শৈশবের কঠিন বাস্তবতায় বাবাকে হারানোর পরপরই মা আমিনার স্নেহ থেকেও বঞ্চিত হন ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.)। এর পর অভিভাবকের শূন্যস্থান পূরণ করেন তাঁর দয়ালু চাচা আবু তালিব। চাচা শুধু তাঁকে লালন-পালনই করেননি, বরং নিজের সন্তানদের মতোই ভালোবাসতেন, আগলে রাখতেন সব সময়- যেন এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল না হন প্রিয় ভাতিজা। চাচা আবু তালিবের গভীর স্নেহ-মমতায় আচ্ছাদিত ছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশব।
সমাজে তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, চরিত্র ছিল সর্বোত্তম। যা তাঁর বয়সের তুলনায় ছিল অভাবনীয়। সততা, ধৈর্য, সৌজন্য, পরিমিত ভাষা, ন্যায়নিষ্ঠা এবং মার্জিত ব্যবহার সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন মক্কার শ্রেষ্ঠ তরুণ। তাঁর এই ব্যতিক্রমী গুণাবলি দেখে তাঁর স্বজাতিই তাঁকে দিয়েছিল ‘আল-আমিন’ উপাধি, অর্থাৎ বিশ্বাসী ও নির্ভরযোগ্য। তৎকালীন সমাজে বনু লেহাব গোত্রের এক ব্যক্তি দৈহিক লক্ষণ দেখে ভাগ্য গণনা করত। কুরাইশরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জানার জন্য বনু লেহাব গোত্রের সেই গণকের কাছে ভিড় করত। একদিন চাচা আবু তালিবও শিশু মুহাম্মদকে (সা.) নিয়ে সেই ভাগ্য গণনাকারীর কাছে গেলেন। গণক শিশুটির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ গভীরভাবে ভাবলেন।
এর পর আবু তালিবকে বিশেষভাবে বললেন এই বালকের প্রতি মনোযোগ দিতে। বিশ্বনবির প্রতি গণকের এই বিশেষ আগ্রহ লক্ষ্য করে আবু তালিব কৌশলে তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যান। এতে গণক বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘তোমাদের এ কেমন কাজ! বালকটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনো। মালিকের কসম, এ এক অসাধারণ বালক!’ ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে ৫৭৯ সালে এই ঘটনা ঘটেছিল।
অন্যদিকে, ইবনু আসাকির বর্ণিত এক হৃদয়স্পর্শী ঘটনার কথা বললে আজও হৃদয় কেঁপে ওঠে। তিনি বলেন, একবার মক্কায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অনাবৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, কুরাইশরা বৃষ্টির জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে আবু তালিবের কাছে ছুটে যায়। আবু তালিব তখন এক সুদর্শন বালককে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন যেন মেঘে ঢাকা এক সূর্য। তাঁর আশপাশে আরও কিছু বালক ছিল। আবু তালিব সেই বালকটিকে নিয়ে কাবার সামনে গেলেন এবং তাঁর পিঠ কাবার দেয়ালে ঠেকিয়ে দিলেন। বালকটি তখন আকাশের দিকে নিজের আঙুল তুলে ধরলেন। আকাশে মেঘের কোনো চিহ্নও ছিল না। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ঘন মেঘে ছেয়ে গেল এবং মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। মক্কা ও তার চারপাশের প্রান্তর সজীব ও উর্বর হয়ে উঠল।
পরবর্তী সময়ে আবু তালিব এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন, যেখানে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে সুদর্শন, এতিমদের আশ্রয়দাতা ও বিধবাদের রক্ষাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁর চেহারার দিকে তাকালে বৃষ্টির করুণা নেমে আসে বলে বর্ণনা করেন। যদিও এই ঘটনার সঠিক সন-তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকলেও
তবে অধিকাংশ বর্ণনাকারী বলেন, ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে, এই সময়েই পারস্যের ন্যায়পরায়ণ সম্রাট নওশেরওয়া (খোসরু আনুশিরওয়ান) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সুবিচার, জ্ঞানচর্চা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এতটাই ইতিহাসে বিখ্যাত ও সম্মানিত ছিল যে, আরবের লোকজন তাঁর শাসনামলে জন্ম গ্রহণ করাকে গৌরব হিসেবে বিবেচনা করত। এমন এক যুগে বেড়ে উঠছিলেন আরবের বুকে এক মহান পুরুষ যিনি আনবেন জ্ঞানের আলো, ন্যায়ের সুবাতাস এবং অন্ধকারে হারানো মানবতাকে আলোর পথে ফিরিয়ে দেবেন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক