ভুল করা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধন করে দেওয়া অন্য মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে কার্যকর পদ্ধতিতে অন্যের ভুল শুধরে দিতেন। ফলে ব্যক্তি খুব দ্রুত ভুল থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পেত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভুল শুধরে দেওয়ার পাঁচটি পদ্ধতির কথা তুলে ধরা হলো,
তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য নয়: কেউ ভুল করলে তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। ভুলের জন্য অপমান করা, লজ্জা দেওয়া, ট্রল বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা সমীচীন নয়। মুয়াবিয়া ইবনে হাকাম (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে নামাজে ছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি হাঁচি দেয়। আমি তার উত্তরে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলি। উপস্থিত লোকজন আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে থাকলে আমি চুপ হয়ে যাই। রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করে আমাকে ডাকলেন। তিনি (নামাজে অবাঞ্ছিত কথাবার্তার জন্য) আমাকে তিরস্কারও করলেন না এবং কটুকথাও বললেন না। আমি তাঁর আগে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক দেখিনি। তিনি শুধু বললেন, আমাদের জন্য নামাজে কথা বলা সমীচীন নয়। নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির এবং কোরআন তেলাওয়াতের সমষ্টি।’ (মুসলিম, ৫৩৭)
ভালোবাসায় ভুল সংশোধন: একদিন গ্রামে বসবাসকারী এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদে প্রবেশ করল। এরপর মসজিদের মেঝেতে প্রস্রাব করে দিল। সাহাবিরা তাকে থামাতে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাকে বাধা দিয়ো না; বরং ছেড়ে দাও। একপর্যায়ে সে প্রস্রাব সেরে নিল। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে নম্রভাবে সংশোধন করে বললেন, ‘আমরা মসজিদে প্রস্রাব করি না। এই ঘরগুলো ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণের জন্য তৈরি করা হয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ, ৫২৯ )
ভুলের সঠিক বিকল্প বলা: অনেক সময় আমরা ভুল ধরতে গিয়ে এর সঠিক বিকল্পের সন্ধান দিই না। ফলে তা তেমন ফলপ্রসূ হয় না। ভুলের উত্তম বিকল্প বলে দেওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার মসজিদে কেবলার দিকে (দেয়ালে) কফ দেখলেন। এটা তাঁর কাছে কষ্টদায়ক মনে হলো। তাঁর চেহারায় তা ফুটে উঠল। তিনি উঠে গিয়ে হাত দিয়ে তা পরিষ্কার করে বললেন, তোমাদের কেউ যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন সে তার রবের সঙ্গে একান্তে কথা বলে। কাজেই তোমাদের কেউ যেন কেবলার দিকে থুথু না ফেলে। বরং সে যেন তার বাম দিকে অথবা পায়ের নিচে তা ফেলে। অতঃপর চাদরের আঁচল নিয়ে তাতে তিনি থুথু ফেললেন এবং এর এক অংশকে অন্য অংশের ওপর ভাঁজ করে বললেন, অথবা সে এমন করবে।’ (বুখারি, ৪০৫)
বিবেকবোধ জাগিয়ে তোলা: ভুলকারীর সঙ্গে রূঢ় আচরণ না করে বোঝানোর মাধ্যমে তার বিবেকবোধ জাগ্রত করা উচিত। এক যুবক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। এটা শুনে লোকজন তার প্রতি উত্তেজিত হয়ে ধমক দিল এবং চুপ করতে বলল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি কি এটা তোমার মা-বোন বা মেয়ের জন্য পছন্দ করো? যুবক জবাব দিল, আল্লাহর শপথ, তা কখনো পছন্দ করি না। তখন তিনি বললেন, তদ্রুপ লোকেরাও তাদের মা-বোন বা মেয়ের জন্য তা পছন্দ করে না। এরপর তিনি তার বুকে হাত রেখে বললেন, ‘হে আল্লাহ, তার গুনাহ ক্ষমা করে দিন, তার মনকে পবিত্র করুন এবং তার লজ্জাস্থানের হেফাজত করুন।’ বর্ণনাকারী সাহাবি বলেন, এরপর এ যুবককে কারও প্রতি তাকাতে দেখা যেত না।’ (শুয়াবুল ঈমান, ৫৪১৫)
ভুলের ভয়াবহতা জানানো: ভুলের শাস্তি বা ভয়াবহতা সম্পর্কে জানালে অনেকেই তা থেকে বিরত থাকতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) কাউকে ভুল করতে দেখলে শাস্তি সম্পর্কে বলে দিতেন। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নামাজে দাঁড়াতে যাবেন, এ সময় এক সাহাবিকে দেখলেন, সে নামাজের কাতার থেকে আগে বেড়ে গেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তোমরা অবশ্যই কাতার সোজা করে দাঁড়াবে। অন্যথায় আল্লাহও তোমাদের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করে দেবেন।’ (বুখারি, ৪৩৬)
লেখক : খতিব, গাবতলী বাগবাড়ি জামে মসজিদ, ঢাকা