং ‘আউটসোর্সিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই আইনি বাধ্যবাধকতাকে কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। কাগজে-কলমে চুক্তি ভাঙলেও সেবার ধারাবাহিকতা থাকে, মানুষটাও একই থাকেন, কিন্তু আইনের চোখে তিনি বারবার ‘নতুন নিয়োগ’ পান। এই কৌশলটিই এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।

দেশের বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক ও মাস্টাররোল কর্মচারীরা আউটসোর্সিং বা ঠিকাদারি প্রথার নামে আধুনিক দাসপ্রথা বাতিল, চাকরি স্থায়ীকরণসহ ছয় দফা দাবিতে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছে। এই লড়াই শুধু ৫০ হাজার কর্মচারীর নয়, এটি দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার লড়াই। তাই বৈষম্যমুক্ত মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারণের অধিকার ও শ্রমিকের চাকরির নিশ্চয়তা রক্ষায় তাদের চাকরি স্থায়ী করুন।

লেখক: উন্নয়ন ও অধিকারকর্মী (শ্রেষ্ঠ যুব সম্মাননাপ্রাপ্ত)
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ইয়ুথ অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জ (ইয়্যাস); সভাপতি, ভঙ্গী নৃত্য শিল্পালয়
[email protected] 

রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:২০ পিএম
রাজনীতিকে সরল সমীকরণে দেখা যায় না
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

সম্প্রতি রাজনৈতিক আলোচনায় একটি বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে–আওয়ামী লীগ যদি আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, তাহলে রাজনৈতিক পড়াশোনাই নাকি ব্যর্থ বলে ধরে নিতে হবে। বক্তব্যটি চিন্তার খোরাক দেয়, সন্দেহ নেই। তবে আমার সীমিত বোঝাপড়া অনুযায়ী, এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অতিসরলীকৃত।

রাজনীতি কখনো গণিতের সরল সমীকরণ নয়। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে ১+১ সাধারণত ২ হয়; কিন্তু সমাজবিজ্ঞানে একই সমীকরণের ফল সবসময় একরকম হয় না। এখানে মানুষ আছে, ইতিহাস আছে, ক্ষমতার সম্পর্ক আছে, স্মৃতি আছে, ভয় আছে, আশা আছে, স্বার্থ আছে এবং পরিচয়ের রাজনীতি আছে। তাই রাজনীতিকে কেবল তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত প্রত্যাশার ভিত্তিতে বিচার করলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

অ্যারিস্টটল বহু আগেই মানুষকে ‘রাজনৈতিক প্রাণী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অর্থাৎ রাজনীতি মানুষের সামাজিক অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। মানুষ শুধু যুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় না; আবেগ, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাবোধ, পরিচয় এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কও তার রাজনৈতিক অবস্থান গঠনে ভূমিকা রাখে। সে কারণেই কোনো রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না শুধু বর্তমান সংকট বা ক্ষমতার অবস্থান দেখে।

বাস্তব রাজনীতিতে দুই পক্ষকে পাশাপাশি রাখলেই কোনো সরল যোগফল তৈরি হয় না। ওবামা ও ওসামা–দুই নাম পাশাপাশি থাকলেও তা কোনো মিলনের সমীকরণ নয়; বরং সংঘাতের প্রতীক। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানও বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণের প্রতীক। আবার ট্রাম্প ও খামেনির রাজনৈতিক বাস্তবতাও কোনো সরল সমীকরণে ব্যাখ্যা করা যায় না। অর্থাৎ রাজনীতিতে যোগ, বিয়োগ, সংঘাত, মেরুকরণ, পুনর্গঠন–সবকিছুই একসঙ্গে কাজ করে।

সুতরাং, কোনো রাজনৈতিক দল একবার বিপর্যয়ে পড়লেই তা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে–এমন ধারণা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের শিক্ষা নয়। বরং রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, একটি দলের সামাজিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক ভূমিকা, সাংগঠনিক কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি এবং জনগণের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকলে তাকে সহজে মুছে ফেলা যায় না।

প্রখ্যাত জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ভেবারের বহুল উদ্ধৃত ধারণা অনুযায়ী, রাজনীতি হলো শক্ত কাঠে ধীরে ধীরে ছিদ্র করার মতো কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি কাজ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি হলো ধৈর্য, সংগঠন, সময়, কৌশল এবং সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কোনো দল সংকটে পড়তে পারে, ভুল করতে পারে, ক্ষমতায় থেকে বিতর্কিত হতে পারে, জনবিচ্ছিন্নতার মুখেও পড়তে পারে–কিন্তু এগুলো কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির স্বয়ংক্রিয় মৃত্যু নির্দেশ করে না।

আওয়ামী লীগকে বোঝার ক্ষেত্রেও শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখা যথেষ্ট নয়। দলটির ঐতিহাসিক ভিত্তি, সাংগঠনিক শিকড়, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্ক, গ্রাম-শহরে বিস্তৃত সামাজিক উপস্থিতি এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ কেবল একটি নির্বাচনি দল নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক স্মৃতি, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বহু মানুষের আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি।

আমার পর্যবেক্ষণে, আওয়ামী লীগ, ১৪ দল এবং সমমনা রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে দেশের প্রায় ৫০ ভাগ মানুষের মধ্যে এ ধারার প্রতি কোনো না কোনো মাত্রায় সমর্থন, আবেগ, ঐতিহাসিক সংযোগ বা রাজনৈতিক আস্থা রয়েছে বলে বলা যায়। এ ধরনের বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তিকে কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিকসংকট দিয়ে বিচার করা যায় না। তাই আওয়ামী লীগ, ১৪ দল ও সমমনা রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত সামাজিক ভিত্তিকে কোনো সাময়িক বিপর্যয়, প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যমে সহজে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

ইতিহাস বলছে, আওয়ামী লীগ বহুবার চাপ, দমন, সংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে; কিন্তু বারবার নতুনভাবে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনি বিজয় এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–প্রতিটি পর্যায়েই আওয়ামী লীগ নিজেকে নতুন রাজনৈতিক ভাষায় সংগঠিত করেছে এবং জনসমর্থনের ভেতর দিয়ে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

১৯৭৫ সালের পর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। কিন্তু সেখান থেকেও দলটি হারিয়ে যায়নি। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক উত্তরণ, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনি বিজয়–এসব ঘটনা দেখায় যে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের ইতিহাস একবারের নয়, বহুবারের।

অবশ্যই কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক পুনর্গঠন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ এবং নতুন সময়ের উপযোগী রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করা জরুরি। কিন্তু এই প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, দলটি শেষ হয়ে গেছে। বরং সংকট অনেক সময় রাজনৈতিক শক্তিকে নতুনভাবে চিন্তা করতে, নিজেকে সংশোধন করতে এবং পুনর্গঠিত হতে বাধ্য করে।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামসি রাজনৈতিকসংকট নিয়ে বলেছিলেন, পুরোনোটি মরে যাচ্ছে, কিন্তু নতুনটি জন্ম নিতে পারছে না–এই মধ্যবর্তী সময়েই নানা অস্থিরতা তৈরি হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিও আজ তেমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তবে সংকট মানেই কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তির মৃত্যু নয়; অনেক সময় সংকটই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেয়।

অতএব, আওয়ামী লীগ আবার উঠে দাঁড়ালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই ফেলে দিতে হবে, কিংবা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা ব্যর্থ হয়ে যাবে–যেটা সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খানসহ আরও কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন–এই ধারণা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং আওয়ামী লীগ যদি আবার সংগঠিত হয়, তা রাজনৈতিক বিজ্ঞানের পাঠকেই আরও স্পষ্ট করবে। কারণ রাজনৈতিক বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, যে দলের সামাজিক ভিত্তি আছে, ঐতিহাসিক স্মৃতি আছে, সাংগঠনিক কাঠামো আছে এবং রাজনৈতিক প্রতীকী শক্তি আছে, তাকে কেবল প্রশাসনিক চাপ, সাময়িক বিপর্যয় বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে মুছে ফেলা যায় না।

কোনো দল ভুল করতে পারে, বিতর্কিত হতে পারে, জনসমর্থনের ওঠানামার মধ্যদিয়ে যেতে পারে–এসবই রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে ‘শেষ’ ঘোষণা করা অনেক সময় বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ বেশি।

আমার মূল্যায়নে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল, আছে এবং থাকবে। তবে সেই থাকা কতটা শক্তিশালী, কতটা সংগঠিত এবং কতটা জনসম্পৃক্ত হবে–তা নির্ভর করবে দলটির আত্মসমালোচনা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর।

রাজনীতিতে শেষ কথা কোনো একক ব্যক্তি, কোনো একক বক্তব্য কিংবা কোনো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বলে না। শেষ কথা বলে ইতিহাস, সংগঠন, জনগণ এবং সময়।

লেখক: নির্বাহী চেয়ারম্যান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান-গ্রোয়িং টুগেদার ওপিসি
গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম
ক্যানভাসে নৃবিজ্ঞান: দৃশ্যপটে বাস্তবতার সমকালীন রূপ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

বিশ শতকের শেষভাগে উত্তর-উপনিবেশবাদী তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক যখন প্রশ্ন তুলেছিলেন–‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তখন অনুন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রান্তিক মানুষের ‘প্রতিনিধিত্ব’ বা রিপ্রেজেন্টেশনের সংকটটি বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘকাল ধরে দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষ, জলবায়ু শরণার্থী কিংবা শ্রমজীবীশ্রেণি পশ্চিমা আলোকচিত্রী বা নৃবিজ্ঞানীদের ক্যামেরায় কেবলই ‘দুর্দশার উপাত্ত’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের চারুকলার জগতে এই ঔপনিবেশিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানের মাঠপর্যায়ের পদ্ধতি ‘ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি’ (Visual Ethnography) এবং বাস্তবতার দলিল ‘ডকুমেন্টারি চর্চা’ (Documentary Practice)–এ দুইয়ের সীমানা ভেঙে দিয়ে সমকালীন বাংলাদেশি শিল্পীরা ক্যানভাস, ভিডিও আর্ট ও স্থাপনাশিল্পকে (Installation) করে তুলেছেন ঔপনিবেশিক বয়ান প্রতিরোধের এক একটি অ্যাকাডেমিক ও নান্দনিক হাতিয়ার।

একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যদিয়ে যদি আমরা এ রূপান্তরকে ব্যবচ্ছেদ করি, তবে এর তাত্ত্বিক গভীরতা অনুধাবন করা সহজ হবে:

নৃবিজ্ঞানগত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফির চিরাচরিত উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা আদিবাসী গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ভাষা ও জীবনযাত্রাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণের স্বার্থে ‘পদ্ধতিগত নথিকরণ’ বা ট্যাক্সোনমিক ডকুমেন্টেশন করা। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রথাগত নৃবিজ্ঞানীরা যে ভিজ্যুয়াল কাজ করেন, তার মূল লক্ষ্য থাকে সাংস্কৃতিক অবলুপ্তি ঠেকানো বা অ্যাকাডেমিক জ্ঞান উৎপাদন করা।

কিন্তু যখন ই এথনোগ্রাফি চারুকলার প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডিতে প্রবেশ করে, তখন তার উদ্দেশ্য আর কেবল তথ্য সংগ্রহে সীমাবদ্ধ থাকে না। হ্যাল ফস্টার (Hal Foster) তার বিখ্যাত ‘দ্য আর্টিস্ট এজ এথনোগ্রাফার’ (১৯৯৫) প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন কীভাবে সমকালীন শিল্পীরা নিজেরা নৃবিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা–যেমন কামরুজ্জামান স্বাধীন বা জিহান করিম–মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে স্রেফ তুলে ধরেন না; বরং তারা সেই বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ‘ধারণাগত সমালোচনা’ (Conceptual Critique) তৈরি করেন। জলবায়ু পরিবর্তন বা পুঁজিবাদের কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি কীভাবে ধ্বংস হচ্ছে, চারুকলার ডকুমেন্টারি চর্চায় তার এক একটি ‘কাঠামোগত ব্যবচ্ছেদ’ ঘটে। এখানে নথিকরণ রূপান্তরিত হয় রাজনৈতিক ও নান্দনিক প্রতিবাদে।

পদ্ধতিগত নৃবিজ্ঞানে তথ্যের ‘নৈর্ব্যক্তিকতা’ বা অবজেকটিভিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় টেক্সট-ভিত্তিক নৃবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র বা অপরিবর্তিত মূল আর্কাইভ (Raw Archive)। সেখানে দৃশ্যের নান্দনিক কাটছাঁটের চেয়ে তথ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা বেশি জরুরি।

অথচ, চারুকলার প্রেক্ষাপটে এই মাধ্যমগুলো এক একটি জাদুকরী ও রূপক রূপ ধারণ করে। শিল্পীরা মাঠপর্যায় থেকে সংগৃহীত অডিও রেকর্ডিং, পুরোনো চিঠি, বা আলোকচিত্রকে সরাসরি প্রদর্শন না করে সেগুলোকে ‘পরিমার্জিত আর্কাইভ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। যেমন–বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলায় ব্রেট আর্টস ট্রাস্ট বা ঢাকা আর্ট সামিটের প্রদর্শনীগুলোতে দেখা যায়, যমুনার ভাঙনে ঘরহারা মানুষের জীবনের প্রামাণ্যচিত্রটি কেবল স্ক্রিনে আটকে নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ইনস্টলেশন, ভিডিও আর্ট কিংবা স্থানীয় মাটি ও পোড়াকাঠ দিয়ে তৈরি মিশ্র-মাধ্যমের ভাস্কর্যে (Mixed-media sculpture)। লুইজি মারিন (Louis Marin) আর্ট থিওরিতে যাকে ‘স্পেশাল প্র্যাকটিস’ বা স্থানিক চর্চা বলেছেন–শিল্পী এখানে দর্শককে কেবল ছবি দেখান না, বরং গ্যালারির ত্রিমাত্রিক পরিমণ্ডলে সে যন্ত্রণার একটি বাস্তব ও স্থানিক অনুভূতি তৈরি করেন।

সবচেয়ে বড় তাত্ত্বিক ও নৈতিক রূপান্তরটি ঘটে কাজের ‘বিষয়’ (Subject) বা মানুষের অবস্থানের ক্ষেত্রে। চিরাচরিত ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফিতে প্রান্তিক মানুষটি কেবলই একজন ‘ইনফরম্যান্ট’ বা তথ্যদাতা। গবেষক ক্যামেরা হাতে তার সামনে দাঁড়ান, তিনি অবজেক্ট বা লক্ষ্যবস্তু মাত্র।

কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান চারুকলা আন্দোলনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পীরা এই ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিয়েছেন। এখানে বিষয়ের সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটি সহভাগিতার। উদাহরণস্বরূপ, তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) নারী শ্রমিকদের জীবন নিয়ে যখন কোনো সমকালীন ভিজ্যুয়াল প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন সেই নারী শ্রমিকরা কেবল ক্যামেরার সামনে পোজ দেন না; অনেক সময় তাদের নিজেদের হাতে ক্যামেরা তুলে দেওয়া হয় কিংবা তাদের ব্যবহৃত কাপড়ের টুকরো দিয়েই তৈরি হয় স্থাপনাশিল্প। ফলে, তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক মানুষটি এখানে স্রেফ গবেষণার উপাদান থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন শিল্পের একজন ‘সহ-স্রষ্টা’ (Co-creator)।
আজকের বাংলাদেশের দিকে তাকালে এই অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাজপথে ও গ্যালারিতে দেখতে পাই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকার দেয়ালগুলোতে যে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্রের বিপ্লব ঘটে গেল, তা কিন্তু এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ‘স্ট্রিট এথনোগ্রাফি’। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক সাদা গ্যালারি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথের ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে।

তবে এ মেলবন্ধনের উল্টো পিঠে কিছু সংকটও রয়েছে, যা সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনা হওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর অর্থায়নে যখন অনেক ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি বা ডকুমেন্টারি প্রজেক্ট তৈরি হয়, তখন অনেক সময় ‘এনজিও নান্দনিকতা’র (NGO Aesthetics) চাপে পড়ে শিল্পের নিজস্ব স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়। পশ্চিমা ফান্ডিং এজেন্সির মনঃপূত করার জন্য বাংলাদেশের দারিদ্র্য বা দুর্যোগকে এক ধরনের ‘শৈল্পিক পণ্য’ হিসেবে বিক্রির প্রবণতাও সমকালীন শিল্পসমালোচকদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে চারুকলার ভেতরে ভিজ্যুয়াল এথনোগ্রাফি এবং ডকুমেন্টারি চর্চার এই অনুপ্রবেশ কেবল দুটি মাধ্যমের মিলন নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। জয়নুল আবেদিনের ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের স্কেচ থেকে শুরু করে আজকের তরুণ ভিডিও শিল্পীদের কাজ–এই দীর্ঘ যাত্রায় স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্পকলা সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিনোদন নয়। সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব উপাত্তকে নান্দনিকতার ছাঁচে ফেলে যেভাবে এ দেশের শিল্পীরা ইতিহাস বিকৃতি ও প্রান্তিককরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন, তা চারুকলার সীমানাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। ক্যানভাস এখানে কেবল রঙের খেলা নয়, ক্যানভাস এখানে সমাজ ও ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

লেখক: চারুকলা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ-ইউওডা, ঢাকা
[email protected]

রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ
ডা. তিমির কুমার সাহা

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।

কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।

ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।

NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।

ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।

রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন