হাজরে আসওয়াদ মূলত পাথরের একটি একক অংশ ছিল; তবে আজ বেশ কয়েকটি টুকরো নিয়ে গঠিত; যা একসঙ্গে সিমেন্ট করা বা জোড়া দেওয়া হয়েছে। এগুলো একটি রুপালি ফ্রেমে বেষ্টিত। যা কাবার বাইরের দেয়ালে রুপার নখর দ্বারা বাঁধা। কাবার দক্ষিণ-পূর্বকোণে একটি খাঁটি রুপার ফ্রেমে হাজরে আসওয়াদ লাগানো।
হাজরে আসওয়াদ একটি কালো রঙের প্রাচীন পাথর; যা মাতাফ থেকে দেড় মিটার (চার ফুট) উঁচুতে অবস্থিত। আদম (আ.)-এর সময়কালের বলে কালো পাথরের উল্লেখ করা হয়। আবার অন্য সূত্র বলে, ইবরাহিম (আ.) কাবা নির্মাণকালে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে পাথরটি পান। কাবাঘর ইবরাহিম (আ.) ও তার ছেলে ইসমাইল (আ.) পুনর্নির্মাণ করেন। হজের সময় তীর্থযাত্রীরা এ স্থাপনার চারদিকে প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় তারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা চুম্বন করেন।
সাদা থেকে কালো পাথর
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হাজরে আসওয়াদ একটি জান্নাতি পাথর। এর রং দুধের চেয়ে বেশি সাদা ছিল। এরপর বনি আদমের পাপরাশি এটি কালো বানিয়ে দিয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৮৭৭)
আরেক হাদিসে আছে, ‘হাজরে আসওয়াদ জান্নাতেরই একটি অংশ।’ (ইবনে খুজায়মা, হাদিস: ৪/২২০)
হাজরে আসওয়াদ চুম্বন
কাবাঘর তাওয়াফ এবং প্রদক্ষিণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করা সুন্নত। মুসলিম নারী-পুরুষের কাছে এ পাথর মূল্যবান। বায়তুল্লাহ তাওয়াফের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের বিধান থাকলেও ভিড় ঠেলে ভীষণ কষ্ট স্বীকার করে সরাসরি চুম্বন করতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়। তবে করতে পারলে ভালো। যদি সরাসরি চুম্বন করা সম্ভব না হয়, তাহলে ডান হাত দিয়ে ইশারা করলেও হবে। প্রতি চক্করে হাজরে আসওয়াদ বরাবর এসে সরাসরি বা ইশারায় চুমু খাওয়ার সময় ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলা ভালো। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাওয়াফের মধ্যে যখনই হাজরে আসওয়াদের কাছে আসতেন, তাকবির তথা আল্লাহু আকবার বলে চুমু দিতেন বা লাঠি ইত্যাদি দিয়ে ইশারা করতেন।
হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের ফজিলত
শরিয়তে মর্যাদাপূর্ণ এ পাথরে সরাসরি বা ইশারার মাধ্যমে চুমু দেওয়ার বিধান রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, এ দুটি রোকন (হাজরে আসওয়াদ ও রোকনে ইয়ামানি) স্পর্শ গুনাহগুলো মুছে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৯৫৯)
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন তার একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট থাকবে। বায়তুল্লাহর জিয়ারতকারীরা কে কোন নিয়তে তাকে চুম্বন করেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে।’ (ইবনে খুজায়মা, হাদিস: ৪/২২১)
হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস
ইসলামপূর্ব কোরাইশদের যুগে কাবা শরিফের গিলাফ যখন পুড়ে গিয়েছিল, তখন হাজরে আসওয়াদও পুড়ে গিয়েছিল। ফলে এর কৃষ্ণতা আরও বেড়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুয়তপূর্ব সময়ে কাবা পুনর্নির্মাণের পর হাজরে আসওয়াদ আগের স্থানে কে বসাবেন, তা নিয়ে কুরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধেছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের গায়ের চাদর খুলে তাতে হাজরে আসওয়াদ রেখে সব গোত্রপ্রধানকে চাদর ধরতে বলেন। গোত্রপ্রধানরা চাদরটি ধরে কাবাচত্বর পর্যন্ত নিয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে তা কাবার দেয়ালে স্থাপন করেন। এভাবে দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর শাসনামলে (৬১-৭১ হি.) হাজরে আসওয়াদ ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি তা রুপা দিয়ে বাঁধাই করেন। তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী। ১৭৯ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ হাজরে আসওয়াদকে হীরা দিয়ে ছিদ্র করে রুপা দিয়ে ঢালাই করেন। ৩১৭ হিজরিতে কারামতিয়ারা হারাম শরিফে অতর্কিত আক্রমণ করে হাজরে আসওয়াদ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে ৩৩২ হিজরিতে ফিরিয়ে এনে চুনা দিয়ে তার চারপাশ এঁটে দেওয়া হয়। ৪১৩ হিজরিতে এক নাস্তিক লৌহ শলাকা দ্বারা হাজরে আসওয়াদের ওপর হামলে পড়ে। ফলে তা ছিদ্র হয়ে যায়। এরপর বনি শাইবার কিছু লোক তার ভগ্নাংশগুলো একত্রিত করে কস্তুরি দ্বারা ধুয়ে তার টুকরোগুলো আবার জোড়া লাগায়। ১৩৩১ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মদ রাশাদ হাজরে আসওয়াদের চারপাশে রুপার একটি নতুন বেষ্টনী তৈরি করে দেন। ১৩৫১ হিজরির এপ্রিলের ১৮ তারিখে বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আলেম-ওলামাসহ কাবা শরিফে উপস্থিত হন। হাজরে আসওয়াদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তাতে মেশকে আম্বরের মতো মূল্যবান পাথর সংযুক্ত করেন। অবশেষে ১৪১৭ হিজরিতে পবিত্র কাবাঘরের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদের বিশেষ রুপার দ্বারা নতুন বেষ্টনী স্থাপিত হয়।
হাজিদের করণীয়
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলিমরা কাবা শরিফে হজ পালন করতে আসেন। প্রায় সবারই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বনের মুহূর্তে বেশ কিছু অসতর্কতা পরিলক্ষিত হয়। কারও জবরদস্তিমূলক চুম্বন বা স্পর্শের চেষ্টায় যেন অন্য কোনো মুমিনের ক্ষতি না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্য কেউ যেন মনে আঘাত না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। গুনাহ মাফ করাতে গিয়ে যেন আরও গুনাহের বোঝা মাথায় করে ফিরতে না হয়, খেয়াল রাখতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যেসব লোক বিনা দোষে মুমিন নারী-পুরুষকে কষ্ট দেয়, তারা অতি বড় একটা মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট গুনাহের বোঝা মাথায় তুলে নেয়।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫৮)
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক