আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, যখন ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিল, হে আমার পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি, এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রকে, তাদেরকে আমার প্রতি সিজদাবনত অবস্থায় দেখেছি। ইয়াকুব বলল, হে আমার ছেলে! তোমার স্বপ্নবৃত্তান্ত তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না; তা হলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগূঢ়তত্ত্ব (স্বপ্নের ব্যাখ্যা) শিক্ষা দেবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের পরিবার-পরিজনের প্রতি তার অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন; যেভাবে তিনি তা (নবুয়তের নেয়ামত) পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৪-৬)
এটা ছিল হজরত ইউসুফ (আ.)-এর স্বপ্ন। ছোট্টবেলায় একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘এ স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হজরত ইউসুফের ১১ ভাই আর সূর্য ও চন্দ্র দ্বারা উদ্দেশ্য হলো পিতা-মাতা।’ (তাফসীরে মারেফুল কোরআন, মুফতি শফী আহমদ, অনুবাদ ও সম্পাদনা: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ৬৫১)
হজরত ইয়াকুব (আ.) নিজের সব সন্তান-সন্ততির মধ্যে ইউসুফকে (আ.) সবচেয়ে বেশি আদর করতেন। অধিক ভালোবাসতেন। ইউসুফের প্রতি তার পিতার এ আদর ও ভালোবাসা ভাইদের জন্য অসহনীয় ছিল। ইউসুফের এ স্বপ্ন ভাইদের হিংসাত্মক মনোভাবে আঘাত হানতে পারে, এমনটা ভেবে পিতা ইয়াকুব (আ.) পুত্রের স্বপ্নের কথা অন্য কাউকে; বিশেষত ভাইদের কাছে বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করলেন। (কসাসুল কুরআন, হিফজুর রহমান, অনুবাদ : মাওলানা আবদুস সাত্তার আইনি, মাকতাবাতুল ইসলাম, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৯)
যেমন সন্দেহ তেমন বাস্তবায়ন। হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর সতর্কবার্তা সঠিক হলো। অবশেষে একদিন হিংসার প্রজ্বলিত আগুন ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে বাধ্যই করল। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ইউসুফ ও তার ভাইদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যখন তারা বলল, আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ ও তার ভাই-ই (বিন ইয়ামিন) আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটি সংহত দল। নিশ্চয়ই আমাদের পিতা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে। (ভাইয়েরা পরস্পর আলোচনা করছিল) তোমরা ইউসুফকে হত্যা করো অথবা তাকে কোনো স্থানে (দূর দেশে) ফেলে আসো। ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে এবং তারপর তোমরাই একমাত্র যোগ্য বিবেচিত হবে। তাদের মধ্যে একজন বলল, তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর না। যদি কিছু করতেই চাও, তা হলে তাকে কোনো কূপের গভীরে নিক্ষেপ কর, যাতে করে কোনো যাত্রীদলের কেউ তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৭-১০)
এভাবে পরস্পর আলোচনা করার পর সব ভাই মিলে হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে গেল এবং বলল, আপনি ইউসুফকে আমাদের সঙ্গে বাইরে বেড়াতে পাঠান না কেন? আমাদের ওপর কি আপনার বিশ্বাস নেই! তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে আমাদের চেয়ে অধিক যত্নবান আর কে হতে পারে? এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে, ‘তারা এসে বলল, হে আমাদের পিতা! ইউসুফের ব্যাপারে আপনি আমাদের বিশ্বাস করছেন না কেন? অথচ আমরা তো তার শুভাকাঙ্ক্ষী। আগামীকাল তাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ করুন। সে তৃপ্তিসহকারে খাবে এবং খেলাধুলা করবে আর আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১১-১২)
হজরত ইয়াকুব (আ.) ছেলেদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পারলেন। তিনি বুঝলেন, ইউসুফের ক্ষতি করার জন্য তার ভাইয়েরা কোনো ষড়যন্ত্র পেতেছে। কিন্তু তিনি পরিষ্কার কথায় তার সে মনোভাব প্রকাশ করলেন না। কারণ এতে তার পুত্ররা বিগড়ে গিয়ে ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে প্রকাশ্য শত্রুতা শুরু করতে পারে। তাই তিনি ইশারা-ইঙ্গিত করে বললেন, ‘তোমরা নিজেদের অত্যাচারী ষড়যন্ত্রকারী বানানো থেকে বিরত থেক।’
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘ইয়াকুব বলল, আমার দুশ্চিন্তা হয়, তোমরা তাকে (ইউসুফকে) নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি, তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী (অসতর্ক) থাকবে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৩)
ইয়াকুব (আ.)-এর কথা শুনে ছেলেরা সমস্বরে বলে উঠল—‘আমরা একটি সংহত দল হওয়া সত্ত্বেও তাকে যদি নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্তই হব। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৪)
এ ব্যাপারে আরও এরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর তারা (ভাইয়েরা) যখন তাকে (ইউসুফকে) নিয়ে গেল এবং তাকে কূপের গভীরে ফেলে দিতে একমত হলো (তখন তারা তাই করল) এবং আমি তার কাছে অহি (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করলাম এই মর্মে, অবশ্যই তুমি তাদেরকে (ভবিষ্যতে) তাদের এই কর্ম সম্পর্কে এমতাবস্থায় জানাবে, যখন তারা উপলব্ধি করতে পারবে না।’
এরপর তারা রাতের প্রথম ভাগে কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার কাছে এলো এবং তারা বলল, হে আমাদের পিতা! আমরা প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম আর ইউসুফকে রেখে গিয়েছিলাম আমাদের মালপত্রের কাছে। অতঃপর নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলেছে। আর আমরা জানি আপনি আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী হই। তারা (ভাইয়েরা) তার (ইউসুফের) জামায় মিথ্যা রক্ত লাগিয়ে নিয়ে এসেছিল। ইয়াকুব (আ.) বলল, বরং তোমাদের নফস তোমাদের জন্য একটি গল্প সাজিয়েছে। সুতরাং (আমার করণীয় হচ্ছে) সুন্দর ধৈর্য। আর তোমরা যা বর্ণনা করছ; সে বিষয়ে আল্লাহই একমাত্র সাহায্যস্থল।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১৫-১৮)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক