মানুষের অধিকার রক্ষায় ইসলামি শরিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হচ্ছে হাক্কুল ইবাদ—যা বান্দার অধিকার বা মানবাধিকার হিসেবে পরিচিত। বান্দার অধিকার মানে একজন মুসলিমের পক্ষে অপর মুসলিমের যাবতীয় অধিকার নষ্ট না করা, কষ্ট না দেওয়া, বিপদাপদে পাশে দাঁড়ানো এবং পরস্পর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া প্রভৃতি। মানুষের অধিকার আদায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। এর প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক। হাক্কুলাহ তথা আল্লাহর অধিকার যেমন নামাজ, রোজা ইত্যাদি লঙ্ঘনে বান্দার কোনো ত্রুটি থাকলে মহান আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু হাক্কুল্লাহ ইবাদ তথা বান্দার হক লঙ্ঘনে যদি বান্দা ক্ষমা না করে, তা হলে আল্লাহও ক্ষমা করবেন না।
কোনো মুসলিম যদি তার ভাইকে কষ্ট না দেয়, বিপদাপদে এগিয়ে আসে এবং দুঃখ-দুর্দশা দূর করার মাধ্যমে মানবসেবায় ভূমিকা পালন করে, তার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরস্কার ঘোষণা করে বলেছেন, ‘যে তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন মেটাবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন মেটাবেন। একইভাবে যিনি কোনো মুসলিমের বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদ দূর করে দেবেন। আর যিনি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৯৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে মুসলিম কোনো বস্ত্রহীন মুসলিমকে কাপড় পরাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের সবুজ পোশাক পরাবেন। যে মুসলিম কোনো অভুক্ত মুসলমানকে আহার করাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের ফলফলাদি খাওয়াবেন...।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৮২)
মানুষকে কষ্ট দেওয়া গুনাহের কাজ। সেটা কথা, কাজ কিংবা অন্য যেকোনো মাধ্যমে হোক না কেন। প্রকৃত মুমিন-মুসলমান কাউকে কষ্ট দিতে পারে না। সে সব সময় মানুষের কল্যাণ কামনা করবে। মানুষের ভালো চাইবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে সব মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ১০)
হাক্কুল ইবাদ হিসেবে একজন মুসলিমের প্রতি অন্যান্য মুসলিমের কি কি দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, এ ব্যাপারেও ইসলামে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে; যা মানা সবার জন্য অবশ্য কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক মুমিনের জন্য আরেক মুমিনের ওপর ছয়টি হক রয়েছে। যথা—১. সে অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাবে, ২. মারা গেলে তার জানাজায় উপস্থিত হবে, ৩. ডাকলে তাতে সাড়া দেবে, ৪. তার সঙ্গে দেখা হলে তাকে সালাম করবে, ৫. সে হাঁচি দিলে তার জবাব দেবে এবং ৬. তার অনুপস্থিতি কিংবা উপস্থিতি সব অবস্থায় তার শুভ কামনা করবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৭৩৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে যেমন এর প্রতি সচেষ্ট ছিলেন, তেমনি এর প্রতি গুরুত্ব প্রদানে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে অবস্থান করে সৌহার্দ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠার প্রতি গুরুত্ব প্রদানে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পর ধোঁকাবাজি করো না, পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করো না, একে অপরের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অগোচরে শত্রুতা করো না এবং একে অন্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর ক্রয়-বিক্রয়ের চেষ্টা করবে না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে থাকো। এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই।’ (মুসলিম, হাদিস: ৬৪৩৫)
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে বান্দার অধিকার রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এ অধিকার আদায়ে সবার সচেষ্ট থাকা উচিত। কোনো কারণে যদি লঙ্ঘিত হয়, তা হলে জীবিতাবস্থায় সঙ্গে সঙ্গে এর হক পূর্ণ করা আবশ্যক। তবেই দুনিয়ার জীবন যেমন মঙ্গলময় হবে, তেমনি আখেরাত হবে কল্যাণকর। কিয়ামতের দিনে বান্দার সব কাজের বিচারকাজ সংঘটিত হবে। আল্লাহ আমাদের সব ধরনের হক আদায়ের তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম