পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটির নাম ‘তারা মসজিদ’। মসজিদটি নির্মাণ করেন মীর্জা গোলাম পীর সাহেব, যিনি এটি ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। তখন লোকমুখে এর নাম ছিল ‘মীর্জা সাহেবের মসজিদ’। ১৯২৬ সালে মসজিদটি প্রথমবারের মতো সংস্কার করা হয় এবং গম্বুজগুলোর ওপর অসংখ্য তারা ফুটিয়ে তোলা হয়। সেই থেকে এটি ‘তারা মসজিদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
মসজিদটির মাটি ছুঁয়ে থাকা দেয়াল ও মেঝে থেকে শুরু করে ছাদের ওপরের গম্বুজের চূড়ার শীর্ষ পর্যন্ত অনিন্দ্যসুন্দর নকশায় আবৃত। দুর্লভ প্রাচীন টাইলস, রঙ-বেরঙের কাচের টুকরো, চীনামাটির ফলকসহ হরেকরকমের উপকরণ দিয়ে সুনিপুণভাবে মসজিদটির ভেতর-বাইরের সর্বাঙ্গ অলংকৃত করা হয়েছে। এই নকশার পদ্ধতির নাম ‘চিনি টিকরি’। বিশেষ করে ভেতরে বাতি জ্বালালে দেয়ালে রঙিন কাচের টুকরো কেটে বসানো চিনি টিকরির নকশা এমন বর্ণিল হয়ে ওঠে যে প্রথম দর্শনে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
তবে এই মসজিদের বয়স নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন মসজিদগুলোতে সাধারণত যেমন শিলালিপি থাকে, এই মসজিদে নির্মাণকাল উল্লেখ করে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। তিন গম্বুজবিশিষ্ট তারা মসজিদটি ছোট আকারের ছিল। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ ফুট ও প্রস্থ ১২ ফুট। পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারণ করে ছাদে তিন গম্বুজের সঙ্গে আরও দুটি গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। এখন পরিবর্ধিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৭০ ফুট ও প্রস্থ ২৬ ফুট।
তারা মসজিদের ভেতরে চারটি কাতার এবং বারান্দায় আছে তিনটি কাতার। এতে প্রায় ২৮৫ জন মুসল্লি একসঙ্গে জামাতে দাঁড়াতে পারেন। ১৯২৬ সালে মসজিদটি প্রথমবারের মতো সংস্কার করেন আরমানিটোলার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আলী জান ব্যাপারী। তিনি বিপুল অর্থ খরচ করে জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নত মানের টাইলস, মার্বেলসহ মূল্যবান নির্মাণসামগ্রী এনে মীর্জা সাহেবের মসজিদটির সংস্কার করেন। এ সময় গম্বুজ ও ভেতর-বাইরের দেয়াল ফুল, লতাপাতা ও নান্দনিক নকশায় অলংকৃত করা হয়। মূল ভবনের সঙ্গে সংযুক্ত হয় বারান্দা।
মসজিদের বারান্দার সামনে সবুজ ঘাসে ছাওয়া অনেকখানি খোলা জায়গা রয়েছে, যা মাঠের মতো। মাঝখানে তারা আকৃতির ফোয়ারা। ফোয়ারার চারপাশ আর মাঠের ভেতর দিয়ে চলাচলের জন্য মার্বেল পাথরের ফলক বিছানো রাস্তা রয়েছে। মাঠসহ পুরো মসজিদটি অলংকৃত লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। অস্বীকার করার উপায় নেই, পুরান ঢাকার যানবাহনে ঠাসা সরু গলি আর গায়ে গায়ে লাগানো ঘরবাড়ি, দোকানপাটের ঘিঞ্জি পরিবেশে তারা মসজিদ সত্যিই এক দর্শনীয় নিদর্শন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক