মুহাম্মাদ (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জগৎবাসীর জন্য আদর্শ। মানবজীবনে যত ভালো গুণাবলির প্রয়োজন, সব গুণাবলির সমাবেশ ঘটেছিল মহানবি (সা.)-এর জীবনে। তিনি যখন শৈশব অতিক্রম করে ১৪ বা ১৫ বছর বয়সে পড়লেন, তখন আরবের কুরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। নিষিদ্ধ মাস ও বায়তুল্লাহর পবিত্র হারামের বিধিনিষেধ অমান্য করায় ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধকে ‘হারবুল ফুজ্জার’ বা অন্যায় যুদ্ধ নামে চিহ্নিত করেছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। তখন মুহাম্মাদ (সা.) সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুবকদের নিয়ে হিলফুল ফুজুল নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের অঙ্গীকার ছিল সামাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা, অন্যায়-অত্যাচার প্রতিরোধ, মানুষের জীবন-সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান ও অসহায়কে সাহায্য করা। তাঁর কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল।
মহানবি (সা.) নবুয়ত লাভের পর হিলফুল ফুজুল প্রতিষ্ঠার পর গৃহীত অঙ্গীকারের বিষয়টি আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি একটি অঙ্গীকারে উপস্থিত ছিলাম, যা আমার কাছে লাল উটের চেয়ে প্রিয়। যদি ইসলাম আগমনের পরও আমাকে এ কাজের জন্য আহ্বান করা হতো, তবে আমি সাড়া দিতাম।’
চাচা আবু তালেবের পরামর্শে বিশ বছর বয়সে মক্কার ধনবতী নারী খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায় যুক্ত হন মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি খাদিজা (রা.)-এর প্রতিনিধি হয়ে সিরিয়া ও ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
মুহাম্মাদ (সা.)-এর সততা, দক্ষতা ও চরিত্র-মাধুর্যে বিমুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) বিবাহের প্রস্তাব দিলে ২৫ বছর বয়সে খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি।
মহানবী (সা.) সব সময় মূর্তিপূজার বিরোধিতা করতেন। জীবনে তিনি কখনো প্রতিমা পূজা করেননি। কোনো দেব-দেবীর প্রসাদ ভক্ষণ করেননি। একবার কুরাইশ পৌত্তলিকরা তাদের দেবীর নামে বলি দেওয়া পশুর গোশত তাঁকে খেতে দিয়েছিল। তিনি তা প্রত্যাখ্যান এবং খেতে অস্বীকার করেন। এভাবে নবুয়তের আগেই পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচরণ করে একটি বিশেষ অবস্থানে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।
যুবক মুহাম্মাদ (সা.) এর চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, নম্রতা, ভদ্রতা, বদান্যতা, উদারতা, কর্মদক্ষতা, বিচক্ষণতা, সততা-বিশ্বস্ততা সবই ছিল অতুলনীয়। যে কারণে সবাই তাঁর সিদ্ধান্ত কল্পনাতীতভাবে মেনে নিত। একবার হাজরে আসওয়াদ কালো পাথর স্থাপন করা নিয়ে কয়েকটি গোত্রের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় মুহাম্মাদ (সা.) এখানে আগমন করলেন। হাজরে আসওয়াদ স্থাপনে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান তিনি এমনভাবে দিলেন, যাতে কারও কোনো আপত্তি থাকল না।
মহানবি (সা.) সব সময় যুবকদের প্রাধান্য দিতেন। যুবকদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতেন। তিনি প্রথমে মদিনায় দ্বীনের দাওয়াত ও ইসলামি শিক্ষার জন্য যুবক সাহাবি মুসয়াব বিন উমায়ের (রা.)-কে পাঠান। হিজরতের সময় তিনি যুবক সাহাবি আলি (রা.)-কে মক্কাবাসীর কাছে গচ্ছিত আমানত পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের যত্ন নিতেন, খোঁজ-খবর নিতেন। তরুণ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। একবার তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি একে কিতাবের জ্ঞান দান করুন।’ (বুখারি, হাদিস: ৭০৫৪)
যুবকদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা যাদের আরশের নিচে স্থান দেবেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলো সেই যুবকরা, যাদের জীবন গড়ে উঠেছে আল্লাহর আনুগত্যে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
লেখক: সহকারী শিক্ষক, সৈয়দ হাতিম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সাদিপুর, সিলেট