অন্যান্য মাসে আমাদের মাঝে যে ভুল-ভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়, তা বিশেষভাবে আমরা রমজান মাসেও অব্যাহত রাখি। আশঙ্কা হয় যে, আল্লাহ না করুন- এই উদাসীনতা ও ভুল-ভ্রান্তির কারণে আমরা হাদিসে বর্ণিত সর্তকবার্তার আওতায় পড়ে যাই কি না। আল্লাহ এমন ফয়সালা না করুন!
সর্বপ্রথম ভুল হলো, এই পবিত্র মাসের যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুধাবন না করা। প্রকৃতপক্ষে এ মাসটির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে সারা বছরের কলুষতা, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পূত-পবিত্র করতে চান। তাই এ মাসের প্রকৃত দাবি কেবল রোজা ও তারাবির নামাজ আদায় করলেই পূর্ণ হবে না। বরং এ মাসের মৌলিক দাবি এটাই যে, এই পুরো মাসটিতে আল্লাহতায়ালার সব ধরনের নাফরমানি ও অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রেখে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করা।
রমজান মাসে রোজা রাখার কারণে মানুষ পানাহারের ন্যায় অতিপ্রয়োজনীয় হালাল বস্তুসমূহ বর্জন করে। কিন্তু যেসব কাজকর্ম রমজান ছাড়া অন্য মাসেও অবৈধ ও হারামরূপে স্বীকৃত, তা যদি রোজা রাখা অবস্থায়ও বর্জন করার চেষ্টা করা না হয়, তবে এটা হবে রোজার সাথে ঠাট্টা ও উপহাসস্বরূপ। যেমন হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘এমন রোজা দ্বারা উপবাস থাকা ব্যতীত আর কোনো উপকার সাধিত হয় না।’ তাই রমজান মাসের প্রকৃত দাবি এটাই যে, মহিমান্বিত এ মাসটিতে দুনিয়াবি সব চাহিদা ও কর্মব্যস্ততা থেকে নিজেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রতি নিবিষ্ট হওয়া। জাগতিক কর্মব্যস্ততা, অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা পূরণের জন্য তো সারা বছরই রয়েছে। অন্য এগারোটি মাস এ-জাতীয় কাজ-কর্মেই বেশি ব্যয় হয়। কিন্তু রহমত ও বরকতের এই অনুপম ও অতুলনীয় মুহূর্তগুলো তো সারা বছরে পাওয়া যাবে না। এই মহামূল্যবান দিনগুলো আর কখনো ফিরবে না। যখন এভাবে রোজা পালন করা হবে, তখন এর সাথে চোখ, কান, মুখ এবং অন্তরের রোজাও পালন হয়ে যাবে। ফলে আল্লাহর দেওয়া যন্ত্রগুলোকে নাফরমানি ও অবাধ্যতায় ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত রাখা যাবে। এতে মানুষের ইন্দ্রিয়শক্তিগুলো সংযত হয়ে গুনাহ থেকে নিবৃত্ত হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় ভুল হলো, আমরা তো কয়েক ঘণ্টার জন্য পানাহার বর্জন করে রোজা পালন করে থাকি, কিন্তু মিথ্যা বলা, গিবত করা, দুর্নীতি করা, গান-বাদ্য করা, সুদ-ঘুষের লেনদেন করা, প্রতারণা করা, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, গালিগালাজ করা এবং এ-জাতীয় অন্যান্য গুনাহ থেকে বিরত থাকার প্রতি কোনো গুরুত্ব দিই না। এমনকি এসব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার কোনো চেষ্টাই করি না। তদুপরি আমরা রমজান মাসে নানা ধরনের অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের বোঝা জমা করে রাখি। যেহেতু বৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ দ্বারা এ-জাতীয় ব্যয়ভার নির্বাহ করা সম্ভব হয় না, সেহেতু বাধ্য হয়ে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। না-জায়েজ টাকা-পয়সার লেনদেন বৃদ্ধি করি। ফলে পবিত্র রমজান মাসেও সুদ-ঘুষের লেনদেন অব্যাহত থাকে। ব্যবসায়ীরা রোজা রাখা অবস্থায়ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানো, ওজনে কম-বেশি করা, প্রতারণা করা, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের পথ পরিহার করে না। মোট কথা, রমজান মাসেও দুনিয়া লাভের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং পার্থিব স্বার্থে লুটপাট ও অবৈধ উপার্জনের মন-মানসিকতার মধ্যে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি হয় না। আবার আমাদের মধ্যে এমন অনেক লোক আছেন, যারা এ-জাতীয় পাপ ও অন্যায়-অপকর্মে হয়তো লিপ্ত নয়। তবে পবিত্র রমজান মাসের মতো অতি মূল্যবান মাসে সময় ও মুহূর্তগুলোকে গল্প-গুজবে আড্ডার আসর জমিয়ে, অনর্থক ও বেহুদা আলাপচারিতায় নষ্ট করে দেয়। এভাবে মিথ্যা বলা ও গিবত-পরনিন্দার মধ্যেই অনেকের মূল্যবান সময় বিনষ্ট হয়ে যায়।
হাদিস শরিফে রমজান মাসকে সংযম ও সহমর্মিতার মাস বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন অনেক লোকও আছেন, যারা কথায় কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং তুচ্ছ বিষয়েও ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। পবিত্র রমজান মাসে আমরা নিজেদের পার্থিব কাজ-কর্ম ও জাগতিক ব্যস্ততা এবং নানা চাহিদা কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে নিই। বিশেষত ব্যবসায়ী ভাইয়েরা এই মাসটিকে ‘বিশেষ উপার্জনের’ মাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাত-দিন কেবল এই ধ্যানেই মগ্ন থাকে। অনেক সময় এই ‘বিশেষ উপার্জনের’ চিন্তা, ধ্যানমগ্নতা ও ব্যস্ততার ফলে নামাজও ছুটে যায়।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক